কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

পি.শাশ্বতী

 

 

অসুর ও অসুর-সাহিত্য

 


ভারতীয় পুরাণ সাহিত্যের হাত ধরে আবহমান কাল ধরে ‘অসুর’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বিভীষিকাময় রূপের মনুষ্য আকৃতির মানুষ বা গোষ্ঠী। আর ফুটে ওঠে তাদের অত্যাচার। সেই পুরাণকাল থেকেই দেখা গেছে কী সাধারণ মানুষ, কী মুনিঋষি বা স্বর্গের দেবদেবী— তাঁদের অত্যাচার ও অনাচারের হাত থেকে রেহাই পায়নি কেউই। আবার একই সঙ্গে দেখা গেছে, এই অসুর গোষ্ঠীরই কোনো কোনো ব্যক্তি কোনো না-কোনো দেবতার উপাসনায় তাঁদের সন্তুষ্ট করে বিভিন্ন ধরনের বর লাভ করে এক-একজন হয়ে উঠেছে ত্রিভুবনের ত্রাস। অর্থাৎ তারা যে শুধু অত্যাচারী বা অনাচারী ছিল, তাই নয়— এদের অনেকেরই কোনো কোনো দেবতার প্রতি দুর্বলতা ছিল। আর সেই জায়গা থেকেই ধরে নেওয়া যেতে পারে, তাদের মধ্যেও দেবপ্রীতির মতো আধ্যাত্মিক মন ছিল। তাহলে তাদের চরিত্র নিয়ে পুরাণ সাহিত্যের এই দ্বিবিধ রূপ কেন? আবার একই সঙ্গে সেখানে ফুটে উঠেছে সত্য ও ন্যায়পরায়ণ এবং অন্যায়পরায়ণকারী দুটি চরিত্র। ফলে সেইসব কাহিনি থেকে একটা ধারণা হয়— সত্যের পথে এবং ন্যায়ের পথে যে চলবে দেবতা তাঁদের পক্ষে থাকে বা তাঁরা দেবতার আশ্রয়ে থাকেন। অতএব দেবতার কৃপা পান। আর যে অন্যায়ের পথে এবং মিথ্যার পথে চলবে সে অসুর বা অসুর দলীয়। বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতর অংশে অসুর সম্পর্কে বিভিন্ন নঞর্থক চিত্র পাওয়া যায়।

অসুর এবং অসুরীয় সাহিত্য নিয়ে বিশদ আলোচনা শুরু করার আগে তাই ভারতীয় ও অভারতীয় অসুরদের ইতিহাস ও তুলনামূলক বিচার্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করাটা অত্যন্ত জরুরি বলেই সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে ‘অসু’র বলতে বৈদিক সংস্কৃতি-বিরোধী যে-কোনো জাতিকেই বোঝানো হয়েছিল। প্রাচীন পুরাণ ঘটলেই চোখে পড়ে, সেখানে যাঁদের বিভীষিকাময় অমানুষরূপে চিত্রিত করা হয়েছে, সেখানেই আবার বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীনতর অংশে তাঁদের সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র লক্ষ করা যায়। কিন্তু ইতিহাস বলে যে, বাস্তবে অসুর নামে সুপ্রাচীনকালে একটি আস্ত দেশ ও সভ্যতা ছিল, যেটি এক সময় ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদী সংলগ্ন অঞ্চল তখন আসিরিয়া নামে পরিচিত হয়েছিল; যাঁদের নামানুসারেই বর্তমান মেসোপটেমিয়া অঞ্চলটি তৈরি হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে এই অঞ্চলে তখন পর পর বেশ কয়েকটি সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, যেমন— সুমেরে, ব্যাবিলনে এবং আসিরিয়া। সামগ্রিকভাবে এগুলিই অসুর সভ্যতা নামে পরিচিত হয়েছিল। এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য গিলগামেশ এই সভ্যতারই সৃষ্টি ছিল, যা মাটির টালির উপরে বাণমুখো লিপিতে উৎকীর্ণ করা হয়েছিল। প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য যে, অসুর নামের একটি উপজাতি আজও মধ্যভারতে এবং বিহারের কিছু কিছু অঞ্চলে এখনও বর্তমান রয়েছে। যদিও তাঁদের সঙ্গে প্রাচীন অসুর সভ্যতার কোনো সম্পর্ক ছিল কিনা, সেবিষয়ে অবশ্য ঐতিহাসিক ভাবে আজও কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ভারতীয় বৈদিক মানুষেরা অসুর বলতে শুধু আদি ইরানীয় বা মেসোপটেমীয়দেরই বুঝতেন না, বরং আরও পশ্চিমের মিশরীয় সভ্যতাও তাঁদের কাছে অসুর সভ্যতা হিসাবেই পরিচিত ছিল। সেই অর্থ তাঁদের মধ্যে পশ্চিমের যাবতীয় দেশগুলিই অসুরদের আবাস  ছিল বলে ধারণা ছিল। বাস্তবিক ওই সমস্ত দেশগুলি সম্পর্কে প্রাচীন বৈদিক যুগের মানুষের ধারণা প্রায় ছিলই না। যেটুকু ছিল, সেটাও অত্যন্ত ভাসা-ভাসা। ফলে তাঁদের মধ্যে এই ধারণা হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না যে, সেগুলো সবই অসুর দেশ ছিল।

ছান্দোগ্য উপনিষদের (৮।৭-৮) প্রজাপতি ও ইন্দ্র-বিরোচনের আখ্যান থেকে এর ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণিত হয়। এই আখ্যানে দেখতে পাওয়া যায় যে, অসুররাজ বিরোচন এবং দেবরাজ ইন্দ্র উভয়েই ব্রহ্মজিজ্ঞাসু হয়ে প্রজাপতির কাছে শিক্ষালাভ করতে গিয়েছিলেন। পরবর্তী কাহিনি অনুসারে, বিরোচন প্রজাপতির শিক্ষার অর্থ বুঝতে ভুল করেছিলেন, এবং দেহই যে ব্রহ্ম— এরকম ধারণা নিয়ে স্বদেশে ফিরে গিয়েছিলেন ও সকলের কাছে এবিষয়ে এরকমই ব্যাখ্যা করেছিলেন। এরপরে এবিষয়ে ওই  ছান্দোগ্য উপনিষদেই বলা হয়েছে যে, দেহই ব্রহ্ম— ওই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়েই তাঁদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মেছিল— অসুরেরা তাঁদের গোষ্ঠীর মৃতদেহকে দাহ বা সমাধিস্থ না করে, ওষুধ প্রয়োগ ও নানাধরনের কৃত্রিম প্রক্রিয়ার দ্বারা সেগুলিকে সংরক্ষিত করে রাখতে শুরু করেছিলেন। এই মন্তব্য ধারণায় আপাত ভ্রান্তি যাই-ই থাকে না কেন, একটি বিষয় ঐতিহাসিক ভাবে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রাচীনকালে মৃতদেহ সংরক্ষণ করে রাখা বা মমি করবার মিশরীয় প্রথার ঈঙ্গিত সেখান থেকেই পাওয়া যায়। সে যাই হোক, এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, প্রাচীনকালে অসুর সভ্যতা বলতে বৈদিক মানুষেরা ইরান থেকে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার নানা ধরনের সভ্যতাকে বুঝতেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, ইরানীয়রা অসুর সভ্যতার দ্বারা এত বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, বৈদিক সভ্যতার মানুষদের চোখে তাঁরাও অসুর ছাড়াও অন্য কিছুই ছিলেন না। কিন্তু পশ্চিম দিক থেকে এভাবে প্রভাবিত হওয়ার আগে ইরানীয় সংস্কৃতি যে বৈদিক ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে খুব একটা পৃথক ছিল না, একথারও ঐতিহাসিক প্রমাণ স্পষ্ট তাঁদের উভয়ের ভাষার সাদৃশ্য এবং আরও কিছু ঐতিহাসিক তথ্য। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে, বৈদিক ভারতীয়রা এবং ইরানীয়রা একটি প্রাচীনতর অগ্নিপূজার শরিক ছিলেন, এবং অগ্নি-উপাসনা ছাড়াও এই উভয় গোষ্ঠীর মধ্যেই তখন সোম-উপাসনা বা সোম-যাগের প্রবর্তন ঘটেছিল। এছাড়া বৈদিক ও ইরানীয় যাগযজ্ঞের ব্যাপারটা কিন্তু একইরকমের ছিল। শুধু তাই নয়, উভয়ক্ষেত্রেই একই পরিভাষার ব্যবহার করা হত। যেমন— হওম = সোম, জ্বওতর = হোতা, অধ্রবন = অথর্বন, মনথ্র = মন্ত্র, যজ্বত = যজত, যশ্ন = যজ্ঞ, আজুইতি = আহুতি ইত্যাদি। আরও লক্ষ্য করবার বিষয় হল যে, বেদ ও অবেস্তায় একই ধরনের উপনয়ন-প্রথার অস্তিত্ব দেখতে পাওয়া যায়, এবং উভয়ক্ষেত্রেই দেবতাদের সংখ্যা হল তেত্রিশ। এঁদের মধ্যে উভয় জায়গাতেই মিত্র (ইরানীয়=মিথ্র) এবং বরুণ (ইরানীয়=অহুর) হলেন বিশ্বচরাচরের নিয়মরক্ষক, আর বৈদিক ঋত ও অবেস্তীয় অশ হলেন সেই নিয়মশৃঙ্খলার প্রতীক। তাছাড়া আবেস্তাতেও বৈদিক ইন্দ্র বর্তমান রয়েছেন, তবে সেখানে তাঁর কিছুটা মর্যাদাহানি করা হয়েছে। আবার নাসত্য— বেদ এবং অবেস্তা, উভয় জায়গাতেই বর্তমান রয়েছেন। অপাং নপাতের ক্ষেত্রেও একইকথা খাটে। আর বৈদিক গন্ধর্ব অবেস্তার হয়েছেন গন্দরেওয়া, বৈদিক কুশাণু অবেস্তায় হয়েছেন কৃশনি, এবং বৈদিক যম হলেন অবেস্তার যিম। ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখলে এই রকমই আরও অনেক ভাষাগত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।

ঐতিহাসিকদের মতে, ইরানীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির যেসব প্রাচীন দৃষ্টান্ত ভারতীয়দের বৈদিক সংস্কৃতির সঙ্গে প্রায় একই রকম ছিল, সেগুলিকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে ও এর জায়গায় পশ্চিমী অসুর ভাবধারার ব্যাপকভাবে প্রচলন করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন ইরানি ধর্মসংস্কারক জরাথুষ্ট্র। বলাই বাহুল্য, এবিষয়ে তিনি বহুলাংশে সাফল্য লাভ করলেও  প্রাচীন ইরানীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির অবশেষসমূহকে একেবারে লোপ করে দেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভবপর হয়নি। খৃষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের সম্রাট জারেকসেসের একটি লেখমালা থেকে জানা যায় যে, তখন রীতিমত আইন করে প্রাচীন ইরানীয় দৈব ধ্যানধারণা সমূহকে উচ্ছেদ করবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও বহুসংখ্যক দৈব উপাসক ইরানে টিকে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে অসুরদের মুণ্ডপাত করা হলেও অসুর সভ্যতার কিছু কিছু অনুগামী এখানেও থেকে গিয়েছিলেন, যাঁদের সেসময় কোনো ভাবেই নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব হয়নি।

বিদেশি অসুর ও ভারতীয় বৈদিক সাহিত্যে উল্লিখিত অসুরদের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য এবং তুলনামূলক আপাত এই আলোচনায় এবিষয়ে প্রেক্ষাপট হয়তো অনেকটাই স্পষ্ট হওয়া গেল। এবার মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক। আর এবিষয়ে কোনো আলোকপাত করতে গেলে সবার আগে প্রাচীন ইরানীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঠিক অবস্থান বুঝতে হবে। আর সেটা করতে গেলে পশ্চিমের অসুর সভ্যতার অন্তর্গত দেশগুলির ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কেও কিছুটা ধারণা থাকবার প্রয়োজন রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের উপর সঠিক ধারণা তো থাকতেই হবে।

ইতিহাস বলে যে, ইউফ্রেটিস ও টাইগ্রিস নদীর অববাহিকায় সুপ্রাচীনকালে যথাক্রমে সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয় ও আসিরীয় সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। এই তিনটি সভ্যতার মধ্যে সুমেরীয় সভ্যতাই সবথেকে প্রাচীন। পরবর্তীতে অন্যদুটি সভ্যতা নিজেদের বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল হলেও এগুলিরও মূল উৎস যে সুমেরীয় সভ্যতাই ছিল। যদিও ব্যাবিলন ও আসিরিয়ার ভাষা সুমেরের ভাষার থেকে পৃথক হলেও লিপির ক্ষেত্রে এই তিনের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। পণ্ডিতদের মতে, আনুমানিক ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সম্রাট হামুরাবি কর্তৃক সমগ্র মেসোপটেমীয় ভূখণ্ড অধিকৃত হওয়ার পর থেকেই সুমেরীয় সভ্যতা ব্যাবিলনীয় এবং পরবর্তীকালে আসিরীয় সভ্যতার শ্রীবৃদ্ধির অন্তরালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল; কিন্তু তবুও বর্তমানের ভারতীয়রা ঠিক যে চোখে সংস্কৃতকে দেখে থাকেন, রোমান ক্যাথলিক গির্জা যে চোখে ল্যাটিন ভাষাকে দেখে থাকে, তখন ব্যাবিলনীয় ও আসিরীয় পণ্ডিত এবং পুরোহিতরা ঠিক একইভাবে সুমেরীয় ভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন। বিশেষ করে ধর্মীয় ক্ষেত্রে।

বাস্তবিক, অসুর সাহিত্যের আদি অবস্থা জানার জন্য সমাজ গবেষক ও ঐতিহাসিকদের প্রত্নতত্ত্ব-ভিত্তিক নিদর্শনের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। সেই সূত্রেই জানা গেছে, অতীতে ইরানীয় রাজবংশ বা আকিমিনীয় রাজাদের কিছু দ্বিভাষিক লেখমালা আবিষ্কৃত হয়েছিল। এবং মনে করা হয় সেগুলিই ওই অঞ্চলের প্রাচীন সাহিত্যের মূল্য নির্ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক ও গবেষকরা এই লেখমালাগুলির পাঠোদ্ধার করে প্রাচীন মেসোপটেমীয় অঞ্চলের ভাষায় রচিত বেশ কিছু সাহিত্যের নমুনা উদ্ধার করেন। সেই সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত আসিরীয় ও ব্যাবিলনীয় পুরোহিতদের রচিত হাজার হাজার টালিলিপি উদ্ধার হয়েছে। এই টালিলিপির উপকরণ ছিল কাঁচা মাটি। ওই মাটি দিয়ে টালি তৈরি করে সেগুলির উপর কাঁচা অবস্থায় প্রয়োজনীয় লেখনীর বিষয় লেখা হত এবং পরে সেগুলিকে পুড়িয়ে নেওয়া হত। মাটির ওই প্রত্নগুলি আকারে ও গঠনে টালির মতো দেখতে হওয়ার কারণেই এগুলিকে টালিলিপি বলা হয়ে থাকে। এগুলির উপর মূলত রাজরাজড়াদের জীবনযাপন, শাসন পদ্ধতি এবং নানা গুণকীর্তনের কথাই লেখা হত। তখনকার ভাষার লিপি অনুযায়ী এক-একটি টালিতে লিখিত ব্যাপ্তিতে প্রচুর পরিমাণে বিষয়বস্তু থাকত। যেমন— ৭১৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি টালিলিপির মোট রচনার পরিমাণ হিসাব করে দেখা গিয়েছিল যে, সেটা আধুনিকযুগের ‘লন্ডন টাইমস’ পত্রিকার একটি পাতার পাঁচ কলামের বিষয়বস্তুর সমান ছিল।

সম্রাট হামুরাবির অনুশাসনাবলি থেকে ব্যাবিলনীয় সাহিত্যের সূত্রপাত হয়েছিল বলা যেতে পারে। তাঁর আমলের টালিলিপি থেকে তাঁর রাজত্বে সুশাসনের কথা জানা যায়। তিনি সারা দেশে একই ধরনের আইন-কানুনের প্রবর্তন করেছিলেন। ওই সময়ের আরও লিখিত  অনুশাসনাবলি পাওয়া গেছে একটি পর্বতের গায়ে উৎকীর্ণ লেখ থেকে। ওই লেখর উপরে সূর্যদেবতা খামাশের একটি মূর্তিও খোদিত ছিল। এটিও তৈরি করেছিলেন   সম্রাট হামুরাবি। প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসের পরে সেই একই জায়গায় আসিরীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটেছিল, এবং তারপরে এসেছিল নব্য-ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য। গবেষকদের মতে, ব্যাবলনীয় ও আসিরীয় ভাষাসমূহের মধ্যে বিশেষ কোনো পার্থক্য ছিল না, অনেকটা ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের বাংলা ভাষার মধ্যেকার পার্থক্যের কাছাকাছি ব্যবধানের মতো।

সম্রাট অসুরবানিপালের (৬৬৮-৬০৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) বিখ্যাত গ্রন্থাগারের ধ্বংসাবশেষ থেকে ঐতিহাসিকেরা প্রাচীন ব্যাবিলনীয় ও আসিরীয় সাহিত্যের নিদর্শনের সন্ধান পেয়েছিলেন। তাঁদের মতে, এই গ্রন্থাগারটি তখন আসিরীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী নিনেভেতে বর্তমান ছিল। এখান থেকেও তখন অজস্র টালিলিপি পাওয়া গিয়েছিল। স্যার হেনরি রলিনসন যেগুলির পাঠোদ্ধার করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার থেকে প্রাপ্ত টালিলিপির সংগ্রহের নাম হল ‘Kouyunjık Collection’। এছাড়া পরবর্তীকালে প্রত্নতত্ত্ববিদরা আরও নানা জায়গা থেকে অজস্র টালিলিপি বা অসুর সাহিত্য সংগ্রহ করেছিলেন, যেগুলির বিষয়বস্তুকে— প্রার্থনা ও স্তোত্র, শুভাশুভ লক্ষণ, চিকিৎসা ও ঔষধ এবং জ্যোতিষ— এই চারভাগে ভাগ করা হয়েছিল।

আগেই বলা হয়েছে, ভারতীয় মানসে ‘অসুর’ শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে রাক্ষস, দৈত্য, মহিষাসুরের মতো ভয়ংকর চরিত্র। কিন্তু এই শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক গভীর সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও প্রতীকী স্তর। ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে আধুনিক আদিবাসী অসুর জনগোষ্ঠী পর্যন্ত এই শব্দটি বহন করে চলেছে ভারতীয় সভ্যতার আলো-অন্ধকারের দ্বন্দ্ব, শ্রেণি-সংঘর্ষের স্মৃতি এবং আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। যা তাঁদেরকে কেন্দ্র করে রচিত নানা সময়ের সাহিত্যের আলোকে অম্লান হয়ে আছে।

এবার ভারতীয় প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় অসুরকাহিনি কী কী ভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। পুরাণ কাহিনি গুলির পৃষ্ঠায় তাঁদেরকে যতই আসুরিক রূপের শিরোপা দিয়ে খাটো করা হোক না কেন, ঋগ্বেদে কিন্তু ‘অসুর’কে দেবত্বের প্রতীক হিসাবেই দেখানো হয়েছে। জন সেখানে ‘অসুর’ অর্থে বলা হয়েছে— “প্রাণশক্তি-সম্পন্ন দেবতা”। ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, অগ্নি— এদের সবাইকে একসময় ‘তো’ বলা হতো। সেখানে অসুরকে দানব অর্থে দেখানো হয়নি, বরং শক্তিশালী, জীবনীশক্তির অধিকারী এক উচ্চমার্গের সত্তা হিসাবেই তাঁদের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। প্রাচীনকালে দেবতা ও অসুরের মধ্যে কোনো বৈরিতার প্রশ্ন যে ছিল না— সেটা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। বরং উভয়কেই একই আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক গোত্রের অংশ হিসাবে দেখানো হয়েছে।

‘অসুর’ শব্দটি এক বহুমাত্রিক প্রতীক। ঋগ্বেদের দর্শনে একে বোঝানো হয়েছে মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে। যা শুধু বাইরের দানব নয়, মানুষের ভেতরের অন্ধকার দিকের প্রতীক। দেবতা মানে আলো, সত্য, শৃঙ্খলা; অসুর মানে অন্ধকার, অহংকার, বিশৃঙ্খলা। এই দ্বন্দ্ব আসলে মানুষের অন্তরের দ্বন্দ্ব— আত্মসংযম বনাম কামনা, বিনয় বনাম অহংকার।

ভাষাতত্ত্ববিদের মতে অসুর শব্দটির উৎপত্তি ‘অসু’ শব্দ থেকে; যার অর্থ হল প্রাণ। সেই মতে অসুর শব্দের অর্থ হল প্রাণবান অথবা বলবান। ঋগ্বেদে প্রায় একশোর বেশি বার অসুর শব্দের ব্যবহার রয়েছে যার মধ্যে মাত্র এগারো বার এই শব্দটিকে দেবশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে বরুণ, সবিতা, সূর্য, পুষা, মিত্র, রুদ্র, মরুৎ, বায়ু, অগ্নি, সোম, ত্বষ্টা, পর্জন্য ইত্যাদি দেবতাদের বোঝানো হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ মানবকেও ‘অসুর’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে।

এখানে তার কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে আশা করি।

যেমন, বলা হয়েছে—

‘হে ইন্দ্র। তুমি জগতের ও সমুদয় দেবতাগণের রাজা। তুমি মনুষ্যগণকে রক্ষা কর। হে অসুর। তুমি আমাদিগকে রক্ষা কর।’ সূক্ত: ১/১৭৪/১

হে অসুর বরুণ। তুমি দেব ও মনুষ্য সকলেরই রাজা।’ সূক্ত: ২/২৭/১০

‘তোমরা স্তুতিযোগ্য, অসুর সুদক্ষ… অগ্নিকে সর্বদা পূজা কর।’ সূক্ত: ৭/২/৩

‘অসুরগণ পিতৃস্বরুপ; তাঁহাদিগের সুখোদ্দেশে আমি স্তব উচ্চারণ করিয়া থাকি।’ সূক্ত: ১০/১২৪/৩

‘হিরণ্যহস্ত অসুর, সুনেতা, হর্ষদাতা ও ধনবান সবিতা অভিমুখ হইয়া আগমন করুন।’। সূক্ত: ১/৩৫/১০

সুতরাং ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকালে যে কোনো একসময় অসুর উপাসনা করা হতো সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেখা যাচ্ছে, সেই প্রাচীনকালের সাহিত্যেও ‘অসুর’ শব্দ ছিল সম্মান-সূচক। আর পরবর্তীকালে যে সময়ের সাহিত্য অপেক্ষাকৃত আধুনিক শুধুমাত্র সেই সময়ের সূক্ত, মন্ত্র ইত্যাদিতে ‘অসুর’ শব্দকে ঘৃণা-সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের অধিকাংশ সূক্ত একেবারে শেষ দিকে রচিত হয়েছিল এবং এই মণ্ডলে ‘অসুর’ শব্দটি অন্তত ছ-বার পৌরাণিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর থেকে আন্দাজ করা যায় যে একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের ঋষিগণ অসুর উপাসনা করতেন এবং ঋগ্বেদের সময়কালের শেষ দিকে তাদের মধ্যে অনেকে অসুর-বিরোধী হয়ে পড়েছিলেন। আর এসবই অসুর সাহিত্যের প্রাঞ্জল এবং সাবলীল সাহিত্যের উজ্জ্বল উদাহরণ।

অসিরিয় অসুর এবং ভারতীয় অসুরঃ

আবার পুরাণে এসে অসুরের চরিত্র সম্পূর্ণ ভাবেই বদলে গেছে। সেখানে ‘একই আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক গোত্রের অংশ’ তো দূর অস্ত, অসুরকে দেবতাদের এক এবং অদ্বিতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবেই বারে বারে দেখানো হয়েছে। আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই পুরাণে ‘অসুর’ শব্দের অর্থ বদলে যায়। কিন্তু কেন? এর কোনো ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নেই। কিন্তু তখনকার অসুরকেন্দ্রিক সাহিত্যগুলির নানান বিবরণের মধ্যে দিয়ে মনে করা হয় যে, সমাজের কোনো একটি অনার্য গোষ্ঠীর কোনো একটি সম্প্রদায় ধনে এবং বলে ক্রমেই পরাক্রমশালী হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। স্বাভাবিক ভাবেই সমাজের উচ্চ ও মধ্য আর্যশ্রেণির মানুষের কাছে যেটা মোটেই অভিপ্রেত ছিল না। কাজেই ক্ষমতা ও মাটি রক্ষার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে উভয় শ্রেণির শক্তিমান মানুষ। যা সেই সময়ের সাহিত্যে স্থান পেতে থাকে স্বর্গমর্ত্যের দেব-অসুরের  দ্বন্দ্বকাহিনি হিসাবে। সেই সাহিত্যের কথন ও রচনাগুণে দেবতা ও অসুরের এই দ্বন্দ্বকাহিনি ক্রমেই জনপ্রিয় হতে থাকে। বাড়তে থাকে অসুরদের নিয়ে আরও বেশি করে ভিন্নধর্মী গল্পের। যার পেছনে তৎকালীন মুনিঋষিদের একটি প্রচ্ছন্ন ভূমিকা ছিল বলেই গবেষকদের ধারণা।

আবার এই পুরাণ গল্পেই উঠে আসে দেবতার ঔরসে দেবীর গর্ভে অসুর বা দানবের জন্মকথা। যেমন— দেখা যায় ঋষি কাশ্যপ ছিলেন দেবতা, অসুর, নাগ, দানব—সব সত্তার পূর্বপুরুষ। তার দুই স্ত্রী—অদিতি ও দিতি। অদিতির সন্তানরা হলেন আদিত্য— অর্থাৎ দেবতা। দিতির সন্তানরা হলেন দৈত্য— অর্থাৎ অসুর। পুরাণে বলা হয়েছে, এইভাবে অসুররা দেবতাদের সহোদর হয়ে জন্ম নিলেও শুধুমাত্র অহংকার ও হিংস্রতার কারণে হয়ে ওঠেন দেবতাদের চিরশত্রু। পুরাণে অসুরদের শক্তিশালী, তপস্যাশীল চরিত্রে যেমন বর্ণনা করা হয়েছে, তেমনই তাঁদের অহংকারী ও হিংস্র চরিত্রেও উত্থাপন করা হয়েছে। তারা দেবতাদের উৎখাত করতে চায়, এবং সেই দ্বন্দ্বই গড়ে তোলে দেব-অসুর যুদ্ধের মহাকাব্য।

ভারতীয় উপমহাদেশ তো বটেই, এই পশ্চিমবঙ্গের জেলায় ছড়িয়ে আছেন বেশ কিছু অসুর গোষ্ঠীর জনজাতি পরিবার। অসুর সাহিত্যের সঙ্গে যেহেতু ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি, তাই এই নিবন্ধে তাঁদের একটি বিশেষ সংস্কৃতির উল্লেখ করে এটি টানব। এটি তাঁদের অসুর পুজো।

অসুর পুজো এই উপজাতি জনগোষ্ঠী জীবনের বিষাদের স্মরণ। দেবী দুর্গার হাতে নিধন হওয়া মহিষাসুরের বংশধর বলে দাবি করা এই জনগোষ্ঠীর কাছে এই অসুর পুজো হিন্দু দুর্গাকে কেন্দ্র করে বাঙালির অন্যতম আনন্দ উৎসব শাদোৎসবের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ বলা যেতে পারে। এই প্রসঙ্গে মহিষাসুর বধের পৌরাণিক ইতিহাস নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা জরুরি।

কালিকা পুরাণ অনুসারে দেবী তিনবার মহিষাসুরকে বধ করেন।  প্রথম ও দ্বিতীয় সৃষ্টিকল্পে দু-বার দুই রূপে অসুর নিধনের পর তৃতীয় সৃষ্টিকল্পে তপ্তকাঞ্চনবর্ণা দশভূজা দুর্গা রূপে দেবী মহিষাসুরকে বধ করেন। এই তৃতীয় পর্বে পুরাণ মতে, মহিষাসুর তখন ব্রহ্মার বরে ত্রিভুবনে অজেয় এবং পুরুষ-অবধ্য, অর্থাৎ তাঁকে কোনো পুরুষই কোনো উপায়ে বধ করতে পারবে না— সে যত বড় বীরই হোক না কেন। ব্রহ্মার কাছ থেকে এই বড় পেয়ে অপরাজেয় শক্তির বলিয়ানে বলদীপ্ত হয়ে মহিষাসুর ত্রিভুবন জয়ের উদ্দেশ্যে প্রথমে মর্ত্য, তরপর পাতাল জয় করে এতটাই দুঃসাহসী হয়ে ওঠেন যে, এরপর তিনি সুরপুর স্বর্গের দিকে তাঁর বিপুল অসুর বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করলেন। অবধ্য মহিষাসুরের একচ্ছত্র আধিপত্যে একের পর এক সমস্ত বীর দেবতা শুধু পরাজিতই হলেন না, যে যেখানে পারলেন প্রাণ ভয়ে পালিয়ে বাঁচলেন। স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রও পরাজয় স্বীকার করলেন মহিষাসুরের কাছে।

তখন মহিষাসুর তখন তিন লোকের অধীশ্বর। কিন্তু দুর্ভাগ্য অসুরকুলের! পুরাণ সাহিত্যের পরম্পরা অনুযায়ী কোনো বিজিত অসুরই তাঁর বিজিত লোকের অধিবাসীদের শান্তিতে বসবাস করতে দেননি। কারণ অসুরকুলের রীতি অনুযায়ী তাঁরা নাকি ছিলেন বিজাতীয় সম্প্রদায়ের কাছে সব সময়েই অত্যাচারীর মূর্ত প্রতীক। মহিষাসুরের ক্ষেত্রেও সেটাই হল। তাঁর অত্যাচারে ত্রিভুবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ল, বিশেষ করে দেবকুলের বাসিন্দারা।

আসনহারা, রাজ্যহারা ত্রিদেব-সহ অন্যান্য দেবতা সেই সময় আরও একবার  মহামায়ার সংহার রূপের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। ইতিপূর্বে দু-দুবার অসুররাজ দমনের কথা স্মরণ করে ত্রিদেব একত্রিত হয়ে তাঁর মুখমণ্ডল থেকে ভীষণাকার  ক্রোধাগ্নি নির্গত করলে  সেই   তেজ ও অন্যান্য দেবতার পুঞ্জীভূত রোষ সম্মিলিত হয়ে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে হিমালয়ের শীর্ষে মহর্ষি কাত্যায়নের আশ্রমে আবির্ভূতা হলেন এক দশভূজা ‘নারী’। ত্রিভুবনের দুর্গতি বিনাশ করার জন্যই তাঁর আবির্ভাবের কারণে তাঁর নাম হয় দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা। ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে আবির্ভাবের জন্য তাঁর আর-এক নাম হয় ‘কাত্যায়নী’।

পুরাণ অনুসারে স্বর্গের বিভিন্ন দেবতার বিভিন্ন শক্তির আধারে দেবী সর্বশক্তির অধিকারিণী হয়ে অমরাবতীর দিকে যাত্রা করলেন। রণমূর্তিনি সেই দেবীর রণ হুংকার ও তাঁর বাহন সিংহের সিংহনাদে ত্রিভুবন কেঁপে উঠল। প্রবল যুদ্ধ শুরু হল অসুরাধিপতি মহিষাসুরের সঙ্গে।, দেবী দুর্গার প্রবল তেজ, দুর্দমনীয় পরাক্রম এবং অসাধারণ রণকৌশলে ধ্বংস হয়ে গেল মহিষাসুরের সেনাবাহিনী।  কিন্তু অপরাজেয় থেকে গেলেন মহিষাসুর।তিনি নানা রূপ ধারণ করে, নানা ছলাকলায় দেবীকে বিব্রত ও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলেও, দেবী দুর্গা তাঁর সমস্ত রকম চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত মহিষাসুরকে সংহার করেন।

তৃতীয় সৃষ্টিকল্পে পরাজিত হয়ে পূর্ব বিধান অনুযায়ী মৃত্যুর আগে  মহিষাসুর দেবী দুর্গার কাছে অসুর প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে যজ্ঞভাগের অধিকারের বর প্রার্থনা করেন। দেবী তাঁকে অসুরত্ব মোচনের বরপ্রদান করলেও যজ্ঞভাগ দিতে অস্বীকৃত হন। কিন্তু মহিষাসুর দেবীর চরণ তলে থেকে ত্রিলোকপূজ্য হবেন— এই বরে অভিষিক্ত করেন তিনি।

পুরাণ মতে, অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন দেবী দুর্গা। ভারতের কয়েকটি প্রদেশে এই অসুর সম্প্রদায়ের বংশধর বলে কথিত এক শ্রেণির উপজাতি মানুষ নিজেদের অসুর সম্প্রদায় হিসাবে গর্বের সঙ্গে পরিচয় দিয়ে থাকেন। যদিও সমাজের চোখে এঁরা চিরকালই অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ বলেই গণ্য হয়ে এসেছেন। ভারত সরকারের বদান্যতায় আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৪ সালে এই অসুর গোষ্ঠীকে তফসিলি উপজাতি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও দেশের আর পাঁচটা উপজাতির মতো এঁরাও সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে যে তিমিরে সেই তিমিরেই আছেন। এ বিষয়ে আমরা পরে আসব। এখন এই নিবন্ধের মূল বিষয়ে ফিরে যাওয়া যাক।

গোটা রাজ্য যখন দুর্গাপুজোয় মাতোয়ারা, সেই সময় শোকের উৎসবে মুখ গোজেন এই রাজ্যেরই বেশ কিছু এলাকার একশ্রেণির আদিবাসী গোষ্ঠী। যেমন পূর্ব বর্ধমান জেলার আউসগ্রামের মালিয়ারা জঙ্গলমহল এলাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। এই গোষ্ঠীর নাম অসুর গোষ্ঠী। উপজাতি জনগোষ্ঠীর এই সব মানুষের কাছে দুর্গাপুজো হল শোকের সময়। এঁদের কাছে দেবী দুর্গা দুর্গতিনাশিনী নন। দুর্গা বলতে এঁরা বোঝেন ‘হুদুড়দুর্গা’-কে। তাই দেবীপক্ষে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা যখন দেবী দুর্গার আরাধনায় মগ্ন থাকেন, তখন নাচের মাধ্যমে দুর্গা অর্থাৎ ‘হুদুড়দুর্গা’-কে খুঁজে বেড়ান এইসব উপজাতীয় মানুষেরা। ছদ্মবেশে ‘হুদুড় দুর্গা’কে খুঁজে বেরানোর আচার-অনুষ্ঠানই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে ‘দাসাই পরব’ নামে পরিচিত। যে পরব পালনে আজও অবিচল রয়েছেন ওই এলাকার মানুষজনেরা।

তাঁদের কাছে এই পরবের মাহাত্মই আলাদা। সেই মাহাত্ম্য মেনেই মহাষষ্ঠীর দিন থেকেই এই পরব শুরু হয়ে যায়। এই জনগোষ্ঠী যেহেতু মনে করেন, তাঁরা মহিষাসুরের বংশধর। তাই দুর্গা পুজোর সময়ে তাঁরা মহিষাসুরের পুজো করেন। রাঢ়বঙ্গ-সহ উত্তরবঙ্গের অসুর জনজাতির মানুষজন বিশ্বাস করেন, দুর্গা আসলে কোনো নারী শক্তি নয়। তাঁদের মতে দুর্গা শক্তিশালী একজন পুরুষ যোদ্ধা।

অসুর গোষ্ঠী বা জনজাতির মানুষজন এ-ও বিশ্বাস করেন ‘অনার্যদের’ দেবতা হলেন অসুর। আর্যরা কখনোই অনার্যদের দেবতা ‘হুদুড়দুর্গার’ সঙ্গে যুদ্ধে সমকক্ষ হতে পারেনি। তাই দেবী রূপী দুর্গাকে সামনে এগিয়ে দিয়ে মহিষাসুরের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন দেবতারা। তাঁদের মতে, চিরাচরিত দুর্গা পুজোর কাঠামোয় অসুরকে যতই অত্যাচারী দেখানো হোক না কেন, বাস্তবে মহিষাসুর ছিলেন ঠিক তার উল্টোটাই। যুদ্ধে ‘অসুর’ কোনো মহিলা ও শিশুদের আঘাত করতেন না। সেই দুর্বলতা জেনে দেবতারা নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দুর্গাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মহিষাসুরের সামনে। নিজের নীতিতে অবিচল মহিষাসুর তাই দুর্গার কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হন।

মহিষাসুর বধের প্রেক্ষাপট হিসাবে পুরাণে যাই-ই বলা হোক না কেন, অসুর উপজাতি গোষ্ঠীর  বিশ্বাস, আর্য-অনার্যের লড়াইয়ে ছলনার আশ্রয়ে দুর্গা তাঁদের আদিপুরুষ হুদুড়দুর্গা অর্থাৎ মহিষাসুরকে হত্যা করেছিলেন। এই বিশ্বাসেই পুরুলিয়ার কাশীপুরের ‘শিকার দিশম খেরোয়াল বীর লাকচার গাঁওতা’ সংগঠন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দুর্গা পূজার নবমীর দিনে  হুদুড়দুর্গা বা মহিষাসুরের মূর্তি তৈরি করে, তাঁর পায়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছেন। এটি এক ধরনের অসুর পূজা হিসাবে গণ্য হয়ে থাকে। অসুর গোষ্ঠীর মানুষের কাছে এই দিনগুলি একটি শোকের দিনও বটে। ‘শিকার দিশম খেরোয়াল বীর লাকচার গাঁওতা’র মুখপাত্র অজিত হেমব্রমের মতে, ‘‘অনার্য সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষ বা আদিপুরুষ হচ্ছেন মহিষাসুর বা হুদুড় দুর্গা। দুর্গাপুজোয় অশুভ শক্তি হিসেবে তাঁকে কল্পনা করা হয়। কিন্তু এক জন আর্য নারীর ছলনার আশ্রয়ে তাঁকে হত্যা করার বিষয়টি আজও অনার্যরা মেনে নিতে পারেননি। অনার্য রীতি অনুযায়ী তাঁরা কখনো নারীকে আক্রমণ করে না।’’

এই বিশ্বাসে ভর করেই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন দুর্গাপুজোর সময়ে ছদ্মবেশে নাচের মাধ্যমে তাঁদের অনার্য ভগবানকে খুঁজে থাকেন। মূলত ভাদ্র মাস শেষ হতেই আদিবাসী মহল্লায় শুরু হয়ে যায় দাসাই পরব পালনের প্রস্তুতি। পুজোর ষষ্ঠীর দিন থেকেই পুরুষেরা নারী সেজে ধামসা ও মাদল নিয়ে ‘দাসাই নাচে’ মাতোয়ারা হন। দশমী পর্যন্ত চলে এই দাসাই পরব ।

এই গোষ্ঠীর ইতিহাসের আর একটি সূত্রে কথিত রয়েছে, হুদুড়দুর্গার মৃত্যুর পরে নারীর ছদ্মবেশে অনার্য সম্প্রদায়ের মানুষজন পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেই প্রথা মেনে এখনো এই জনজাতির পুরুষরা একত্রিত হয়ে দুর্গা পূজার দিনগুলিতে নারীর পোশাকে হায় হায় করতে করতে শোক প্রকাশ করে নিজের নিজের এলাকা পরিক্রমা করে। এই পরিক্রমার সময় প্রথা অনুযায়ী তারা এক ধরনের নাচের মুদ্রায় অঙ্গভঙ্গি করে। যেটা  ‘দাঁশাই নাচ’ নামে পরিচিত। অসুর গোষ্ঠীর এই পরবের সঙ্গে ইসালাম ধর্মের মহরম পরবে হাহাকার বিলাপের অনেকটা মিল দেখতে পাওয়া যায়।

এই জনজাতির আর একটি মতের বিবরণ অনুযায়ী যে তথ্য পাওয়া যায়, সেটি হল তাদের নেতার নাম ছিল ‘হুদুড়দুর্গা’ অর্থাৎ ‘মহিষাসুর’। সাঁওতালি ভাষায় দুর্গা পুংলিঙ্গ এবং ‘হুদুড়’ কথার অর্থ প্রচণ্ড জোরে বয়ে চলা বাতাস। আর্য সেনাপতি ইন্দ্র ছলনা এবং কৌশলের আশ্রয় নিয়ে এক সুন্দরী দেবীকে হুদুড়দুর্গার কাছে পাঠান। ওই দেবী হুদুড়দুর্গাকে বিয়ে করার পর নবমীর দিন হুদুড়দুর্গাকে হত্যা করেন। সেই কারণে ওই দেবী ‘দুর্গাদেবী’ নামে পরিচিতি পান। অসুর জনজাতির মানুষজন এই লোককথাকে বিশ্বাস করেই শতকের পর শতক দুর্গোৎসবের চার দিন শোকের পরব দাসাই পালন করে আসছেন। আদিবাসী পুরুষেরা নারীর বেশে, মাথায় ময়ূরের পুচ্ছ লাগিয়ে ‘ভুয়াং’ নাচের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে দুঃখের গান গেয়ে এই সময়ে খুঁজে থাকেন তাঁদের মহিষাসুর বা হুদুড় দুর্গাকে।

যদিও যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অসুর গোষ্ঠীর নতুন প্রজন্মের মানুষের মধ্যেও দৃষ্টিভঙ্গির বদল ঘটছে। এই গোষ্ঠীর প্রবীণদের মধ্যে এখনো দুর্গাপুজো নিয়ে অনেক বিরুদ্ধ প্রশ্ন থাকলেও বা তাঁরা এই সময়টিকে শোকের দিন হিসাবে মনে করলেও নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তাদের চারিদিকের উৎসবের আলোয় আলোকিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে রাজি নয়। আর এই জায়গা থেকেই গত কয়েক বছর ধরে শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ির মেরিভিউ চা বাগানে ছবিটা বদলে গেছে। এই বাগানের শ্রমিক হিসাবে বাস করেন অসুর সমাজের একটা বড় অংশ। শারদোৎসবে চারপাশ যখন আনন্দে মেতে থাকে, এই চা বাগানের ছোটরা মন ভার করে বসে থাকত এতদিন। তাদের মনে আনন্দ দিতেই এখন মেরিভিউ চা বাগানেও দুর্গাপুজো হচ্ছে। সে পুজোর উদ্যোক্তাদের একাংশ অসুর সমাজেরই লোকজন।

প্রবীণেরা এখনো শোক ধরে রাখতে চান বলে, তাঁদের এড়িয়েই দুর্গাপুজোর অনুষ্ঠানে অংশ নেবার জন্য পুজোর আগের দিনগুলোতে অনেক দিন ধরে তালিম নিয়ে চলেন অসুর সমাজেরই মেয়েরা। আজকের প্রজন্মের অসুরগোষ্ঠীর মানুষের মতে, অসুর সমাজের প্রবীণ মানুষেরা দুর্গাকে মহিষাসুরের হত্যাকারী হিসাবেই দেখে। কিন্তু এটা তো নিছকই একটা পুরাণ কল্পিত কাহিনি। এর কোনো ঐতিহাসিক সত্যাসত্য প্রমাণ করা কখনোই সম্ভব নয়। আবার তেমনই সেই প্রাচীনকাল থেকে এই জনগোষ্ঠী যে অসুরেরই বংশধর, এই বিশ্বাসকে অস্বীকার করারও কোনো অর্থ নেই। কারণ এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সম্প্রদায়গত লোকবিশ্বাস। ফলে আজকের আধুনিক প্রজন্মের কাছে তাঁদের বংশ পরম্পরা এবং মর্যাদার প্রশ্ন এবং অসুরের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার আসন যেমন আছে, তেমনই শারদোৎসবের আলোকোজ্জ্বল উন্মাদনাও তাঁদের কাছে বাস্তব জীবনে চলার পথের একটি অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ফলে আনন্দ উপভোগের সুযোগটুকুও ছাড়তে চান না তাঁরা।

নকশালবাড়ির ওই পুজো কমিটিতে অসুর সমাজের কিছু প্রবীণ সদস্যও আছেন। তেমনই এক সদস্য এবং পূজা কমিটির সম্পাদক পেয়ারা বেনের কথায়, প্রতি বছরই তাঁদের পুজোর বাজেট থাকে দেড় থেকে দু-লক্ষ টাকার। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রবীণ চা শ্রমিকদের দিয়ে এই পুজোর উদ্বোধন করা হয়ে থাকে।  এলাকায় এত দিন ঢাকের আওয়াজ দূর থেকেই ভেসে আসত। মনখারাপ করে বসে থাকত ছেলেমেয়েরা। এখন তারাই পুজোয় নাচছে, গাইছে।  আদিবাসী সমাজের সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়েই এই পুজোর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় বলেই জানা গেছে।

আলিপুরদুয়ার শহর লাগোয়া মাঝেরডাবরি চা বাগান। এই চা বাগানেই থাকেন সত্তরোর্ধ্ব লুনিস অসুর। একসময় পুজোর চারদিন নিজেকে ঘরবন্দি রাখতেন। কিন্তু এখন শুধু ঘর থেকে মুখ বার করেন না, নকশালবাড়ি চা বাগানের অসুর গোষ্ঠীর মানুষের মতো  তিনিও তাঁদের চিরাচরিত সংস্কারের বন্ধন থেকে অনেকটা বাইরে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। বাঙালির প্রিয় দুর্গোৎসবের অনিন্দ্য তিনিও একজন সামিল হন হাদি মুখে। দুর্গা প্রতিমা দেখতে সপরিবারে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দর্শনে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর কথায়, “একসময় দুর্গাপুজোর সময় বাড়ি থেকে বের হতাম না। কিন্তু এখন পুজোর সময় মণ্ডপে যাই। আমাদের এলাকায় সব বড় বড় দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়। আমার এক নাতি তো জংশনের ক্লাবের দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তা কমিটির সদস্যও।” শুধু মাঝেরডাবরি চা বাগানই নয়, উত্তরবঙ্গের নাগরাকাটা, বানারহাট, মেটেলি-সহ কিছু এলাকা জুড়ে অসুর সম্প্রদায়ের বাস করেন। মূলত চা বাগানেই কাজ করেন এই এঁরা।

যেহেতু পুরাণ আর ইতিহাস এক নয়, তাই মহিষাসুর বধের ঘটনাকে ঐতিহাসিক বলে ধরে নেওয়ার বিষয়ে বিতর্ক থেকেই যায়। যদিও বিশেষজ্ঞদের বক্তব‌্য, মিথ সব সময়েই ইতিহাসপূর্ব ঘটনার প্রতীকী ইশারা। তাই বঙ্গে আর্য আগমন ও ভূমিসন্তান অনার্যদের সঙ্গে তাদের সংঘাত ও অনার্য প্রতিরোধের আখ‌্যানের নিরিখে মহিষাসুর বধের ভিন্ন বয়ান প্রচলিত আছে ভূমিসন্তানদের মধ্যে। বিশেষত এই অসুর জনজাতির মধ্যে যে বিশ্বাস শিকড় গেড়ে আছে,  এক্ষেত্রে সেটি উল্লেখযোগ‌্য একটি মিথ।

তবে অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা যে অনার্য জনগোষ্ঠীর মানুষ তা নিয়ে কারও মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। স্থানীয় জনজাতি বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট গবেষক প্রমোদ নাথের কথায়, অসুর সম্প্রদায়ের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলেই উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু পৌরাণিক অসুরের সঙ্গে এই অসুর সম্প্রদায়ের কোনো যোগ আছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আবার এটাও ঠিক, এই অসুর সম্প্রদায়ের মানুষদের বিশ্বাস, তারা দুর্গার হাতে বধ হওয়া অসুরেরই বংশধর। সেই কারণে তারা দুর্গা ঠাকুরের মুখ দেখতেন না। শুধু তাই নয়, দুর্গা পুজোর সময় অসুর সম্প্রদায়ের মানুষেরা শোকের গান গাইতেন। সেই গান গাওয়ার রীতি আজও চালু আছে। প্রমোদবাবু বর্তমান সময়ে এই সম্প্রদায়ের অনেক মানুষই যে দুর্গাপুজোয় শামিল হচ্ছেন, প্রমোদবাবুও সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। এরকমই সুর ধরা পড়ে মাঝের ডাবরি চা বাগানের মীরা অসুর গলায়। তিনিও চা বাগানে কাজ করেন। পুজোর সময় বোনাস পান। ছেলেমেয়েরা জন্য নতুন জামাকাপড় কেনেন। শহরে ঠাকুর দেখতে যান। পুরনো সংস্কারের বশে ছেলেমেয়েদের বাড়িতে আটকে রাখায় তিনি বিশ্বাসী নন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নকশালবাড়ি কিংবা আলিপুরদুয়ারের মাঝেরডাবরি চা বাগানের অসুর গোষ্ঠীর মধ্যে প্রগতির ছোঁয়া লাগলেও এই সম্প্রদায়ের বাকি অংশের জনজাতি কিভাবে কাটান এই সময়টা? এ পর্যন্ত যা দেখা গেছে, তাতে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং ঝাড়খণ্ড-সহ অন্যান্য জায়গায়  বসবাসকারী অসুর সম্প্রদায় হুদুড় পুজোর মধ্যে দিয়ে তাঁদের অন্তরের শোক এবং বিষাদের নির্জন চোরাবালিতেই ডুবে থাকেন এই ক-দিন। তাঁরা তাঁদের মূল বিশ্বাস থেকে এতটুকুও সরে আসতে রাজি নন। নৃতাত্ত্বিক গবেষকদের মতে, এই জনগোষ্ঠীর অনার্য আদিবাসীরা সাধারণত নিজেদের স্থির বিশ্বাস থেকে কখনোই বিচ্যুত হয় না। আধুনিক সময়ে নেট সর্বস্ব জীবনযাপন এবং বেঁচে থাকার ইদুর দৌড়ে কিছু শিক্ষিত অসুর গোষ্ঠীর মানুষ হয়তো নবীন চিন্তাভাবনার সাথী হতে পেরেছেন। কিন্তু অশিক্ষা আর দারিদ্র্যের যাঁতাকলের পেষণে এই সমাজের যে বৃহৎ অংশ এখনো তাঁদের ধর্ম বিশ্বাস থেকে সরে আসতে পারেননি, তাঁদের কাছে তাঁদের বিশ্বাসটাই সত্যি।

এবার এই অসুর জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক ইতিহাস নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। অসুর সম্প্রদায় হল একটি ছোট অস্ট্রো-এশিয়াটিক জাতিগোষ্ঠী, যা মূলত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড,  অহম, ওডিশা, মেঘালয় এবং ছত্তিশগড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, অসুররা মূলত সিন্ধু উপত্যকার বাসিন্দা ছিল। কিন্তু আর্য অভিবাসনের কারণে তারা তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে এক প্রকার বাধ্য হয়েই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ভারতে অসুর সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় ৩৩,০০০। এক সময় মূলত শিকার এদের জীবিকা থাকলেও ঊনবিংশ শতাব্দীতে এদের একটা বড় অংশ উত্তরবঙ্গ ও অহমে ব্রিটিশ পরিচালিত চা বাগানগুলিতে শ্রমিকের কাজ শুরু করে। পরিশ্রমী এই জনজাতির অন্য অংশের বেশির ভাগই জীবিকা হিসাবে বেছে নেয় কৃষিকাজ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ৯২.১৯ শতাংশ অসুর সম্প্রদায়ের মানুষই কৃষক হিসাবে তালিকাভুক্ত হওয়ায় বোঝা যায়, বর্তমানে এরা কৃষিকাজকেই মূল জীবিকা হিসাবে বেছে নিয়েছে।

অসুর উপজাতি আবার তিনটি উপ-বিভাগে বিভক্ত হয়ে আছে। যেমন— বীর (কোল) অসুর, বিরজিয়া অসুর এবং আগরিয়া অসুর। বিরজিয়া অসুর আবার একটি পৃথক তফসিলি উপজাতি হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে আর একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। ২০১৪ সালে এই সম্প্রদায় তফসিলি উপজাতি হিসাবে যেমন স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনই ভারতে বিশেষভাবে দুর্বল উপজাতীয় গোষ্ঠীর (পিভিটিজি) মর্যাদাও এদের দেওয়া হয়েছে।

আর্থিক অবস্থার দিক থেকে অসুররা আজও ভারতে সব থেকে দরিদ্র সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি। সাক্ষরতার হারও সবচেয়ে কম। সামাজিক ভাবে এরা অন্যান্য সম্প্রদায়ের নানা বৈষম্যের শিকার হয়ে এসেছে। বর্তমানে সেই অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও, সর্বত্র এদের স্বীকৃতি নজর কাড়ার মতো নয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধাও এখনো অপ্রতুল।

ধর্মীয় আচারের দিক থেকে এই সম্প্রদায়ের প্রধান দেবতা সিংবোঙ্গা। অন্যান্য দেবতাদের মধ্যে রয়েছে ধরতি মাতা, দুয়ারী, পাটদরহা এবং তুরি হুসিদ। এদের ধর্মীয় উৎসব বলতে সারহুল, কর্ম, ধনবুনি, কাদেলতা, রাজ কর্ম, দশহারা করমের মতো উৎসবই প্রধান। এই উৎসবগুলি এরা যথেষ্ট আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করে থাকে।

ফলে দেখা যাচ্ছে আসন্ন শারদোৎসবে আপামর বাঙালি যখন আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে থাকবে তাদের প্রিয় উৎসবের উন্মাদনায়, তখন শুধুমাত্র একটা সংস্কার আর বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে বিষাদের আধো অন্ধকারে ডুবে থাকবে এই দেশেরই একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ। আমরা কি পারি না তাদের নতুন আলোর দিশা দেখাতে?

 

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন