কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রশান্ত গুহমজুমদার

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

 

অমলের ঘরবসত

শিয়ালদা এখান থেকে ক’টা স্টেশন! ১৫-১৬ হবে। বড়ো জোর ঘন্টাখানেক লাগে। অমলের অনেক বন্ধুরাই যাতায়াত করে। কেঊ শিশির মার্কেট, কেউ বা বড়বাজার। কেউ নবান্ন। রোববারের সকালে হ্যান্টাকালির বাজারে শম্ভুর চায়ের দোকানে বসে তাদের আড্ডা। সেখানে কতো গল্পই যে হয়! লোকালের দৈনন্দিন মশকরা, বাজারের ছিঁচকেমি, বর্ষার হয়রানি, এমন কি রসের গল্পও। সাতজনের এই বন্ধুদের দলে অমল শুরু থেকেই। বলা ভালো, ওরা সকলেই হয় স্কুল কিংবা কলেজ শেষ করার অনেক আগে থেকেই। সকলেই প্রায় সমবয়সী। বিয়ে থা করে নিয়েছে সকলেই। ব্যতিক্রম অমল। যদিও তার মাস গেলে উপার্জন খারাপ না, কিন্তু তবু এই সাঁইত্রিশ পেরিয়েও ওদিকে পা মাড়ায়নি। বন্ধুরা ওকে নিয়ে যে কতো ঠাট্টা করে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। বলে, শালা সবার বরযাত্রী গেল, দুবার করে খ্যাটন মারলো কবজি ডুবিয়ে, অথচ শ্লা নিজে কাউকে খাওয়াবে না। শম্ভুও দোকান ফাঁকা থাকলে সেই তামাশায় যোগ দেয়। বলে, তোরা আজও অমলকে চিনলি না রে! বিয়ে করেনি বলে কি ও কুমার হয়ে বসে আছে! অমল হাসে। শম্ভুও প্রায় ওদেরই বয়সী। অমল উত্তর দেয়, তুমিও তো কিছু কম যাও না, চাঁদ! টাকা খসানোর ভয়ে প্রতি রাতে মহল্লায় হনুমান চালিশা গেয়েই এতগুলো বছর  কাটিয়ে দিলে। এখন তো শুনছি, তুমি নাকি গুরুগিরিও ধরেছো! প্রত্যেকের জন্য লাল চায়ের কাগজের কাপ ধরিয়ে দিতে দিতে শম্ভু হাসে। বলে, তাতে তোর কোন্‌ পাকা ধানে মই দিয়েছি আমি!

শম্ভুর চায়ের দোকানে এই আড্ডাটা যে ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, কে-ই বা শুরু করেছিল, আজ আর সে কথা কারোরই মনে পড়ে না। সাত দিনের আড্ডা কবে যে কেবল রোববারের সকালের আসর হয়ে উঠলো, তা-ও বোধহয় কেউ ঠিকঠাক বলতে পারবে না। তবে বিশেষ কারণ ছাড়া প্রতি রোববারেই ওরা এখানে বসে। শম্ভু ওদের জন্য দোকানের ভিতর দিকে একটা লম্বা বেঞ্চ আর হাই বেঞ্চ মতো একটা টেবিল দিয়ে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আসলে করতে বাধ্য হয়েছে। না’হলে হাই রোডের পাশের এই চায়ের দোকানে ওদের হৈহল্লার চোটে অন্য খদ্দের আর ঢুকতেই পারতো না।    তো যে কথা হচ্ছিলো। শিয়ালদা আর কতদূর! আর নন্দন! তবু অমল ওদিকে পা বাড়ায় কদাচিৎ। তা-ও বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে। এই কলকাতাফোবিয়া নিয়ে অমলকে যে কতো কথা শুনতে হয়! তবু ওর কোনো হেলদোল নেই। আসলে এই আজন্মের বেড়ে ওঠা ছোট্ট এলাকাটাকে যে কী ভালোবাসে, কাউকে বোঝাতে পারবে না। এই মাটিতেই যে ওর ভাতকাপড়ের সংস্থান হয়, তার জন্যেও পুরোপুরি নয়। আসলে এই প্রায় জনবহুল টাউন এলাকা থেকে একটু দূরে গেলেই ও পেয়ে যায় সেই চিরন্তন এক গ্রামীন ছবিধূধূ ধানক্ষেত, তিরতিরে একটা নদী, পানকৌড়ি, মাছরাঙা আর আশ্চর্য সব বিকেল! কোনো কোনো দিন অমল সেখানে যায়। আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে আলের ধারেই বসে, সূর্যাস্ত দেখে। সেই সময়গুলোতে অমল আর কারখানার স্টোর কিপার থাকে না। ওর তখন সিকিউরিটি চেক করা, কাঁচা তুলো চালানের সাথে মিলিয়ে নেওয়া, মালের কোয়ালিটি চেক করা, মেকানিকদের চাহিদামতো পার্টস দেওয়া বা মাল ডেলিভারি দেওয়ার মতো হুজ্জুতির কাজের কিছুই আর মনে থাকে না। ও তখন আকাশের বুক ছুঁয়ে শুয়ে থাকা হলুদ জমির রঙে ভ্যান গগ দেখে, বালির উপর দিয়ে ও দেখতে পায় বয়ে যাচ্ছে দুরন্ত জল, যেন অলীক, যেন শৃঙ্খলহীনও র‍্যাঁবো মনে করে। হয়তো একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক, তবু একদা সাহিত্যের ছাত্র অমলের এমন মনে হয়।

কারখানায় থাকলে অমল আবার অন্য মানুষ। সত্যি কথা বলতে কি, ওর মতো দক্ষ সৎ স্টোরকিপার এই মিল বহুদিন পর পেয়েছে। সহকর্মীরা তো খুশিই, মালিকও বেশ নিশ্চিন্ত। শুধু এক ম্যানেজারই মাঝেমধ্যে খিটমিট করে।

কি একটা ভাবতে ভাবতে সেদিন কারখানার নাইট শিফটে ঢুকছিল। সামনেই সেই ভদ্রলোক। একেবারে মুখোমুখি।

-এই যে অমলবাবু, সব বিষয়ে আপনার এতো দেরি হয় কেন বলুন তো!

অমল অবাক! তার আবার কিসে দেরি হ’ল!

-কেন! আমার তো দেরি হয়নি!

অমল হাতের ঘড়ি দেখলো।

-হয়েছে নয়, হচ্ছে। আরে মশাই, আমি সে দেরির কথা বলছি না। কারখানায় স্টক ফুরিয়ে আসছে। ডেলিভারির চাপ আসছে। আর আপনি বসে বসে কি এতো খুটিনাটি কাগজ দেখছেন!

অমল কিছু মনে করে না। হাসে। বলে,

-এটাই তো আমার কাজ, ম্যানেজারবাবু। কাগজপত্র, পরিমাণ, ওজন, বেল ভেজা আছে কিনা, এগুলো দেখতে হবে না আমাকে! তাহলে আর আমাকে রেখেছেন কেন!

-না, সে ঠিক আছে। কিন্তু আমার দিকটাও তো দেখতে হবে আপনাকে। যতোই সিন্থেটিক তুলো আসুক, বাজারে তুলোর বাজার তো বাড়ছে। চাহিদাও বাড়ছে। পার্টি একটু দেরি হলেই তো সোজা মালিকের কাছে।

-বেশ। দেখছি, আর কতো তাড়াতাড়ি করা যায়।

ম্যানেজারবাবু কিছুক্ষণ অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে এগিয়া যায় ওনার টেবিলের দিকে।

ম্যানেজারবাবুর অস্থিরতা, চাপ অমল বোঝে। আর উনি যা বলছেন, একেবারে ভুল তো নয়! দেরি ওর একটু হয়। সময় লেগেই যায়। কিন্তু ওর কাজের পরিধি-ও অমল জানে। অনেক ডেলিভারির চালানেই কিছু ভুলভাল থাকে। ত্রুটি থাকে। দেখতেই হয় সেসব। তাই ওর একটু সময়ই লাগে। ও জানে, ম্যানেজারবাবুর স্ত্রী খুব অসুস্থ, বাড়িতে অবিবাহিতা দুই মেয়ে। তার উপরে বয়সও হয়েছে। আর কিছুদিন পরেই বেড়িয়ে যেতে হবে মিল থেকে।  তাই এ সব ভেবেই ভদ্রলোক যা-ই বলুক, অমল মৃদু হেসে ঘাড় কাত করে।

এই সব নিয়েই কারখানায় অমলের দিনকাল কেটে যায়। কিন্তু যখন ভোর রাতে কিংবা সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার জন্য মিলের বিরাট গেটটা পেরিয়ে রাস্তায় পা রাখে, অমল তখন অন্য মানুষ। ও তখন উৎসুক দর্শক। ও তখন বোধহয় শুধু চারপাশের ভোর অথবা অন্ধকারের নির্জনতা খোঁজে না, নৈঃশব্দের বিচিত্র সব শব্দ শুনতে চায়, পাতার অন্ধ কারচুপিতে দেখতে চায় জীবনের মুখ। এমন কি পথের সামান্য নুড়ির রকমফের-ও অমল এমন সময়ে খুব মগ্ন হয়ে দেখতে চায়। দেখতে দেখতে হাঁটে। কী যে এক মমতা! আসলে ক্রমে শহর হয়ে ওঠা এই ছিমছাম অঞ্চলটাকেই ও বোধহয় খুব ভালোবাসে। আর মাঝেমধ্যে মনে পড়ে মা-বাবার কথা। নিজের জন্মের ইতিহাস। সে যে আদতে সেই কলকাতার এক চার্চ থেকে দত্তক নেওয়া বেওয়ারিশ এক শিশু, এ কথা ওঁদের কাছেই তার জানা। তবু কোভিডে একসঙ্গে দু’জনেই চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ওঁরাই ছিলেন অমলের বাবা-মা। অমলের সমগ্র পৃথিবী। দীর্ঘ দশ বছরের কি এক ক্লান্তি নিয়ে ও হাঁটে।

সামনে নির্বাচন। লোকসভার। ও টের পায়, এক দুর্মর অচেনা বাতাসে ভারি হয়ে উঠছে এলাকাটা। গণতন্ত্রের এক অনিবার্য প্রক্রিয়া এই ভোট। অথচ সেই স্বাভাবিক বিষয়টাই কেমন যেন গুলিয়ে দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো আর বিচিত্র সব মিডিয়া! এর মধ্যেই এলাকায় তিনটে ঘটনা ঘটে গেল শহরে। এক ভোরে খালের ধারে পাওয়া গেল পাশের একটা চালকলের প্রোডাকশন ম্যানেজারের ক্ষতবিক্ষত শরীর। সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কিছু কিনারা হওয়ার আগেই শহরের শেষ প্রান্তের নিষিদ্ধ পল্লিতে আর একটি মর্মন্তুদ ঘটনা। ঘরের মধ্যেই পাওয়া গেল এক পঞ্চাশোর্দ্ধ মহিলার মৃতদেহ। কে বা কারা গলা কেটে ঘরের মধ্যেই ফেলে গিয়েছে। সে একেবারে হৈচৈ ব্যাপার! পুলিস, পুলিশকুকুর, মিডিয়া, সব এলো। শোনা গেল, তোলা দিতে অস্বীকার করাতেই মাসির এই নৃশংস হত্যা। কিছুদিনের মধ্যেই ঘটলো আরও একটা চাঞ্চল্যকর ঘটনা। শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় সাত সকালে এক তরুণীকে এলোপাথারি ছুরি মেরে খুন করা হল। বেশ কিছুদিন কেটে যাওয়ার পরেও এর কোনটারই কিন্তু কোনো কিনারা হলো না। শুধু জানা গেল, ঐ তরুণী পড়াশোনার জন্য এই শহরের একটা মেসে থাকতো। শহরের বুকে পরপর এমন সব ঘটনায় মানুষ হতচকিত, সন্ত্রস্ত। সেই সত্তর দশকের ঘটনাবহুল রক্তাক্ত দিনগুলো এখন কেবল বয়স্কদের স্মৃতিতে। তার এতদিন পর এ অঞ্চলে এমন ঘটনা। আর তারপর শুরু হ’ল রাজনীতি, দৃশ্যমাধ্যমের দৌড়ঝাঁপ আর ট্রেডইউনিয়নের গলাবাজি। এইসব হট্টগোলের মধ্যে অমল বুঝতেই পারছে না, কার কী ভূমিকা, শাসক কে, শাসিতই বা কে! ওই মিল-টা হঠাৎ বন্ধই হয়ে গেল। অমল জানে না, ওখানে কাজকরা মানুষগুলো এখন যাবে কোথায়! ওই নিহত প্রোডাকশন ম্যানেজারের হতভাগ্য পরিবারের-ই বা কী অবস্থা।

অমলদের কারখানার পরিবেশটাও হঠাৎ কেমন পাল্টে গিয়েছে। সেই খোলামেলা হাওয়াটা আর নেই। কেমন এক থমথমে অন্ধকার! অমলের ভালো লাগে না। ইদানীং প্রায় রাত্তিরেই বুলবুলির কাছে যায়। আর আকণ্ঠ মদ্যপান। এ ভাবেই অমল পরিত্রাণ খোঁজে। একটু আশ্রয়, একটু ভালোবাসার জন্য তার ভিতরে কেবল হাহাকার।

হেমন্ত পেরিয়ে যাচ্ছে। কিছুটা পথ সাইকেলে এসে বিকেলের দিকে সেই স্রোতস্বিনীর পাশে এসে বসে। মাঠের ফসল তোলার কাজ জোরকদমে চলছে। উঁচু দেখে একটা আলের উপর বসে। দূরে ক্লান্ত সূর্য অস্ত যাচ্ছে। একটা চিল মাথার উপর গভীর নীলে ঘুরে ঘুরে  উড়ছে, যেন স্লো মোশনে গ্লাইডিং। ও দেখে, ধূসর হলুদ আর আলু চারার ঈষৎ সবুজে সামনের মাঠ এক আশ্চর্য ছবি হয়ে আছে। সামান্য রুক্ষ, কিছু সম্ভাবনা নিয়ে বাংলার বুকে এই চরাচর বিস্তৃত মাঠ ক্রমে যেন হয়ে উঠছে অন্য এক ভ্যান গগ। এই দুর্দশাপীড়িত, প্রকৃতির জন্য নিবেদিত মাত্র দশ বছরের শিল্পকর্মে এই শিল্পীর সৃষ্টি এক বিস্ময়! থিও ভ্যান গগ সারাটা জীবন ভিনসেন্টের পাশে আশ্রয় হয়ে না থাকলে কী যে হ’ত, ভাবতে ভয় হয় অমলের।

দেখতে দেখতে শীতকাল এসেই গেল। ভোট, অন্যান্য উৎপাত আস্তে আস্তে কমে এসেছে। এখানের জীবন আবার ফিরছে পুরনো ছন্দে। অমল যেন কিছু স্বস্তি পায়। সেই ম্যানেজারবাবু অবসর নিয়েছেন। অমলেরই উৎসাহে বেশ মনোরম পরিবেশে ওনাকে বিদায় সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল।

শরীরটাও খুব ভালো যাচ্ছিল না ওঁর। অমল এরপর একদিন ওনার বাড়ি গিয়েছিল। হাতে তুলে দিয়েছিল ওনার পছন্দের রঙের একটা শার্ট পিস, একটা পান্টের কাপড় আর কিছু মিষ্টি। ভদ্রলোকের চোখে যেন জল।

অমল ওনাকে বুকে টেনে নিয়ে বলেছিল,

-আমাদেরও তো সময় হচ্ছে। আমরাও একদিন। এখন আপনারা দু’জনে সুস্থ থাকুন।  কারখানার চাপ তো আর নেই। পাওনা টাকাপয়সাও তো পেয়েছেন?

-হ্যাঁ। ধরা গলায় বলেছিলেন উনি।

-তা মেয়ের বিয়ের কিছু ব্যবস্থা হ’ল?

-হয়েছে। সামনের অঘ্রাণে। আমি যাবো আপনার কাছে। আসতে হবে কিন্তু।

-তবে তো হাতে সময় আছে। নিশ্চয়ই আসবো। এবার ধীরেসুস্থে সব কাজকম্ম গুছিয়ে ফেলুনঅমল মৃদু হেসে বলে।

-আজ আসি। বৌদিকে বলবেন, চা-টা কিন্তু খুব ভালো হয়েছিল।

আজ ওর রেস্ট ডে। মনটা বেশ ফুরফুরে। শম্ভুর দোকানে এসে বসলো।

শম্ভু অবাক।

-আজ এতো তাড়াতাড়ি!

-তাতে তোর কী! ভালো করে দুটো চা বানা।

-দুটো কেন!

-একটা আমার। একটা তোর। কেন, খাবি না?

শম্ভু আজ ওকে এখন দেখে একটু অবাক হচ্ছিল। অমলের মতিগতি সত্যিই বোঝা ভার।

 

সন্ধ্যার মুখোমুখি উঠে পড়লো অমল।

-চলি রে শম্ভু।

-কি, আজ আবার ওখানে যাবে না কি?

ইঙ্গিতটা অমল বুঝলো। সামান্য হেসে ধীরে সুস্থে পা রাখলো রাস্তায়। এই শীত আর বুলবুলি কীভাবে যেন কবে থেকে একাকার হয়ে আছে অমলের ভিতরে। শীত তাকে যেমন কিছু অলস করে  তোলে, বুলবুলি ঠিক উল্টো। এমন প্রাণোচ্ছল মেয়ের সামনে দাঁড়ালে ও যেন হয়ে ওঠে এক মাতাল তরণী। ভের্লেন নয়, সবকিছু তখন বুলবুলি। অমল কবিতা লেখে না। তবে বুলবুলির ঘরে পা রাখলেই তার যেন মনে হয়, বুলবুলি সব সময়েই ওকে ডাকছে। এখানে এলেই অমল আরেক মানুষ। চরম উচ্ছৃঙ্খল, বেপরোয়া, নির্মম।

আজ শীতটা জমিয়ে পড়েছে। জ্যাকেটের হুডিটা মাথায় তুলে নিল। কিছু কেনাকাটা করতে হবে। ও একটা বড়ো স্মিরনফ নিলো। ফাস্ট ফুডের দোকান থেকে রোস্টেড চিকেন আর একটা দেড় লিটারের সফট ড্রিংক্স, জলের বোতলনিয়ে নিলো কয়েকটা বাটার নান আর কিছু ভাজা বাদাম। আরো একটা জিনিস অমল কিনলো। সম্পূর্ণ লেসের কাজকরা একটা পিংক কালারের নাইটি। ভালোবাসার জন্য সত্যিই কি এতসব লাগে! অমল মনে মনে হাসে। শুধু তো ভালোবাসা নয়, যে মানসিক আশ্রয় বুলবুলি দেয়, অমলের যতো দৌরাত্মপনা সহ্য করে সারা রাত, তার জন্য এ তো কিছুই নয়। সমুদ্র অমল দেখেনি, বুলবুলির কাছে ও সমুদ্রের সবটুকু পায়। ভয়, অন্তহীন সাঁতার, অফুরন্ত নোনা বাতাস আর নাতিশীতোষ্ণ এক ঊষ্ণতা। অমল এই কয়েক ঘন্টায় তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে সবটুকু শোষণ করে, বুলবুলিকেও হতাশ করে না।

বুলবুলির ঘরটা অন্যদের তুলনায় বোধহয় একটু বড়োই হবে। পাঁচ-সাতের খাট, ড্রেসিং টেবল, স্টিলের আলমারি, ঠাকুরের আসন, সব থেকেও ঘরে ফাঁকা জায়গা থাকে কিছুটা। ওর ঘরের আলোটাও অন্যরকম। সামান্য হলদেটে উজ্জ্বল। অমল নাইট ল্যাম্প পছন্দ করে না। অস্পষ্টতা ওর অসহ্য।

বুলবুলির কাছে যে অন্য লোক আসে, অমল জানে। সেই জন্যেই অমলের ডেট, সময়, সব  নির্দিষ্ট করা আছে। তাই অমল নিশ্চিন্তেই আসে। আসে একটা যেন ঘোরের মধ্যে। ওকে ঢুকতে দেখে কয়েকটা মেয়ে মুখ টিপে হাসলো। অমল এখন এদের পরিচিত মুখ। ওরা জানে, কাল বুলবুলি আর কাউকে ঘরে নেবে না। দরজায় বেল টিপতেই সামনে হাস্যমুখী বুলবুলি। ওর গজদন্ত আছে। মেয়েটা এতো সুন্দরী কেন, এতো নিখুঁত, অমল মাঝেমধ্যে অবাক হয়। আলতো আঙুলে বুলির গালে একটু আদর করলো।

–ইস্‌! তোমার হাত কী ঠান্ডা! এসো ভিতরে এসো।

-আসবো বলছো?

-ইয়ার্কি করতে হবে না। একে তো দেরি করে এসেছ, তারপরে আবার কথা!

-এগুলো ধরবে না!

-কী এতসব এনেছ!

-কেন! রাত্রে খাবো না!

বুলির ঘরটা বেশ গরম।

-রুমহিটার চালিয়েছ নাকি!

-না না। জানলা সব বন্ধ, তার উপরে তুমি বাইরে থেকে এসেছ। তাই এমন মনে হচ্ছে।

বুলবুলি টেবিলের উপর সব সাজিয়ে রাখলো।

-কিন্তু এটা কী!

-তোমার জন্য একটা নাইটি কিনলাম। সেদিন গোলাপী নাইটির কাঁধের কাছে একটু ছিঁড়ে গিয়েছিল।

-ছিঁড়বে না! যা তাড়াহুড়ো করো তুমি।

অমল হাসলো। বুলবুলি কি তার বন্ধু! তার সহধর্মিনী! নাকি কেবল বিনোদনের পণ্য!

খুব গুছিয়ে সাজিয়ে নিয়ে এসেছে স্মিরনফের বোতল, জল।

-কিছু খেয়েছ?

-সেরকম কিছু না। একটা ডিমটোস্ট আর চা। খাবো। তবে আগে দু’পেগ নিয়ে নিই। তুমিও নাও।

পাকা গিন্নির মতো বুলি সব রেডি করে দিলো।

-আজ ঘরে কিছু করোনি!

-করেছি। মেটে চচ্চরি আর সামান্য চাট।

-বেশ। নিয়ে এসো সেটাও। আজ সবই খাবো।

ঘরের একপাশে গিয়ে মেটে চচ্চরি সামান্য গরম করে নেওয়ার জন্য গ্যাস জ্বালিয়ে নিলো। ঠোঁটের কোণে হাসি। অমলটা একটা পাগল। কখন যে কী করে, ঠিক নেই।

শরীরটা এখন বেশ চাঙ্গা লাগছে। উঠে দাঁড়ালো। ড্রেসিং টেবলের সামনে গিয়ে নিজের মুখের দিকে তাকালো। ঘরের হলুদ আলোয় আয়নায় ভেসে উঠলো অনেকগুলো অমল। জারজ অমল, শিক্ষিত ভদ্র অমল, সহানুভূতিশীল অমল, সদা-বিষণ্ণ উদাসী অমল, একটু ভালোবাসার জন্য পাগল  অমল। চোখ কচলে নিলো দুহাতে। আজ কি দু’পেগেই! আয়নাটা হাত দিয়ে মুছলো। এবার যেন একটু স্পষ্ট হলোভেসে উঠলো একটা আর্ত অনাথ মুখ, যে সারাদিন তার সবটুকু মেধা আর জ্ঞান দিয়ে কারখানায় কাজ করে, সহকর্মীদের কষ্টে ক্লিষ্ট হয়, হেমন্তের ধূ ধূ ফসলশূন্য মাঠ দেখতে দেখতে ভিনসেন্টের কথা ভাবে, ভাবে একদিন ঠিক সব ছেড়েছুড়ে দূর কোনো বিদেশে গিয়ে মাদকের ব্যবসা করে বিরাট ধনী হয়ে উঠবে, আবার বুলবুলির কাছে একটু ভালোবাসার জন্য, আদরের জন্য কাতর হয়ে ছুটে ছুটে আসবে বারবার

অমল ঘুরে এসে ধীর পায়ে বুলবুলির পিছনে এসে দাঁড়ালো। কমবেশি চার বছর ধরে অমল ওর কাছে। ও খুব মন দিয়ে এখন মেটে চচ্চরি রেডি করছে। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো ওকে। ধবল দীর্ঘ গ্রীবায় ঠোঁট গুঁজে দিলো। অমলের এখন একটু কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

-এই! কী হচ্ছে! আমার কিন্তু সুড়সুড়ি লাগছে।

অমল এবার বুলির দুই শঙ্খপ্রতিম বুক করতলে নিলো। ওকে ঘুরিয়ে নিলো নিজের দিকে। পাগলের মতোই চুম্বনে ভরিয়ে দিলো বুলির কপোল, ওষ্ঠ, গ্রীবা।

-এই তো শুরু হল পাগলামি! এমন আদর করতে থাকলে তোমাকে খেতে দিই কী করে!

অমল হাসছে। পাগলের মতোই।

-নাইটিটা পড়লে না! ভালো লাগেনি?

-সময় পেলাম কখন!

-বেশ চলো। আমিও একটু সাহায্য করি।

-কিচ্ছু করতে হবে না তোমাকে। ওখানে বসো। আমি সব গুছিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। নাইটিটাও পরে নিচ্ছি।

বাধ্য ছেলের মতো অমল ফিরে এলো। বসলো। ও এখন অপেক্ষা করছে। তুমুল একটা ঝড়ের জন্য।

ভোরে ঘরের বাইরে পা রেখে কুয়াশায় অমলের প্রায় হারিয়ে যাওয়ার জোগাড়। শীত অবশ্য তেমন লাগছে না। বুলবুলির বুকের ওম এখনো ওকে জড়িয়ে আছে। আর কে-ই বা আছে অমলের!  এক কাজের মাসি। আম্মা। অমল ওকে এই নামেই ডাকে। সারাদিন থেকে রাত্রে ঘরে ফিরে যায়অমলের ভালোমন্দ সব ওরই হাতে। ও জানে, অমল মাঝেমধ্যে কোথায় রাত কাটায়। তাতে আম্মার কিছু যায় আসে না। এই শহরতলীর অনেকেই অমন যায়। তার লোকটাও কি যেতো না! অমল তো তবু একা। কারখানার রবি জিজ্ঞেস করেছিল, কি পাস্‌ তুই ওখানে রোজ রোজ। অমলও কি ছাই ঠিকঠাক জানে, বুলবুলের কাছে ও কি পায়। শুধু বোঝে, কারখানার হৈ হল্লা থেকে বেড়িয়ে বাকি সময়টায় হারিয়ে যাওয়ার কিম্ভুত একটা আতঙ্ক, ভালোবাসা না পাওয়ার ভয় যে ওকে গ্রাস করে থাকে, সেসব থেকে রেহাই পায় ওর কাছে এসে।

বুলবুলি ওকে সব বলে। আর বলে হারিয়ে যাওয়া এক নদীর গল্প, ভিনদেশের দাদুর গল্প, পুরনো বটগাছ আর এক মেঠোপথের ঠিকানা। বলে, কিশোরী বুলির ভালোবাসার মানুষটা কিভাবে শয়তান হয়ে গেল। আর অমল বলে, তার মৃত বাবা-মায়ের ভালোবাসা আর না-দেখা এক চার্চের কথা। বলে, ভিনসেন্ট আর সেই তরুণ কবির পাগলামির কথা, ক্ষিদের কথা, বিচিত্র সব ভয়ের স্বপ্ন পর্দায় আড়াল করা ঘরের একমাত্র তাকে রাখা বুলির দাদুর সাদাকালো ছবি হাসে। ক্যালেণ্ডারের রাধা হাসে। বুলি মানে বুলবুলিও খুব হাসে। হাসতে হাসতে চা করে, সুস্বাদু চাট কিংবা আলুর পরোটা বানায়, গ্লাসে পেগ মেপে ভদকা ঢেলে দেয়। হ্যাঁ, অমল বুলির জন্য ভালোমন্দ খাবার নিয়ে আসে আর ওর পছন্দের ভদকাকয়েকদিন আগে শাড়ি আর ব্রা-প্যান্টি নিয়ে এসেছিল। তা দেখে বুলির হাসি আর থামতেই চায় না।

-খুব দেখি সাইজ জেনেছো!

-তাইই! হাসে অমল।

-যাক, এতদিনে একটা পরীক্ষায় তা’হলে পাশ করা গেল।

অমল কাঁধের ব্যাগটা ছোট টেবিলে রাখতে রাখতে উত্তর দিয়েছিলআর দেখেছিল বুলিকে। ও হাসলেই বাঁদিকের গজদন্ত বেড়িয়ে আসেঅমল সেসময়ে চিকনা বুলবুলিকে দেখতে থাকে, দেখতেই থাকেহাতের গ্লাস আর ঠোঁটে ওঠে না।

শীতটা এবার ভালোই পড়বে মনে হচ্ছে। আজ কারখানায় নাইট শিফট। গিয়ে স্নান করে আম্মার রাঁধা ভাত খেয়ে টানা ঘুম। ওর তো আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। পি এফ আর অন্যান্য সম্ভাব্য পাওনা-র নমিনি আম্মা আর বুলির নামে করে দিয়েছে। ওরা জানে না সেসব কথা। বলতে অমলেরই কেমন সঙ্কোচ হয়।

অমল সাবধানে হাঁটে। এই কুয়াশায় রাস্তা প্রায় দেখাই যায় না। হঠাৎ বিড়ালের কান্নার শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ায় অমলএকটু ঠাহর করার চেষ্টা করে। পেয়েও যায়। রাস্তার পাশের শুকনো ড্রেনের ভিতর পড়ে গিয়েছে একটা সাদা বিড়াল বাচ্চা। সামনে অসহায় ওর মা আর আরও একটা বাচ্চা। ও এগিয়ে যায়। সাবধানে। গিয়ে ধীরেসুস্থে তোলে। একেবারেই গ্যাঁদাবাচ্চা। তুলোর বল যেন। ভাগ্যিস ড্রেনটা শুকনো। শুধু ভয় পাচ্ছিল, মা-টা তেড়ে না আসে।

নামিয়ে রাখে মায়ের সামনে। আর কী আশ্চর্য! বিড়ালটা বাচ্চার কাছে না এগিয়ে এসে অমলের প্যান্টের কাপড়ে মাথা ঘসতে থাকে। অমল অবাক হয়। বিড়ালটা কি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে! অমল রাস্তার পাশেই উবু হয়ে বসে। সব ক’টাকে টেনে নেয় কাছে। কারোও কোনো আপত্তি নেই!

অমল ভেবে নিলো, সব ক’টাকেই বুলিকে দেবে। এমনিতেও রোজ সকালে বুলি বস্তির দুটো বিড়ালকে খেতে দেয়। প্রশ্ন করলে, বুলি বলেছিল, আহা! মা ষষ্টীর বাহন। অমলের মনে পড়লো, বুলি ওকে একবার ষষ্টির ছড়া আনতে বলেছিল।

অমল মনে মনে হাসে

বুলিরও মা ষষ্টী!

বুলিকে নিয়ে শহরের বাইরে সামন্তপাড়ার ওদিকে একদিন ঠিক ও চলে যাবে। আম্মাকেও নিয়ে যাবে। এখনো বলেনি বুলিকে। আম্মাকেও না। অবশ্য বুলির বাড়তি উপার্জনটা বন্ধ হয়ে যাবে।

তাহলে কি বুলি রাজী হবে না!

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন