![]() |
| কবিতার কালিমাটি ১৬১ |
প্রস্থান
একজন মানুষের আকস্মিক প্রস্থানের সাথে তার গৃহের পরিবর্তন ঘটে। দেয়ালগুলো সংকুচিত হয়ে আসে, জানালাগুলো সকালের আলোর অভিভাবকত্ব অস্বীকার করে। একটি চেয়ার শূন্যতার চিরস্থায়ী ছায়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। দ্বিধাগ্রস্ত বাতাসের সিল্ক রিবন থেকে ঝরে যায় পাতার সবুজ আভা।
অন্য শহরে কর্মরত ছেলে কিংবা মেয়ের সাথে এক মুহূর্তে যোগাযোগ করা যায়। তবে যে মুখটি দেখার জন্য তারা ছুটে আসে তা চিত্রের বিবর্ণতার ভেতর মিশে যেতে থাকে। পৃথিবীর দূরত্ব-চেতনা মৃত মানুষকে গৃহে অপেক্ষমাণ রাখে।
মৃতদের জন্য রয়েছে কিছু আনুষ্ঠানিকতা যা এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে অনুসৃত হয়ে থাকে। জীবিতেরা মৃতের শেষ স্নানের ব্যবস্থা করে, নতুন বস্ত্রে তাকে সজ্জিত করে। শোকের ভেতর একটি নিশ্চল শরীর কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া পথে যাত্রা শুরু করে।
স্বজনরা কাঁদে—তাদের বিচূর্ণ হৃদয় থেকে ঝরে দুঃখস্রোত।একটি নাম বারবার উচ্চারিত হয়, শায়িত মস্তিষ্কের শ্রবণ কেন্দ্রে কোনো সংকেত পৌঁছায় না। নাম ছড়িয়ে দেয় টুকরো আয়না যেখানে কিছুই প্রতিফলিত হয় না।
মৃত মানুষটি যখন ঘরে শুয়ে থাকে, তখন কেউ খেতে চায় না। ভাত ঠান্ডা হয়ে যায়, গ্লাসের জল পড়ে থাকে, এবং রান্নার গন্ধ বয়ে আনে না গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দ্বীপের মৃদু বাতাস। জীবিতদের শরীর ভুলে যায় ক্ষুধার ভাষা।
অন্ত্যেষ্টির পর ধীরে ধীরে ক্ষুধার উদ্রেক অনুভূত হয়। চূর্ণ হৃদয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে নির্লজ্জ জীবন—সে কিছু খেতে চায়, ক্রন্দনের পর চায় নিদ্রা।
তবুও যে মানুষটি মৃতকে ভালোবাসত, সে সহজে খেতে পারে না। প্রতিটি গ্রাসের সঙ্গে তার মনে পড়ে টেবিলে সাজানো ভাতের থালা, সদ্যস্নাত মানুষের সান্নিধ্যের দৃশ্য। মনের ভেতরেই কেবল প্রলম্বিত হতে থাকে এ দৃশ্যের ছায়া।
দুজন মানুষের বন্ধন অন্য দুজনের বন্ধনের অনুকৃতি নয়। দুজন মানুষের অন্তরঙ্গতার কোনো মানচিত্র থাকে না বলে অন্যরা তা কিছুটা অনুধাবন করতে পারে, কিন্তু তার গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করতে পারে না। একজন মানুষের প্রস্থানের সাথে সাথে একটি বিশ্বচক্র প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়—নিরর্থক হয়ে পড়ে এর প্রতিরূপ-নির্মিতি।
হয়তো এ কারণেই আমরা মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে চাই। জীবন যতই দুঃসহ হোক, আমরা তাকে আঁকড়ে থাকি। আমাদের হৃৎপিণ্ড কিংবা ফুসফুস স্বাধীনভাবে বাজিয়ে চলে প্রাচীন কঙ্কমালা। আমরা মৃত্যুকে যখন পরিণতি হিসেবে চিনি শরীর তখন চেনে শত্রু হিসেবে।
মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়, অথচ তার ভেতরে বাস করে হিংস্রতা। মানুষ যেমন আলিঙ্গন করতে পারে, তেমনি পারে আঘাত করতে। কোমলতা ও নৃশংসতার ভেতর একটি পরিখা থাকবে—এমন কোনো কথা নেই।
কোনো কোনো মানুষ নগণ্য কারণে হিংস্র হয়ে ওঠে। বিরোধ, লোলুপতা অথবা আহত অহংকারের মুহূর্ত প্রজ্বলিত হলে হঠাৎ একটি জীবন অঙ্গারিত হয়ে যায়। পড়ে থাকে স্তব্ধ শরীর—একটি পরিবার; ঝোড়ো বাতাসে ওড়ে প্রশ্নাবলি যাদের উত্তর অনুসন্ধান করা বিপত্তিকর।
মানুষ অদ্ভুত প্রাণী—যাকে সে ভালোবাসে তার মৃত্যু সহ্য করতে পারে না, অথচ কখনো সে হয়ে ওঠে অন্যের হন্তারক। মানুষের ভেতরে থেকে যেতে চায় একটি অপচ্ছায়া।
মৃতরা জানে না, তাদের প্রস্থানের পর জীবিতরা কী করে। তারা দেখে না মানুষের সমাবেশ, অশ্রু ও দীনতা। তারা যে নীরবতার ভেতর অন্তরিন হয় সেখান থেকে কোনো বার্তা ফিরে আসে না।
মৃতরা কী কখনোই ফিরে আসে না? তারা ফিরে আসে সাধারণ জিনিসের ভেতর দিয়ে। বুকশেলফের বিশেষ কিছু বই, পরিচিত গানের রেকর্ড, বসবার মোড়ার কাছে তাদের পায়ের শব্দ শোনা যায়। আমরা মুহূর্তের জন্য তাদেরকে আবিষ্কার করি।
মৃতদের জন্য পৃথিবী থেমে থাকে না। মৃত্যু জীবনের প্রচুর রস শুষে নেবার পরও জীবন আমাদের উঠে দাঁড়াতে বলে, অন্নজল মুখে দিতে বলে, এবং অন্তর্হিত মানুষটিকে নিজের ভেতরে ধারণ করতে বলে।
রাত ও সবুজ দৃষ্টির উড়াল
উজ্জ্বল দিনের শেষে যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, লজ্জাবতী পাতা যখন নুয়ে পড়ে, তখন আমি অনিবার্য অস্পষ্টতার মধ্যে একটি সবুজ দৃষ্টির উড়াল অনুভব করি।
সন্ধ্যায় সকল বৃক্ষ ক্রন্দন করে। ক্রন্দন-ধ্বনি ভেসে আসে শব্দহীন ঝরনার সাম্পানে। প্রান্তরে প্রান্তরে ঝরনার প্লাবন ঝরে পড়ে। বুকপকেটে জমাতে থাকি প্রাত্যহিক বন্যার প্রতিচ্ছবি। আমার স্থির বিশ্বাস পৃথিবী প্লাবনময়।
সূর্য অস্তমিত হলে অন্ধকারের প্রতীক্ষা সত্য বলে প্রতীয়মান হয়। রাতের অর্থ কি শুধুই অন্ধকার? চিরায়ু আলোর অধিরাজ্যে অন্ধকার কি অনাদ্য? আলোর তৃষ্ণার তসর অন্ধকারে বিছিয়ে রাখে কি প্রতীক্ষার প্রহর?
আমি তুলে রাখি সান্ধ্য প্রকৃতির কিছু ছবি জীবনের ম্লানতায় ছোপানো বেদনাবিভাব। সন্ধ্যার বিষণ্ণ আকাশ, ধূসর বৃক্ষ-লতার দিকে চেয়ে অনিবার্য নিরালোকে নিমজ্জিত হয়ে পড়ি। মাটি আর পাথরের তলদেশ হতে ভেসে আসে সবুজাভ আর্তধ্বনি। অপস্রিয়মাণ আলোকের গন্ধে ভরে থাকে অনিশ্চিত জীবন। কোন এক সন্ধ্যা হবে আমার শেষ আশ্রয়!
তমসা-নিমগ্ন বৃক্ষের দিকে চেয়ে গভীর অন্ধকারের স্বরূপ উপলব্ধি করি; এ অন্ধকারে আলোর অধিকার নেই। নির্ঘুম রাতের নিরালোক কুয়াশায় শুনি বিষণ্ণ তুষারের বৃন্দধ্বনি।
রাতের সাথে রয়েছে হৃদয়ের যোগ। শ্রেয় সত্তার গহন আঙুল নিস্তব্ধ রাত্রির অশ্রুত সঙ্গীতে নেচে ওঠে। রাতের নির্যাস নিয়ে নীল যে কুসুম ফোটে তাকে কোমল থালায় সাজিয়ে রাখি। পরিপক্ক অন্ধকারের ভেতর থেকে ফুটে ওঠে আলো; আপাত দুর্বোধ্য, প্রগাঢ় প্রার্থনার ভেতর থেকে জেগে ওঠে পুষ্প-অমৃত।
রাতের বিষণ্ণ কম্পন-গভীরতায় চাই নিঃসাড় নির্বাসন।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন