কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

চারানা-আটানা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
চারানা-আটানা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

<<<< চারানা আটানা >>>>


অমিতাভ প্রামাণিক

চারানা আটানা


৩৫)  টুকরো টাকরা


এবারের চারানা আটানা কয়েকটা টুকরো টাকরা পান-সুপুরি নিয়ে। এ পান সে পান না, জাপান থেকে আনতে হয় না। এমনিই চলে আসে কড়ায় গন্ডায়। তার থেকে গন্ডাখানেক আপনাদের জন্যে বেছে নিলাম।


(এক)

গাড়ি চালাতে চালাতে ফোন এলে আমি ফোন ধরি না। আনসেফ। দেখিও না ফোনের দিকে তাকিয়ে। যেই হও, ওয়েট করো, ফোনের বক্তব্য নিশ্চয় আমার বা আমার গাড়ির সামনে যারা আছে, তাদের জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়!  

ফোন বাজছিল, আমার হাতে স্টিয়ারিং। আমি কল অগ্রাহ্য করলাম।

গাড়ি রেড সিগন্যালে দাঁড়াতে আবার ফোন। সামনে তাকিয়ে দেখলাম, এখনও বাষট্টি  সেকেন্ড লাল থাকবে। তাহলে ধরা যেতে পারে! ইঞ্জিন বন্ধ করে ফোনের দিকে  তাকিয়ে দেখি, জ্বলজ্বল করছে ‘হোম’। মানে গিন্নীর কল।

ধরেই বললাম, কী ব্যাপার? গাড়িতে আমি। যা বলার জলদি বলো।

ভ্যানভ্যান করে বন্যার জলের মতো কী সব বলতে লাগল, কিছুই মাথায় ঢুকল না।  রাস্তার মোড়ে শব্দ তো কম না! প্লাস জলদি বলতে বলেছি বলে এমনভাবে বলছে,  যেন বিজ্ঞাপনের সেই - ইনভেস্টমেন্টস আর সাবজেক্টেড টু মার্কেট রিস্কস, প্লিজ রিড দ্য অফার ডকুমেন্টস কেয়ারফুলি বিফোর ইনভেস্টিং-এর মত হড়বড় করে বমি  করার মতো বলছে।

শুধু বুঝলাম, কী যেন কিনে নিয়ে যেতে বলছে। টিলুল না কী যেন!  

আমি বললাম, টিলুল আবার কী? বুঝতে পারছি না। হোয়াটস্যাপে লিখে দাও।

শুনলাম, উল, উল।

এই গরমে উল? তাছাড়া আমার বৌকে তো জীবনে সোয়েটার মাফলার বুনতে দেখিনি। আমিই বোধহয় ভালো পারি ও কাজটা। মা'র কাছে সোজা-উল্টো শিখেছিলাম একসময়।
 
সিগন্যালের টাইমার এক অঙ্কের হয়ে যেতেই আমি ফোন কেটে দিলাম। উল এখন কোথায় পাব? উলই তো? রান্নায় দেওয়ার গুল নয় তো? ধ্যেৎ, রান্না তো গ্যাসে  হয়, আর ওই যে কী যেন বলে, হ্যাঁ, ইন্ডাকশনে। ওতে গুল লাগবে কেন? আর কী হ'তে পারে? কুল, খুল, গুল, ঘুল ... সিগন্যাল সবুজ।  

যে দোকান থেকে মাসকাবারি জিনিসপত্র কেনা হয়, ঘ্যাঁচ করে তার সামনে দাঁড়ালাম, ইঞ্জিন বন্ধ করে ফোনে হোয়াটস্যাপ খুললাম। দেখি হ্যাঁ, মেসেজ এসে গেছে। তাতে লেখা– BMW নিয়ে এসো একটা!

বৌ এক ইয়ার্কির! বলছে যেতে নিয়ে কিনে থেকে বাজার! চাই ডব্লিউ এম বি এর-টা লিমিট আছে। নির্ঘাত শুনেছে মুনিয়া বা শুভ্রজিত মার্সিডিজ কিনেছে, সুতরাং তুমিও কিনে ফেল বি এম ডব্লিউ, এ আর এমন কী...
মেজাজ গরম হয়ে গেল। ফোন করলাম। ওপাশে রিং হচ্ছে, তুলছে না। তুলেছ? না তুলছে...

‘ইয়ার্কি মারো কেন? এক্ষুণি অ্যাকসিডেন্ট করছিলাম আর একটু হলেই’, ঝাঁঝিয়ে উঠলাম আমি।

‘কেন কী হয়েছে?’ ওপাশে নির্বিকার জবাব, ‘কী ইয়ার্কি করলাম?’ 

‘এসব কী লিখেছ? তখন তো ফোনে উল উল না কী বলছিলে, এখন মেসেজে লিখেছ BMW, এর মানে কী? BMW চাই তো তোমার শ্বশুরকে বলো গে যাও, আমাকে কেন?’

শ্বশুর তো নেই, তাই তোমাকেই বললাম। অত চ্যাঁচামেচি করার কী আছে? তোমার মুরোদ কি আমার জানা নেই? উলই তো চেয়েছি। BMW হচ্ছে বাসন মাজার উল। স্টিল উল বললাম তখন, বুঝলে না, তো আর কী বললে বুঝবে?


(দুই)

- কীরে হাঁদু, পরীক্ষা কেমন দিলি?

-
ভালো।

-
কী এসেছিল কোশ্চেন?

-
ঐ তো, শেক্সপিয়ারের পাঁচটা নাটকের নাম লিখতে বলেছিল, আর সেগুলো কী নিয়ে লেখা, সেইটা বলতে বলেছিল।


-
পারলি?

-
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ও তো আমার মুখস্ত।

-
কী লিখলি?

-
লিখলাম, শেক্সপিয়ার খুব মামলেট খেতে ভালবাসত। একবার ডিমের মধ্যে হ্যাম পড়ে গেছিল বলে সেটা হয়ে গেল হ্যামলেট। তাই নিয়ে একটা নাটক।

-
বাহ। আর?

-
তারপর একদিন ওর মা রান্নাঘরে দুধ গরম করতে বসিয়ে বাথরুমে গেছিল, বলে গেছিল, বাবা, একটু খেয়াল রাখিস। সেই দুধ উথলে উঠে পুড়ে গেল। তাই নিয়ে লিখল - ওথেলো।

-
উরিব্বাস! তারপর? 


-
তারপর একবার ও আর ওর মা কোথায় যেন গেছিল, সেখানে গিয়ে ওর মার গলার চেনের ওপরে একটা সুন্দরমত কী ছিল, সেই অংশটা হারিয়ে গেল। তাই নিয়ে একটা নাটক লিখল-  মার চেন টপ ভ্যানিশ।

-
এক্সেলেন্ট। নেক্সট?

-
ইস্কুলে ওদের গো অ্যাজ ইউ লাইক নিয়েও কী একটা নাটক লিখেছিল। আমি লিখে এসেছি, নামটা এখন ঠিক মনে পড়ছে না। ঐ রকমই কিছু নাম।

-
আর? পাঁচ নম্বর?

-
আর একটা কী যেন? কী যেন, কী যেন? ও হ্যাঁ। শেক্সপিয়ারের মেয়ে হয়েছিল জুলাই মাসে, তার নাম দিয়েছিল জুলিয়া। তার একটা কাঁচি ছিল। সেই নিয়ে নাটক – জুলিয়া’স সিজার।


(তিন)

সরকার নোটিশ দিয়েছে, মদের দোকান এখন থেকে দিবারাত্তির খোলা রাখা যাবে, বছরের সব দিনেই। ফলে ক্লাবের ছেলে ছোকরাদের মহাফূর্তি। সরকার থেকে এ বাবদ  ভাতাও আসছে আজকাল।

সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পাড়ায় একটা নতুন মদের দোকান খুলে গেল। আগে যেটা ছিল, ওটাতে রাস্তার সাইডের দেওয়ালে একটা ছোট্ট ফোকর দিয়ে টাকা গলিয়ে দিলে অন্ধকারে ঘরের মধ্যে থেকে আনন্দবাজারে জড়ানো একটা বোতল বেরিয়ে আসত। এটাতে সেসব না। রাখঢাক নেই। ইচ্ছে করলে ভেতরে বসেও খাওয়া যায়। তবে চিপস, বাদাম, পেঁয়াজি আলাদা করে কিনতে হবে। এখানে পেঁয়াজির দাম বেশি, এখন ওটা শিল্প তো, ওর ওপর ট্যাক্স, এডুকেশন সেস-ফেসও দিতে হয়।

জগাদা শোনা গেল সেই নতুন দোকানে সারারাত মাল টেনে পুরো আউট হয়ে গেছে। জগাদা ছেলে খারাপ না, উচ্চ মাধ্যমিকে বাংলায় একটুর জন্যে ফার্স্ট ডিভিশন পায়নি। যাত্রায় বিবেকের রোলে দারুণ পার্ট করত, ওর গান শুনে নায়ক নায়িকা থেকে ভিলেন ফিলেন সব নাকেজ্জলে চোকেজ্জলে হয়ে যেত। জগাদা পুরনো মাতাল, একটু আধটু খেত বিশেষ করে যেদিন পাড়ার ডিফেন্স পার্টির ডিউটি থাকত। মাল ফাল না খেলে কি সারারাত জেগে থাকা যায়? হুঁ হুঁ বাওয়া, চোরেরাও সেয়ানা, একটু ঢুল  দিয়েছ কি পকেট কেটে নিয়ে যাবে।

পাড়ার মোড়ল ঘোষবাবু শুনে তো খচে ফায়ার। উনি আগে এই অঞ্চলের দাপুটে নেতা ছিলেন। আলিমুদ্দিনের পায়রা উড়ে এসে ওর বাড়ির কার্নিশে বসত। এখন অবশ্য সে দাপট নেই। তবে ওয়ান্স এ মোড়ল, অলোয়েজ এ মোড়ল।

সবাই মিলে জগাদাকে টানতে টানতে এনে ঘোষবাবুর উঠোনে ফেলল। পাড়ার ঠাকুমা দিদিমারা বলাবলি করতে লাগল, ও জগা, বাপ আমার, ক্ষমা চা, মোড়লমশাইয়ের পা ধরে ক্ষমা চা।


জগাদা রক্তবর্ণ চক্ষু তুলে আকাশের দিকে তাকাল। বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল, এটা কোন যাত্রার কত নম্বর সিন। তারপর হুঙ্কার ছেড়ে বলল, পাড়া-bar পার হয়ে এসে শেষে ডুবিব কি ঘোষ! পদে-


(চার)

পুঁটি - দাদা আগে যে নামের শেষে প্রথম, দ্বিতীয় লাগানোর সিস্টেম ছিল, যেমন রাজা পঞ্চম জর্জ, ষষ্ঠ এডওয়ার্ড, দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত, দ্বিতীয় শাহ আলম, এসব কখন উঠে গেল রে? 

হাঁদু - কে বলল উঠে গিয়েছে?

পুঁটি - এখনো আছে?

হাঁদু – আছে তো! কেন নাম শুনিসনি – অনিন-দো, অ-তিন, মি-তিন, সন-চারি, পোল-টু, ঘোন-টু, সোন-টু, কৃষ্ণচন্দ্র -

পুঁটি - অন্যগুলো বুঝলাম, ইন ফ্যাক্ট নিজের নামটাই বা বললি না কেন, হাঁ-দু? কিন্ত কৃষ্ণচন্দ্র! ওতে নাম্বার কোথায়?

হাঁদু - ওরে উজবুক, একে চন্দ্র দুয়ে পক্ষ জানিস না? কৃষ্ণচন্দ্র মানে প্রথম কৃষ্ণ।   দ্বিতীয় কৃষ্ণ হ’লে কৃষ্ণপক্ষ হ’ত।

পুঁটি – ও! এইরকম হয় তাহলে?

হাঁদু – ঈ বা আ অনেক সময় লাস্টে লেগে যায় মেয়েদের নাম হ'লে। সমীরা রেড্ডীর নাম শুনেছিস? সমীর মানে বাতাস, সমীরা মানে বাতাসা। তেমনি সাহিত্যিক বাণী বসু। পাঁচে পঞ্চবাণ মনে আছে? বাণ মানে পাঁচ, বাণী মানে পাঁচী। গৌতম ঘোষ না কার যেন একটা সিনেমায় ডায়লগ ছিল, একটা পুরুষ ভিখারি একটা মহিলা ভিখারিকে বলছে - পাঁচী নামটা বড়ই সুন্দর। তার নাম পাঁচী তো পটানোর ধান্দায়। যাকগে, তোর আজ রেজাল্ট বেরোনোর কথা ছিল না? কত পেলি? 


পুঁটি -  সমুদ্রচন্দ্র বসু।

হাঁদু - স্যারের নাম না? কিন্তু পরীক্ষায় কত পেলি?

পুঁটি – ৭১৮। সাতে সমুদ্র, একে চন্দ্র, আটে অষ্টবসু। 

মঙ্গলবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৬

অমিতাভ প্রামাণিক

চারানা আটানা






(৩৪) অনুবাদ কবিতা

আজকাল তো সবাই কবি। যারা এই সেদিন অবধি নিজেদের পাঠক/পাঠিকা বলতেও একটু লজ্জা লজ্জা ভাব করত, এখন তারাও রীতিমত কবিতা লিখছে। শুধু তাই নয়, পুরনো কবিরা যেমন শুধু কবিতা লেখেন – কবিতাই লেখেন শুধু – নব্য কবিরা তাতেই আবদ্ধ না থেকে কবিতার সঙ্গে সঙ্গে মাঝে মাঝে মুক্তগদ্য, অণুগল্প, পরমাণুপ্রবন্ধ, ফোটনুপন্যাস, ইলেকট্রনমহাকাব্যও লিখছেন। লিখছেন আর ফেসবুকে সাঁটছেন। উনুনে তরকারি পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু কবিতার স্বার্থে সেটা মেনে নিচ্ছেন। অফিসে ফাইল নড়ছে না, কিন্তু কোনটা নড়া বেশি জরুরি – মুক্তমনা কবিতা না দরকচা-মারা ফাইল? ফলে কবিতার জন্ম হচ্ছে পথে-ঘাটে, বালিশে-চাদরে, অফিসে-রান্নাঘরে। লিখেই চলে আসছে ফেসবুকের পাতায়। আসছে এই আশায় যে কয়েক হাজার লাইক পড়বে। না পড়লে রেগে যাচ্ছেন কবি। ক্রোধবহ্নি জ্বলে উঠছে, তার তেজে বাংলার আকাশ বাতাসের টেম্পারেচার বেড়ে যাচ্ছে কয়েক ডিগ্রি সেলসিয়াস। গ্লোবাল ওয়ার্মিঙের, অন্তত বেঙ্গল ওয়ার্মিঙের – আই মিন বঙ্গ-উষ্ণায়ণের – এটাও একটা কারণ, সেটা লোকাল বা গ্লোবাল নির্বোধ বিজ্ঞানীদের কেউই বুঝতে পারছেন না।

আমিও যেমন সুযোগ পেলেই কবিতা লিখে ফেলছি। অন্তত ভাব করছি যেন কবিতা লিখছি। যারা আমার ঠাট্টা আর সিরিয়াস পোস্টের পার্থক্য বোঝেন এবং যারা বোঝেন না, তাদের কেউ কেউ যথাক্রমে বুঝে এবং না বুঝে লাইক মেরে দিচ্ছেন। আমি দিনের শেষে লাইক গুনছি আর ভাবছি, আহা, ‘আপনার আজকের দিনটি’ সংক্রান্ত বিষ্ণুশর্মা না কে যেন আনন্দবাজারে যে রাশিচক্রের বিধান দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে প্রায় পৌনে আঠাশ শতাংশ তো মিলে গেছে! প্রেমে বিরোধ, বিদেশযাত্রা বা স্বাস্থ্যের অবনতি তো আর ফেসবুকের কবিতায় লাইক থেকে সিদ্ধান্ত করা ঠিক হবে না! 


কথা হচ্ছে, একটু তলিয়ে বোঝার চেষ্টা করলেই জানা যাবে, কবিতা লেখা খুব সহজ ব্যাপার। এর প্রযুক্তিগত কৌশল নিয়ে আমি একাধিক প্রবন্ধ রচনা করে পত্র পত্রিকায় ছাপিয়েছি। কোন পত্র পত্রিকায় জিজ্ঞাসা করে লজ্জিত হবেন না, বলছি যখন আপাতত বিশ্বাস করে নিন। সেই রীতি অনুসরণ করে বহু নব্য কবি কয়েকশো কবিতা লিখে পত্র পত্রিকায় ছাপিয়েছে। কোন পত্র পত্রিকায় জিজ্ঞাসা করে লজ্জা দেবেন না।

এই নিয়ে আবার কেঁচে গন্ডূষ করার দরকার নেই এখানে। গুগল সার্চ করুন, করলেই পেয়ে যাবেন। নিজে খুঁজে বের না করতে পারলে এই পত্রিকার সম্পাদক কাজলদাকে একটা চিঠি লিখে নিজের ঠিকানা-লেখা একটা পোস্টকার্ড-সহ পোস্ট করে দেবেন – ফেসবুকে না, ডাকবাক্সে। উনি ভদ্রলোক, আপনার সে চিঠি পিয়ন ভাগাড়ে ফেলে না  দিয়ে উনার হাতে দিলে উনি নিশ্চয়ই উত্তর দেবেন।



তবে হ্যাঁ, সব কবিতা লেখাই একই রকম সহজ নয়। কবিতা লেখার ব্যাপারটা কঠিন হয়ে যায়, যখন কেউ কবিতা এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করতে যায়। কেননা, প্রথম কথা হচ্ছে যে ভাষা থেকে অনুবাদ করতে হবে এবং যে ভাষায় অনুবাদ করতে হবে, অনুবাদক কবির দুটো ভাষাই কাজ চালানো গোছের অন্তত জানা চাই। এমনিতে র‍্যাপিডেক্স ইংলিশ স্পিকিং কোর্স পড়ে কপিলদেব সহ অনেকে ইংরাজি শিখেছেন, ওয়ান-ডে ইন্টারন্যাশনালে হেরে যাওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে এই কোর্স-লব্ধ জ্ঞান দিয়ে ইন্টারভিউ বেশ ম্যানেজ করে নেওয়া যায়। কিন্তু ঐ কোর্সে কবিতা অনুবাদ করার ওপর অনুশীলন করানো হয় কিনা, সেটা আমার ঠিক জানা নেই, হয় না বোধহয়!

তাও ইংলিশ টু বেঙ্গলি আর বেঙ্গলি টু ইংলিশ মোটামুটি চালিয়ে দেওয়া যায়। কেতকী কুশারী ডাইসন যেমন রবীন্দ্রনাথের কবিতা রবীন্দ্রনাথ মারা যাওয়ার পর বেশ অনেকগুলো নামিয়ে দিয়েছেন। সেগুলো তো বহু লোকে পড়ছে, পড়ে জানছে রবীন্দ্রনাথের মাহাত্ম্য। ফেসবুকেও এই নিয়ে হেব্বি পোস্ট পড়ে। অনুবাদ কবিতার সুবিধে হচ্ছে, এতে বিষয় নিয়ে কবিকে ভাবতে হয় না, শুধু শব্দগুলো নিয়ে ভাবলেই চলে। তারপর ট্রানস্লেশন না ট্রান্সলিটারেশন তা নিয়ে একটু ফেসবুকসুলভ প্রজ্ঞা ট্রান্সমিশন করে, ‘আমি প্রথমটায় বিশ্বাসী নই, কেবল দ্বিতীয়টায়’ ইত্যাদি বলে ফেসবুকে পোস্ট করে দিলেই হয়। কেউ কিছু কোশ্চেন জিজ্ঞেস করলে গড়ুরের মতো মুখ করে মিটিমিটি হাসি হাসা কর্তব্য। হুঁ হুঁ বাওয়া, কবিতার অনুবাদ, সোজা কতা!

তবে এগুলো আমার দ্বারা ভালো হয় না, কেননা আমি ইংলিশে যাচ্ছেতাই রকমের  কাঁচা। আমি কিছু বছর আগে জন্মালে আমার ইংরাজি উচ্চারণ শুনেই ইংরেজরা ভারত ছেড়ে পালাত, কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট বা আলিপুর বোমার মামলা কিছুরই দরকার পড়ত না। টেন্স শুনলেই আমি টেন্স হয়ে পড়ি, কোনটা প্রেজেন্ট করব, তাই ভেবেই আমার ফিউচার মার্চ পাস্ট শুরু করে ইনডেফিনিটলি, কন্টিনিউয়াসলি, পারফেক্টলি।

কিন্তু সুযোগ পেলে এমনকি আমিও যে কবিতার অনুবাদের প্রচেষ্টায় দাঁত ফোটাই না, তা নয়। বাচ্চাদের দাঁত উঠলেই যেমন শুলায়, যেমন কামড়ে দিতে ইচ্ছে করে সেলফোনের কভার বা শারদীয় দেশ, তেমনি আমিও লড়ে যাই ইচ্ছেদানবের হাতে নিজেকে সমর্পণ করে। নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে।



এই যেমন এবার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে একটা অনন্য সৃষ্টি বাজারে ছাড়লাম। সে আপনারা বললে বিশ্বাস করবেন না। রবি ঠাকুরের প্রিয় আফ্রিকার উপজাতি হিম্বা-র এক কবির কবিতা চেক রিপাব্লিকের একজন চেক ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন, সেটা থেকে পরে রাশিয়ানে অনূদিত হয় সেটা। তার স্প্যানিশ অনুবাদ থেকে ইংরাজি ট্রানস্লেশন এক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে দেখে আমি সেটাকে বাংলায় অনুবাদ করার লোভ কিছুতেই সম্বরণ করতে পারলাম না। এ রকম কবিতা পড়তে পাওয়াই ভাগ্যের কথা, এত ঘাটের জল খেতে খেতে এসেছে সেই সুদূর আফ্রিকা থেকে জন্ম নেওয়া কয়েকটা কাব্যময় অনির্বচনীয় পদ, ঘুরতে ঘুরতে আমার নয়নসমুখে এসে আমার অক্ষিযুগলকে ধন্য করেছে, আমার হৃদয়ে দিয়েছে দোলা, আমার মর্মে হেনেছে তীব্র কশাঘাত, এর অনুবাদের সুযোগ ক’জনের ভাগ্যে জোটে?

গুগল ট্রানস্লেট আর সংসদ ডিকশনারি ঘেঁটে আমি এর একটা যুৎসই অনুবাদ নামিয়ে দিলাম ও পরক্ষণেই ফেসবুকের পাতায় সেঁটে দিলাম। এই সেই অনুবাদ –

বিনুনির ভাঁজে চিঠির নাভিশ্বাস।
ভুট্টার মতো
দাঁতে দাঁত চেপে লড়ো।


মা ষষ্ঠীর অশেষ কৃপায় আমার ফেসবুক বন্ধুর সংখ্যা কম নয়। বঙ্গের বাইরেও অনেক বন্ধু আছে, যারা বঙ্গবন্ধু। আদ্দিস আবাবা ছাড়া প্রায় প্রত্যেক মহানগরী থেকে আমি নিয়মিত আমার পোস্টে লাইক পাই। কিন্তু এইবার জানতে পারলাম, এই অনুবাদ পড়ে আমার জাপানি বন্ধুদের একজন ভাবাবেগে অত্যন্ত আবিষ্ট হয়ে প্রায় হারাকিরি করতে গেছিল। সে ভেবেছিল, আফ্রিকার হিম্বারা বুঝি তাদের চেয়েও মিষ্টি হাইকু লিখছে আজকাল।


সে খবর উঠে এলো একটা পত্রিকার – না, নাম জানতে চাইবেন না, গুরুর নিষেধ আছে বলা – একেবারে হেডলাইনে। জাপানিদের নিয়ে এই একটা সমস্যা বটে, অন্যরা কেউ ওদের চেয়ে ভালো করছে, ওরা একেবারে সহ্য করতে পারে না, বিশেষ করে  মিনিয়েচারাইজেশনে। সেই ভয়েই রবীন্দ্রনাথ তানকা লেখেন নি।

যাইহোক, যথারীতি কবিতাটা নিয়ে সারা পৃথিবীতে ব্যাপক শোরগোল শুরু হলো। নিউ  ইয়র্কের টাইম স্কয়ারে আর লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে রীতিমতো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে  আমার এই অনুবাদ আবৃত্তি করলেন পৃথিবীর তাবড় বাচিক শিল্পীরা। আকাশবাণী থেকে ফোন এলো, আপনার এই আফ্রিকান কবিতা তো গুরুদেবের আফ্রিকা-র চেয়েও টি আর পি বাড়িয়ে ফেলছে, আমাদের একটা ইন্টারভিউ দিন। আমি হেঁ হেঁ করে ‘কী যে বলেন, আমি আবার একটা মানুষ’ গোছের একটা অভিব্যক্তি দিলাম। আফ্রিকান উদ্ভিন্নযৌবনা তরুণীর পেলব খোঁপায় কী রহস্য লুকিয়ে ছিল, যার জন্য তাকে দাঁতে দাঁত চেপে সংগ্রাম করতে হচ্ছে, তা জানতে সব্বাই উদ্‌গ্রীব। দিকে দিকে এই বার্তা রটি গেল ক্রমে।

সি এন এন না রয়টার কারা যেন তাদের এক টিম পাঠালো আফ্রিকায় হিম্বাদের ডেরায়, এ নিয়ে অনুসন্ধান করতে, ভাবল এ থেকে যদি নৃতত্ত্বের কোনো অজানা সত্য উদ্ঘাটিত হয়! আফটার অল, মনুষ্য প্রজাতি তো আফ্রিকাতেই প্রথম জন্মেছে, তারপর  ছড়িয়ে পড়েছে কালিঘাট, ম্যাঞ্চেস্টার, ক্যালিফোর্নিয়ায়। সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে সেই সাংবাদিকদের টিম জানতে পারল, এই কবিতার অরিজিন্যাল মালিক এক বুড়ো মাতাল হিম্বা। তার মাথার চুল এত ঘন যে জট পাকিয়ে অসহ্য অবস্থা তার। আর তার দাঁতগুলো নাকি ভুট্টার মতো, বিচি বিচি, হলুদ হলুদ, তাই তাকে কোনো যুবতী বিয়ে করতে চাইছিল না। চিঠি, নাভিশ্বাস, লড়ালড়ির ব্যাপার কিস্যু ছিল না তার লেখায়, ওসব এক ভাষা থেকে অন্যটায় ক্রমান্বয়ে ভুলভাল অনুবাদের ফল, যা সাধারণত প্রায় সমস্ত কবিতা-অনুবাদকই বেশ নিবিষ্ট চিত্তে করেন।

তবে তার চেয়েও ইম্পর্ট্যান্ট হচ্ছে, ওই লেখাটা আদৌ কবিতা ছিল না। ওটা ছিল একটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল হলে যা হয়, চুল আর দাঁতের সমস্যায় জর্জরিত হয়ে সেই হিম্বা যে ডাক্তারের কাছে তার রোগের ব্যাপারে চিকিৎসার কারণে দেখাতে গিয়েছিল, তার ডায়াগনোসিস।