![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৯ |
উমাপতি
মাথার ঠিক ওপরে এখন সূর্য। লম্বালম্বি রোদ হামলে পড়ছে যেন! যাকে বলে চাঁদিফাটা গরম। অথচ এই গরমে হাঁটতে হচ্ছে উমাপতিকে। না হেঁটে উপায় নেই। বাড়ি থেকে ভোররাতে বেরিয়ে ট্রেন ধরে অনেকটা পথ আসা গেছে। কিন্তু তারপর আর ট্রেনে যাবার উপায় নেই, কেননা গ্রামে যাবার রেলপথ নেই। এমন কি বাসরুটও নেই। অগত্যা হেঁটেই যেতে হবে। পৌঁছতে সন্ধ্যে নির্ঘাত।
খবরটা পেয়েছে গতকাল, পার্বতী আর নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন রোগে ভুগছিল। ভুগে ভুগে শরীরটা কঙ্কালসার হয়ে গেছিল। জীবনীশক্তি ফুরিয়ে আসছিল। হারিয়ে যাচ্ছিল আর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাও। অথচ বয়স যে খুব একটা হয়েছিল, তা নয়। এই বছর পঞ্চাশ। উমাপতি এসব খবর আগেই পেয়েছিল। কিন্তু একবার দেখতে আসার ফুরসৎ আর হয়নি। একদিকে অফিসে বিশাল কাজের চাপ। অন্যদিকে নতুন সংসারের রকমারি ক্যাচাল।
পার্বতীর সঙ্গে বিয়েটা অবশ্য অনেকটা আগের ব্যাপার, তা প্রায় পঁচিশবছর হলো। পার্বতী দেশের বাড়ি অর্থাৎ গ্রামেই থাকে। গ্রামটাও নেহাতই যাকে বলে অজ-পাড়াগাঁ। উমাপতিকে বিয়ের আগেই শহরে চাকরিসূত্রে আসতে হয়েছিল। পার্বতীকে নিয়ে আসা হয়নি, বাড়িতে বয়স্ক মা-বাবা, তাদের দেখবে কে? তাছাড়া জমিজমাও দেখা্র আছে। তবে তখন মাঝেমধ্যেই ছুটি ম্যানেজ করে গ্রামে আসত। আর এভাবেই তো চারটে ছেলেমেয়ের বাবাও হয়েছিল। কিন্তু তারপরেই ঘটেছিল ছন্দপতন। এতটা সময়ের ব্যবধানে স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হওয়া এবং সংসার করা পোষাচ্ছিল না। তাই শেষপর্যন্ত বেপরোয়া হয়ে দ্বিতীয় বিয়েটা সেরেই ফেলেছিল। সুখবরটা অবশ্য গ্রামের বাড়িতে জানানো হয়নি। দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম দুর্গা, ইতিমধ্যেই সে আরও দুবার উমাপতিকে বাবা হবার গৌরবদান করেছে।
উমাপতি যখন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছল তখন তার চেহারা কচুপোড়া বলে মনে হচ্ছে। শোকের বাড়ি। মা-বাবা আর তার চার ছেলেমেয়ে উমাপতিকে কাছে পেয়ে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। পার্বতীকে তখন সৎকারের জন্য নিয়ে যাবার তোড়জোড় চলছে। একেই মৃতদেহ বাসী, উমাপতির জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছিল। উমাপতি শুনল, পার্বতী নাকি তাকে দেখার জন্য আকুল হয়ে উঠেছিল। তার অসুস্থতার খবর অনেকবারই জানানো হয়েছিল। কিন্তু উমাপতির ফুরসৎ হয়নি। কথাটা জেনে কষ্ট হলো খুব, পার্বতীর সঙ্গে জীবিত অবস্থায় শেষ দেখাটা হলো না! যতই হোক, তার প্রথম স্ত্রী পার্বতীই তাকে প্রথম নারীসঙ্গের আস্বাদ ও সন্তানসুখ দিয়েছিল!
তখনও শ্রাদ্ধানুষ্ঠান শেষ হয়নি, উমাপতিকে তার বাবা বললেন, তোকে আর চাকরি করতে হবে না। এখানেই থেকে যাস।
আঁতকে উঠল উমাপতি।
-তুমি কী বলছ বাবা! চাকরি ছেড়ে দেব?
বাবা বললেন, হ্যাঁ, ছেড়ে দে। আমাদের প্রচুর জমিজমা আছে, চাষের কাজ খুব ভালো হচ্ছে, অনেক উপার্জন হচ্ছে। তাছাড়া তোকেই এখন এসবের দায়িত্ব নিতে হবে। আমার আর তোর মায়ের অনেক বয়স হয়ে গেল, ক’দিনই বা বাঁচব! এদিকে তোর ছেলেমেয়েরাও বড় হয়ে গেল।
উমাপতি বলল, এটা অসম্ভব।
বাবা হাসলেন।
-জানতাম, তুই তাই বলবি। এবার এসে বৌমার মরামুখ দেখেছিস, আবার যখন খবর পেয়ে আসবি, আমার আর তোর মায়ের মরামুখই দেখবি!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন