কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

 

 

 

কালিমাটি অনলাইন / ১৪৬ / চতুর্দশ বর্ষ : সপ্তম সংখ্যা

 


শরৎ এলেই বাঙালির স্মৃতিতে কয়েকটি চিরপরিচিত ছবি ভেসে ওঠে—নীল আকাশ, সাদা মেঘ, কাশফুল, শিউলি আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ। যেন প্রকৃতি নিজেই উৎসবের ঘোষণা করছে। কিন্তু প্রশ্নটি অন্যত্র: এই শরৎ কি এখনও আমাদের জীবনের বাস্তব ঋতু, নাকি ক্রমশ বিজ্ঞাপন, নস্টালজিয়া এবং উৎসব-বাজারের নির্মিত একটি সাংস্কৃতিক প্রতিমা?

ঋতুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনও নিছক রোমান্টিক ছিল না। কৃষিনির্ভর বাংলায় শরৎ ছিল বর্ষার দুর্ভোগ পেরিয়ে স্বস্তির সময়। মাঠে ধান, গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং উৎসবের প্রস্তুতি—প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে মানুষের জীবন তখন প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল। আজ সেই সম্পর্ক অনেকটাই ছিন্ন। নগরায়ণ আমাদের ঋতুকে জানালার কাচের ওপারে সরিয়ে দিয়েছে। শরৎ এখন অনেকের কাছে আবহাওয়ার অভিজ্ঞতার চেয়ে সামাজিক মাধ্যমের ছবির বিষয় বেশি।

শরতের সামাজিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অবশ্য দুর্গাপূজা। বাংলায় দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামোরও প্রতিচ্ছবি। একসময় জমিদারবাড়ির পূজা ছিল প্রতিপত্তির প্রদর্শন। পরে বারোয়ারি ও সর্বজনীন পূজা সেই উৎসবকে বৃহত্তর সমাজের হাতে তুলে দেয়। ধর্মীয় পরিসর ধীরে ধীরে নাগরিক জনপরিসরে রূপান্তরিত হয়। এই পরিবর্তনকে নিছক উৎসবের বিবর্তন বলে দেখলে ভুল হবে; এর মধ্যে রয়েছে বাংলার সামাজিক গণতন্ত্রীকরণেরও একটি ইতিহাস।

কিন্তু আজকের সর্বজনীনতার সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়— সত্যিই কি উৎসব সর্বজনীন?

যে শহরে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আলোকসজ্জা হয়, সেই শহরেই বহু মানুষ উৎসবের বাজারে দাঁড়িয়ে ক্রেতা নয়, কেবল দর্শক। যে পূজা সাম্যের কথা বলে, তার আয়োজনের শ্রম বহন করেন অসংখ্য নিম্নআয়ের কর্মী, অথচ উৎসবের দৃশ্যমান গৌরবের ভাগ তাঁদের কতটা জোটে? উৎসবের অর্থনীতি যত বড় হচ্ছে, উৎসবের সামাজিক দায়ও তত বড় হওয়া উচিত। তা না হলে ‘সর্বজনীন’ শব্দটি কেবল ব্যানারে ব্যবহৃত একটি অলংকার হয়ে দাঁড়ায়।

আরও একটি সংকট আমাদের সামনে। জলবায়ু পরিবর্তন ঋতুচক্রের স্বাভাবিকতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। শরৎ কি সত্যিই আগের মতো আসে? বর্ষার অনিয়ম, তাপমাত্রার অস্বাভাবিকতা, নগর দূষণ এবং প্রকৃতি ধ্বংসের ফলে সেই পরিচিত শরৎ ক্রমশ দুর্লভ। অথচ আমরা শরৎকে ভালোবাসার নামে তার প্রতীকগুলোকেই ব্যবহার করছি; তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কতটা দায় নিচ্ছি?

এইখানেই শরতের আসল রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করা সহজ; সেই সৌন্দর্যের শর্তগুলি রক্ষা করা কঠিন।

শরৎ তাই শুধু কাশফুলের ঋতু নয়, আত্মসমালোচনারও ঋতু। ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে একটি ধর্মীয় উৎসব সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বর্তমান আমাদের শেখাচ্ছে, কীভাবে সেই উৎসব বাজারের বৃহৎ অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যৎ আমাদের জিজ্ঞাসা করবে—এই বিপুল আয়োজনের মাঝেও আমরা মানুষ, প্রকৃতি ও সামাজিক ন্যায়ের জায়গাটি কতটা অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছি।

শরৎ আসুক। ঢাক বাজুক, আলো জ্বলুক, উৎসব হোক। কিন্তু সেই আলোর বাইরে যে অন্ধকার রয়েছে, তার দিকেও চোখ ফেরানো দরকার। কারণ শরতের প্রকৃত সৌন্দর্য আকাশের নীলতায় নয়—সমাজ কতটা নির্মল, মানুষ কতটা সমান এবং ভবিষ্যৎ কতটা বাসযোগ্য, তার মধ্যেই তার আসল পরীক্ষা। সবাইকে জানাই শারদ শুভেচ্ছা শ্রদ্ধা ভালোবাসা এবং অভিনন্দন।

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

kajalsen1952@gmail.com

দূরভাষ যোগাযোগ : 9835544675

 

<<<< কথনবিশ্ব >>>>

 

কথনবিশ্ব

 

শুভ্রনীল চক্রবর্তী

 

ঋষি অরবিন্দ: বিপ্লবী থেকে বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের রূপকার

 


(তৃতীয় পর্ব)

বঙ্গভঙ্গ, 'বন্দে মাতরম' ও জাতীয়তাবাদের নতুন ভাষা (১৯০৫–১৯০৮)

১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। ব্রিটিশ সরকার এই সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস বলে ব্যাখ্যা করলেও সমসাময়িক বহু ভারতীয় নেতা একে "Divide and Rule" নীতির অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। এই সময়েই বরোদার নীরব অধ্যাপক অরবিন্দ ঘোষ কলকাতায় এসে সরাসরি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। ইতিহাসের দৃষ্টিতে এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়। কারণ মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তিনি কেবল একজন লেখক বা চিন্তাবিদ নন, বরং ভারতীয় চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।

কলকাতায় এসে অরবিন্দ প্রথমে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ-এর অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প গড়ে তোলা। কিন্তু খুব দ্রুতই তিনি উপলব্ধি করেন যে কেবল শিক্ষা নয়, রাজনৈতিক চেতনাকেও জাগিয়ে তুলতে হবে। এই সময় তিনি ইংরেজি দৈনিক Bande Mataram-এর প্রধান সম্পাদকীয় লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। যদিও পত্রিকার আনুষ্ঠানিক সম্পাদক ছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল, অধিকাংশ প্রভাবশালী সম্পাদকীয় অরবিন্দের লেখা বলে সমসাময়িক সূত্র ও গবেষকরা একমত। তাঁর ভাষা ছিল যুক্তিনিষ্ঠ, তীক্ষ্ণ এবং নির্ভীক। ব্রিটিশ শাসনের নৈতিক বৈধতাকেই তিনি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন।

অরবিন্দের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যায় এই সময়ে। তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃত্ব ব্রিটিশ সরকারের কাছে সাংবিধানিক সংস্কার ও অধিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানাচ্ছিল। কিন্তু অরবিন্দ যুক্তি দেন, পরাধীন জাতির লক্ষ্য হতে পারে না সীমিত সংস্কার; লক্ষ্য হতে হবে পূর্ণ জাতীয় স্বাধীনতা। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। অনেক জনপ্রিয় লেখায় দাবি করা হয় যে "পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি প্রথম অরবিন্দই তুলেছিলেন।" ইতিহাসবিদদের অধিকাংশই বরং বলেন, তিনি ছিলেন প্রথম সারির সেই নেতাদের অন্যতম, যিনি ১৯০৬–০৭ সালেই প্রকাশ্যে পূর্ণ স্বাধীনতার ধারণাকে রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। কারণ কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে "পূর্ণ স্বরাজ"-কে লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে ১৯২৯ সালের লাহোর অধিবেশনে। সুতরাং অরবিন্দের অবদান ছিল এই  ধারণাকে অনেক আগে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা।

এই সময় তাঁর লেখায় চারটি বিষয় বারবার ফিরে আসে— স্বদেশি, বয়কট, জাতীয় শিক্ষা এবং স্বশক্তির সংগঠন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল বিদেশি পণ্য বর্জন করলেই স্বাধীনতা আসবে না; প্রয়োজন আত্মনির্ভর অর্থনীতি, জাতীয় চরিত্র গঠন এবং জনগণের মানসিক মুক্তি। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে স্বামী বিবেকানন্দের আত্মশক্তির ধারণা এবং বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয় চেতনার প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। একই সঙ্গে তিনি ভগবদ্গীতা থেকে কর্ম, ত্যাগ ও নির্ভীকতার আদর্শকে রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেন। এই কারণেই তাঁর জাতীয়তাবাদ কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল এক সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের আহ্বান।

১৯০৭ সালের সুরাট কংগ্রেস অধিবেশনে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের বিভাজন ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করে। অরবিন্দ প্রকাশ্যে বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল এবং লালা লাজপত রায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান। তবে এটিও উল্লেখযোগ্য যে তিনি কখনও অকারণ সহিংসতার সমর্থন করেননি। তাঁর মতে, একটি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হতে পারে, কিন্তু জাতীয় আন্দোলনের মূল ভিত্তি হতে হবে সংগঠন, আত্মত্যাগ এবং জনগণের জাগরণ। ব্রিটিশ সরকারের গোপন নথি থেকে জানা যায়, এই সময় থেকেই গোয়েন্দারা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিবিড় নজরদারি শুরু করে। তাঁর লেখনীকে তারা বিশেষভাবে বিপজ্জনক বলে মনে করত, কারণ তা শিক্ষিত যুবসমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছিল।

১৯০৮ সালের শুরুতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সরকার বিপ্লবী কার্যকলাপ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। একই বছরের মে মাসে মুজাফ্ফরপুর বোমা বিস্ফোরণের তদন্তের সূত্র ধরে অরবিন্দ ঘোষকে গ্রেফতার করা হয় এবং শুরু হয় ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম ঐতিহাসিক বিচার— আলিপুর বোমা মামলা। এই মামলায় তাঁর বিচার শুধু একজন ব্যক্তির বিচার ছিল না; কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিল একটি নতুন জাতীয়তাবাদী দর্শন, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নৈতিক ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জ করেছিল। সেখান থেকেই শুরু হবে অরবিন্দের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

(চলবে)

এই পর্বে ব্যবহৃত প্রধান সূত্র

১. Sri Aurobindo – Bande Mataram (Selected Writings, Complete Works)

২. Sri Aurobindo – The Doctrine of Passive Resistance

৩. Peter Heehs – The Lives of Sri Aurobindo

৪. K. R. Srinivasa Iyengar – Sri Aurobindo: A Biography and a History

৫. Bipan Chandra et al. – India's Struggle for Independence

৬. Sumit Sarkar – The Swadeshi Movement in Bengal (1903–1908)

On Thu, 16 Jul 2026, 14:37 Suvroneel Chakroborty, <svrnlchkrbrt1@gmail.com> wrote:

 

 

অরিজিৎ হাজরা

 

ভারতের আধুনিক শিক্ষার সংস্কারক স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

(আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ শতবর্ষে বিশেষ রচনা)

 


উনিশ শতকের ভারতের নবজাগরণের ইতিহাসে যে ঢেউ উঠেছিল এদেশের সমাজদর্শনে, সমাজজীবনে তার অন্যতম পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়ের উত্তরসূরী হিসাবে বিদ্যাসাগরের পরই যাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, তিনি হলেন বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। ভারতের রেনেসাঁসের যুগান্তকারী বলিষ্ঠ  পুরোহিত, পরাধীন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী শিক্ষার উন্নয়নের কান্ডারী স্বাধীনচেতা বলিষ্ঠ পুরুষ। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একাধারে প্রসিদ্ধ গণিতজ্ঞ, স্বনামধন্য আইনজ্ঞ, শিক্ষাবিদ,  শিক্ষা সংস্কারক - অপরদিকে ভারতের নির্ভীক এক দেশপ্রেমিক।

ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন এই মহান পুরুষের জন্ম সম্পর্কে লিখেছেন,  "পিতা-মাতা ও বংশের অনেক পূর্ণ না থাকিলে আশুতোষ-এর মত পুত্র জন্মে না"। 'হিন্দু পেট্রিয়ট' পত্রিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বংশধর পিতা গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মাতা জগত্তারিনী দেবী আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে গড়ে তুলেছিলেন সোনার খনি থেকে তুলে আনা সোনা থেকে তৈরি স্বর্ণ অলংকারের ন্যায়। এই মহান মানুষের জন্ম হয় ২৯ শে জুন ১৮৬৪ সাল বউবাজারের ১৭ নম্বর মঙ্গলা লেনে। প্রকৃতিদত্ত প্রতিভা নিয়ে জন্মানো আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন শিক্ষা ও সমাজ মননে গড়ে ওঠা নৈতিকতার তীব্র আকুতির বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকেও নতমস্তক হতে হয় সুউচ্চ গর্জনে 'রয়েল বেঙ্গল টাইগার' আশুতোষ মুখোপাধ্যায়-এর সামনে। ভারতের বিরুদ্ধে অন্যায়ের আপসহীন এক লড়াকু সৈনিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্মের দ্বারা ভারতবর্ষের প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব মানবতার মহত্ত্বে।

অতুলচন্দ্র ঘটকের 'নোট' থেকে জানা যায় যে, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাল্য-অবস্থা থেকেই এক 'ভরেসাস রিডার'। সাত-আট বছর বয়সেই কন্ঠস্থ ছিল হোমারের ‘ইলিয়ড', ক্যাম্বেলের 'প্লেজার অফ হোপ’,  মিলটনের 'প্যারাডাইস লস্টের' মতন গ্রন্থগুলি। তাঁর অতি আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তার জন্য দশবছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় উপহার দিয়েছিলেন ‘রবিনসন্স ক্রুশো’ বইটি। এছাড়া পিতা গঙ্গাপ্রসাদের কাছ থেকে প্রাতঃভ্রমণ কালে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী শুনতে শুনতে এই সমস্ত ধর্মগ্রন্থগুলির পঙক্তি কণ্ঠস্থ হয়েছিল আশুতোষের, যা পরবর্তীকালে শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাষা ও ধর্মগ্রন্থকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন  সুনামের সঙ্গে। বাল্য-অবস্থা থেকেই বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার জন্য শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন  দুঃসাহসিক শিক্ষাপ্রথার প্রচলন করেছিলেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে।

অতুলচন্দ্র ঘটক মহাশয়ের নোট থেকে আরও জানা যায় যে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বাড়িতে প্রথম ভাগ শেষ করেই ভবানীপুর চক্রবেড়িয়া শিশু বিদ্যালয় ভর্তি হন। ১৮৬৯ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত বঙ্গ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। এগারো বছর বয়সে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সাউথ সুবারবান স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ন্যায়নীতি, ব্রাহ্মজ্ঞান ও গণিতে পারদর্শিতা অর্জন করেন নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর কাছ থেকে। এই স্কুল থেকেই ১৮৭৯ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে লাভ করেন কুড়ি টাকা বৃত্তি। ১৮৮০ সালে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হয়ে প্রচন্ড গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও ১৮৮১ সালে এফ.এ পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অর্জন করে ২৫ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। এছাড়া ১৮৮৪ সালে ‘এ’ কোর্সে পাঁচদিন পরীক্ষা দিয়ে বি.এ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে ১৫০ টাকা বৃত্তি পান এবং গণিতে সর্বাধিক নাম্বার পাওয়ার জন্য ‘হরিশচন্দ্র পারিতোষিক’ লাভ করেন তিনি। দ্বিতীয়বার বিশুদ্ধ গণিত, মিশ্র গণিত ও পদার্থবিদ্যা এই তিন বিষয়ে একত্রে এম.এ পরীক্ষা দিয়ে সর্বোচ্চ নাম্বারের জন্য ‘প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ’ বৃত্তি লাভ করেন। এছাড়া ১৮৮৮ সালে বি.এল পরীক্ষায় পাস, ১৮৯৩এ অনার্স-ইন-ল উপাধি লাভ এবং ১৮৯৪ সালে ডক্টর অফ-ল (ডি.এল) উপাধি লাভ করেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বাল্য অবস্থা থেকে যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন পরবর্তীকালে তা পরিণত হয়েছিল পর্বত সমান পাণ্ডিত্যে। ছেলেবেলা থেকেই যে সকল বৃত্তি ও পারিতোষিক পেয়েছিলেন তার সবটা থেকেই বহু বই কিনে সমৃদ্ধ করেছিলেন তাঁর গ্রন্থাগারকে। দিনেশচন্দ্র সেনের সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির সর্বত্র ছিল বইভর্তি আলমারি। তরুণ বয়সেই আশুতোষ গণিতে নতুন আবিষ্কার করে বিশ্ব বিখ্যাত গণিত বিশেষজ্ঞ মিস্টার গ্লেসিয়ার, মিস্টার কেলি প্রমূখ অধ্যাপকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সেই সময় গণিত নিয়ে তাঁর অনেক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল ইউরোপের বড় বড় কাগজে। গণিতে পারদর্শী আশুতোষ তেইশ বছর বয়সে ১৮৮৭ সালে 'লন্ডন মাথামেটিকাল সোসাইটির' সদস্যপদ লাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯০৮ সালে ভারতবর্ষে প্রথম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে  'ক্যালকাটা ম্যাথামেটিক্যাল সোসাইটি'। ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের নোট থেকে জানা যায় যে তৎকালীন প্রখ্যাত গণিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আর.পি পরঞ্জযাবে মন্তব্য করেছিলেন, "যদি আশুতোষ গণিতের অধ্যায়নে ও গবেষণায় নিযুক্ত থাকতেন তাহলে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গণিত শাস্ত্রবিদদের সমকক্ষ হতে পারতেন"।

ছেলেবেলার 'ভোরেসাস রিডার' আশুতোষ পরবর্তীকালে নিজেকে প্রতিষ্টিত করেছিল একটি স্বাধীনচেতা সমাজ উন্নয়নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রূপে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের প্রথম থেকেই স্বপ্ন ছিল দেশের শিক্ষা পদ্ধতির আমূল সংস্কার করে উচ্চশিক্ষার ঢেউকে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের জগত সভায় বাংলা  তথা ভারতবর্ষকে উজ্জ্বল স্থানে প্রতিষ্ঠা করা। এই সম্বন্ধে তিনি বারবার বলতেন, "It had always been my ambition to be allowed to do something something great as  I flattered myself in my youthful dreams for the good and glory of my Alma Matter."

প্রখর চিন্তাশক্তি হিমালয় সদৃশ পাণ্ডিত্যের মতনই আশুতোষ ছিলেন সিদ্ধান্তে অটল এক শিক্ষাসারথী। তাঁর প্রথম ভাবনাই ছিল বিদেশি শক্তির হাত থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচালনার ভার মুক্ত করে শিক্ষা ব্যবস্থার শীর্ষ থেকে স্বাধীন ভাবনার অধিকার নিয়ে এসে, বুনিয়াদি শিক্ষা থেকে বিদ্যালয়ের স্তর পর্যন্ত স্বাধীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করা এবং দেশে গবেষণার দিগন্ত খুলে দিয়ে ভারতবর্ষকে বিশ্বের শিক্ষা জগতের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেওয়া।

১৯০৬ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। সব্যসাচীর মতন আশুতোষ একদিকে শিক্ষা বিস্তার অপরদিকে শিক্ষা সংস্কারে ব্রতী হন। তাঁর প্রচেষ্টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে সামান্য একটি পরীক্ষাশালা থেকে উচ্চ শিক্ষার জ্ঞানপীঠে পরিণত করেন। মাত্র একজন রেজিস্ট্রার ও তিনজন করণিক নিয়ে কাজ চালানো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় পেয়েছিল স্নাতকোত্তরের ২৫টি বিভাগে ২৫জন অধ্যাপক ও ১৫০জনের বেশি কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতির জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিকাঠামগত উন্নতির চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সরকারি অর্থ  সাহায্যের উপর নির্ভর না করে দেশের বহু ধনী ও শিক্ষা অনুরাগী ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করেন। তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে পালিত ঘোষ, খয়রার রাজা, নির্মলেন্দু ঘোষ, গিরিশ ঘোষ, ময়মনসিংহ শেরপুরের জমিদার গোপাল দাস চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিগণ কয়েক লক্ষ টাকা দান করেন যা পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সার্বিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রথমেই সংস্কৃত বিভাগটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপদানে সচেষ্ট হয়েছিলেন। বেদ-বেদান্ত, স্মৃতি উপনিষদ, সাংখ্যযোগ, লিপিতত্ত্ব বিষয়ে যেমন শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন ঠিক তেমনি সচেষ্ট হয়েছিলেন বৌদ্ধশাস্ত্র, পালি শিক্ষার ক্ষেত্রেও। পন্ডিত সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ-এর সহযোগিতায় আশুতোষ মুখোপাধ্যায় পালি বিভাগের প্রবর্তন করে এদেশের গবেষকদের কাছে নালন্দা বিক্রমশীলা, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, শীলভদ্র, সমুদ্রগুপ্ত, রাজগৃহ, পাটলিপুত্র প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন আগ্রহী শিক্ষার্থীদে। ইসলামের জন্য তিনি শিক্ষার স্থায়ী পথ তৈরি করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা আলাদাভাবে ব্যবস্থা করেছিলেন মুসলিম ধর্ম শাস্ত্র দর্শন অলংকার ব্যাকরণ ও বিজ্ঞান বিষয়ের।

উচ্চশিক্ষা বিষয়ে ইংরাজি, সংস্কৃত, পালি, আরবি, পার্সি সহ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষা সহ তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব, দর্শন,  নীতিশাস্ত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, বাণিজ্য গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, শরীরতত্ত্ব প্রভৃতি ছাড়াও বিজ্ঞান বিভাগে রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, উচ্চতর গণিতশাস্ত্র, জড়বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার দ্বার তিনি উন্মোচন করেন। ফলে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে শিক্ষিত-জ্ঞানী-গবেষক উৎসাহী দৃঢ় নব্য বঙ্গ সম্প্রদায়গগণ।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় আশুতোষ মুখোপাধ্যায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপকদের কলকাতায় নিয়ে এসে ছাত্রদের সামনে বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও জ্ঞানের বিকাশের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। রাশিয়ার ব্যবহার শাস্ত্রের অনন্য পণ্ডিত ভিনগ্রেভফ, ফরাসি পণ্ডিত ফুসে, সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস লেখক ম্যাগডোনা, জার্মান পন্ডিত জেকবি প্রভৃতি পন্ডিতেরা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আহ্বানে  উদ্দীপ্ত করে যেতেন এদেশের পড়ুয়া ও উৎসাহী মানুষদের জ্ঞান সাধনায়। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃত উচ্চশিক্ষা ও মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে ভারতের সঠিক উন্নতি সম্ভব এবং শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমেই দেশের সঠিক স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব।

ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন সংক্ষিপ্ত আকারে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের শিক্ষা চিন্তা বিষয়গুলি লিপিবদ্ধ করেছিলেন যেমন- প্রথমতঃ জলের ধর্ম যেমন নিম্নগামী তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সঞ্চারিত হলে সর্বজনীন শিক্ষাও প্রসারিত হবে। দ্বিতীয়তঃ আশুতোষ মুখার্জি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সংজ্ঞা ও আদর্শ নির্ণয় করে ঘোষণা  করেছিলেন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পরস্পর নির্ভরশীল ও পরিপূরক সম্পর্ক থাকলেই প্রকৃত শিক্ষা প্রসারিত হবে। তৃতীয়তঃ আশুতোষের মতে শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র অবশ্যই দরকার। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদের স্বাধীনচিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা থাকা  ও দরকার। চতুর্থতঃ সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়ভার বহন করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র সরকারি নিয়ন্ত্রণ মুক্ত রাখতে হবে। পঞ্চমতঃ ছাত্ররা যেমন রাষ্ট্রনীতি পাঠ করলেও রাজনীতি করবে না, শিক্ষকরাও তেমনি রাজনীতি মুক্ত হয়ে নিজেকে আচার-আচরণ নৈতিকতা ও আদর্শে সমৃদ্ধ করে ছাত্রদের সামনে নিজেকে আদর্শবান শিক্ষক হিসাবে তুলে ধরবেন। ষষ্ঠতঃ স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা ব্যবস্থায় করাকরি যেমন থাকবে না তেমনি শিক্ষককেও দেখতে হবে তিনি কেমন পড়িয়েছেন, ছাত্র কতটুকু শিখেছে সেই মতো পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। ছাত্ররা অহেতুক যেন ভয় না করে পরীক্ষার ক্ষেত্রে ও পড়াশোনার ক্ষেত্রে। সপ্তমতঃ আশুতোষ মনে করতেন স্কুল কলেজে মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও মাতৃভাষায় পঠন পাঠন, পরীক্ষা গ্রহণ ও ডিগ্রি দান করলে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। অষ্টমতঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা না হলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যাবে না বলেই আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মনে করতেন। নবমতঃ  দেশ ও সমাজ গঠনে ও সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত ও নিবেদিত প্রাণ হিসাবে মানুষ তৈরি করতে পারলে শিক্ষার উদ্দেশ্য সার্থক হবে। দশমতঃ স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত সার্বিক শিক্ষার উন্নতি ও প্রসারের মাধ্যমে তৈরি হওয়া শিক্ষিত জ্ঞানী গবেষক ও যুক্তিবাদী নাগরিকগণই দেশের স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে।

শিক্ষিত মেধা সম্পন্ন নাগরিক ও দেশ গঠনের যে স্বপ্ন প্রথম থেকেই আশুতোষ মুখোপাধ্যায় দেখেছিলেন তা নিপুণভাবে বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন বহু সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে। ব্রিটিশ সরকারের কেরানী তৈরি করার বিপরীত ভাবনায় গিয়ে শিক্ষিত জ্ঞানী মেধা সম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত গবেষক তৈরি করতে তিনি বদ্ধপরিকর ছিলে্ন। ব্রিটিশ সরকারের বহু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাধা সত্বেও স্বাধীনভাবে শিক্ষার সংস্কারের কাজ করে গিয়েছেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। এমনকি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জ-এর ডাকে যখন ছাত্ররা স্কুল-কলেজ থেকে বেরিয়ে আসছেন তখনও দেশবন্ধুর "education can wait, swaraj can't" স্লোগানের সমর্থন করেননি তিনি। কারণ তাঁর আশঙ্কা ছিল শিক্ষাঙ্গন থেকে বেরিয়ে এলেই সব শিক্ষার্থী স্বদেশের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবে না, তারা বিপথগামী হবে এবং দেশের মেধা সম্পদ বিঘ্নিত হবে। বহু অপমান কুৎসা সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি তার ভাবনা এবং পরিকল্পনা থেকে শেষদিন পর্যন্ত সরে যাননি। তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত সঠিক পরিকল্পনায় তৈরি হওয়া উচ্চশিক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষিত নাগরিক সম্প্রদাই ব্রিটিশ শাসনকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রকৃত শিক্ষিত জ্ঞানী ভারতের নাগরিক তৈরি করে সুকৌশলে তুলে ফেলতে চেয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজত্বকে। তার অন্যতম উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বোস। সুভাষচন্দ্র বোস এক চিঠিতে তাঁর প্রতি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বদ্যানতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছিলেন।

ভারতবর্ষের জাতি গঠনের অন্যতম পুরোহিত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সময়ের সাথে সাথে তাঁর নাম ম্লান হতে বসলেও ভারতবর্ষের শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাসে ভারতের আধুনিক শিক্ষার  সারথী হিসাবে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নাম চির প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে। ভারতবাসীর প্রিয়জন হয়ে সকলের গৌরবের হৃদয় আসনে প্রতিষ্ঠিত থাকবে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব পুরুষে। কবির ভাষায় বলা যায় -

বিরাট ভূবন মাঝে আজি

জলে তব বিরাট সুকৃতি,

অন্তরের অনুতে অণুতে

জাগে তব অতুলন প্রীতি!

যা ছিল কল্যাণকর শুভ

তাহাতেই ছিলে তুমি ধ্রুব;

গৌর আসনে তব চির প্রতিষ্ঠিত,

স্বদেশ তোমাদের ধন্য, ধন্য তোমাতে স্মৃতি।

তথ্যসূত্র

 ১) আশুতোষ ইতিকথা - ডঃ দিনেশচন্দ্র সেন

২) স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও বঙ্গ সাহিত্য - অধ্যাপক যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত

৩) আধুনিক শিক্ষার সারথী - শ্যামল দাস