সম্পাদকীয়
কালিমাটি অনলাইন / ১৪৭ / চতুর্দশ বর্ষ : অষ্টম সংখ্যা
দুর্গাপুজো নিয়ে লিখতে বসলে আমার কাছে প্রথমেই কোনও পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় ব্যাখ্যা কিংবা কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর ছবি ভেসে ওঠে না। আমার চোখের সামনে প্রথমে আসে জামশেদপুর। যে শহরে আমার জন্ম, যে শহরের রাস্তায় আমার বড় হয়ে ওঠা, যে শহরের স্কুল-কলেজে আমার পড়াশোনা, যে শহরের মাঠে খেলাধুলো, যে শহরেই কর্মজীবনের দীর্ঘ পর্ব। আমার জীবনের সঙ্গে জামশেদপুরের সম্পর্ক তাই কেবল একটি শহরের সঙ্গে বসবাসের সম্পর্ক নয়। আমার স্মৃতি, আমার সময়বোধ, আমার মানুষ হয়ে ওঠার ভিতরেই শহরটি মিশে আছে। আর সেই কারণেই আমার দুর্গাপুজোও মূলত জামশেদপুরের দুর্গাপুজো।
আজ এত বছর পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমাদের জীবনে দুর্গাপুজো ছিল আসলে সময়কে মাপার একটি নিজস্ব ক্যালেন্ডার। পুজো আসছে মানে শরৎ আসছে, শরৎ মানে ছুটি, নতুন জামাকাপড়, পাড়ার মণ্ডপ, প্রতিমা, ঢাক, আলো, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা। পুজো মানে ছিল একটি শহরের নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা। জামশেদপুরের মতো শিল্পনগরীতে, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই কাজের সময়, কারখানার সময়, শিফটের সময় এবং নিয়মের ভিতর আবদ্ধ; দুর্গাপুজো সেই জীবনকে কয়েক দিনের জন্য অন্য এক ছন্দে নিয়ে আসত।
আমাদের ছোটবেলার পুজোর সঙ্গে আজকের পুজোর তুলনা করলে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে পরিবর্তনটি। তখন উৎসবের আড়ম্বর এত বেশি ছিল না, কিন্তু অপেক্ষা ছিল অনেক বেশি। পুজো যেন ধীরে ধীরে আসত। প্রতিমা তৈরি হওয়ার খবর, মণ্ডপ তৈরির ব্যস্ততা, পাড়ার ছেলেদের উৎসাহ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সবকিছুর মধ্যে একটা অংশগ্রহণ ছিল। আমরা শুধু দর্শক ছিলাম না; উৎসবের ভিতরেই যেন আমাদের ছোট ছোট জীবন জড়িয়ে থাকত।
জামশেদপুরের পুজোর একটি বিশেষ চরিত্র ছিল তার বহুস্বরিক সামাজিকতা। শিল্পনগরী বলে এই শহরে নানা প্রদেশ, নানা ভাষা, নানা সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। তার ভিতরে বাঙালির দুর্গাপুজো নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রাখলেও একেবারে নিজস্ব সীমানার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। উৎসবের দরজা ছিল অনেকখানি খোলা। ফলে দুর্গাপুজো ধীরে ধীরে শুধু বাঙালির ধর্মীয় উৎসব না হয়ে শহরেরও একটি সাংস্কৃতিক ঋতুতে পরিণত হয়েছিল।
সত্তর দশক থেকে আজ পর্যন্ত আমার নিজের জীবনও যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে জামশেদপুরের পুজো। বদলেছে মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, আয়োজন, অর্থের পরিমাণ, মানুষের রুচি এবং উৎসবের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক। একসময় যে পুজোর খবর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত, আজ তার ছবি মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। আগে পাড়ার মানুষ পুজোর আয়োজনের অংশ ছিলেন; এখন অনেক ক্ষেত্রে দর্শক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। আগে উৎসবের আনন্দ ছিল প্রত্যক্ষ সম্পর্কের মধ্যে; এখন তার একটি বড় অংশ দৃশ্যমানতারও আনন্দ। কিন্তু পরিবর্তনকে শুধু অবক্ষয় বলে দেখলে সময়কে বোঝা হয় না। সময়ের নিজস্ব গতি আছে। উৎসবও তার সঙ্গে বদলাবে। প্রশ্ন হল, পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে আমরা কী ধরে রাখছি এবং কী হারিয়ে ফেলছি।
আমার কাছে জামশেদপুরের দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় স্মৃতি তার মানুষেরা। আজ তাদের অনেকেই নেই। কেউ অন্য শহরে চলে গেছেন, কেউ দূরদেশে, কেউ জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে আর আমাদের মধ্যে নেই। কত মুখ, কত কণ্ঠ, কত পরিচিত রাস্তা, কত পাড়ার আড্ডা, পুজোর স্মৃতির সঙ্গে তারা যেন একসঙ্গে জেগে ওঠে। তখন বুঝতে পারি, নস্টালজিয়া আসলে অতীতের প্রতি শুধু আবেগ নয়; নস্টালজিয়া হল সময়ের কাছে মানুষের পরাজয়েরও একটি নীরব স্বীকারোক্তি। আমরা ফিরে যেতে পারি না, কিন্তু স্মৃতি আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
জামশেদপুরের মাঠের কথাও তখন মনে পড়ে। যে শহরে আমার খেলাধুলার দিনগুলি কেটেছে, সেই মাঠ এবং পুজোর মধ্যে আমার স্মৃতিতে একটি অদৃশ্য যোগ আছে। শরৎ এলেই শহর যেন অন্যরকম হয়ে উঠত। খেলার মাঠ, পাড়ার রাস্তা, পুজোমণ্ডপ সবকিছু মিলিয়ে শহরটি ছিল আমাদের জীবনের এক বিস্তৃত পরিসর। আজকের বিচ্ছিন্ন জীবনযাত্রায় সেই সমগ্রতার অভিজ্ঞতা অনেকটাই বিরল।
এই জায়গাতেই আজকের সময়ে দুর্গাপুজোর প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে অনুভব করি। প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগ বাড়িয়েছে, কিন্তু মানুষের মধ্যে দূরত্বও কখনও কখনও বাড়িয়েছে। আমরা একে অপরের খবর জানি, কিন্তু একে অপরের জীবনের ভিতরে কতটা থাকি? সামাজিক যোগাযোগের বিস্তার ঘটেছে, সামাজিকতার গভীরতা সবসময় তার সঙ্গে বাড়েনি। সেই জায়গায় পুজো এখনও মানুষকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর একটি সুযোগ।
তবে এই উৎসবকে নতুন সময়ের প্রশ্নগুলিও গ্রহণ করতে হবে। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক, এই বিশ্বাসের সঙ্গে যদি বাস্তব জীবনের নারী-নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নের কোনও সম্পর্ক না থাকে, তবে আরাধনার অর্থ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অসুরবধের পৌরাণিক কাহিনি যদি আমাদের সময়ের হিংসা, অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য ও ঘৃণার বিরুদ্ধে কোনও মানবিক অবস্থান তৈরি না করে, তবে তার প্রতীকী শক্তিও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। একইভাবে পরিবেশের কথা, অতিরিক্ত ভোগ ও প্রদর্শনের কথা, শ্রমজীবী মানুষের কথা উৎসবের ভিতরেও আজ এসব প্রশ্ন প্রবেশ করেছে।
তাই আজ জামশেদপুরের দুর্গাপুজোর কথা ভাবলে আমি একই সঙ্গে দুটি সময়কে দেখি। দেখি সেই ছেলেটিকে, যে পুজোর অপেক্ষায় থাকত; আবার দেখি আজকের মানুষটিকে, যে পেছনে ফিরে নিজের জীবনকেই দেখতে পাচ্ছে। মাঝখানে কেটে গেছে বহু দশক। শহর বদলেছে, মানুষ বদলেছে, পুজো বদলেছে, আমিও বদলেছি। কিন্তু আশ্চর্যভাবে শরৎ এলেই কোথাও যেন সেই পুরনো জামশেদপুর আবার ফিরে আসে।
সম্ভবত এটাই উৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি, সে অতীতকে হুবহু ফিরিয়ে আনে না, কিন্তু অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি কথোপকথন তৈরি করে।
আজ যখন প্রতিমার সামনে দাঁড়াই, তখন শুধু দেবীর মুখ দেখি না; দেখতে পাই আমার নিজের জীবনের বহু মুখ। দেখতে পাই হারিয়ে যাওয়া মানুষ, পুরনো পাড়া, খেলার মাঠ, কৈশোরের উত্তেজনা, যৌবনের স্বপ্ন, কর্মজীবনের ব্যস্ততা। আর দেখতে পাই একটি শহরকে, যে শহর আমাকে তৈরি করেছে। দুর্গাপুজো তাই আমার কাছে কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, কেবল স্মৃতিও নয়। এটি আমার জীবনের সময়কে ফিরে দেখার একটি জানালা। জামশেদপুরের শরৎ সেই জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে বদলে যাওয়া শহর, বদলে যাওয়া মানুষ এবং বদলে যাওয়া সময়কে নিয়ে।
দেবী আসেন, কয়েক দিনের জন্য শহরকে অন্য আলোয় ভরিয়ে দেন, তারপর চলে যান। কিন্তু জামশেদপুরের শরৎ থেকে যায়। থেকে যায় ঢাকের শব্দের ভিতরে মিশে থাকা শৈশব, আলোয় জেগে থাকা যৌবন, আর স্মৃতির ভিতরে ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে ওঠা একটি শহর। হয়তো সেই কারণেই আজও দুর্গাপুজো এলে মনে হয় দেবী শুধু মণ্ডপে আসেন না; তিনি আমাদের অতীতের কাছেও নিয়ে যান। আর সেই ফিরে দেখা থেকেই বর্তমানকে নতুন করে বোঝার একটি সুযোগ তৈরি হয়।
আমার কাছে এটাই জামশেদপুরের দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় প্রাসঙ্গিকতা, যা উৎসবের চেয়েও বেশি; আমার সময়ের স্মৃতি, আমার শহরের স্মৃতি, এবং শেষ পর্যন্ত আমার নিজের হয়ে ওঠার স্মৃতি।
সবাইকে জানাই শারদ শুভেচ্ছা শ্রদ্ধা ভালোবাসা এবং অভিনন্দন।
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :
kajalsen1952@gmail.com
দূরভাষ যোগাযোগ : 9835544675





