| সমকালীন ছোটগল্প |
অন্তর্গত যন্ত্রণা
যৌবনের মৌবনে রঙবিহীন রুক্ষ দিন কাটে দীপকের। কেটে কেটে রক্তক্ষরণ। চাকরির ইনটারভিউ, কোনটাই লাগছে না। শিল্পহীন শহরে কোথায় এত চাকরি! এ.আই. আজকাল কত চাকরি যে খেয়ে বসে থাকে রোজ! চুড়ান্ত হতাশায় দীপক এখন একটুকরো খড়কুটোকেই আঁকড়ে ধরতে চায়। সামান্য আশ্বাসকে অসামান্য ভেবে বসে। অনেক সময় ঠকেও! দীপকের বাবার চাকরি থেকে অবসরের মাত্র মাসখানেক বাকি।
প্রথমবার হার্ট এ্যাটাকের পর থেকেই ভয়ে গাড়ি ড্রাইভ করা ছেড়ে দিয়েছেন এ্যালয়েড স্টিল কোম্পানির সি.ই.ও অশোকবিজয় স্যান্যাল। হসপিটাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর অবশ্য সার্জেন তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, আপনি এখন একদম ঠিক আছেন অশোকবাবু। জাস্ট নর্মাল লাইফ লিড করুন। কোনও ভয় নেই। আরে আমরা আছি কি করতে! স্ত্রী পারমিতা মাঝে মাঝে সেইকথা মনে করিয়ে দিয়ে টিজ করে তাঁকে। পুং-ইগোতে আঘাত লাগে তাঁর। আজ বছরখানেক পরে ড্রাইভার ছেলেটি কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে বিয়ে করতে গেছে। তার সপ্তাহখানেক ছুটির অবসরে নিজেই ড্রাইভ করার ডিসিসন নিয়েছেন অশোকবিজয়। এতদিনের অনভ্যাসেও গাড়ি তাঁর হাতে অবাধ্যতা করেনি। অসভ্যতাও করেনি। মনে সাহস পেয়ে রবিবার ছুটির দিনটা পারমিতাকে নিয়ে লঙড্রাইভে যাওয়ার রোমান্টিক ইচ্ছেটা পেয়ে বসেছে তাঁকে। সুবর্ণরেখা নদীর পাশের দীর্ঘ বাইলেনের মেরিনড্রাইভের লম্বা রাস্তাটা ধরে যতদূর খুশি যাবেন, শীতের প্রকৃতি উপভোগ করবেন, ফেরার সময় রাস্তার পাশের পাঞ্জাবী ধাবায় লাঞ্চ সেরে ফিরবেন দুজনে। এরকমই পরিকল্পনা তাঁর। হার্ট অপারেশনের পর চিন্তায় চিন্তায় বেড়ে যাওয়া বয়েসটাও যেন আজ অনেক কমে গেছে! মনে হচ্ছে নিজের ওপর হারানো কনফিডেন্সও ফিরে এসেছে। ভাবছেন এভাবেই পারমিতাকে পাল্টা জবাব দিতে পারবেন যে তিনি এখনও যুবক! রাস্তায় বেরিয়ে ভাবছেন মাত্র বছরখানেকের মধ্যেই শহরের রাস্তায় ট্রাফিকের এত বাড়াবাড়ি! শহর ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা গিয়ে মেরিনড্রাইভের রাস্তায় পড়বেন। ঠিকই ড্রাইভ করছিলেন! ব্যস্ত শহরের ততোধিক ব্যস্ত রাস্তায় হঠাত গাড়ির সাইডমিরারে আচমকা একটা স্কুটিকে তাঁরই গাড়ির ডিকিতে সজোরে ধাক্কা মেরে ছিটকে পড়তে দেখলেন। মূহূর্তে সমস্ত কনফিডেন্স হারিয়ে ফেলে, কম্পিত অশোকবাবু ব্রেকে পা দাবালেন।
*** *** ***
নির্জন দূপুরে ফোনের ঝনঝনে চমকে উঠেছে দীপক! এক অচেনা কন্ঠস্বর কি বলছে প্রথমটায় বুঝতে পারেনি! একটু ধাতস্থ হয়ে বুঝতে পেরে আতংকে শিউরে উঠলো ও! আই.সি.ইউ-এর জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে যাকে দেখলো দীপক, সে’ই কি ওর বাবা সুপ্রতিম বসু! অক্সিজেনমাস্ক পরা, হাতের একটুকরো ব্যান্ডেজহীন জায়গায় ড্রিপএর নিড্ল, আপাদমস্তক ব্যান্ডেজ বাঁধা একটি অচেতন দেহ সাদা চাদরের বেডে পড়ে আছে। ও বুঝতে পারছে না বাবা বেঁচে আছে কি না! অথচ বাবার নাম করেই তো ফোনটা এসেছে তার কাছে! বিশ্বাস করতে চাইছে না দীপক সমস্ত শরীর ব্যান্ডেজ-মোড়া মানুষটা ওরই বাবা! দীপকের মাথায় সেই মূহূর্তে এই কথাটাই ঘুরছে, মানুষটি ওর বাবা হলে, এই দামি নার্সিংহোমে রেখে তাঁর পরবর্তী চিকিতসা করার সাধ্য তো ওর নেই!
এ্যালয়েড স্টিল কোম্পানির সি.ই.ও অশোকবিজয়বাবু উত্তেজিত দীপককে একটু স্থির হতে সময় দিলেন। দীপককে ওয়েটিংরুমে নিয়ে বসালেন। তাকে একটু মানসিকভাবে প্রস্তুত হতেও সময় দিলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে দীপকের বাবার দূর্ঘটনা যে তাঁরই গাড়ির সাথে হয়েছে খুব নম্রস্বরে সেকথা জানিয়ে দূ;খপ্রকাশ করে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ক্ষমা চাইলেন। অথচ ক্ষমা চাওয়ার কথা তাঁর নয়! দুঃখপ্রকাশের কথাও তাঁর নয়! কিন্তু পৃথিবীতে এইরকম কিছু কিছু মানুষও আছেন যাঁরা পরোক্ষে হলেও নিজেকে এইরকম দোষী ভাবতে পারেন, যখন বাকি বিশ্বের বেশীরভাগ মানুষ সত্যিকারের দোষী হয়েও দোষ ঝেড়ে ফেলতে কতরকম দুষ্ট পন্থা নিতে একটুও ভাবে না! এই এ্যাকসিডেন্টে ওই ভদ্রলোকের গাড়িটিরও খুব কম ক্ষতি হয়নি! ডিকির অবস্থা দেখে বুঝতে পেরেছে দীপক। ওর বাবার স্কুটার ব্রেক ফেল করে তাঁর গাড়ীর ডিকিতে সজোরে ধাক্কা মেরেছে একথা বলে একবারও দোষারোপ বা আঙুল তুলে চেচামিচি করেননি অশোকবিজয়বাবু। ধাক্কা দিয়ে এতজোরে ছিটকে পড়েছেন যে রাস্তার ডিভাইডারের দেওয়ালে আছড়ে পড়ে দ্বিতীয়বার আঘাত পেয়েছেন সুপ্রতিমবাবু। বরং ধাক্কা খাওয়া গাড়িটা যে তাঁরই, সেইজন্যই অশোকবাবু মর্মাহত! আজকালকার দিনে এরকম একজন মানুষের সাথে দেখা হয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে দীপক তাঁর দিকে তাকিয়েছিল কিছুক্ষণ। আর সেই একই সময়ে অশোকবাবু ভাবছিলেন গাড়ি ড্রাইভ নিয়ে স্ত্রীর কাছে নিজের ইগো-স্যাটিসফ্যাকসনের কি এমন দরকার পড়েছিল তাঁর! আজ তাঁর জন্যই এই মানুষটি এতবড় দূর্ঘটনার শিকার হলেন! নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছেন না এই ইমোশনাল মানুষ অশোকবিজয়! ইতিমধ্যে আই.সি.ইউ থেকে বেরিয়ে এসে ডক্টর ইন ডিউটি, পেশেন্টের বাড়ির লোকের সাথে কথা বলতে চাইছেন। ডাক্তারবাবু বললেন, এখনই কিছু বলতে পারছি না। পেশেন্ট ইজ হেভিলি ইনজিওর্ড! দীপকের মুখে ভয় এবং তারথেকেও বেশী আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করে কষ্ট পেলেন অশোকবাবু। দীপককে ধাতস্থ হতে একটু সময় দিয়ে তিনি ওকে নিয়ে বসলেন, এবং বসে যে কথা বললেন, তা শুনে দীপক অবাক! যে কথা সে স্বপ্নেও ভাবেনি, সেই কথা শুনে দুঃখ-কষ্ট-সুখ-আবেগ-আনন্দ-শ্রদ্ধাবোধ একসাথে এসে দীপককে যেন বিবশ করে দিল! এর উত্তরে কিছুই বলার থাকলো না ওর! শুধু বিস্ময়ে চেয়ে থাকা ছাড়া! উনি দীপককে বলছেন, ঈশ্বরের কাছে তোমার বাবার শীঘ্র সুস্থতা কামনা করি। কিন্তু ঈশ্বর না করুন, যদি চাকরির রিটায়ারমেন্টের আগে ওনার কিছু হয়ে যায়, তবে আমাদের কোম্পানিতে তোমার একটা চাকরির ব্যবস্থা আমি অবশ্যই করে দেবো। রাতে সুপ্রতিমবাবুর কাছে থাকার জন্য এ্যাটেডেন্টের ব্যবস্থা করছি। নার্সিংহোমের সব খরচ আমার। দীপকের মনে হলো, এই অনাত্মীয় ভদ্রলোক ওর মনের ভেতর বয়ে-যাওয়া ঝড়কে কি ভাবে পড়তে পারলেন! মি.সান্যালের মতোই বিনয়ের সাথে দীপক এবার বলে, এ্যাটেনডেন্টের দরকার নেই কাকু, আমিই থাকবো বাবার কাছে। শুনে মনে মনে শান্তি পেলেন মি.সান্যাল। যাক্, এই জেনারেশনের ছেলে হলেও বাবার প্রতি ফিলিংস্ আছে হেলেটির!
*** *** ***
কিন্তু কী ভীষণ যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে এখন দীপকের সময় অতিক্রান্ত হয়ে চলেছে কেউ যদি জানতো! আজ তিনদিন পরেও চোখ খোলেননি সুপ্রতিমবাবু! দীপক কিছুটা নিশ্চিন্ত। এতখানি আঘাত বাবা সইতে পারবেন বলেই মনে হয় না ওর! আর কি করে যেন সেটাই সত্যি বলে মনে করে করে বসে ও। বন্ধুরা পালা করে থাকতে চেয়েছে, রাজি হয়নি দীপক। এখন প্রতিটা মুহূর্ত খুব দরকারি দীপকের কাছে। এবং টানা সাতদিন এভাবে থেকে অষ্টমদিন সকালে ডাক্টারের রাউন্ড দেবার সময় দীপকের বাবা সুপ্রতিমবাবু চোখ মেলে তাকালেন। কোমরের হাড়, একটি হাত, একটি পা ভাঙা এবং ব্রেইনে তীব্র চোট ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে জবুথবু সুপ্রতিমবাবু চাকরি থেকে রিটায়ার করার একমাস আগেই চোখ মেলে তাকালেন। সাকসেসফুল ডাক্তার খুব খুশি। খবর পেয়ে অশোকবিজয়বাবুও নিজেকে কিছুটা হলেও ক্ষমা করতে পেরে শান্তি পেলেন। বেঁচে ওঠা বাবাকে দেখে ভেতর থেকে খুব জোর একটা ধাক্কা খেলো দীপক।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন