কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

রাহুল দাশগুপ্ত

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

 

চেয়ার

ওই চেয়ারটায় সে এসে বসত। ওই চেয়ারটাতেই। কোনওদিকে তাকাত না। খুব মন দিয়ে বই পড়ে যেত। প্রতিদিন বিকেল ঠিক পাঁচটার সময় সে লাইব্রেরিতে এসে ঢুকত। আর থাকত সন্ধে সাতটা পর্যন্ত। সাতটার সময় লাইব্রেরি বন্ধ হত। এই দু-ঘন্টা এই দুনিয়ার সঙ্গে ওর যেন কোনও যোগ থাকত না। চারপাশে কী ঘটছে না ঘটছে, কোনওদিকেই ও খেয়াল করত না। ও ডুবে থাকত বইয়ের ভিতরে। এইভাবে বইয়ের ভিতরে ডুবে থাকতে আমি আগে কখনও কাউকে দেখিনি।

আমি বসতাম ঠিক ওর উলটোদিকে। তবে একটু দূরে। আমার ইউনিভার্সিটির কাছেই ছিল লাইব্রেরিটা। পায়ে হেঁটে গেলে পাঁচ মিনিটের পথ। তাই আমিও রোজ যেতাম। বই নিয়ে আমার যে খুব উৎসাহ ছিল, তা নয়। তবে লাইব্রেরির পরিবেশ আমার ভালো লাগত। একটা উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা লাইব্রেরি। ভেতরে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। প্রচুর আলো-বাতাস। লাইব্রেরির পেছনে সবুজ ঘাসে ঢাকা একটা মাঠ। সেই মাঠ ঘিরে আছে উঁচু উঁচু ঝাউগাছ। গেট থেকে ঢুকেই সিমেন্টের বাঁধানো চত্বর। তারপর পাথরের সিঁড়ি ধাপে ধাপে উঠে গেছে লাইব্রেরির প্রকাণ্ড কাঠের দরজা পর্যন্ত। সেই সিঁড়িগুলোও আমার খুব পছন্দের ছিল। আমি একটা একটা করে সিঁড়ি ভাঙতাম। আর মনে মনে ভাবতাম, একটু পরেই আমি দেখতে পাব সেই চেয়ারটা। আর অবশ্যই সেই ছেলেটাকে। সে নিশ্চয়ই ওই চেয়ারটাতেই বসে থাকবে!

আমার সঙ্গে এক বন্ধুও মাঝেমধ্যে লাইব্রেরিতে আসত। মেয়েটি আমার সঙ্গেই রিসার্চ করছে। নাম, কবিতা। আমার পাশে বসেই পড়াশোনা করত। পড়াশোনার চেয়ে গল্প করতেই ও বেশি ভালোবাসত। ওর নজরও ছিল আমার চেয়ে বেশি তীক্ষ্ণ।

একদিন হঠাৎ কবিতা আমাকে বলল, ওই ছেলেটা ভারী অদ্ভুত, তাই না?

কেন? জানতে চাইলাম।

না, রোজ ওই একটা চেয়ারেই এসে বসে। যেন ওর জন্যই ওটা নির্দিষ্ট করে রাখা আছে। ওর প্রাইভেট প্রপার্টি। অথবা লাইব্রেরির পক্ষ থেকে ওকে দেওয়া গিফ্ট...

তাতে কী? আমি কৌতূহল গোপন করার চেষ্টা করলাম। তারপর বললাম, দ্যাখ, দুনিয়ায় সব কিছুই কেমন বদলে যায়! কিছুই তো স্থির নয়, তাই না? আগে ভোরবেলা আমি ট্রেনের হুইসল শুনতাম, মোরগের ডাক শুনতাম, পাশের বাড়িতে একটি মেয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে গলা সাধতে বসত। এখন ওসব কিছুই আর নেই। কেউ যদি একটা চেয়ারকে আঁকড়ে থেকে দুনিয়ার নিয়মকে ভাঙতে চায়, সেটা মন্দ কী? ও যদি চেয়ারটা বদলাতে না চায়, তাতে কার কী বলার আছে?

ব্যাপারটা কিন্তু লোকের চোখে পড়েছে!

তাই নাকি?

এই নিয়ে অনেকে হাসাহাসিও করছে।

কেন?

কারণ ব্যাপারটা অদ্ভুত। ছেলেটাও অদ্ভুত। আর অদ্ভুত ব্যাপারই লোকের চোখে আগে পড়ে।

কী বলছে লোকে?

লোকে বলছে, ছেলেটা দাম বাড়াতে চাইছে। নিজের ওজন দেখাতে চাইছে। বিশিষ্ট করে তুলতে চাইছে নিজেকে। বিশিষ্ট লোকেদের জন্যই একটা চেয়ার নির্দিষ্ট করা থাকে, তাই না? মামুলি লোকেদের জন্য নয়...

একদিন কবিতা একটা কাণ্ড করে বসল। ছেলেটি আসার আগেই ওর চেয়ারটায় গিয়ে বসে পড়ল। ছেলেটি আসে ঠিক পাঁচটায়। ও হিসেব করে দশ মিনিট আগে পৌঁছে ওই চেয়ারটায় গিয়ে বসল। আর এমনভাবে বই খুলে পড়তে লাগল, যেন ডুবে গেছে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনও ব্যাপারে আর হুঁশই নেই।

ছেলেটি লাইব্রেরিতে ঢুকেই দৃশ্যটি দেখে ঘাবড়ে গেল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিজের মনকে প্রস্তুত করে নিল। দৃঢ় পায়ে হেঁটে গেল কবিতার দিকে। তারপর বিনীত কিন্তু বলিষ্ঠ গলায় বলল, এই চেয়ারটা যদি একটু ছেড়ে দেন, প্লিজ...

কেন বলুন তো? কবিতা বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল।

আসলে, ছেলেটা একটু মরিয়া হয়েই উঠেছে, এই চেয়ারটায় বসে কেমন যেন অভ্যাস হয়ে গেছে। অন্য কোনও চেয়ারে বসে আমি ঠিক মন বসাতে পারি না...

কবিতা এমনভাবে তাকাল, ছেলেটিকে যেন ভস্ম করে দেবে। ফুঁসে উঠল, আপনি কী মেন্টাল পেশেন্ট?

আর ফুঁসতে ফুঁসতেই চেয়ারটা ছেড়ে দিল। পরে এই নিয়ে আমার কাছে সে অনেক হাসাহাসিও করেছিল। বিশেষ করে, ওই শেষ কথাগুলো বলার সময় ছেলেটাকে কতটা মরিয়া দেখাচ্ছিল, সেটার বর্ণনা দেওয়ার সময়।

আমি কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম, আগাগোড়াই ও অ্যাক্টিং করছিল। আর সেটা ছেলেটাকে অপমান করবে বলেই। মানুষের এই প্রবৃত্তিটিকে আমি ঘৃণা করি। এরা নিরীহ লোক দেখলেই খামচাখামচি শুরু করে দেয়। দাঁত-নখ বার করে। ছেলেটাকে ওইভাবে না বললেই কী চলত না? কথাটা শুনে কী করুণ হয়ে গেছিল ওর মুখ। একটা চেয়ারের জন্য এইভাবে ওকে খাটো হতে হল। আর সেটা দেখে কবিতাও কত মজা পেল। মেন্টাল পেশেন্ট আসলে কে?

এর কয়েকদিন পর আবার একটা ঘটনা ঘটল। ছেলেটি আসার আগেই কবিতা ওর টেবিলে স্তূপাকার করে পেনসিলের খোসা ফেলে রাখল। ছেলেটি ওর নির্দিষ্ট চেয়ারে বসতে গিয়েও উঠে দাঁড়াল। তারপর সোজা লাইব্রেরিয়ানের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানাল। লাইব্রেরিয়ান আমাদের পিছনেই বসেছিলেন। আমরা ওদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছিলাম।

লাইব্রেরিয়ান বললেন, আপনি অন্য কোনও চেয়ারে গিয়ে বসুন না। আমি টেবিলটা পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করছি। কিন্তু একটু সময় লাগবে যে...

ছেলেটিকে হঠাৎ খুব অসহায় দেখাল। সে বলল, তার দরকার নেই।

সে নিজের জায়গায় ফিরে এল। আর নিজেই যত্ন করে, গুছিয়ে খোসাগুলো তুলে নিয়ে ওয়েস্ট পেপার বক্সে ফেলে এল। এতক্ষণে তাকে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত দেখাল। বইয়ের ভেতর মুখ গুঁজে খুব দ্রুত সে মগ্ন হয়ে গেল।

আমি রেগে গিয়ে বললাম, তুই শুধু শুধু ওকে উত্যক্ত করছিস কেন?

কবিতা মুচকি হেসে বলল, তোর অত লাগছে কেন? ওর প্রতি তোর একটু ব্যথা আছে মনে হচ্ছে...

বোকার মতো কথা বলিস না। আমি সপাটে বললাম। তুই ওর পিছনে যেভাবে লেগেছিস, সেটা কী ঠিক?

ছেলেটা কী পাগল? কবিতা হঠাৎ জিগ্যেস করল।

অথবা অন্য কিছু। আমরা হয়তো ঠিক ধরতে পারছি না। আমি আর কথা বাড়ালাম না।

একদিন বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। সাতটা প্রায় বাজে। লাইব্রেরির রিডিং রুমে শুধু আমি আর সেই ছেলেটি। আর কেউ নেই। ভয়ানক দুর্যোগ দেখে অনেকেই আসে নি, বাকিরা আগেভাগেই চলে গেছে। লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। ছেলেটি আমার সঙ্গেই, প্রায় পাশাপাশি হেঁটেই বেরিয়ে এল। আমরা দু-জনেই বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টিটা কমে এসেছে। আমার কাছে কোনও ছাতা ছিল না।

পাশাপাশি দু-জনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমার ছাতাটা নেবেন?

আমি একটু অবাকই হলাম। ছেলেটি আগে কখনও আমার সঙ্গে এভাবে নিজের থেকে কথা বলেনি। বললাম, নিতে পারি। কিন্তু আপনি তো ভিজে যাবেন!

তাতে কিছু হবে না। ছেলেটি বলল। ভিজতে আমার ভালোই লাগে।

আমরা নিজেদের মধ্যে একটু-আধটু কথা বলছিলাম। ছেলেটি হঠাৎ একটা ট্যাক্সি দাঁড় করাল। তারপর বলল, উঠে আসুন। আপনার পাড়ার ওপর দিয়েই আমি যাব।

আমি কথা না বাড়িয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম। দু-জনে পাশাপাশি বসে আছি। কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। একটু গুমোটও লাগছে। হঠাৎ ছেলেটিই আবার বলল, আজ খুব দুর্যোগ। আপনার আগেই বাড়ি ফিরে যাওয়া উচিত ছিল।

খুব একা লাগে। আমি বললাম।

কেন?

আমার বাবা নেই, মা কলেজে পড়ায়। তারপর ক্লাব হয়ে বাড়ি ফেরে। রোজই অনেক রাত হয়ে যায়। কী করব বাড়ি ফিরে? কথা বলার কেউ নেই...

আপনি বই ভালোবাসেন না?

আপনার মতো নয়।

তাহলে রোজ লাইব্রেরিতে আসেন কেন?

সময় কাটাতে। এখানকার পরিবেশটা এত ভালো লাগে। এই শহরে এত সুন্দর পরিবেশ আর কোথাও নেই।

ছেলেটার একদম মনের মতো হল কথাটা। বলল, ঠিক বলেছেন।

কিছুটা সময় কেটে গেল। দু-জনেই চুপ করে রয়েছি। আবার সেই গুমোট ভাবটা ফিরে আসছে। হঠাৎ ছেলেটি অদ্ভুত একটা কাণ্ড করে বসল। বলল, আপনার হাতটা একটু দেবেন?

এত অবাক আমি আগে কখনও হইনি। এত বিনীত, লাজুক, পড়ুয়া একটা ছেলে! ও কী পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইছে? বাইরে থেকে দেখে তো কিছুই বোঝা যায় না!

কিন্তু আর একটা হাতের স্পর্শের জন্য আমিও কী ভিতরে ভিতরে মুখিয়ে নেই? এই চাওয়ার মধ্যে যদি কোনও মিথ্যে না থাকে, আমারই বা দিতে আপত্তি কেন হবে? তাছাড়া, ও তো অদ্ভুত একটা ছেলে। ওর হাতের স্পর্শও কী অদ্ভুত হবে?

আমি হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। ও আমার হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল, আমি পেইন্টিং নিয়ে গবেষণা করছি। আমার বিষয়, সৌন্দর্য ও নান্দনিকতা। বিউটি অ্যান্ড এসথেটিকস। সৌন্দর্য কী, আমি তা জানতে চাই। আর আপনি খুব সুন্দর। স্পর্শ না করলে কী সৌন্দর্যকে অনুভব করা যায়?

কথাটা বলেই ছেলেটি আমার হাত ছেড়ে দিল। ও শুধু এটুকুই চেয়েছিল। আর একটা কথাও সে বলল না। কিন্তু আমার হঠাৎ খুব ভালো লাগতে শুরু করেছিল। সত্যিই, ছেলেটির সবকিছুই অদ্ভুত। ওর হাতের স্পর্শও খুব অদ্ভুত। তাতে যেন জাদু আছে। সেই স্পর্শের অনুভূতি আমি কিছুতেই যেন ভুলতে পারছিলাম না।

আমার পাড়া এসে গেছিল। ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার বাড়িটা চিনিয়ে দেবেন?

হ্যাঁ। আমার গলা দিয়ে যেন স্বর বেরোতে চাইছিল না।

চিনে রাখি। ছেলেটি বলল। কালই এই শহর ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি। আমার কপাল ভালো, এইভাবে আপনাকে আজই পেয়ে গেলাম। নইলে একটা আপশোশ থেকে যেত। পরে কখনও এই শহরে এলে, আপনাকে ঠিক খুঁজে বার করতে পারব...

ছেলেটির ভেতরে তাহলে এই ছিল! আর আমি কিছুই বুঝতে পারিনি! দেখে তো মনে হত, যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না! কিন্তু ওর সবকিছুই আজ আমার এত ভালো লাগছে কেন? বিশেষ করে, ওর ওই কণ্ঠস্বর! কী আবেগ ওর গলার স্বরে। আরও যেন কিছু একটা আছে? কী সেটা? নিজের কাছেও কী সবকিছু স্বীকার করা যায়? শুধু হঠাৎ খুব লজ্জা করতে লাগল।

আমি বাড়িটা চিনিয়ে দিলাম। তারপর ট্যাক্সি থেকে নেমে একছুটে গেট খুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলাম। দরজায় চাবি লাগিয়ে ঘোরানোর সময় আমার হাত রীতিমতো কাঁপছিল। আমি একবারও পিছন ফিরে তাকাইনি। কিন্তু আমি জানতাম, ছেলেটির চোখ আমাকেই অনুসরণ করছে। আমি নিজের ঘরে ঢুকে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ার পর ট্যাক্সিটা ছেড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম। ছেলেটি হয়তো অপেক্ষা করছিল। হয়তো ভেবেছিল, আমি আবার ফিরে আসব। অন্তত জানলার পর্দা সরিয়ে একবার নীচের দিকে তাকাব।

এতক্ষণে আমি একা হলাম। পাগলের মতোই আমি ছুটে এসেছি। ওর কাছ থেকে আমি যেন পালাতেই চাইছিলাম। ও আমাকে খাতির করে ট্যাক্সিতে চাপিয়ে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল। আর ওকে আমি একটা বিদায়-সম্ভাষণ পর্যন্ত জানাইনি। হয়তো আর কখনও আমাদের দেখা হবে না।

পরদিন লাইব্রেরিতে অভ্যাসমতোই আমি গেলাম। আগেই জানতাম, ছেলেটিকে দেখতে পাব না। ওর চেয়ারটা ফাঁকাই পড়ে আছে। অনেকেই হয়তো ভাবছে, একটু পরেই ও আসবে। ওই চেয়ারে এসে বসবে। ওই চেয়ারে এখন আর কেউ বসে না। সবাই যেন জানে, ওই চেয়ারটা ছাড়া ছেলেটা কত অসহায়! সবাই যেন করুণা করেই চেয়ারটা ওর জন্য ফাঁকা করে রেখে দেয়।

কিন্তু সেদিন চেয়ারটা যেন চুম্বকের মতোই আমাকে আকর্ষণ করল। আমি সোজা গিয়ে ওই চেয়ারটায় বসলাম। আর তখনই আমার যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। মনে হল, এই চেয়ারটায় বসলে লাইব্রেরিটাকে সম্পূর্ণ অন্যরকম লাগে। এই জীবনটাকে, এই দুনিয়াটাকে, এই মানুষগুলোকে, এই ঘরটাকে সব কেমন অন্যরকম লাগে। সব কেমন যেন বদলে যায়। এই চেয়ারটায় নিশ্চয়ই জাদু আছে।

তারপর থেকে ওই চেয়ারটাতেই আমি বসতে শুরু করলাম। প্রথমটায় সবাই একটু অবাক হয়েছিল। তারপর জেনে গেছিল, ছেলেটা আর কোনওদিনই ওই চেয়ারটায় এসে বসবে না। কিন্তু আমার ব্যবহারে অনেকেই আশ্চর্য হয়েছিল।

একদিন কবিতা এসে বলল, তোর ব্যাপারটা কী?

কেন? আমি জানতে চাইলাম।

রোজ ওই চেয়ারটাতেই এসে বসিস কেন? লোকে তো তোকে নিয়েও হাসাহাসি শুরু করে দিয়েছে।

আমি চুপ করে রইলাম। কী বলতাম আমি? যদি বলতাম, ওই চেয়ারটায় জাদু আছে, চুম্বক আছে, এখানে বসলে আমার চোখে দুনিয়াটা বদলে যায়, আমি নিজেও বদলে যাই, আমার আর একটুও একা লাগে না, একটা আশ্চর্য সুখের আমেজে....

কিন্তু এসব কথা কী কবিতা বুঝত? ও হেসেই উড়িয়ে দিত। তারপর আমাকেও হয়তো বলে বসত, তুই একটা মেন্টাল পেশেন্ট! তাছাড়া আমিই বা বোঝাতে যাব কেন? আমি শুধু এই চেয়ারটাকে আঁকড়ে থাকতে চাই। এর থেকে কেউ আমাকে আলাদা করতে পারবে না।

একদিন একটা ঘটনা ঘটল। আবার একটা ছেলে আমার হাত স্পর্শ করল। শীতকালের বিকেল। সূর্যাস্ত হচ্ছে। ইউনিভার্সিটির মাঠের পশ্চিমে আকাশ লালচে হয়ে গেছে। ছেলেটি আমার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল, তোমার হাতগুলো কী রোগা! আর কী ঠাণ্ডা!

আমি নিজের হাতটা সরিয়ে নিলাম। এখন আমি কারওর হাতের স্পর্শই সহ্য করতে পারি না। তাহলে যে স্পর্শটাকে আমি বাঁচিয়ে রাখতে চাই, সেটা মুছে যেতে পারে। তাছাড়া একমাত্র আমিই জানি, কবে থেকে আমি রোগা হতে শুরু করেছি। আর কখনও কোনও পুরুষ আমার হাত স্পর্শ করতে পারবে না। যদি করে, তারা নিজেরাই সরিয়ে নেবে। এত রোগা আর ঠাণ্ডা সেই হাত! এই হাতের কাছ থেকে কোনও উত্তর পাবে না তারা।

আমি ছুটতে ছুটতে ইউনিভার্সিটির মাঠ থেকে লাইব্রেরিতে এলাম। এক্ষুনি গিয়ে আমার চেয়ারটায় বসতে হবে। কিন্তু রিডিং রুমে ঢুকেই আমি অবাক হয়ে গেলাম। চেয়ারটা তো ফাঁকা নেই! কে যেন বসে আছে সেখানে। আমি তার পিছনটা দেখতে পাচ্ছি।

তাহলে কী সে ফিরে এল? আমি ছুটে গেলাম চেয়ারটার দিকে....

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন