![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫১ |
তখন ঝড় উঠেছিল
অনেকদিন পর গল্ফগ্রীনে এসেছি একটা গুরুত্বপূর্ণ
কাজে। এখানেই আমার কলেজের সহপাঠী রাতুলের ফ্ল্যাট। দিন চারেক আগেও ফোনে কথা হয়েছে অন্তত আধঘন্টা ধরে। ও বলেছিল,
-- অনেক দিন তো আসিস না। একদিন আয় না।
শর্মিষ্ঠা তোর কথা বলছিল। তুই এলে খুব খুশি হবে। তিনজনে
মিলে আড্ডা মারা যাবে।
--- হ্যাঁ, ঠিকই বলেছিস।
কতদিন তোর কবিতা শুনি না, শর্বরীর গানও শুনি না।
-- চলে আয় একদিন।
--- ঠিক আছে যাবো। এখন রাখছি বসের ঘরে ডাক পড়েছে।
-- ওকে!
-- বাই!
এতো তাড়াতাড়ি এবং রাতুলদের পাড়াতেই
যে তার কাজ পড়ে যাবে তা ভাবিনি।
আমার কাজ সাড়া হয়ে গেছে। এখন ঘড়িতে মাত্র চারটে বাজে। বৈশাখী
গরমে একবারে নাজেহাল। এখনো সূর্যটা ভীষণ তেজে গরম ঢেলেই যাচ্ছে। হঠাৎ করেই রাতুলের কথা মনে পড়ল। হঠাৎ
মনে পড়ল -- একথা বলাটা ঠিক হলো না। যখনই অফিস থেকে গল্ফগ্রীনের অ্যাসাইনমেন্টা দেওয়া হয়েছিল তখন
থেকেই রাতুল আর শর্মিষ্ঠার কথা মনের মধ্যে গেঁথে বসেছে। দুজনের
কথাই কী মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল, নাকি শর্মিষ্ঠার মুখটাই কেবল আমাকে টেনেছিল? ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কিন্তু
আমাকে যে যেতেই হবে! না গিয়ে কোনো উপায় নেই। আমি অন্তত নিজে খুঁজে পাচ্ছি না।
কতদিন যে শর্মিষ্ঠার হাতে কফি খাই না তা
মনেও করতে পারছি না। শুধু তাই না, শর্মিষ্ঠার
গলায়, তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম… গান শুনলেই সেই ইউনিভার্সিটি থেকেই আমার কেমন যেন মনে হতো শর্মিষ্ঠা
নির্ঘাত আমার জন্যই এই গান গায়।
যদি তাই না হতো তবে ওর কাছে যতবার গান
শুনতে চেয়েছি ততবারই ও দু একটি গান গেয়ে এই গানটাই গাইত। এবং কেউ
শত চেষ্টা করেও ওকে আর কোনো গান গাওয়াতে পারত না। এমনকি
আমি একদিন অনুরোধ করার পর বেশ কিছুক্ষণ গভীর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বেশ কঠিন
স্বরেই শুধু বলেছিল, না।
আজ যদি গান শুনতে চাই তবে কি ও সেই একই
গান গাইবে? নিজের প্রশ্নে নিজেই কেন যে চমকে উঠলাম
ঠিক বুঝতে পারলাম না।
ডোর বেলটা বেজে উঠতেই কিছুক্ষণের মধ্যে
দরজার আইহোলে ঘরের ভিতর থেকে কেউ যে আমাকে দেখে নিল তা বুঝতে অসুবিধা হলো না। তারপর দরজাটা খুলে গেল। সম্পূর্ণ
খোলা চুলের সুগন্ধি ছড়িয়ে শর্মিষ্ঠা পরিষ্কার উচ্চারণে বলল,
-- বাব্বা, এতোদিনে মনে পড়ল! এসো…
আমি পুতুলের মতো ওর নির্দেশ মতো ঘরে ঢুকে
গেলাম। শর্মিষ্ঠা দরজাটা বন্ধ করে দিল। বাইরে তখন প্রবল কালবৈশাখীর ঝড় উঠে গেছে।
শর্মিষ্ঠার মুখোমুখি আমি। জানালা দিয়ে বৈশাখী ঝড়ের হাওয়ায় ওর চুল ছড়িয়ে পড়েছে সারা
চোখেমুখে। হালকা করে আমার চিবুক স্পর্শ করে যাচ্ছে
ওর এলোমেলো চুল। কী অপূর্ব যে লাগছে শর্মিষ্ঠাকে! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়েই থাকি। তখন ঝড়
ভিতরে বাইরে। হঠাৎ আমার হাতে একটা হ্যাঁচকা টান অনুভব
করলাম শুধু।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন