কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চঞ্চল বোস

 

সমকালীন ছোটগল্প

 ‘আপ জাইয়ে স্যার, হামলোগ সবকুছ সম্ভাল লেঙ্গে।’

কাজ শেষ করার তাগিদ দেখে সহকর্মী গুলাবচাঁদের ওই প্রস্তাব। গুলাবচাঁদ উদার মানেই জিতেন্দরের ভাষায় ‘আজ ইংলিশ চড়াকে আয়া’। ইংলিশ চড়লে গুলাবচাঁদকে ফিলানথ্রোপিতে ভর করে। তখন ও বিশ্বপ্রেমিক। আর বাংলা চড়লে শিভালরি। বীররসে ভরপুর গুলাবচাঁদ চিৎকার করে—‘জিন্দা দফনা দেংগে।’

মত্ত গুলাবচাঁদকে ভরসা করতে পারলাম না। অফিস বন্ধ করার দায়িত্ব জিতেন্দরকে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

এসব আশির দশকের ঘটনা।

আমরা হাত পুড়িয়ে রান্না করে খাই শুনে প্রতিবেশী ডাক্তার চ্যাটার্জি নিজের পরিচিত অধরকে বলে গ্রাম থেকে একটা কাজের লোক জোগাড় করে দিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। অধর ফোন করে জানিয়েছে, একটা লোককে ছাতনার গ্রাম থেকে আনিয়েছে। লোকটা ওর চায়ের দোকানে বসে আছে। বাঁকুড়ার অজ পাড়া গ্রামের লোক, রাস্তা-ঘাট চেনে না। তাই অধর ওকে একা ছাড়তে চায় না। আমাকে গিয়ে লোকটাকে নিয়ে আসতে হবে।

অফিস ছুটির পর তড়িঘড়ি বাইকে চড়ে কোলিয়ারি এলাকার কুসুণ্ডা-করকেন্দের কয়লার ধুলো ওড়ানো রাস্তা পেরিয়ে অধরের চায়ের দোকানে পৌঁছলাম।

চায়ের দোকানের সামনে আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে আছে শীর্ণকায় এক লোক। শতচ্ছিন্ন জামা, হাঁটু পর্যন্ত ধুতি। আমাকে দেখেই পরম উৎসাহে হাত নাড়ল।

‘ওই! ইদিকে দেখো, হামি ইদিকে দাঁড়হায়ে আছি।’


অধর বলল, ‘আসুন। সুকু বাবুকে নমস্কার কর।’

লোকটা আশঙ্কা আর খুশি মেশানো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নমস্কার করল।

ওকে দেখে আমার একটু সংকোচ হল। এই লোকটাকে বাইকের পিছনে বসিয়ে মেসে নিয়ে যাওয়া যাবে তো?

অধর আমার মুখ দেখে বুঝে ফেলল।

‘অনেক গরিব বুঝলেন না। তবে আপনাদের কাছে থাকলে দুদিনেই সুরত পাল্টে যাবে। হামদের গাঁয়ের লোক বিশ্বাসী হয়। টাকা-পয়সার কথা কিছু বলি নাই। এর আগে যাকে দিয়েছি, ডাক্তারবাবু উহাকে পঞ্চাশ টাকা দেয়। এখনই টাকা-পয়সার কথা বলার দরকার নাই। পাঁচ-সাত দিন কাজ করুক। না পারলে ফেরত পাঠাবেন।’

সেই সময়ে আমাদের মতন সাধারণ চাকুরেদের বেতন পাঁচ-সাতশো টাকা। পঞ্চাশ টাকা খুব বেশি নয়, নেহাৎ কমও নয়। অধরের কথায় ভরসা করে লোকটাকে বাইকের পিছনে বসালাম।

লোকটা জীবনে বাইক চড়েনি।

আমার পিছনে বসে দূরত্ব রেখে এমন চিৎ হয়ে গেল যে বাইক বেসামাল হয়ে উঠল।

বললাম, ‘একটু এগিয়ে এস। দুহাত আমার কাঁধে রেখে ধরে থাক।’

পড়ে গেলে বিপদ হবে।

কুসুণ্ডা, লোয়াবাদ, তেতুলমারি পেরিয়ে যে রাস্তা কতরাশগড়ের দিকে গেছে, তাকে রাস্তা বলা উচিত হবে না। দুপাশে ওপেন কাস্ট কোলিয়ারি। চব্বিশ ঘণ্টা কর্মযজ্ঞ চলছে। আর্থমুভার আর ডাম্পার দিয়ে কয়লা আর ছাইমাটি সরিয়ে রাস্তা বদলে যাচ্ছে। সকালে যে রাস্তায় গেছ, বিকেলে দেখবে সে রাস্তা অন্য দিকে ঘুরে গেছে।

কোলিয়ারির বিস্তীর্ণ অংশের নিচে আগুন লেগে আছে। সন্ধে হলে মাটির নিচ থেকে চার-ছ ইঞ্চির লক্ষ লক্ষ নীল আগুনের শিখা কয়েক মাইল জুড়ে লকলক করে জ্বলে। রাতের অন্ধকারে এক অলৌকিক দৃশ্য।



পিছন থেকে লোকটা জিজ্ঞাসা করল—

‘ঐ নীলগুলা কি দেখাচ্ছে?’

‘আগুন।’

‘আগুন?’

‘হ্যাঁ।’

লোকটা বিশ্বাস করল না।

‘কি বলছ! আগুন নাই!’

কিছু দূর এগোতেই নীল আগুনের একটা জিভ রাস্তার দিকে এগিয়ে এসেছে। লোকটা হঠাৎ আমার কাঁধ জাপটে ধরল।

‘থাম থাম! আগুনের লকলকানি ধাঞে আসচে! হামার দমে ডর করছে।’

আমি বাইক থামালাম না।

‘চুপ করে বসে থাক। নড়বে না। লাফালাফি করলে আগুনে পড়বে।’

আমার কথায় সে আরও শক্ত করে আমাকে আঁকড়ে ধরল।

সেদিন তার জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর যাত্রা শেষ হল রানীবাজারের আমাদের মেসের দরজায়।

আমাদের দুই কামরার চারজনের মেস।

ঘরে ঢুকতেই তক্তপোশে বসে থাকা অজয়, দেবু আর চিত্ত একসঙ্গে আমার দিকে তাকাল।

আমি নাটকীয় ভঙ্গিতে সুকুর কাঁধে হাত রেখে বললাম—

‘এই দেখ তোমাদের কাজের লোক।’

সবার মুখ একটু গম্ভীর হয়ে গেল।

সুকুর চেহারা দেখে অজয়ের ঠাট্টা করার লোভ সামলাতে পারল না।

‘এসে গেছে! এসে গেছে! কাল থেকে রোজ পাতে মাছের কালিয়া, কষা মাংস।’

সুকু তখনও বাইকে চড়ে আগুনে রাস্তার ঘোরে।

উত্তেজিত গলায় বলল—

‘আগুনের মধ্যে দিয়ে আলি। একদম সত্যি বলছি।’

চিত্তর আদি বাড়ি বেগুনকোদর, পুরুলিয়া। সুকুর গলার টান শুনেই বুঝে ফেলল, লোকটা ওর দেশের লোক।

‘নাম কি তুমার?’

সুকু একটু থেমে বলল—

‘হামার নাম? কি বইলবো তুমায়! নামটা হামার সুকুমার। কিন্তু বামনকুলী যায়ে কাউকে সুকুমার সুধাবে ন। সব লোকে সুকু নামেই চিন্হে।’

‘ঠিক আছে। হামরা তুমাকে সুকু নামেই হাঁকাব। বামনকুলী গাঁটা কোনদিকে?’

‘ছাতনা টেসন থিকে পুবদিকে দু কোশ হাঁটবে ন, বামনকুলী পৌঁছাই যাবে।’

অজয় এবার কাজের কথায় এল।

‘এর আগে কী কাজ করেছ? কখনও কারও বাড়িতে কাজ করেছ?’

‘কই করলাম। করি নাই।’

‘করি নাই মানে?’

‘ইখানে তো আজকেই আলি ন। আজকাল কাজ শুরু করব।’

‘কি করতে হবে জানা আছে তো?’

‘অধর বলে দিছে, বাবুরা যা বলবে সব করতে হবে।’

‘কখনও বাড়ির রান্না করেছ?’

সুকু অবাক হয়ে তাকাল।

‘কি বইলবো! গাঁয়ে রান্না-তান্না বিটিছায়েই করে?’

‘তুমি গাঁয়ে কী কাজ করতে?’

‘হামি মাঠে গরুতরু চরাতি।’


অজয় বলল—

‘গরু চরানো থেকে রাঁধুনিতে প্রমোশন! অন্য কিছু কাজ করনি?’

‘হঁ করেছি ন। বিচালি লিয়ে ষাঁড়গাড়ি হাঁকাইছি। ধানের উখড়ানি, মড়ানি, সিধা-শুখা। আর গরুতরু চরাতি।’

আমরা একে অন্যের মুখের দিকে তাকালাম।

সুকু অনর্গল নিজের গ্রামের কাজের কথা বলে যাচ্ছে মানভুমি বাংলায়। আমাদের কাছে সে যেন একেবারে নতুন একটা ভাষায় কথা বলছে।

অজয় ডাক ছেড়ে কীর্তন ধরল—

‘হরে কৃষ্ণ মাধবো,
আর কতকাল একলা শোবো!’

সুকু বোধহয় বুঝতে পারল না, এটা তার জন্য বলা হয়েছে কি না।

অজয় এমনই। সবকিছুর মধ্যে ঠাট্টার গন্ধ পায়।

তবু সেদিন আর বেশি কিছু হল না।

সুকুর গায়ের জামাটা দেখে অজয় নিজের একটা পুরোনো জামা বের করে দিল।

‘গায়েরটা খুলে এটা পরো। তোমায় রাজেশ খান্না বানিয়ে দিচ্ছি।’

সুকু জামাটা হাতে নিয়ে এমনভাবে দেখল, যেন সত্যিই রাজেশ খান্না হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

রাতে শোবার ব্যবস্থা করতে একটা খাটিয়ার প্রয়োজন।

চিত্ত বলল, ওর বাড়িতে একটা খাটিয়া পড়ে আছে। আপাতত সেটা দিয়ে কাজ চলে যাবে।

খাটিয়া নিতে সদলবলে চিত্তর বাড়ি গেলাম। সুকুকে রিকশায় বসিয়ে রিকশাওয়ালাকে বুঝিয়ে দিলাম—রামকানালি বাসস্ট্যান্ডের পাশে আমাদের বাসা।

সুকু বলল—

‘হামি রাস্তা চিন্হে গেছি। ঠিক পৌঁছাই যাব।’

আমরা মেসে ফিরে এলাম।

কিছুক্ষণ পরে দেখি সুকুর কোনও চিহ্ন নেই।

খাটিয়া নিয়ে রিকশা গেল কোথায়?

রামকানালি বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে সুকুকে খুঁজছি।

অজয় হেঁড়ে গলায় চিৎকার করল—

‘ও সুকুমার! সুকু দেখা দে বাবা!’

অন্ধকার চিরে উত্তর এল—

‘ওই! হাই দিক দেখো। হামরা ইখানে বইসে আছি।’


কাছে গিয়ে দেখি সুকু খাটিয়া খাড়া করে দিব্যি রিকশায় বসে আছে।

রিকশাওয়ালা অভিযোগ করল—

‘ইয়ে বুড়বক কুছ নাহি জানতা, বাংলা মে অল-বল বকে যা রহা।’

সুকুও কম যায় না।

‘ই বিটা বিহারি। একটা বাংলা কথা বুঝে নাই।’

সেদিন রাতে কোনও ঝুঁকি না নিয়ে আমরাই রান্না করলাম।

সুকু এক থালা ভাত এমন আনন্দে খেল যে চিত্তর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি বলে মনে হল—লোকটা অনেক ভাত খাবে।

পরদিন সকাল থেকে শুরু হল আসল পরীক্ষা।

আমাদের মেসের কাজ ভাগ করা ছিল।

আমি উনুন ধরিয়ে চা বানিয়ে সার্ভ করে দিলে আমার কাজ শেষ। দেবুর বাসন মাজা। অজয়ের রান্না।

সুকুর কাজ—সব শেখা।

প্রথম সমস্যা উনুন ধরানো।

কয়লা প্রায় শেষ। এ অঞ্চলে কয়লা কিনে ব্যবহার করা এক অলিখিত সামাজিক অপরাধ। মেসের পেছনের দরজা থেকে রেলওয়ে ইয়ার্ডের পাঁচিল হাত ছয়েক দূরে। পাঁচিলে একটা তিন ফুট বাই ছয় ফুট ফুটো আছে। কে কখন ইট সরিয়ে এই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, কেউ জানে না।


সাত সকালে ছোট-বড় ছেলেরা মাথায়, পিঠে, সাইকেলে করে কয়লা নিয়ে যায়।

অজয় একদিন তাদের এমন ভয় দেখিয়েছে যেন কোলিয়ারি তার বাবার সম্পত্তি।

‘ইস উমর মে চোরি করতা হ্যায়? ছিঃ! আমি যখন বলব দু-চারটে কয়লার চাঙড় আমার দরজায় ঢুকিয়ে দিবি।’

কয়লা ফুরোলেই অজয় পেছনের দরজা খুলে দাঁড়াত। আধুলি বা এক টাকা ধরিয়ে দিলে ভাণ্ডার ভরে যেত।

সুকুর হাতে এক টাকা দিয়ে বলা হল—

‘পেছনের দরজায় দাঁড়িয়ে কয়লা ধরো।’

কিছুক্ষণ পরে দেখি সুকু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছেলেদের বলছে—

‘এই কয়লা, ইখানে কিছু দিয়ে যা।’

ছেলেগুলো সুকুর দিকে তাকিয়ে অকথ্য খিস্তি করে চলে গেল।

সুকুর চেহারায় কোনও ভয় নেই, কিন্তু কর্তৃত্বও নেই।


অজয় বলল, ‘ওদের সঙ্গে তোমার এখনও পরিচয় হয়নি। চিনবে।’

চা বানানো গেল কোনওমতে।

বাসন মাজার দায়িত্বে দেবু। মনেপ্রাণে বামপন্থী, মিতভাষী দেবু, সুকুকে উঠোনের পাশে বসিয়ে ডেমোন্সট্রেশন দিল।

সুকু দেখল।

তারপর আবার দেখল।

তারপরও ঠিক হল না।

দেবু বিরক্ত হয়ে বলল—

‘এর দ্বারা হবে না দাদা!’

অজয় রান্নাঘরে সুকুকে বটিতে আলু কাটতে দিল। সুকুর আলু কাটার ধরন দেখে অজয় থমকে গেল।

‘তুমি কি ঘরে কাটারি দিয়ে আলু ছেলো?’

বোঝা গেল তরকারি কাটার কাজ সুকুকে দিয়ে এখনই হবে না। একটা কোনও বিপত্তি বাধিয়ে বসবে।

শেষে অজয় প্রেসারকুকারে ডাল চাপিয়ে বলল—

‘দুটো সিটি বাজলে নামিয়ে দেবে।’

সুকু প্রেসারকুকারের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

‘সিটি মাইরবে ইটা?’

‘হ্যাঁ।’

‘না। মিছা বৈলছ তুমি।’

‘দুটো সিটি বাজবে। তারপর নামাবে।’

অজয় চলে গেল।

সুকু উনুনের সামনে উবু হয়ে বসে রইল।

কিছুক্ষণ পরে প্রেসারকুকার থেকে মৃদু ছিকছিক শব্দ।

সুকু তাকিয়ে আছে।

তারপর হঠাৎ—

ফুঁউউউউ!

একটা তীক্ষ্ণ কর্কশ সিটি।

সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘর থেকে বাসন উল্টে পড়ার শব্দ।

দৌড়ে গিয়ে দেখি সুকু মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে।


সুকু অজয়ের দিকে তাকিয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল—

‘ইটা কি করলে! তুমি বৈললে সিটি মারবে।’

অজয় বলল—

‘এইটাই সিটি।’

সুকু বিশ্বাস করল না।

‘গর্জন করছে, ধুঁয়া ফেকাচ্ছে। প্রলয় করে দেবে বুঝাচ্ছে। ইটা সিটি! ইটা ঠিক কর নাই। হামার একটা কিছু বিপদ হয়ে গেলে?’

অজয় হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণ পরে সুকু নিজেও একটু লজ্জা পেল।

‘ইটা বড় কঠিন ম্যাশিন। যে আগে দেখে নাই, দমে ডরাবে।’

আমরা কেউ তাকে তখন আর কিছু বললাম না।

সেদিন সন্ধ্যায় চা বানাতে গিয়ে সুকু আবার ভুল করল।

আমি হাত লাগালাম।

রাতে অজয়ের সক্রিয় তত্ত্বাবধানে ভাত, ডাল, আলুপোস্ত হল।

দেবু বলল—

‘আলুপোস্তটা খুব ভাল হয়েছে।’

সুকুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

‘দেখ, আজ কেমন চা বানালী। সব রাঁধে খাওয়ালি। তুমাদের ভাল লাইগলো ন?’

অজয় বলল—

‘বাল তুমি বানালে? সবটা তো আমাকেই হাত লাগাতে হল।’

সুকু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ডান হাতের তর্জনী তুলে বলল—

‘হামি কিন্তু এইটা লিবো।’

‘এইটা কি?’

‘লম্বরী।’

‘লম্বরী?’

‘হঁ। লম্বরী।’

পরে বুঝলাম, ও বলতে চাইছে নম্বরি—একশো টাকা।

অজয় তর্জনীটা গুটিয়ে অর্ধেক করে দেখাল।

‘তোমার কাজের যা নমুনা, এইটা দিব।’

সুকু তাকিয়ে রইল।

পঞ্চাশ টাকা।

আমার মনে পড়ল—আমরা লোকটার সঙ্গে মাইনের কথাটাই ঠিকমতো বলিনি।

পরদিন সকালে সুকু অনেক চেষ্টা করেও উনুন জ্বালাতে পারল না।

বাসন মাজতে বসে সুকু দেবুকে বলল—

‘কাল যেমনটা বাসন গুলা মাজে ছিলে, আজ টুকু আরেকবার দেখাই দাও।’

দেবু বিরক্ত হয়ে বলল—

‘এ যে আজকেও আবার দেখিয়ে দিতে বলে!’

দেবু আবার দু-চারটে বাসন মেজে সুকুকে দিয়ে ধুইয়ে নিল।

তারপর আমাকে বলল—

‘একে দিয়ে হবে না।’

কথাটা ঠিক। কিন্তু লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে ‘তোমার দ্বারা হবে না’ বলা গেল না।

সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে দেখি সুকু খাটিয়ায় বসে আছে। মনমরা। কিছু একটা বলবে বলে উসখুস করছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম—

‘কি হল? মুখটা ওরকম করে বসে আছো কেন? কিছু বলবে?’

সুকু মাথা নিচু করে বলল—

‘একটা কথা বলবো। মনে কিছু ইহা কর নাই।’

‘বলো।’

‘তুমাদের ঘরের কাজ হামি কইরতে পারবো নাই।’

আমি চুপ করে রইলাম।

সুকু আপন মনে বলে গেল—

‘তুমাদের দোস নাই। হামি এই কাম কভু করি নাই।’

একটু থেমে বলল—

‘তুমি হামাকে বৈলবে, এক-ষাঁড়গাড়ি বিচালি ভইরে দিতে। হামি এক মিনিটে ভইরে দিবো।’


 তার গলার স্বর বদলে গেল।

‘ষাঁড়গাড়ি বিচালি বামনকুলী থেকে ছাতনা টেসন একরাতে পৌঁছাই দিয়ে ঘুইরে আসব।’

এবার সে হাত দিয়ে যেন অদৃশ্য বলদের দড়ি ধরল।

‘হামি লখাইয়ের মা-কে লিয়ে এক বেলাঞে এক বিঘা ভুইঁয়ে ধানের ছাঁচ টপাটপ লাগাই দিব। বলদগুলাকে গোটা দিন দৌঁড়াইয়ে কাঁদা মাটেই হাল চইষে পাটপাট করে দিব।’

কথা বলতে বলতে লোকটার মুখে প্রথমবার এমন একটা আত্মবিশ্বাস দেখলাম, যা গত দুদিনে একবারও দেখিনি।

‘গোটা দিন দমে জলে বলদগুলা দিয়ে দু-পাঁচটা বাবুর ভুঁই একাই চষাই দিব।’

তারপর বলল—

‘কাউর কুঁড়হার ছাঙরটা কাইলকের বাতাসে উধারে লিয়ে গেছে। ছাঙর দিয়ে জল চুইছে। তুমি দেইখবে ন, হামি দু ঘইণ্টায় পুরা করে দিব।’

সুকু থামল।

‘কাজটা সেরে দিলে বাবুরা দু-আড়া ধান কি কিছু ভূতি দিতেন।’

আমার চোখের সামনে হঠাৎ একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।

রাতের কালবৈশাখীতে সুকুদের নিজের কুঁড়েঘরের চালের খড় উড়ে গেছে। কিন্তু সকাল হলেই সুকুকে বাবুর বাড়ির বেড়া সারতে যেতে হয়েছে।

রোদ বাড়ছে। হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে সুকু বাঁশের চটা দিয়ে বেড়া বুনছে। উদোম পিঠ বেয়ে ঘাম ঝরছে।

বাবু বারান্দায় বসে গড়গড়ি টানছেন।

‘টুকু হুঁশিয়ার থাকবি সুকু। খুঁটা যেন লড়ভড় না করে।’


সুকু মাথা নিচু করে কাজ করে যাচ্ছে।

তার নিজের কুঁড়েঘরে বউ আর বাচ্চা ভিজে মাটিতে বসে আছে।

বাবুর বেড়া আজ ঠিক করে না দিলে আজ রাতে তাদের কপালে এক মুঠো মুড়িও জুটবে না।

সুকু মনে মনে হয়তো বলছে—

‘আজ্ঞে বাবু, কঁষেই বাঁধছি। ইদিকে হামার নিজের কুঁড়হার ছাঙরটাও কালকের বাতাসে উধারে লিয়ে গেছে গো। ছাঙর দিয়ে জল চুইছে।’

আমি জানি না দৃশ্যটা সত্যিই এমন ছিল কি না।

কিন্তু সুকুর কথা শুনে আমার মনে হল, এটাই তো তার পৃথিবী।

ও কাজ জানে না—তা নয়। ও অনেক কাজ জানে। শুধু যে কাজ ও করতে জানে, সেই কাজের বাজার এখানে নেই।

সুকু আবার বলল—

‘হামি রাঁধা করি। হামদের রাঁধা, তুমাকে কি বলবো! শুকা কাঠি ঘাসফুস দেইখে উনানটা একভাঁড়া জ্বলে। এক ঠিল্যা চাল ফুটালে রাঁধা সিরাল।’

‘নুন-লঙ্কা, আলু চটকা, মাড়ভাত আর পান্তাভাত। তেল লংকায় তিসি বাইটে লিবে তো অনেক। ভাজা, তরকারি, সবজি—কভু বাবুদের ঘর থেকে বিটিছায়ে খুঁটে বেঁধে লিয়ে আসে। হঁইয়ে যায়।’

একটু হেসে বলল—

‘শহরের লোকগিলার মতন হামাদের রাঁধায় অতো কাইদা নাই।’

আমি জিজ্ঞেস করলাম—

‘বেশ তো ছিলে গাঁয়ে। কাজ যখন করতেই, ঘরদোর বউ বাচ্চা ছেড়ে এদিকে আসলে কোন বুদ্ধিতে?’

সুকুর মুখে কাষ্ঠ হাসি।

‘কথাটা ঠিকেই বললে।’

একটু চুপ করে থেকে বলল—

‘বর্ষার দিন ধান রুপাই, অঘান মাঁসে ধান কাটাই, পুস মাসে ধানের উখড়ানি, মড়ানি, ধান সিধা-শুখা। এই সকল সময় গুলায় গোটা দিন বাবুদের ঘরে হামদের দমে কাজ। সবদিন কে কাজ দিবে বল? যদি একদিন আধা বেলার কাম পালে, তো পাঁচ দিন ইধার-উধার ভটকে মর, কামের দেখা নাই। ঘরে বসে থাকলে পেট তো আর বসে থাকে নাই। কাম নাই তো হামদের উপায় কী বল?’


আমি আর কিছু বললাম না।

সুকু একটু পরে জিজ্ঞাসা করল—

‘ইখানে বাঁকুড়ার গাড়ি যায় ন?’

আমি বুঝলাম।

‘যায়। কাল সকালে তোমাকে বাঁকুড়ার ট্রেনে চড়িয়ে দেব। তুমি একা যেতে পারবে?’

সুকু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

‘একদম পারব। বাঁকুড়ার গাড়িগুলা ছাতনা দাঁড়হাবে। ছাতনার লে দু কোশ চলবে তো বামনকুলী পৌঁছাই যাবে।’

এই লোকটাই দুদিন আগে রামকানালি বাসস্ট্যান্ডে নিজের বাড়ি খুঁজে পায়নি। এখন নিজের বাড়ি ফেরার পথ সে চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে।

পরদিন কিছু পুরোনো জামাকাপড়, যা ওকে দেওয়ার জন্য আমরা আলাদা করে রেখেছিলাম, সুকুকে দিলাম।

‘দেখ তো, এই জামাকাপড় তোমার গায়ে হবে?’

সুকু জামাগুলো হাতে নিয়ে বলল—

‘হঁ, একদম হবে। কত সুন্দর কাপড়গুলা।’

সকালে বাইকে বসিয়ে ওকে মালকেরা রেলস্টেশনে পৌঁছে দিলাম।

হাতে দিয়ে দিলাম একশো টাকা খুচরো।

টিকিট কাটতে আমি লাইনে দাঁড়ালাম।

ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে।

আমি টিকিট হাতে নিয়ে সুকুকে খুঁজছি।

হঠাৎ সবচেয়ে পিছনের কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে ওকে দেখতে পেলাম।

সুকু দুহাত নেড়ে চিৎকার করছে—

‘ওই! ইদিকে দেখো, হামি ইদিকে দাঁড়হায়ে আছি।’


 আমি হাত তুললাম।

সুকু হাসল।

ট্রেন ছেড়ে দিল।

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন