কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

স্বর্গ এসেছে নেমে

 


 

 

(২৫)

অনঙ্গবাবুর প্রতি মাসে গ্রামে যাওয়া বজায় আছে, তবে এখন আর বৈশ্বানরের মায়ের কাছে স্কলারশিপের টাকা পৌঁছানোর কোন দায় নেই। বৈশ্বানর স্নাতক উত্তীর্ণ হবার পর থেকেই ওই ব্যাপারটির ইতি ঘটেছে। এখন অফিসার ট্রেনী হিসাবে বৈশ্বানরের মাসিক বৃত্তি সাধারণের পক্ষে ঈর্ষনীয় একটি অঙ্ক। সে তেত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা প্রায়। বৈশ্বানর অনুরোধ জানিয়েছে অনঙ্গ বাবুকে তিনি যেন তার মাকে এখন থেকে আর কোন রকম আর্থিক সাহায্য না করেন। প্রতি মাসে  বৈশ্বানর যে টাকা পাঠাচ্ছে মাকে তা মায়ের পক্ষে যথেষ্ট। অনঙ্গবাবু বৈশ্বানরের কথায় সায় দিতে পারেননি। তাঁর যুক্তি, যে মানুষটি তার বাড়িটিকে নিজের মত করে আগলে রেখেছে তাকে সে কোন মতেই তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। অনেকবার বলেছে বৈশ্বানরের মা, ‘দাদাবাবু গো! তোমার দয়াতেই তো বিশু আজ কত টাকা রোজগার করছে, তুমি আমারে এত বড় বাড়িটায় থাকতে  দিয়েছ, এবার ক্ষান্ত দাও’। অনঙ্গ বাবুর সে এক কথা, সময় আসুক তখন দেখা যাবে।

***

কেটে যায় দিন। মাস গড়িয়ে বছরও শেষ হয়। যোগ্যতার সঙ্গেই সংসদের কাজ করে চলেছে মৃদুলা। মাঝে মাঝে রুদ্রাক্ষ মাথাচাড়া দেবার চেষ্টা করে। মৃদুলা উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসিকতার দ্বারা প্রতিহত করে রুদ্রাক্ষর সব রকম জারিজুরি। মনস্বিনী পরীক্ষায় যোগ্যতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ল’ কলেজে ভর্তি হয়ে যায় তার পরিকল্পনা অনুযায়ী।

ওদিকে রাজ্যে নির্বাচনের দামামা বেজে ওঠে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ রুদ্রাক্ষ এখন নেতা দাদার পেছনে ঘুরে বেড়ায়। আশা, ভোটে জিতলে দাদা যদি একটা চাকরী জুটিয়ে দেয়। চাকরী পেতে হলে যোগ্যতা থাকতে হবে। রুদ্রাক্ষর যোগ্যতা বলতে তো মানুষের সর্বনাশ সাধন। অসুস্থ রাজনীতির জীবাণু এরা। ছত্রাকের মত ছেয়ে ফেলেছে এরা সমাজ ও রাষ্ট্রের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। ধর্ষণ খুন রাহাজানি এদের নিত্যদিনের খোরাক। দেশের নেতৃবর্গ এদের কাজে লাগিয়ে ভোটবাক্সে নিজেদের ভাগ্য নিশ্চিত করার ফন্দী আঁটে। রুদ্রাক্ষদের নিজেদের কোন বিচার থাকতে নেই। তারা তাদের মস্তিষ্ক বাঁধা রেখেছে  তাদের ভাগ্যনিয়ন্তা নেতা দাদাদের পদমূলে।

নেতৃবর্গ অনঙ্গ সান্যালের মুখাপেক্ষী। তারা নিজ নিজ দলের জন্য কেবল আর্থিক সাহায্য নয়, নৈতিক সমর্থনও আশা করে থাকে। অনঙ্গ বাবুর এককথা, আর্থিক সহযোগিতা করবেন তিনি তবে নিরপেক্ষভাবে। যেহেতু কোন পার্টির প্রতিই বিশেষ অনুরাগ বোধ করেন না তিনি, তাই সমর্থনের কথা অর্থহীন।

ওদিকে কুন্তলার মনে শান্তি নেই। অনেক বলে কয়েও সে না পারলো মেয়েকে রাজী করাতে, না পারলো মেয়ের জন্মদাতাকে। বোন আন্না আসে যায় কিন্তু তার দুর্বুদ্ধি এখন বিষদন্তহীন সাপের মত। তবু আসতেই হয়, কোন ফিকিরে দিদির মনটা গলিয়ে যদি কিছু খুঁটে বেঁধে নেওয়া যায়!

বৈশ্বানর মন প্রাণ এক করে তার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। সেই ভোর থেকে শুরু করে শরীর ও মনের গঠন প্রক্রিয়া, সময়ানুবর্তিতা নিয়মানুবর্তিতার পাঠ গ্রহণের পর আর কিছু করার ইচ্ছা অবশিষ্ট থাকে না। তবু সে নিয়মিত সকলের খোঁজ খবর নিয়ে তবে ঘুমোতে যায়। নিজের উপার্জিত অর্থের একটি বিশেষ অংশ মায়ের প্রয়োজনে ব্যয় হচ্ছে, এ কথা ভেবে এক  ধরনের মানসিক তৃপ্তি বোধ করে সে। নিয়মিত মনস্বিনীর খবর নেওয়াটাও তার বিশেষ কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, এমনই ভাবে বৈশ্বানর। সপ্তাহে একবার দুবার ফোন করে জেনে নেয় সমস্ত খবর। এর মধ্যে যুক্ত থাকে কলেজ, শহর, রাজনীতি এমনই সব বিষয়।

রাজনীতি, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটির, কোন মোহ জাগায় না মনস্বিনীর মনে। ভোট সে দেয় কিন্তু নোটাতে। যে দলগুলি রোজ স্লোগানে স্লোগানে ঝড় তোলে রাস্তায় গলিতে তার কোনটির প্রতিই আস্থা পোষণ করে না সে। সে দেখেছে, দলীয় নীতির বিচারে সব দলের লক্ষ্য প্রায় একই। ডান বাম সকল নেতার মুখে একই প্রতিশ্রুতি, তোতা পাখীর মত জনগণের মঙ্গলের কথা আউড়ে যাওয়া। না, একার পক্ষে সম্ভব নয় জগদ্দল পাথরকে উলটে দেওয়া, তা বলে বসে থাকা চলবে না। অতি সচেতন মনস্বিনী, নৈরাশ্ব যেন তাকে গ্রাস না করে।

 

(২৬)

 

জীবন নিস্তরঙ্গ দীঘি নয় যে সেখানে কোন রকম বাধা বিপত্তি থাকবে না। বাধা বিপদ আসবে কিন্তু তাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকে সার্থকতা। মনস্বিনী বৈশ্বানর এভাবেই লক্ষ্যে স্থির নাবিকের মত জীবনের ছোট বড় সকল অভিঘাতকে তুচ্ছ করে উপনীত হয়েছে তাদের উদ্দিষ্ট বন্দরে। এখান থেকেই শুরু হবে তাদের যাত্রা নতুন দিগন্তের অভিমুখে। এবার ঝড় উঠবে প্রবল বেগে, উতাল তরঙ্গে বেসামাল হবে তরণী কিন্তু হাল ধরে থাকতে হবে শক্তহাতে।

যেমন চেয়েছিল বৈশ্বানর ঠিক তেমনটিই হল। হোম ডিসট্রিক্টেই পোস্টিং হল তার। সে এখন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারি্নটেন্ডেন্ট অফ পুলিস। তার লক্ষ্য যত দুর্বৃত্বদের একে একে শায়েস্তা করা। যে কোন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিই শাস্তিযোগ্য। জানে বৈশ্বানর, অপরাধীরা রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় নিশ্চিন্ত। বৈশ্বানর ভুলে যায়নি তার জীবনের সেই দিনগুলির কথা। রুদ্রাক্ষ যে এখনও ওঁত পেতে আছে প্রতিশোধ নেবার জন্য তা বর্তমান ছাত্রসংসদের প্রতি তার উক্তি ও বাধাসৃষ্টিকারী কাজকর্মের মধ্য দিয়েই প্রকাশ করে দিচ্ছে সে।

এটা কি তবে বৈশ্বানরকে চ্যালেঞ্জ জানানো! তুমি যতই কেউকেটা পুলিশ অফিসার হও না কেন, মনে রেখো, এই রাজ্যে পুলিশ নেতাদের পকেটে পকেটে ঘোরে। একবার জিততে দে দলকে তারপর খেল দেখাবো তোদের।

নির্ধারিত দিনে হয়ে গেল ভোট গ্রহণ। হ্যাঁ, রুদ্রাক্ষের দলই শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করল। আবির উড়িয়ে বাজনা বাজিয়ে মিষ্টি বিতরণ করে মহা সমারোহে উদযাপন করল রুদ্রাক্ষ দলনেতার বিজয়ানুষ্ঠান। চেষ্টা করেছিল রুদ্রাক্ষ পরাজিত দলনেতাকে নানাভাবে প্ররোচিত করার কিন্তু অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল প্রয়োগে সমস্ত ব্যাপারটা সামলে নিল বৈশ্বানর। রুদ্রাক্ষ দেখল, বৈশ্বানর পকেটে ভরে রাখার পুলিশ অফিসার নয়। তবে দমে গেল না রুদ্রাক্ষ। ভাবল, সময় বুঝে একটা মোক্ষম ছোবল মারতে হবে ওকে। তবে কি মনস্বিনীই রুদ্রাক্ষর টার্গেট? বৈশ্বানর মনস্বিনীকে যে চোখেই দেখুক না কেন, রুদ্রাক্ষর ভাবনায় ওরা দুজন প্রেমিক প্রেমিকা ছাড়া আর কিছু নয়। বৈশ্বানরকে আঘাত করতে হলে মনস্বিনীকে নিয়ে ভাবতে হবে মোক্ষম কিছু। এসব ব্যাপারে আবার নেতা-দাদাকে জানাতে হবে কেন? এটা একশ ভাগ বৈশ্বানর আর রুদ্রাক্ষর বোঝাপড়া।

মনস্বিনী এখন কোর্টে জুনিয়র ল-ইয়ার হিসাবে কাজ করছে একজন নামকরা সিনিয়র ক্রিমিনাল ল-ইয়ারের অধীনে। কোর্ট থেকে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা। এ সুযোগটাই কাজে লাগাতে হবে, ভাবল রুদ্রাক্ষ। সাকরেদদের সাথে কথাবার্তা বলে একটা পরিকল্পনাও তৈরি করে ফেলল ঝটপট। অ্যাকশনের স্পট হিসাবে বেছে নিল রাস্তার এমন একটি বাঁক যেখানে কিছু ঘটে গেলেও সহজে নজরে পড়বে না কারও। আর কিছু নয়, মনস্বিনীকে তুলে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা কিছুক্ষণ। বৈশ্বানরকে বুঝিয়ে দেওয়া, রুদ্রাক্ষর দল জিতেছে, তার হাতে এখন কতখানি ক্ষমতা মেপে নে একবার।

ওদিকে বৈশ্বানরও বসে নেই। অপরাধীদের মনে আতঙ্কের ঢেউ। এর মধ্যেই বেশ কয়েকজন দুষ্কৃতি জেলের ভাত খাচ্ছে। রুদ্রাক্ষর কানে কি যায়নি সে খবর? গেছে, তবে রুদ্রাক্ষদের প্রতিশোধ স্পৃহা বড় ভয়ঙ্কর। সহজে হার মানার পাত্র নয় ওরা। নিজের ইমেজ ধরে রাখতে কি না করতে পারে এই দুর্জনেরা! দাদাদের খুঁটির জোরে বেপরোয়া এমন সব কাজ করে বসে যা সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কল্পনায়ও আনতে পারে না।

মনস্বিনীর রক্ষাকবচ একটি ফোন নম্বর। আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আঁচ করতে পারলেই যেন সে নাম্বারে ফোন করে দেয় মনস্বিনী, এমনই নির্দেশ দিয়ে রেখেছে বৈশ্বানর। বৈশ্বানর এমন একটি নেট ওয়ার্ক করে রেখেছে যেখানে মুহূর্তের মধ্যেই খবর পৌঁছে যাবে তার কাছে আর অ্যাকশনে নেমে পড়তে যেটুকু সময়। থানায় যে নতুন বড়বাবু এসেছেন তাকে কব্জা করার চেষ্টা করা হয়েছিল রুদ্রাক্ষের দলের তরফে। তিনি ঠারেঠুরে জানিয়ে দিয়েছেন তার অনেক কষ্টে পাওয়া চাকরীটি তিনি কোন সর্তেই হারাতে চান না।

ওদিকে বৈশ্বানরের মায়ের চিন্তার শেষ নেই। কানে আসে কত খবর! গ্রামের লোক যারা শহরে যায় নানা প্রয়োজনে, তারা এসে জানিয়ে যায় কত সুনাম তার ছেলের। গর্ব হয় মনে আবার দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হয় মায়ের মন। এমন কথাও তো শোনা যায়, উন্মত্ত মানুষেরা পুলিশের উপর হামলা করে। কিছু যদি হয়ে যায় ছেলের! কোন এক সুযোগে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসে বৈশ্বানর। মা বলেন, ‘কি দরকার ছিল পুলিশ অওনের, ধারে কাছে কোন চাকরী কি জুটতো না, আমার তো অত টাকা দরকার  ছিল না বিশু, তুই কাছে থাকলেই আমার সব’। বৈশ্বানর মাকে বোঝায়, কত মানুষের দায়িত্ব তার কাঁধে, মায়ের আদর স্নেহের লোভে গ্রামে বসে থাকলে তাদের কি হবে। মা বোঝেন বৈশ্বানরের কথা। আশীর্বাদ করেন, কোন অমঙ্গল যেন ছুঁতে না পারে তার প্রাণের বিশুকে।

 

(ক্রমশ)

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন