বঙ্কিমচন্দ্র ও বিবেকানন্দ
সময়টা উনিশ শতক। প্রগতিশীল শিক্ষা ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনগুলিকে সম্পূর্ণ রূপে অপসারণ করে ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনের অন্যতম হোতা ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং স্বামী বিবেকানন্দ। ব্রিটিশ শাসনের সুফল-কুফল সম্বন্ধে তাঁদের মনোভাব সম্পর্কে অনেক মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। তার কিছু এখানে উপস্থাপিত করা হল।
১১ই কার্ত্তিক, ১২৮০ বঙ্গাব্দে 'সাধারণী' পত্রিকায় প্রকাশিত 'জাতিবৈর' শীর্ষক প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের বক্তব্য "ইংরেজরা যে এ দেশের লোকের অপেক্ষা সাধারণতঃ শ্রেষ্ঠ, তাহা আত্মগৌরবান্ধ ব্যক্তি ব্যতীত কেহই অস্বীকার করিবেন না। ইংরেজরা আমাদের অপেক্ষা বলে, সভ্যতায়, জ্ঞানে, এবং গৌরবে শ্রেষ্ঠ। কোন এক জন ইংরেজের অপেক্ষা, কোন এক বাঙ্গালীকে শ্রেষ্ঠ দেখা যাইতে পারে, কিন্তু সাধারণ বাঙ্গালীর অপেক্ষা, সাধারণ ইংরেজ যে শ্রেষ্ঠ তদ্বিষয়ে সংশয় নাই। যেখানে এরূপ তারতম্য, সেখানে যদি শ্রেষ্ঠ পক্ষ নিস্পৃহ, হিতাকাঙ্ক্ষী এবং শমিতবল হইয়া থাকিতে পারেন, নিকৃষ্ট পক্ষ তাঁহাদিগের নিকট বিনীত আজ্ঞাকারী এবং ভক্তিমান হইয়া থাকিতে পারেন, তবেই উভয়ের প্রীতির সম্ভাবনা।"
১৮৭২ খ্রীস্টাব্দে 'বঙ্গদর্শনে' ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত 'বঙ্গদেশে কৃষক' প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র স্পষ্টাক্ষরে দাবী করেন, "ব্রিটিশ্ অধিকারে রাজ্য সুশাসিত। পরজাতীয়েরা জনপদপীড়া উপস্থিত করিয়া যে দেশের অর্থাপহরণ করিবে, সে আশঙ্কা বহুকাল হইতে রহিত হইয়াছে। আবার স্বদেশীয়, স্বজাতীয়ের মধ্যে পরস্পরে যে সঞ্চিতার্থ অপহরণ করিবে, সে ভয়ও অনেক নিবারণ হইয়াছে। দস্যুভীতি, চৌরভীতি, বলবৎকর্ত্তৃক দুর্ব্বলের সম্পত্তিহরণের ভয়, এ সকলের অনেক লাঘব হইয়াছে। আবার রাজা বা রাজপুরুষেরা প্রজার সঞ্চিতার্থ সংগ্রহ-লালসায় যে বলে, ছলে, কৌশলে লোকের সর্ব্বস্বাপহরণ করিবেন, সে দিনও নাই।"
একই প্রবন্ধে ইংরেজ রাজত্বে দেশের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র সপক্ষে বলেন, "সকলে মহাদুঃখিত হইয়া বলিয়া থাকেন, এক্ষণে দিনপাত করা ভার—দ্রব্য সামগ্রী বড় দুর্ম্মূল্য হইয়া উঠিতেছে। এই কথা নির্দ্দেশ করিয়া অনেকেই প্রমাণ করিতে চাহেন যে, বর্ত্তমান সময় দেশের পক্ষে বড় দুঃসময়, ইংরাজের রাজ্য প্রজাপীড়ক রাজ্য, এবং কলিযুগ অত্যন্ত অধর্ম্মাক্রান্ত যুগ—দেশ উৎসন্ন গেল! ইহা যে গুরুতর ভ্রম, তাহা সুশিক্ষিত সকলেই অবগত আছেন। বাস্তবিক, দ্রব্যের বর্ত্তমান সাধারণ দুর্ম্মূল্য দেশের অমঙ্গলের চিহ্ন নহে, বরং একটি মঙ্গলের চিহ্ন।"
ওই প্রবন্ধেই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গুণগান গেয়ে বঙ্কিম দাবী করেন, "এইরূপে বঙ্গদেশের কৃষিজাত আয় যে চিরস্থায়ী সময় হইতে এ পর্য্যন্ত তিন চারিগুণ বৃদ্ধি হইয়াছে, ইহা বলিলে অত্যুক্তি হইবে না।"
বৃটিশ শাসনের প্রবল প্রশংসা করতে গিয়ে বিগলিত হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র এও বলেন, "ইচ্ছাপূর্ব্বক ব্রিটিশ্ রাজপুরুষেরা প্রজার অনিষ্ট করেন নাই। তাঁহারা প্রজার পরম মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। দেওয়ানী পাইয়া অবধি এ পর্য্যন্ত কিসে সাধারণ প্রজার হিত হয়, ইহাই তাঁহাদিগের অভিপ্রায়, এবং ইহাই তাহাদিগের চেষ্টা।"
বিবেকানন্দের বক্তব্যে পাওয়া যায় :
২৬ ফেব্রুয়ারী ১৮৯৭, বিবেকানন্দ কলকাতার শোভাবাজার রাজবাটীতে প্রদত্ত বক্তৃতায় বলেন, "হে ভ্রাতৃগণ, এখানে এমন কেহই উপস্থিত নাই, যিনি ইংরেজ জাতিকে এখন আমা অপেক্ষা বেশী ভালবাসেন।" একই বক্তৃতাতে তিনি আবারও বলেন, "যদি আপনি একবার সেখানে পৌঁছিতে পারেন, যদি ইংরেজের সহিত আপনার একবার ঘনিষ্ঠতা হয়, যদি তাহার সহিত মেশেন, যদি একবার আপনার নিকট তাহাকে তাহার হৃদয়ের কথা ব্যক্ত করাইতে পারেন, তবে ইংরেজ আপনার চিরবন্ধু—আপনার চিরদাস।"
'প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকায় লিখিত ‘ভারতের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ, বিবেকানন্দ সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের অবস্থা নিয়ে লেখেন, "তারপর আবার এক বিশৃঙ্খলার যুগ উপস্থিত হইল। শত্রু ও মিত্র, মোগলশক্তি ও তাহার ধ্বংসকারীরা এবং তৎকাল পর্যন্ত শান্তিপ্রিয় ফরাসী, ইংরেজ-প্রমুখ বিদেশী বণিকদল এক ব্যাপক হানাহানিতে লিপ্ত হইয়াছিল। প্রায় অর্ধ-শতাব্দীরও অধিক কাল যুদ্ধ লুণ্ঠন ও ধ্বংস ছাড়া দেশে আর কিছুই ছিল না। পরে সে তাণ্ডব অপসারিত হইলে, দেখা গেল সকলের উপর জয়লাভ করিয়া সদম্ভ পদবিক্ষেপে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে ইংরেজশক্তি। সেই শক্তির শাসনাধীনেই অর্ধ-শতাব্দীকাল ধরিয়া দেশে শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা অব্যাহত।"
১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দের ১০ই জুলাই ইয়োকোহামা থেকে আলাসিঙ্গাকে লিখিত পত্রে বিবেকানন্দ ঘোষণা করেন, "প্রভু তোমাদের এই বাঁধাধরা সভ্যতা ভাঙবার জন্য ইংরেজ গভর্ণমেণ্টকে প্রেরণ করেছেন, আর মান্দ্রাজের লোকই ইংরেজদের ভারতে বসবার প্রধান সহায় হয়।"
১৮৯৮ খ্রীস্টাব্দেের জানুয়ারী মাসে বেলুড়ের ভাড়াটিয়া মঠ-বাড়িতে বসে শিষ্যদের সঙ্গে কথোপকথনকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করে বিবেকানন্দ বলেন, "একটা ছুঁচ গড়বার ক্ষমতা নেই, তোরা আবার ইংরেজদের criticize (দোষগুণ-বিচার) করতে যাস— আহম্মক! ওদের পায়ে ধরে জীবন-
সংগ্রামোপযোগী বিদ্যা, শিল্পবিজ্ঞান, কর্মতৎপরতা শিখগে। যখন উপযুক্ত হবি, তখন তোদের আবার আদর হবে। ওরাও তখন তোদের কথা রাখবে। কোথাও কিছুই নেই, কেবল Congress (কংগ্রেস—জাতীয় মহাসমিতি) করে চেঁচামিচি করলে কি হবে?"
'স্বামীজীর স্মৃতি' গ্রন্থে বিবেকানন্দের বাল্যবন্ধু প্রিয়নাথ সিংহের বক্তব্য অনুযায়ী বিবেকানন্দ তাঁকে বলেন, "তোদের উচ্চশিক্ষিত বড় বড় লোকেরা দল বেঁধে ‘হায় ভারত গেল! হে ইংরেজ, তোমরা আমাদের লোকদের চাকরি দাও, দুর্ভিক্ষ মোচন কর’ ইত্যাদি দিনরাত কেবল ‘দাও দাও’ করে মহা হল্লা করছে। সকল কথার ধুয়ো হচ্ছে— ‘ইংরেজ, আমাদের দাও!’ বাপু, আর কত দেবে? রেল দিয়েছে, তারের খবর দিয়েছে, রাজ্যে শৃঙ্খলা দিয়েছে, ডাকাতের দল প্রায় তাড়িয়েছে, বিজ্ঞানশিক্ষা দিয়েছে। আবার কি দেবে? নিঃস্বার্থ ভাবে কে কি দেয়? বলি বাপু, ওরা তো এত দিয়েছে, তোরা কি দিয়েছিস?"
ইতিহাসের করুণ পরিহাস হল উনিশ শতকে যে রামমোহন-বিদ্যাসাগরকে লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছিল সনাতন হিন্দুসমাজের কুপ্রথাগুলির বিরোধিতা করে প্রগতিশীল চিন্তাধারা প্রসার করবার জন্য, সেই তাঁদেরই আজ দায়ী করা হয় তাঁদের তথাকথিত পরিবর্তন-পরিপন্থী ভূমিকার জন্য! এবং সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় উনিশ শতকের মুক্তচিন্তার প্রতীক হিসেবে রামমোহন, বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথের পিতৃপুরুষ উদ্ধার হলেও ধর্মীয় পুনরুত্থানবাদের প্রতীক বঙ্কিমচন্দ্র ও বিবেকানন্দকে এঁরা ক্ষমার চোখে দেখে থাকেন। এই ব্যাপারে চারু-সরোজ সহ সত্তর দশকের অগ্নিময় বিপ্লবীরা এবং আজকের তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা, উভয়ই এক গোত্রের।
তথ্যসূত্র :
বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ
স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা পঞ্চম খণ্ড, ষষ্ঠ খণ্ড, নবম খণ্ড, উদ্বোধন কার্যালয়

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন