নাটকের কথা
প্রতি
হে দর্শক,
নাটকের কথা নাটকওলাদের নেপথ্যের কথা। পাতায় পাতায় লেখা নেই। এ হল মুখে মুখে চালু কথা। অনেকটা বেদের মতো, শ্রুতি নির্ভর। হ্যাঁ, নাটককে তো পঞ্চম বেদ বলা হয়। এদিকে ফিরলেই এখন শোনা কথার জোর দেখা যাবে। শোনা কথা-র ইয়ত্তা নেই। কিন্তু এই শোনা কথা তো একটু আলাদা। সেটা প্রচলিত কাব্য, ছড়া, কবিতার গোত্রে পড়ে না -- যা মুখে মুখে ফেরে। কোনও এক চারণকবির সুরে। আর রচনাকারের কথাও থাকে এক পঙক্তিতে। আর থাকে ছন্দ-পদ, আহা, তাতেই স্মৃতি-ব্যায়াম চলে।
এখন স্মৃতিরক্ষার জন্য অনেক অনেক সাহায্যকারী হয়েছে। যেমন অ্যাপ্স, টুলস ইত্যাদি। আহা, আমার তো খুবই মজা লেগেছিল যখন আমাকে আমারই পোস্ট করা জন্মদিন ফিরিয়ে দিল ওয়েব-টুলস। কি বুদ্ধি, কি স্মৃতি-ক্ষমতা! বাহবা দিতে দিতে খুশির সীমা নাই। এদিকে একটু পর খেয়াল করে দেখা গেল, শুধু আমারই জন্মদিন নয়, এরকম সহস্র-লক্ষ-কোটি-অযুত-নিযুত জন্মদিন মনে রেখেছে। এই মনে রাখার জন্য কবিতা, ছড়া, পদ্য, কাব্য এক বড় নির্ভরতার ব্যায়াম। যেখানে, সহস্র স্মৃতির শব্দরা কথায় কথায় স্মৃতির মণিকোঠায় ঠাঁই রাখে। ছোটবেলা থেকেই এই চর্চা জীবনের নানা মনে রাখা, মানে স্মৃতির কাজে লাগে।
মনে পড়ে, রবি ঠাকুরের কবিতা মুখস্থ করা একটা বাধ্যতামূলক ব্যাপার ছিল। যেখানে ক্লাস পরীক্ষার জোর ছিল বেশি। মনের আনন্দে পড়ার মতো কবিতার সঙ্গে দেখা হয় সুকুমার রায়-এর লেখায়। বাহ, ভারি মজারু। ভারি অদ্ভুত সেসব শব্দ। ছোট থেকেই তার শব্দরা নিঃশব্দে টানত। খাতায় কলমে দেওয়ালে বইয়ের মলাটে সেই টানের চিহ্নে কত না নতুন শব্দ লিখতাম। এবং ক্লাস-পরীক্ষায় গোল্লা পেতাম না, তবে লাল কালির চিহ্নে বেচারা খাতার পাতা দাগিয়ে উঠত। সেই দাগের মধ্যে শিশিরের শব্দের মতো হারিয়ে যেত নতুন শব্দরা। একটা তবুও জোর ছিল, সেই শব্দদের লিখে রাখার ব্যারাম ছিল একটা পোক্ত ডায়েরিতে। সে যে কি দারুণ ব্যাপার! বর্ষশেষে সবাই যখন ঘর সাফাই, পুরনো অতিরিক্ত জিনিস ফেলে দিত, সারাবেলার ঘামের শ্রমে, তখন এই রিক্ত বেচারার শব্দরা ঠাঁই খুঁজত এদিক-সেদিক। এক গোয়েন্দা উঁকি দিত মনের মধ্যে গোপন জায়গার তলাশে।
তবে, সুবিধে ছিল একটা বড় রকমের, বাড়িটা ছিল ঢিলেঢালা রকমের খোলা। একটা কোণে গোয়েন্দা-মন ঠিক লুকিয়ে ফেলতে পারত সেই খাতা-ডায়েরি। একদিন নেপথ্য থেকে সেই ডায়েরি বেরিয়ে হাতে এসে ঘুমিয়ে পড়ত মনের মধ্যে। এক কোণে এক শিক্ষকমশাইয়ের খাতা যেন রক্ষা করতাম প্রাণপণে। তবুও, স্মৃতির থেকে রবিবার ছিল সেই মজার ডায়েরি দেখার দিন। সেই হল সুকুমার রায়! সুকুমার রায়-এর লেখা-
“রামগরুড়ের ছানা
হাসতে তাদের মানা
হাসির কথা শুনে বলে হাসব না-না না-না...!”
এভাবেই আরও সব মনে মনে আওড়াতাম।

যেমন, হাসজারু, কুমড়োপটাশ ... মনে পড়ল কুমড়ো মাথায় নিয়ে পটাশের চেহারা বুঝতে সিঁড়ি দিয়ে উঠতাম-নামতাম। আর অন্য ভাইবোনেরা হাসত। না, আমাদের হাসতে মানা ছিল না। কিন্তু হাসতে মানা ছিল পড়ার সময়, খাওয়ার সময়। কিন্তু ঘুমনোর আগে স্মৃতির জানলা খুলে দিলে চলে আসত এইসব মজারুরা। সজারু চিড়িয়াখানায় দেখেছিলাম। আর হাঁস যত্রতত্র। বেচারা হাঁসের উপর চেপে বসবে একটা সজারু? এটা ভেবেই মাথা চক্কর দেয়। আর ঘুমিয়ে পড়তে হয় নিয়মাফিক। কিন্তু, চিড়িয়াখানায় দেখা জীবদের সঙ্গে সুকুমার রায়ের আমার আগেই দেখা হয়েছিল। তাই, উনি সুবিধেমতো এত শব্দ বানালেন। এখন, আমাদের ছোটবেলায় ইস্কুলে পাড়ায় বাড়িতে নাটকের বিচিত্র মহলা চলত। স্ক্রিপ্ট করা নাটক শুধু নয়, আমরা কবিতা নিয়েই নাটক পেয়েছি। যেমন, রবি ঠাকুরের লেখাগুলো রয়েছিল। সেরকম সব তো আর হয় না। কবিতা হল কবিতা ... কিন্তু কবিতার মধ্যে নাটকের কত না উপাদান!
সেই শব্দগুলো মাথার মধ্যে চলেফিরে বিচিত্র নাটক তৈরি করত। আমাদের কবিতার মধ্যে একটা নাটকীয় উত্তাপ তখন হত। যেমন, "ভয় পেয়ো না"। আমরা মারামারি করতাম খুবই। কিন্তু বলতাম, " ভয় পেয়ো না ভয় পেয়ো না তোমায় আমি মারব না।"
হ্যাঁ, এটা বিচিত্রভাবে বলতাম। কোনও ব্যাকরণ জানা না থাকায় কখনও ভয় পেয়েই শব্দগুলোর মানে পাল্টে যেত। আবার, কোনও শব্দের মধ্যে এমনই পাক খেতাম যে, অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসি এমনিই পেত দর্শকের।
অভিনেতাকে অ বা এ শেখান যায় না। বিশেষত ছোট থেকে এর কোন ক্লাস হয় না ইস্কুলে। বিশেষত এর কোনও বই হয় না। পাড়ায় পাড়ায় যেভাবে নাচ গান আঁকা ব্যায়াম শেখার স্কুল হয় – তেমন নাটক শেখার নেই... নেই নেই। হ্যাঁ, এখন এই আপ-শো-শ মেনে নিয়েই নাটক করতে পারাদের দল তৈরি করা। সেই দলে ছোটদের মতো চরিত্র থাকে কম। কিন্তু, যেসময়ের কথা মনে পড়ছে সেখানে ছোটদের জন্য যে লেখা, সেখান থেকেই শিক্ষকরা নাটকীয় চরিত্র তৈরি করতেন। কখনও ইস্কুলের সাদা নিটোল থামে আলো থেমে থাকত। এর মধ্যে রথের মেলার সময়, বৃষ্টিকাল। প্রকৃতি পাল্টে যায় কালের নিয়মে।
হাঁসগুলো ভিজে সারা? কই হাঁসের গায়ে জল লাগে না কেন? পাখিদের মতো হাঁস ভিজেও ভেজে না। অনেক পরে বিজ্ঞানের এই পাখিদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব জেনেছিলাম। আমাদের ভিজে গেলে বৃষ্টিতে স্কুল ছুটি হয়ে যেত। আর আমরা বৃষ্টিফোঁটার মতো লাফিয়ে উঠতাম। সেই অনাবিল অভিনয় ছিল আমাদের স্কুলের উঠোনে- রাস্তায়। তবে সেই অভিনয়ের দর্শক ছিল কেবলমাত্র ওই তখনের সঙ্গে থাকারাই, মানে যারা আমরা ভিজছি, তারাই। এখন অভিনয় মানেটা এমন ছিল যে, মনে মনে ডাকতাম, "আয় বৃষ্টি ঝেঁপে"। সেই চুপ-সংলাপের মধ্যে আসল-নকলের বৃষ্টি ঢুকে পড়ত। আমাদের ইস্কুলের মজার বেলাটা এখন ভাবলে মনে হয় নাটকীয়তায় ভরা ছিল।
ভাইবোন আর দাদাদিদি, পিসি-কাকা নিয়ে আমাদের নাটকের দল। বাড়ির নাটক। আগেই লিখেছিলাম যে, বাড়ির ছাদে চৌকি ঢেকে চারটে কাপড়, বিছানার চাদর দিয়ে শামিয়ানা। তারসঙ্গে শাড়ি দিয়ে হত উইংস। আমাদের ছোট মঞ্চে দুটো উইংয়েই কাজ চলে যেত। আর আলো থাকত সেই হলদে বাল্ব। তার দিয়ে টেনে হত লাইন, তারমধ্যে দুলত চারটে হলদে বাল্ব। এটা নাটক। আমাদের মঞ্চ। আমাদের পার্টগুলো মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে আমরা সাজসজ্জা করতাম। থিম সুকুমার রায় ধরলে আমাদের সাজের বাহার দেখে সহ-অভিনেতারা হাসত। এখানে হাসিতে হাসিতে গোঁফ খুলে ঝুলে আসত। তাই দেখে আবার আমরা হাসতাম। নাটকের অন্দরমহলের কথা এত বেশি করে খুশি দিচ্ছি যে... আরেকটা ঘটনা লিখি।
নাটকের কথা আলোচনা হচ্ছে শ্রীমতী অলকনন্দা রায় ব্যানার্জি-র সঙ্গে। সেই ছোটবেলা। তিনিও সুকুমার রায়-এর নাটকের অভিনেতা। তিনি ও তাঁর ভাইবোনেদের দিয়ে সুকুমার রায়ের ‘হযবরল’-তে নাটক করিয়েছিলেন। নাটকের নির্দেশক তাঁর মাসি নিবেদিতা দাস। পারিবারিক নাটক! হ্যাঁ, পারিবারিক। নিবেদিতা দাস-এর বাড়ির উঠোনে বিস্তর জায়গা ছিল। সেখানেই হত এই নাটকগুলো।
অলকনন্দা ‘হিজিবিজ’ পার্ট বলতে বলতে খুব হেসেছিলেন সেবার। কী কী হয়েছিল নিবেদিতা দাস-এর সেই নাটকে। বড় মজার! মাসি নিবেদিতা দাস, গেঞ্জি কেটে রং করে মাথার মাপে সেলাই করে উইগ বানিয়েছিলেন ন্যাড়া সাজাতে। তিনি ছোটদের শেখাতেন কী করে একটা চরিত্র হয়ে উঠতে হয়। পরে বুঝেছিলেন বডি ল্যাঙ্গোয়েজ বলে এটাকে। ওইভাবেই শেখা নাটকের সেই চরিত্রটা হয়ে ওঠা। তাঁর মাসির থেকে তাঁর অনেকটাই শেখা। যদিও ছোটবেলার কথা, নাটকের ব্যাপারটা তখন এত সিরিয়াস কিছু ছিল না, বিশেষত ছোটদের নাটকে ভুলত্রুটি হতেই পারে। তবে, দেখা যেত ছোটদের নাটক জমে ক্ষীর। একবার মনে আছে, আমাদের নাটক শ্রেষ্ঠ নাটকের পুরস্কারও পেয়েছিল। হতেই পারে! নিবেদিতা দাস বড় মাপের শিল্পী। উঠলই যখন তাঁর কথা... দুকথা লেখা যায়। তিনি আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন গ্রুপ থিয়েটারের সঙ্গে। তাঁর প্রতিষ্ঠা করা দলের নাম ‘শৌভনিক’। হ্যাঁ, তিনি মঞ্চও তৈরি করেছিলেন।
মন খারাপের বিভিন্ন সময়ে সুকুমার রায় আজও হাসিয়ে দেন মনে মনে। তবে, সুকুমারের লেখা নাটকও তো রয়েছে। স্মৃতিঝাঁপি থেকে ... ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল, ‘ঝালাপালা’, ‘অবাক জলপান, ‘চলচ্চিত্তচঞ্চরী’, ‘শব্দকল্পদ্রুম’। আর কবিতাগুলোও তো নাটক হয়ে গেছে যেমন, ‘খাইখাই’, ‘বাপুরাম সাপুড়ে’ এবং আরও কত কবিতার লাইন থেকেই জন্ম নিয়েছে নাটক।
ইতি--একুশ শতকের ফ্ল্যাশব্যাক সত্ত্বাধিকারী



0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন