কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

উদয় চট্টোপাধ্যায়

 

ডিম

 


সম্প্রতিকালে ডিম নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে বেশ হইচই হল। দুটো কারণে। প্রথমটা হল, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই শুরু হল অপসৃত শাসকদলের কর্তাব্যক্তিদের লক্ষ্য করে বিক্ষুব্ধ জনতার ডিম ছোড়া, পঞ্চায়েত সদস্য থেকে শুরু করে পুরসভার কমিশনার, মায় মন্ত্রী পর্যন্ত। কখনো তাঁদের অফিসে চড়াও হয়ে, কখনো তাঁদের জনসংযোগ মানসে নিজ মহল্লা পরিদর্শনের কালে, আবার কখনো তাঁদের বিচারার্থে আদালতে নিয়ে যাবার সময়ে। বলা বাহুল্য, এটা তাঁদের কাছে কোন সুখের অভিজ্ঞতা নয় – মাথার উপর ডিম ফেটে শিবের জটা থেকে গঙ্গাবতরণের মতো ডিমের কুসুম আর অ্যালবুমেন মিলেমিশে ধারাসারে তাঁদের মুখ কলঙ্কিত করে পরণের বসনের উপর বর্ষিত হয়ে এক সাইকেডেলিক চিত্রায়নের অবতারণা। আর, আমিষভোজী বাঙালির কাছেও কাঁচা ডিমের গন্ধ কোন আতর বা পরিমলের আবহ সৃষ্টি করে না। অবশ্য কোন সুখ উপভোগ করানোর উদ্দেশ্যে ডিম বর্ষিত হয় না, হয় বিরক্তি সৃষ্টির কারণে, আর এটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে যে বাইবেল-কথিত আর  মিশনারিদের অনুবাদে ‘পাপের বেতন মৃত্যু’ না-হলেও পাপকর্মের জন্যে এটুকু হেনস্তা তাঁদের প্রাপ্য। পাপের শাস্তিবিধান আদালতের হাতে না-ছেড়ে নিজের হাতে নেওয়া অবশ্যই নীতিবিরুদ্ধ কাজ, কিন্তু ‘এ রোষের জলতরঙ্গ রুধিবে কে?’

সংবাদপত্রের দাক্ষিণ্যে জানা গেল সম্প্রতি পূর্ব ইউরোপের ছোট্ট দেশ কসোভোর পার্লামেন্টে ডিম ছোড়ার শিকার হয়েছেন সে-দেশের প্রধানমন্ত্রী। খবরটা নতুন কিছু নয়, এর আগে খোদ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে এই ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। হয়তো অন্যান্য দেশেও – পার্লামেন্টে কিংবা প্রকাশ্য জনসভায় – কিন্তু তার হিসাব কে রাখে! তখন ফেভরিট ছিল পচা ডিম। খুব সঙ্গত কারণেই – পচা ডিম থেকে নির্গত হয় পূতিগন্ধময় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস, তাজা ডিমে  সেটা থাকে না। একদিক থেকে এটা খুবই সমর্থনযোগ্য – তাজা ডিম এভাবে নষ্ট হতে দেখে একজন হা-হুতাশ করে বলেছিলেন, আহা এগুলো দিয়ে কত অমলেট বানানো যেত!

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কী করে পচা ডিম শনাক্ত করে সেগুলো বাজার থেকে সংগ্রহ করা হত? পদ্ধতিটা সহজ। বাল্যকালে দেখেছি ডিম কিনতে গেলে দোকানদার আলোর সামনে ধরে সেটা বিচার করতেন। খুব একটা ফুল-প্রুফ ছিল না। তবে একটা পাত্রে জল রেখে তাতে ডিম ডুবিয়ে দিলে পচা ডিম ভেসে ওঠে - ভিতরে ওই হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস সৃষ্টির কারণেই। এটা কিন্তু ঘটে দেশি মুরগি বা হাঁসের নিষিক্ত ডিমে ভিতরে ভ্রূণ বা embryo-র উপস্থিতির জন্যে। ইদানীং কালের পোলট্রির মুরগির অনিষিক্ত ডিমে সেটা সহজে ঘটে না। তাই ইচ্ছা থাকলেও পচা ডিম সংগ্রহ এখন কষ্টসাধ্য। পচা ডিমের সহযোগী ছিল পচা টম্যাটো – এখন সেটাও সহজলভ্য নয়। এখনকার হাইব্রিড টম্যাটোতে ‘লিকুইড সেরাম’ বা রসালো ভাব অনেক কম – সেগুলো শক্ত এবং সহজে পচে না। শক্ত হওয়ার কারণে কারো উপর বর্ষিত হলে সেগুলোর ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

