ধারাবাহিক উপন্যাস
মহাকর্ষের ছায়া
(দ্বিতীয় পর্ব)
অবশ্য এবারও তেমন বিপর্যয়ের কিছু হল না। সে ধীরে ধীরে নেমে এল নিজের বাড়িরই ছাদে। মানুষ যেখানে দলবদ্ধ ভাবে বাস করে সেখানে বাতাসের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। সেই গন্ধ কেবল জৈবিক নয়; তাতে মিশে থাকে গোপন ভয়, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা আর যৌথ স্মৃতির ভিজে ভাব। সমাজ মূলত এক অদ্ভুত আপস—সেখানে নিজস্ব পরিসরের ভিতরে মানুষকে গ্রহণ করতে হয় সামগ্রিক অস্তিত্বের ভারী ঘ্রাণ। এই গন্ধ মানুষকে মনে করিয়ে দেয়: সে একা বাঁচতে পারেনা। সে ভয় পায়। তাই সে অভিন্ন শেকলে বাঁধা পড়তে ভালোবাসে। সভ্যতার প্রতিটি জনপদে আশ্রয় যেমন সত্য, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধীরে ধীরে মুছে যাওয়াও সমান সত্য। অসংখ্য বুকের পাশাপাশি ওঠানামায় বাতাস তখন আর কেবল অক্সিজেন থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক বহতা স্মৃতিজল, যাতে দ্রবীভূত হয়ে যায় সহস্র গোপন একাকিত্ব। তাপসের জীবনটা ছিল এইরকমই গন্ধের মতোই। ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট, ভারী।
ছাদে চুপ করে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে তাপস। অস্তিত্বের মূল সংকট কি তবে দৃষ্টির মধ্যেই লুকিয়ে? যতক্ষণ আমরা অপরের চোখে ধরা পড়ি, ততক্ষণ আমরা কেমন সুনির্দিষ্ট, ছকে বাঁধা। তাহলে তো অদৃশ্য হওয়াই মুক্তির শর্ত। সে আবার নতুন করে ভাবার চেষ্টা করে সেই মুহূর্তগুলোকে যখন একটু একটু করে তার এই উড়ে চলা শুরু হচ্ছিল। ব্যাপারটা ঠিক একদিনে ঘটেনি। আসলে মায়ের মৃত্যুর অনেক আগে থেকেই তাপসের কখনো কখনো মনে হতো, চারপাশের পরিচিত মানুষগুলো কথা বলছে, হাসছে, কাঁদছে; কিন্তু কারো স্পন্দন অন্য কারোর বুকের ভেতর পৌঁছাচ্ছে না। তাপস বুঝতে পেরেছিল, দূরত্বের কোনো ভৌগোলিক পরিমাপ হয় না; মানুষের সাথে মানুষের বিচ্ছিন্নতা আসলে প্রতিধ্বনিত হতে না পারা এক অনুচ্চারিত অতল খাদ, যেখানে দুটি সত্তা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থেকেও অনন্ত আলোকবর্ষের দূরত্ব বোধ করতে থাকে।
সেদিন রাতের আবহাওয়াটা ছিল অদ্ভুত। আকাশে চাঁদ ছিল না, কিন্তু মেঘের পেটের ভেতর থেকে একটা ফ্যাকাশে আলো ঠিক বের হচ্ছিল। শূন্যতারও নিজস্ব এক ধরনের দীপ্তি আছে যে দীপ্তিতে মানুষ বাধ্য হয় নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে সাক্ষাৎকার করতে। এই আকাশটা মানুষের নিয়তির এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। দেখতে লাগে ঘোর অন্ধকার, অথচ গভীরে এক ক্লান্ত, অনির্বাপিত সত্য লুকিয়ে।
ছাদে দাঁড়িয়ে তাপসের মনে পড়ছিল সেই প্রথম রাতের কথা, রাতের নিস্তব্ধ ছাদে একা দাঁড়িয়ে যেদিন কার্নিশের সংকীর্ণ সীমারেখায় পা রেখে সে আবিষ্কার করেছিল—মানুষের ভার আসলে তার মাংসপেশির নয়, তার স্মৃতির আর অনুশোচনার। আর সেদিন সমস্ত ভেতরের ক্ষত উবে গিয়ে শরীর জুড়ে নেমে এসেছিল এক অতলস্পর্শী ভরহীনতা।
গ্রীষ্মের শেষের দিকের সেই রাতগুলো তো বড় অস্বস্তিকর। বাতাস স্থবির। ঘামে শরীর চটচট করে। ঘড়িতে তখন রাত পৌনে একটা।
মা যেভাবে হারিয়ে গেল মহাকাশের দিকে, সেও যে সেইভাবে একদিন হারাতে পারে, এইসব বিষন্ন ভাবনায় বিছানায় শুয়ে ঘরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে, তার মনে হচ্ছিল, পিঠের নিচের তোশকটা আস্তে আস্তে তার ঘনত্ব হারাচ্ছে। মহাকর্ষের যে টান মানুষকে মাটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখে, তা এক অদৃশ্য হাত দিয়ে তার শরীর থেকে একটু একটু করে ছিঁড়ে নিচ্ছে কেউ। হঠাৎ তার মনে হল, এই ঘরের চারটে দেয়াল আসলে স্থির নেই। এক প্রবাহিত অন্ধকারের ধীরগতিতে দুলছে। দেয়ালের ফাটলগুলো থেকে বেরিয়ে আসছে বহু যুগ আগের মৃত নক্ষত্রদের আলো। তাপস বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। মেঝের স্পর্শটা কেমন ভিজে ভিজে, কিন্তু সেই স্পর্শ জলের নয়, সে এক ধরনের ঘন স্মৃতির স্পর্শ। সে খালি পায়ে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল ঘরের মাঝখানে—ঠিক সেই জায়গাটার নিচে, যেখানে একদিন তার মায়ের মাথা ঠেকে গিয়েছিল ঘরের ভেতরের ছাদে।
সে আবার সেই পুরনো, কাঠঘুণে ধরা চেয়ারটা টেনে আনল। চেয়ারের উপরে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল সিলিংয়ের দিকে। যেখানে মায়ের চুল ঘষা খেয়েছিল, যেখানে জমেছিল তাঁর অলৌকিক নীরবতার গন্ধ—সেখানকার প্লাস্টারটা কি আজও নরম?
তাপসের আঙুলের ডগা সিলিং স্পর্শ করতেই মনে হলো, কোনো কঠিন সিমেন্টের আবরণ নয়, সে আঙুল ডুবিয়ে দিয়েছে এক অন্তহীন কুয়াশার জলীয় মেঘে। সেখান থেকে একটা অদৃশ্য আকর্ষণ স্পন্দনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে তার হাতের রক্তনালী বেয়ে, সরাসরি তার বুকের গভীর পর্যন্ত। সিলিংটা যেন একটা বন্ধ দরজা, যার ওপার থেকে কেউ তাকে নিঃশব্দে ডাকছে—কোনো শব্দ ছাড়া, কোনো চেনা ভাষার শৃঙ্খলা ছাড়া।
চেয়ার থেকে নেমে আসার পর তাপস লক্ষ্য করল, তার পায়ের পাতা আর পুরোপুরি মেঝে স্পর্শ করছে না। কঠিন মেঝে আর তার পায়ের মাঝখানে থেকে গেছে এক সূক্ষ্ম অলৌকিক ব্যবধান। সে এবার কোনো এক আদিম সমুদ্রের তলদেশে হেঁটে চলেছে যেন। সে সেইভাবেই ঘরের কোণে রাখা পুরনো আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অন্ধকারের আবছায়ায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পেল, তার চোখের তারার গভীরে আর চেনা পৃথিবীর কোনো প্রতিচ্ছায়া নেই। সেখানে ফুটে উঠছে এক অচেনা ছায়াপথের অস্পষ্ট মানচিত্র, অতিদূরবর্তী নক্ষত্রদের নিঃশব্দ পথ। আয়নার ভেতরকার তাপস আর বাইরের তাপস—দুজনের মাঝখানের কাঁচের ব্যবধানটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
তাপস আবার গিয়ে শুয়ে পড়ল তার বিছানায়। চোখ বুজে সে টের পেল, এই ঘরের ছাদ আর দেয়ালগুলো তাকে আর বেশিদিন আটকে রাখতে পারবে না। তার মায়ের রূপান্তরটি যদি হয় প্রথম সংকেত, তবে সে হতে চলেছে তার অনিবার্য অনুগামী। সে আর মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখার তাগিদ অনুভব করছেও না। বরং গাছ থেকে ঝরে যাওয়া পাতাদের বাতাসে উড়তে দেখে সে কখনো কখনো মোহগ্রস্ত হয়েছে। স্মৃতির ভারহীন কেমন আশ্চর্য উড়ে চলে সেই সব পাতারা। দেহের ভার আসলে কি স্মৃতিরই ভার? মানুষ যখন নিজের সমস্ত পরিচয় আর ক্ষতগুলো একে একে ঝেড়ে ফেলে দেয়, তখন কি সে এমন হালকা এক পাতায় পরিণত হতে পারে? শুয়ে শুয়ে ঘরের একঘেয়ে ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ সহ্য করতে না পেরে তাপস ছাদে যাবে ঠিক করল।
ছাদের কার্নিশের কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। নিচে বিস্তৃত শহরটা এখন নিঝুম, কিন্তু ঘুমন্ত নয়। দূরে হাইওয়ের ওপর দিয়ে ভারী ট্রাক চলে যাওয়ার বিকট শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। রাস্তার উপরে ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো জমে আছে ছোট ছোট জলাশয়ের মতো।
তাপস কার্নিশে দুই হাত রেখে নিচে তাকাল। তার মনে হল, সে যদি এখন ওই নিচে লাফিয়ে পড়ে, তবে কি রাস্তার ওই হলুদ আলোটা একটুও কাঁপবে? আচ্ছা, এইভাবে এখান থেকে লাফিয়ে পড়ে সে যদি মরে যায়, তাহলে সকালে যখন তার লাশটা সরানো হবে, তখনও পাড়ার চায়ের দোকানে ঠিক একইভাবে উথলে উঠবে দুধ-চায়ের ফেনা আর খবরের কাগজের পাতা ওল্টানোর খসখসে শব্দ। এই মহাবিশ্ব মানুষের কান্নায় যেমন কোনো ছন্দপতন ঘটায় না, আবার কারও গোটা জীবনের সমাপ্তিতেও, চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া ওঠা কিংবা সকালের রুটিনকে এক সেকেন্ডের জন্যে থামিয়েও দেয় না।
এইসব ভাবনায় বুকের ভেতরের একটা বিষণ্ণতার পাথর যেন আরও কয়েক কেজি ওজন বাড়িয়ে নিল। মানুষের শরীর তো কেবল রক্ত-মাংসের নয়, স্মৃতিরও একটা নিজস্ব ভর থাকে। কিছু স্মৃতি শিরায় শিরায় কেমন জমাট বেঁধে থাকে। তাপস অনুভব করল, সে আসলে বেঁচে নেই—সে শুধু সেই জমে থাকা ক্ষোভ আর ব্যর্থতার একটা ধারক মাত্র। ফলে নিজেকে সম্পূর্ণ শূন্য করে দেওয়ার এক আদিম প্রলোভন তার ভিতরে আছে। যখন কিছু চাওয়ার থাকে না, তখন হারানোর ভয়টাও মুছে যায়। তাপস সেই নির্লিপ্ত হারিয়ে যাওয়ার ভিতরেই ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে চাইল। বন্ধ হয়ে এলো তাপসের চোখ।
ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটল।
প্রথমে একটা মৃদু ঝিঁঝিঁ ধরার মত অনুভূতি তার দুই পায়ের তলায়। একধরনের শূন্যতা। তখনও যে এরকম কিছু ঘটতে পারে, তাপস ভাবেনি। হয়তো চেনা মাথা ঘোরার লক্ষণ। রক্তচাপ বোধহয় কমে গেছে। সে কার্নিশটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে চাইল। কিন্তু তার হাত কার্নিশ ছুঁতে পারল না। হাত দুটো ভেসে আছে! একটা বিস্ময়ের ধাক্কায় তাপস চোখ খুলল এবং যা দেখল, তা বোঝার মতো ক্ষমতা তার মস্তিষ্কের ছিল না। তার পা... ছাদের মেঝে ছুঁয়ে নেই! সে মাটি থেকে অন্তত ছয় ইঞ্চি ওপরে ভাসছে! তার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। সে যত পা নাড়াচ্ছে, যেন আরও কয়েক ইঞ্চি ওপরে উঠে যাচ্ছে! মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে? কিন্তু ছাদের কোণে পড়ে থাকা খালি বোতলটা তো ঠিকই মেঝের ওপর রয়েছে। ছাদের পাশের বটগাছের শুকনো পাতাগুলো তো নিচে গিয়ে পড়ছে। তাহলে শুধু সে-ই কেন? তাপস ওপরের দিকে উঠতে লাগল। সাত ইঞ্চি... আট ইঞ্চি... এক ফুট। নিচের শহরটা আরেকটু নিচে নেমে গেল। বাতাসে ভাসতে ভাসতে তার মনে হলো, সে একটা ফানুস। যে ফানুসের ভেতরে কোনো বাতাস নেই, শুধুই শূন্যতা। সেই শূন্যতাই তাকে ঠেলে দিচ্ছে ওপরের দিকে।
এক অদ্ভুত ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠল। এই ভয় মৃত্যুভয় নয়। এই ভয় নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়। এতকাল সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল ঠিকই, কিন্তু মাটির ওপর তার একটা অধিকার ছিল। পৃথিবীর কেন্দ্রমুখী টান তাকে অন্তত ধরে রাখত। এখন সেই বাঁধনটাও যদি ছিঁড়ে যায়? একটা অসহায়তা নিয়ে তাপসের চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা করল। কিন্তু কেমন মনে হল, তার সেই চিৎকারটা বাইরে না গিয়ে, ছড়িয়ে পড়বে তার বুকেরই ভেতর—একটি ফাঁপা, দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি হয়ে।
তাপসের মনে হলো, তার শরীরের ভেতরের স্মৃতির স্তূপগুলোও একে একে উবে যাচ্ছে। গতকালের জমতে থাকা বিষাদ, শৈশবের বৃষ্টির গন্ধ, প্রথম ভালোবাসার শেষ উত্তাপ—সব যেন তার ধমনী থেকে বাষ্প হয়ে আকাশে মিশে যাচ্ছে। মানুষ তো শুধু মাংস আর রক্তের সমষ্টি নয়; মানুষ গঠিত হয় তার বেদনার ঘনত্ব দিয়ে, তার অপরাধবোধ আর অনুশোচনার ওজন দিয়ে। তবে কি তার সেই বেদনার ঘনত্বও ফুরিয়ে গেল? সে কি এতটাই হালকা, এতটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে যে এই ভারী, স্থূল পৃথিবী আর তাকে ধরে রাখার মতো কোনো প্রয়োজন অনুভব করছে না? বাতাসের স্পর্শে এখন এক তীক্ষ্ণ কাচের শীতলতা। আকাশে জমে থাকা মেঘের স্তূপগুলো আর স্থির নেই; সেগুলো অদৃশ্য কোনো সুতোয় পেঁচিয়ে যাচ্ছে তার চারপাশে। সে আবার হাত বাড়াল, এবার নিজের বুকের দিকে। নিজের হৃদস্পন্দনটা অনুভব করার শেষ চেষ্টা। কিন্তু আঙুলগুলো যখন বুকের চামড়া ছুঁল, সেখানে শুধুই এক ঘূর্ণায়মান, নীরব শ্বাসপ্রশ্বাসের ঘূর্ণিপাক, যা অবলীলায় তাকে ঠেলে নিয়ে চলেছে দিগন্তের ওপারে।
কিন্তু তাপসের এই অবস্থা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। অস্তিত্বহীনতার এই অবস্থা হঠাৎ তার মনে এক আতঙ্কের জন্ম দিল। নিজেকে হারিয়ে ফেলবার এই ভয় তার শূন্য শরীরে যেন আবার এক নতুন ভরের সৃষ্টি করল। মৃত্যুর চেয়েও বড় এই ভয়, আর সেই ভয়ের ভারী ওজন। সব মিলিয়ে মাধ্যাকর্ষণ আবারও তার ওপর অধিকার ফিরে পেতে শুরু করল।সে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসতে লাগল। শূন্যে ভাসতে থাকা তার বুকের ভেতরটা আবার ভারী হয়ে উঠল, আর সেই ফাঁপা জায়গায় ফিরে এল হৃৎপিণ্ডের তীব্র লাফালাফি, মাথার ভেতর শুরু হলো রক্তের ধুপধাপ শব্দ।
অবশেষে খুব ধীরে... অনেকটা পালকের মতো তার পায়ের তলা ছাদের মেঝের সিমেন্টের ওপর এসে ঠেকল। মাটির স্পর্শটা খুব মসৃণ হলেও তাপসের শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল শিহরণ মস্তিষ্কের গভীরতম কোণে গিয়ে পৌঁছাল। বাতাসের স্পর্শে যে শরীর আলোর মতো হালকা হয়ে গিয়েছিল, তা আবার অণু-পরমাণুর স্থূল ভিড়ে রূপান্তরিত হতে লাগল। মাথার ভেতরের সেই রক্তের ধুপধাপ শব্দটা এখন তার কানের পর্দায় হাতুড়ির মতো আঘাত করছে।
তাপস দুই হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল সিমেন্টের শক্ত, খসখসে মেঝের ওপর। দুই হাতের চেটো দিয়ে চেপে ধরল ছাদের বুকটাকে। ছাদের খসখসে বালি আর সিমেন্টের দানা তার তালুতে ফুটে যেতে লাগল, আর এই তীক্ষ্ণ যন্ত্রণাই যেন তাকে আশ্বস্ত করল যে সে আর ভেসে যাচ্ছে না, সে এখন এক কঠিন, নিরেট বাস্তবের সঙ্গে গাঁথা। ছাদের শ্যাওলা আর ঠাণ্ডা ধুলোর গন্ধ তার নাকে এসে ধাক্কা দিল—যে গন্ধের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠল পৃথিবীর এক নির্মম সত্য: কোনো অস্তিত্বই তার ভয়কে টপকে অনন্ত শূন্যতায় হারিয়ে যেতে পারে না। তাপস হাত দিয়ে ছাদের শক্ত, অমসৃণ মেঝেটাকে চেপে ধরল। যেন মেঝেটাকে শক্ত করে না ধরলে সে আবার ভেসে উঠবে।
-আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?
তাপস বিড়বিড় করল। সে চোখ বুজে মেঝের ধুলোয় মুখ গুঁজে পড়ে রইল।
-আমি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাচ্ছি। এটা একটা দুঃস্বপ্ন। অতি অবসাদ... আমি শুধু একটু ঘুম চাই।
কখন যে সকাল হয়ে গিয়েছিল, তাপস টের পায়নি। রোদের একটা মিষ্টি হলুদ আলো তার মুখে এসে পড়ার পর তার ঘুম ভাঙল। সে তখনও ছাদের মেঝেতেই শুয়ে আছে। শরীরটা প্রচণ্ড ব্যথায় রি-রি করছে। তাপস খুব ধীরে ধীরে উঠে বসল। চারপাশটা দেখল। রোদ উঠেছে। দূরে পাখিরা ডাকছে। পৃথিবীটা তার চেনা অবস্থাতেই ফিরে এসেছে। কোথাও কোনো অলৌকিকতা নেই।
সে আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। পা দুটো মেঝের ওপর চেপে চেপে কয়েক পা হাঁটল। না, মাটির টান স্বাভাবিক। তার ওজন বাষট্টি কেজিই আছে।
-ওটা একটা স্বপ্নই ছিল।
তাপস দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সান্ত্বনা দিল।
সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো নিজের ঘরে। বাথরুমে ঢুকে হাত-মুখ ধুলো। আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকাল। সেই এক চেনা মুখ—ফোলা চোখ, গালের কোণে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখের নিচে কালি। সে টেবিলের ওপর থেকে চশমাটা তুলে নিতে গেল। চশমাটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই তার চোখ গেল নিজের পায়ের দিকে।
তাপস জমে গেল। তার ঘরটা অন্ধকার নয়। সকালের আলো জানালায় এসে পড়েছে। আর সেই আলোয় মেঝেতে স্পষ্ট ভেসে উঠছে কাঠের আসবাবের ছায়া, চেয়ারের ছায়া, ক্যালেন্ডারের ছায়া। কিন্তু ঘরের মেঝের ওপর তাপসের কোনো ছায়া পড়ে নেই। তাপস কয়েক পা পেছাল। ছায়াটাও পেছনে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে কিচ্ছু নেই। হালকা আলো-আঁধারির মাঝে সে দাঁড়িয়ে আছে একা, কিন্তু মেঝের ওপর তার কায়ার কোনো অবয়ব তৈরি হচ্ছে না। না কি এই আলোতে তার কোনো ছায়া থাকার কথা নয়। গতকালের অভিজ্ঞতার পর সে সবকিছুই একটু বেশি বেশি ভাবছে।
সেদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় পাড়ার গলিতে পা রাখতেই তাপস প্রথম বাইরের পৃথিবীর অদ্ভুত এক বদল টের পেল। চেনা মুদি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ভোম্বল। তাপসকে দেখেই সে প্রতিদিনের মতো হাত তুলে ডাকতে গিয়ে হঠাৎ মাঝপথেই থেমে গেল। তার চোখে ফুটে উঠল এক অচেনা ব্যাকুলতা। ভোম্বল হাতের কাজ ফেলে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাপসের দিকে। তার চোখে-মুখে এমন এক তৃপ্তি আর স্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল, যেন বহু অপেক্ষার পর সে এক আশ্বাসের দেখা পেয়েছে। ভোম্বল বিড়বিড় করে উঠল, "মাস্টারমশাই... আপনি? আপনাকে দেখে আজ কেমন যেন ভেতরটা জুড়িয়ে গেল..." তাপস কোনো উত্তর দিতে পারল না, একটু হেসে তাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল।
এরপর, রাস্তার ধারের ডাস্টবিনের পাশে শুয়ে থাকা চেনা কুকুরটা তাপস কাছে আসতেই লেজ নাড়তে নাড়তে উঠে দাঁড়াল। কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করল না, কোনো অস্থিরতা দেখাল না; বরং নিশ্চিন্তে এগিয়ে এসে তাপসের পায়ের কাছে মাথাটা নত করে দিল। তাপসের অস্তিত্ব থেকে যেন এক স্নিগ্ধ, শীতল ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছিল, যার টানে ঐ প্রাণীটাও এক গভীর নির্ভরতায় চোখ বুজে ফেলল।
স্কুলের গেট দিয়ে ঢোকার সময় ঘণ্টা বাজছিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সহকর্মী সুনীতিবাবু তাপসের মুখের দিকে তাকিয়ে একটু থমকে গেলেন। তাঁর চোখেও এক বিস্ময় ও মমতা। "তাপসবাবু, কেন জানিনা, আজ আপনাকে দেখে এক অদ্ভুত শান্তি লাগছে।"
সুনীতিবাবু তাপসের কাঁধে হাত রাখলেন।
সবচেয়ে আশ্চর্য কাণ্ডটা ঘটল ক্লাসরুমে। ক্লাস ফোরের বাচ্চাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে তাপস যখন ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লিখতে গেল, শিশুরা, যারা অন্যদিন মাস্টারমশাই ঢোকামাত্রই হইচই জুড়ে দেয়, আজ তারা একযোগে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ক্লাসের প্রতিটি শিশুর মুখে এক অনাবিল আনন্দের ছোঁয়া। সামনের বেঞ্চে বসা ছোট্ট মেয়েটা একদৃষ্টিতে তাপসের পায়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই সময় তাপস খেয়াল করেছিল দুপুরের তীব্র তির্যক রোদ খোলা জানলা দিয়ে তার সারা গায়ে এসে পড়ছে, কিন্তু মেঝের সিমেন্টে তার দেহের কোনো ছায়া পড়ছে না। সারাক্ষণই কি এরকম হচ্ছে তার সঙ্গে না কি এটা এই মুহূর্তেই ঘটছে? সে বলতে পারবে না।
-মাস্টারমশাই...
মেয়েটি এক অপার্থিব মায়ামাখা গলায় ফিসফিস করে বলল,
-আপনার পেছনের কালো মানুষটা নেই... আপনি আলোর মতো হয়ে গেছেন!
গোটা ক্লাস জুড়ে সেই মুহূর্তে চল্লিশ জোড়া নিষ্পাপ চোখের সেই আকুল, মায়াবী দৃষ্টি তাপসকে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ ও ভালোবাসার ভারে নুইয়ে দিল। তাপস বুঝতে পারল, এই পৃথিবী, এই মানুষগুলো তাকে আর চেনা হিসেবের রক্তমাংসে বাঁধতে চাইছে না; বরং এক চিরন্তন আশ্রয়ের মতো তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু এই বিপুল মায়ার টান, এই ভালোবাসার বন্ধন সহ্য করার মতো স্থূলতা তো তার আর অবশিষ্ট নেই।
ভালোবাসার এই ভার থেকে বাঁচতেই সে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এসেছিল সেইদিন। ছুটি না নিয়েই সে প্রায় ঘোরের মধ্যে বাড়ি ফিরে এসেছিল। সদর দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে সে আবার দাঁড়াল সেই অন্ধকার ঘরের আয়নার সামনে।
তাপস নিজের জামাটা খুলে ফেলল। অবশিষ্ট পোশাকও খুলে ফেলে দিল মেঝের উপরে। সে এবার নগ্ন দাঁড়াতে চায় এই আয়নার সামনে। আর তখনই আরো আরো ভয়, আরো বিষন্নতা, কেননা সে আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেয়েছে তার বুকের মাঝ বরাবর একটা কালো বৃত্ত। খানিকটা বড় ছড়ানো তিলের মত। কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, সে যখনই ওই কালো তিলটার দিকে তাকিয়ে থাকছে মনে হচ্ছে ওটা আস্তে আস্তে আরো বড় বৃত্তে পরিণত হচ্ছে। নিজের বুকের ঠিক মাঝখানে এরকম অজানা পরিবর্তন, তা সারা শরীরে এক ধরনের শিহরণ তৈরি করল। সে চোখ সরালো অন্যদিকে। কিন্তু যা কিছু ঘটছে সেখান থেকে চোখ সরালে তা তো এড়ানো যাবে না। সে আবার ফিরে তাকিয়েছিল আর দেখছিল যে সেই কালো বৃত্তটি এবার তার বুকের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে ছড়িয়েছে।
আরো আশ্চর্য ব্যাপার, যতক্ষণ সে আয়নার প্রতিবিম্বে নিজের সেই বুকের উপর কালো বৃত্তের দিকে তাকিয়ে থাকছে, সে নড়তে পারছে না। এটা কি ঘটছে? সে কি আসলে মরে যাচ্ছে? একটা অজানা সংক্রমণে তার শরীরটা কি ভিতর থেকে পচে যাচ্ছে? এত দ্রুত এই কালো বৃত্তটির বড় হয়ে যাওয়ার কারন কি? কিন্তু যে সব প্রশ্ন সে নিজেকে করেছে আর সেই হিসাবে যে যে উত্তর সে আশঙ্কা করছে তার একটিও সত্য হলে তার নিজের তো অসুস্থ লাগার কথা। কিন্তু কই? সে তো নিজের শরীরের ভেতর থেকে তো কোনও অসুস্থতা বোধ করছে না! বরং এক আশ্চর্য প্রাণশক্তিতে ভরপুর তার শরীর ও মন।
নিজের সুস্থতার এই অনুভব তাপসকে এক ধরনের উদ্দীপনা দিল। সে আঙুল দিয়ে নিজের বুকের ওই কালো বৃত্তটিকে স্পর্শ করে ব্যাপারটাকে একটু নিরেটভাবে বুঝতে চাইল। কিন্তু অবাক হয়ে দেখল যে তার আঙুলগুলো ওই বৃত্তের ভিতর কেমন হারিয়ে গেল। সে ভয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে আঙুলগুলো বের করে আনল। না তার আঙুল বা হাতের কোনো ক্ষতি হয়নি, কিন্তু এটা কি রকম হল?
সে বিষয়টা আরো ভালো করে বোঝার জন্য এবার নিজের হাতটা কব্জি পর্যন্ত বুকের ঐ কালো বৃত্তের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। এমনকি নিজের হাতের আঙুলগুলো বারবার প্রসারণ এবং সংকোচন করে কিছু স্পর্শযোগ্য থাকলে সেটাকে ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুই ঘটল না। সেভাবে ধরা গেল না কিছুই।
এরপর সে ওই বুকের কালো বৃত্তটাকে আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য একটা টর্চ নিয়ে এসে আলো ফেলল তার উপরে। অবাক হয়ে দেখল টর্চের আলোটা সেই কালো বৃত্তটাকে আলোকিত করল না। আলোটা যেন ওই কালো বৃত্তটার উপরে পড়ছে না অথবা আলোটা ঐ বৃত্তের ভিতরে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে অর্থাৎ বৃত্তটা আরো শুষে নিচ্ছে। আলোকিত হচ্ছে না কিছুই।
এইটা দেখার পর তাপসের বিস্ময়ের আর শেষ ছিল না। তাহলে তার বুকের অর্ধেকটা জুড়ে এই যে কালো বৃত্ত, এটা কি এক ধরনের ব্ল্যাক হোল? কৃষ্ণগহ্বর? যার ভিতরে হারিয়ে যায় এমনকি আলোও। তার বুকে এই কৃষ্ণ গহ্বরের আবির্ভাব কি তার সর্বস্ব হারানোর একটা শুরু? নাকি এই কৃষ্ণ গহ্বর থেকে উঠে আসতে পারে তার প্রত্যাশিত কিছু, যা তাকে তৃপ্ত করবে, যা তাকে সান্ত্বনা দেবে।
এই ভাবনা আসার পর আবার আশ্চর্য হওয়ার পালা কেননা সামনে আয়নার প্রতিবিম্বে এবার সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে যে তার বুকের ওই কৃষ্ণগহ্বরে, যেভাবে পর্দার উপরে ছবি ফুটে ওঠে, ঠিক সেইভাবে দেখা দিয়েছে একটা শরীর। খুব দূর থেকে ভেসে আসছে যেন। সেই শরীর সম্পূর্ণ নগ্ন। যতই এগিয়ে আসছে তত স্পষ্ট হচ্ছে সেই শরীরের নগ্নতা। একটা নারী শরীর। স্তন এবং যোনির আভাস এখনই ধরা যাচ্ছে। তবে যত এগোচ্ছে এবার শুধুই দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে আসছে তার মুখ। তাপস ভালো করে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এটা তারই মুখ। তবে কি নিজেরই নারী মূর্তিকে অবচেতনভাবে কামনা করে আসার ফলাফল এটা? নিজের ভিতর থেকে নিজেরই নারী মূর্তি ভেসে আসছে তার দিকে, সেটা কি তার অবশিষ্ট সত্তাকে ওই কৃষ্ণ গহ্বরে তলিয়ে নিয়ে যাবে বলে?
অবশ্য ছোটবেলা থেকে যে সে নিজেকে মেয়ে হিসেবে কখনো কখনো কল্পনা করতে চেয়েছে, এটা তো সত্য। আমি যদি মেয়ে হতাম, তবে আমাকেও হয়তো এমন দেখাত—তার মনে এরকম ভাবনা অসংখ্যবার এসেছে। স্কুলে একঘেয়ে ক্লাসের সময় সে সহপাঠীদের বিপরীত লিঙ্গের মানুষ হিসেবে কল্পনা করে সময় কাটাত। প্রতি বিরতিতে কোঁকড়ানো চুলের শ্যামলা ছেলেটিকে মেয়ে হিসেবে কেমন দেখাত আর তার যে মেয়ে সহপাঠী গালাগালি ছাড়া একটি কথাও বলতে পারত না, সে ছেলে হলে কেমন হতো, এইসব কল্পনা করে সময় কাটতো। কল্পনায় সে তাদের মুখ, শরীর ও মনস্তত্ত্ব নতুন করে গড়ে তুলত। তাদের নিতম্ব ভরাট বা সরু করত, বুক চ্যাপ্টা বা স্ফীত করত, হাঁটার ভঙ্গি বদলাত এবং তাদের যৌনাঙ্গের নতুন রূপ পর্যন্ত কল্পনা করত। এইসব কল্পনা করতে করতে সে বুঝেছিল, শরীরের চেয়ে কণ্ঠস্বরই আসলে অনেক বেশি আবেদনময়। তার নিজেরও তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল—একদিনের জন্য হলেও—মেয়ে হয়ে ওঠার, যাতে সবকিছু অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে সে দেখতে পারে। তারপর সেই সব দৃষ্টিভঙ্গিকে একীভূত করে গড়ে তুলতে পারে এক সামগ্রিক রূপ। নারী বা পুরুষ হিসেবে নয়, বরং লিঙ্গের বন্ধন থেকে মুক্ত এক মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীকে ঠিক কেমন দেখাত, এইটা জানতে ইচ্ছে করত তার।
আসলে সে তার নিজের চেয়েও বেশি কিছু হতে চেয়েছিল। আকাশে রক্তহীন নখের মতো ঝুলে থাকা একাকীত্বের ক্ষুধার্ত নক্ষত্র অথবা চাঁদের এক মায়াবী অস্তিত্ব যাপন করতে চেয়েছিল সে।
-হ্যাঁ, আমি যদি মেয়ে হতাম, তবে ঠিক এমনই হতাম।
মনে মনে কথাটি আওড়াত।
এদিকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে এসে সেই নারী মূর্তি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। দৃষ্টি তার দিকেই। সেই দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে তাপস টের পেতে থাকল, তার বুকের মাঝখানে প্রসারিত সেই গাঢ় অন্ধকার—যাকে সে কৃষ্ণগহ্বর বলে ভাবছিল—সেটি আর তার আশঙ্কার শারীরিক বিকৃতি হিসেবে নেই। সেটি হয়ে উঠেছে কোনো এক অজানার দিকে এক গুহা পথ।
তার মনে পড়ল সেই দিনগুলোর কথা, যখন তার মা একটু একটু করে মাধ্যাকর্ষণের টান অস্বীকার করে শূন্যে ভাসতে শুরু করেছিল। তখন সে ভেবেছিল, এটা হয়তো মৃত্যুশোকের এক অদ্ভুত খেলা। এই খেলা মায়ের প্রতি তার গভীর আসক্তি, তার মনের ভেতরে জমে থাকা শোক এসব থেকে ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু আজ, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার উপলব্ধি, সেসব কেবল শোকের হ্যালুসিনেশন ছিল না। তা ছিল এক প্রস্তুতি। মা তাকে শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল, কীভাবে পৃথিবীর স্থূল অস্তিত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হয়। আর সেই শিখে চলার পদ্ধতির ভিতরে, মাধ্যাকর্ষণের যে অদৃশ্য শৃঙ্খল মানুষকে মাটির সাথে বেঁধে রাখে, তার ওপর থেকে সেই শৃঙ্খলের প্রভাব মুছে যাচ্ছে। তার মা নক্ষত্রে পরিণত হয়ে যে পথ দেখিয়ে গিয়েছিলেন, আজ তাপস সেই পথের অভিযাত্রীতে পরিণত হয়েছে। বুকের সেই কৃষ্ণগহ্বরের দিকে আবার চোখ ফেরাল তাপস। সেখান থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসছে সেই নারীমূর্তি। একদম নগ্ন, স্পষ্ট এবং পরিচিত। যে মুখটি অন্য কারও নয়, তাপসের নিজেরই।
তাপস বুঝতে পারল, সে আসলে মরছে না বা কোনো অদ্ভুত রোগে পচতে শুরু করেনি। সে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কোনো কিছুর দিকে এগোচ্ছে। সেই আদিম মানুষের গল্পের মতো, যেখানে এক দেহে নারী ও পুরুষের বাস ছিল, তাপস আজ সেই হারিয়ে যাওয়া অর্ধেককে খুঁজে পেয়েছে নিজেরই ভেতরে।
নারীসত্তাটি এবার তার বুকের ভেতর থেকে—হাত বাড়িয়ে দিল। তার চোখে কোনো ভয় নেই, আছে এক অসীম প্রশান্তি; ঠিক যেমন প্রশান্তি সে দেখেছিল তার মায়ের ভাসমান মুখে। তাপস আর এক মুহূর্তও দ্বিধা করল না। সে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল সেই দিকে। দুটো হাত—একটি রক্তমাংসের, অন্যটি অবচেতনের পরস্পরকে স্পর্শ করল। স্পর্শ হওয়ার সাথে সাথেই কোনো শব্দ হলো না, কিন্তু তাপসের চারপাশের পৃথিবীটা, তার পুরোনো আমলের বিশাল ঘর, টেবিলের ওপর রাখা চশমা, জানলা থেকে আসা রৌদ্র—সবকিছু চোখের পলকে মুছে গেল এক প্রবল ঘূর্ণির মধ্যে।
সে নিজেকে আবিষ্কার করল অন্য এক জগতে। এখানকার আকাশ নীল নয়, বরং এক ধরনের তরল সোনালি রঙের। তার চারপাশের দৃশ্যপটগুলো অবিরত রূপ বদলাচ্ছে। তা হয়ে উঠছে জ্যামিতিক নকশায় ঘেরা এক শূন্যতা।
সেই নারীমূর্তিটি এখন তার মুখোমুখি ভাসছে। তাপস খেয়াল করল, তার নিজের শরীরটাও আর আগের মতো নেই। তার গায়ের চামড়া, মাংসপেশি যেন স্বচ্ছ হয়ে আসছে। সে আর শুধুই একজন 'পুরুষ' নয়। তার ভেতরে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ—সকলের অনুভূতি একসাথে খেলা করছে। সে যেন একই সাথে একটি ভ্রূণ এবং একটি মৃত্যুপথযাত্রী আত্মা।
—তুমি কে?
—আমি তোমার সেই তুমি, যাকে তুমি ভয় পাও, আবার যাকে তুমি আকাঙ্ক্ষাও করো।
নারীসত্তাটির কণ্ঠস্বর কোনো নির্দিষ্ট দিক থেকে এল না, মনে হল তা তাপসের নিজের মাথার ভেতর থেকেই অনুরণিত হচ্ছে।
তাপস বুঝতে পারল, তার বুকের ভেতরের এই ব্ল্যাকহোলটি সৃষ্টির এক অনন্ত মাতৃজরায়ু। মানুষের মন তাহলে কেবল স্মৃতি ধারণের পাত্র নয়; তা নিজেই এমন এক অন্ধকার গর্ভাশয়, যেখানে খণ্ডিত অহং চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে এমনই সত্তার জন্ম দেয়। নারীসত্তাটি ধীরে ধীরে তাপসের দিকে এগিয়ে এল। তাপসের মনে হল, তার শিরায় শিরায় কোটি কোটি আলোকবর্ষ পুরোনো কোনো নক্ষত্রের আলো বইতে শুরু করেছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে সে ওপরের দিকে তাকাল। সেই তরল আকাশের বুকে অসংখ্য উজ্জ্বল বিন্দুর জন্ম হচ্ছে। ঠিক যেমন ছাদের ওপর শুয়ে সে তার মাকে নক্ষত্রে পরিণত হতে দেখেছিল, আজ সে দেখল সেই নক্ষত্রমণ্ডলী তার দিকে নেমে আসছে। এবার সেই নারীসত্তাটির দিকে তার চেতনার গভীর থেকে একটা ডাক বেরিয়ে এল
—মা…।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন