কালিমাটি অনলাইন / ১৪৬ / চতুর্দশ বর্ষ : সপ্তম সংখ্যা
শরৎ এলেই বাঙালির স্মৃতিতে কয়েকটি চিরপরিচিত ছবি ভেসে ওঠে—নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল, শিউলি আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ। যেন প্রকৃতি নিজেই উৎসবের ঘোষণা করছে। কিন্তু প্রশ্নটি অন্যত্র: এই শরৎ কি এখনও আমাদের জীবনের বাস্তব ঋতু, নাকি ক্রমশ বিজ্ঞাপন, নস্টালজিয়া এবং উৎসব-বাজারের নির্মিত একটি সাংস্কৃতিক প্রতিমা?
ঋতুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনও নিছক রোমান্টিক ছিল না। কৃষিনির্ভর বাংলায় শরৎ ছিল বর্ষার দুর্ভোগ পেরিয়ে স্বস্তির সময়। মাঠে ধান, গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং উৎসবের প্রস্তুতি—প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে মানুষের জীবন তখন প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল। আজ সেই সম্পর্ক অনেকটাই ছিন্ন। নগরায়ণ আমাদের ঋতুকে জানালার কাচের ওপারে সরিয়ে দিয়েছে। শরৎ এখন অনেকের কাছে আবহাওয়ার অভিজ্ঞতার চেয়ে সামাজিক মাধ্যমের ছবির বিষয় বেশি।
শরতের সামাজিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অবশ্য দুর্গাপূজা। বাংলায় দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামোরও প্রতিচ্ছবি। একসময় জমিদারবাড়ির পূজা ছিল প্রতিপত্তির প্রদর্শন। পরে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজা সেই উৎসবকে বৃহত্তর সমাজের হাতে তুলে দেয়। ধর্মীয় পরিসর ধীরে ধীরে নাগরিক জনপরিসরে রূপান্তরিত হয়। এই পরিবর্তনকে নিছক উৎসবের বিবর্তন বলে দেখলে ভুল হবে; এর মধ্যে রয়েছে বাংলার সামাজিক গণতন্ত্রীকরণেরও একটি ইতিহাস।
কিন্তু আজকের সর্বজনীনতার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়— সত্যিই কি উৎসব সর্বজনীন?
যে শহরে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আলোকসজ্জা হয়, সেই শহরেই বহু মানুষ উৎসবের বাজারে দাঁড়িয়ে ক্রেতা নয়, কেবল দর্শক। যে পূজা সাম্যের কথা বলে, তার আয়োজনের শ্রম বহন করেন অসংখ্য নিম্নআয়ের কর্মী, অথচ উৎসবের দৃশ্যমান গৌরবের ভাগ তাঁদের কতটা জোটে? উৎসবের অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, উৎসবের সামাজিক দায়ও তত বড় হওয়া উচিত। তা না হলে ‘সর্বজনীন’ শব্দটি কেবল ব্যানারে ব্যবহৃত একটি অলংকার হয়ে দাঁড়ায়।
আরও একটি সংকট আমাদের সামনে। জলবায়ু পরিবর্তন ঋতুচক্রের স্বাভাবিকতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শরৎ কি সত্যিই আগের মতো আসে? বর্ষার অনিয়ম, তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা, নগর দূষণ এবং প্রকৃতি ধ্বংসের ফলে সেই পরিচিত শরৎ ক্রমশ দুর্লভ। অথচ আমরা শরৎকে ভালোবাসার নামে তার প্রতীকগুলোকেই ব্যবহার করছি; তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কতটা দায় নিচ্ছি?
এইখানেই শরতের আসল রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা সহজ; সেই সৌন্দর্যের শর্তগুলি রক্ষা করা কঠিন।
শরৎ তাই শুধু কাশফুলের ঋতু নয়, আত্মসমালোচনারও ঋতু। ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে একটি ধর্মীয় উৎসব সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বর্তমান আমাদের শেখাচ্ছে, কীভাবে সেই উৎসব বাজারের বৃহৎ অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যৎ আমাদের জিজ্ঞাসা করবে—এই বিপুল আয়োজনের মাঝেও আমরা মানুষ, প্রকৃতি ও সামাজিক ন্যায়ের জায়গাটি কতটা অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছি।
শরৎ আসুক। ঢাক বাজুক, আলো জ্বলুক, উৎসব হোক। কিন্তু সেই আলোর বাইরে যে অন্ধকার রয়েছে, তার দিকেও চোখ ফেরানো দরকার। কারণ শরতের প্রকৃত সৌন্দর্য আকাশের নীলতায় নয়—সমাজ কতটা নির্মল, মানুষ কতটা সমান এবং ভবিষ্যৎ কতটা বাসযোগ্য, তার মধ্যেই তার আসল পরীক্ষা। সবাইকে জানাই শারদ শুভেচ্ছা শ্রদ্ধা ভালোবাসা এবং অভিনন্দন।
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :
kajalsen1952@gmail.com
দূরভাষ যোগাযোগ : 9835544675