 

ডিমের সাম্প্রতিক লাইম-লাইটে আসার দ্বিতীয় কারণটা হল স্কুল-পড়ুয়াদের মিড-ডে মিলে ডিম দেওয়া  না-দেওয়ার প্রশ্ন। নানা বাধা বিপত্তি আর সীমিত আর্থিক বরাদ্দ সত্ত্বেও স্কুলে দুপুরে ভাতের সঙ্গে ডিম সেদ্ধ বা ডিমের তরকারি দেওয়ার প্রথা চালু আছে। ডিম প্রোটিনের জোগান দেয় তো বটেই, তা ছাড়া বাচ্চাদের কাছে ডিমের একটা অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ আছে – কাঁটা নেই, হাড় নেই, কিন্তু সুস্বাদু। সংবাদ মাধ্যমে আমরা দেখেছি ডিমে কামড় দিতে দিতে তাদের মুখের পরিতৃপ্ত হাসি। মনে পড়ে যায়, আমাদের বাল্যকালে অনেক বহু-সদস্যের পরিবারে সেদ্ধ ডিম সুতোয় কেটে অর্ধেক পরিবেশন করা হত। উপভোক্তাদের আনন্দ তাতে কিছু কম ছিল না। ‘তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিতাঃ, মা গৃধ কস্যচিদ ধনম্‌’ – ঈশ উপনিষদের প্রথম শ্লোকের এই বাণী, যা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মহর্ষি হতে উদবুদ্ধ করেছিল, সেটা অলিখিতভাবে সঞ্চারিত ছিল বড়ো ছোটো সকলের মনে। যা পাচ্ছি তাতেই সুখ; উপনিষদের আর এক বাণী ‘ভূমৈব সুখম্‌ নাল্পে সুখমস্তি’ অধরাই ছিল। প্রশ্নটা উঠেছিল যখন নতুন রাজ্য সরকার মিড-ডে মিলের ভার এক ধমীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে সমর্পণ করছিল, যারা শুধু নিরামিষ খাবারই পরিবেশন করে। ডিমের খাদ্যগুণের একটা ব্যাপার আছে, তার সঙ্গে রয়েছে রুচির প্রশ্ন। জনমতকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার সরকারী তরফে ডিম যোগ করার ব্যবস্থা নিয়েছে – অবশ্যই  সাধু সিদ্ধান্ত । 

তবে ডিম যে পশ্চিমের দেশে নিরামিষ হিসাবে গণ্য হয় সে অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার এক উত্তর ভারতীয় নিরামিষাশী বন্ধুর। এক রেস্তোরাঁয় নিরামিষ ডিশের অর্ডার দিলে তাকে দেওয়া হয়েছিল প্রচুর সেদ্ধ ডিমের টুকরোর টপিং দিয়ে এক মনোগ্রাহী স্যালাড ডিশ। ডিমের কারি আর রাইস পশ্চিমের দেশে চালু না-থাকলেও  ডিমের ব্যবহারে তারা অকৃপণ – কেক বিসকুট পুডিং তৈরিতে, আর বেক-করা খাদ্য সামগ্রীতে। রাশিয়ায় রেস্তোরাঁয় পরিবেশন করা হয় তিনটে  ডিমের ফ্রায়েড এগ বা অমলেট –‘ট্রয়কার’ দেশে সেটা হওয়াই স্বাভাবিক।

ছোটোবেলায়  দেখেছি হিন্দু বাঙালির বাড়িতে ডিম বলতে বোঝাত হাঁসের ডিম, মুরগির ডিম নৈব নৈব চ। রোগভোগের পর ডাক্তারের পরামর্শে আমার জন্যে রোজ সকালে একটা মুরগির ডিম সেদ্ধ বরাদ্দ হয়েছিল। উঠোনে ইট সাজিয়ে বানানো এক উনুনে পাটকাঠির আগুনে অ্যালুমিনিয়ামের একটা বাটিতে ডিম সেদ্ধ করে সেটা দাওয়ার এক কোণে রাখা হত । একটু নুন লাগিয়ে সেটা খেয়ে হাত ধুয়ে আসতে হত বাড়ির পাশের পুকুরের জলে। খেয়ে কেমন যেন একটা অপরাধবোধ হত। এখন বাঙালির খাদ্য তালিকায় মুরগির ডিম অপরিহার্য। হেঁশেলের চৌহদ্দির বাইরে মধ্যবিত্ত রেস্তোরাঁর মেনুতে এক জনপ্রিয় আইটেম হল ডিমের ডেভিল - সেদ্ধ ডিম আলুসেদ্ধর মোড়কে শুকনো পাউরুটির গুঁড়ো মাখিয়ে ছাঁকা তেলেভাজা। এমন  সুস্বাদু খাদ্যের এই শয়তানি নাম এল কোথা থেকে কে জানে! আর একটা আইটেম হল কবিরাজি কাটলেট – ওপরে ডিমের প্রলেপ দিয়ে ভাজা। ‘কবিরাজির’ সঙ্গে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকের কোন সম্বন্ধ নেই – কথাটা এসেছে ইংরেজি ‘কভারেজ’ (coverage) থেকে — চিকেনের ওপর ডিমের কভার।

ডিম বলতে কি আমাদের হাঁস বা মুরগির ডিমেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে? কখনোই নয়। রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন তাঁর দাদার জন্যে আবদুল মাঝি পদ্মানদী থেকে এনে দিত কচ্ছপের ডিম। বুদ্ধদেব গুহের লেখায় পেয়েছি মধ্যপ্রদেশের কোন এক অঞ্চলে এক ভোজন বিলাসীর শকুনের ডিমের অমলেট খাওয়ার সগর্ব বর্ণনা। আফ্রিকার কোন কোন জায়গার অধিবাসীদের কাছে পিঁপড়ের ডিম অতীব সুখাদ্য। এইসব বিজাতীয় খাদ্যের বিশদ বিবরণে না-গিয়ে আমরা ফিরে আসতে পারি আমাদের অতি-পরিচিত  মাছের ডিমে। রুই বা কাতলা মাছের ডিম বেসন পেঁয়াজ মিশিয়ে ভেজে তৈরী বড়া কোন্‌ বাঙালির রসনাকে না লোলুপিত করেছে! আর যেটা না বললেই নয় সেটা হল সরষে সহযোগে ভাপানো চাকা করে কাটা ডিমসুদ্ধ ইলিশের টুকরোর কথা – বাড়িতে পাতে পড়া কদাচিৎ হলেও বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং- এ যার অহরহ দর্শন মেলে।

মাছের ডিম কাঁচা খাওয়া বাঙালির রসনা বরদাস্ত করে না। তবে পশ্চিমের দেশে ‘ক্যাভিয়ার’ (cavier) – যেটা হল ভিনিগারে ম্যারিনেট করা মাছের কাঁচা ডিম – রীতিমতো ডেলিকেসি। ফরাসিরা তো  ক্যাভিয়ারের নামে অজ্ঞান। এর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটেছিল রাশিয়ায়, বিগত সত্তরের দশকে। ওই দেশে সদ্য পদার্পণ করে এক নিউ-ইয়ার পার্টিতে। সরষের সস লাগানো কালো পাউরুটির সঙ্গে বাটিতে রাখা ভিনিগারে ভেজানো ব্ল্যাক ক্যাভিয়ার। গৃহকর্ত্রী সগর্বে জানিয়েছিলেন, ওই কালো রঙের  মাছের ডিম সংগ্রহ করতে তাঁকে  বাজার পরিক্রমা করতে হয়েছে। এখন ভাবি, সঙ্গে  ভোদকা না-থাকলে প্রথম যাত্রায় সেটার সদ্‌ব্যবহার করা যেত কিনা সন্দেহ আছে।  

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন