বর্ণমালার সাতকাহন
(পর্ব ৪২)
একটা জীবন হাঁটছে সামনের দিকে। জীবন দেখেশুনেই হাঁটছে বলে ভাবছে কিন্তু আসলেই কিছু দেখতে পাচ্ছে না। সামনে বিরাট একটা গর্ত এবং সে সোজা পড়ল গর্তের ভেতর। তবে কি এভাবেই ছটফট করে মরে যাবে? আর কোনোদিনই কি বুক ভরে বাতাস নেয়া যাবে না??
কিন্তু না আরো কিছু অন্ধ জীবন তারই মতো আশপাশ দিয়ে যায়। টেনে তোলে তাকে দুজনে হাত ধরে চলে। তবু মানুষ মাত্রেই গর্তে পড়বে আজ না হোক কাল। কাল না হোক পরশু। জীবন একটা যান্ত্রিক গতি। কিন্তু তবু তাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উৎসব। এই উৎসবে নারী আর পুরুষ দুটি সম্প্রদায়। মেয়ে আর ছেলে তবু তফাত অনেক। তাদের বিষাদের ধারা ভিন্ন।
জৈবিক তফাত ছাড়াও সমাজ তফাত গড়ে দেয়। একটা ফরম্যাট মেয়ে হলে কেমন হবে। ছেলে হলে কেমন। এই ফরম্যাটের বাইরে পা বাড়ানো জগতের কোনো দেশেই সে যত সভ্য ও ঐতিহ্যবাহী বলে আস্ফালন করুক যেতে পারেনি। এসব নিয়ে লেখালিখি অনেক হয় আবাল্য পড়ে এসেছি শুনে এসেছি তবু মোটের ওপর চিত্রটা পাল্টায়নি। গার্লফ্রেন্ড যা খুশি পরতে পারে বউ নয়, ছেলেরা প্রেম করে ছেড়ে ফের করে তারপর মায়ের দেখে দেয়া এরেঞ্জ ম্যারেজ, কিন্তু মেয়ে যদি প্রেম করে অথবা ইনফ্যাচুয়েশন কিনা সেটা দেখে নেবার সময় সেটা দেয়া হয় না, সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে করতে হবে তাকেই। এখনও স্বামী বিচ্ছিন্না বিধবা মানেই তার জীবন সন্তান মানুষ করা। ঠাকুর পুজো করে মলিন মুখে কাটবে না হলেই কুলটা। সে চাকরি করুক আর যাই করুক একবার মা হয়ে গেলে নারী যেন মরে গেছে শরীরে এমনটাই ধরে নেয়া সমাজের পক্ষে নিরাপদ। আমি দেখেছি, অধিকাংশ মানুষ বলে আমরা ওরম নয় কিন্তু তারাও ওরমই দেখেছি। পাল্টেছে সামান্যই পৃথিবীটা। যতটা আমরা আধুনিক ততটাই প্রাগৈতিহাসিকে আটকে। হ্যারিকেনের আলো থেকে ফাইভ জি। বাইরেটা অনেকটাই পাল্টেছে পৃথিবীর। পুরনো বাড়িতে পড়েছে রঙের প্রলেপ।
"Religious prayer is at the same time an experience of the real suffering.Relgion is the sign of the oppressed creature,the sentiment of the heartless world,and the soul of the soulless condition."(Karl Marx)
তবুও পাল্টায় জীবনের জলছবি। অনেকটা জীবন হেঁটে এসে হোঁচট খেয়ে গর্তে পড়ে আবার উঠে রক্ত পাত হয়ে এবং আবার সেরে উঠে অসুখ থেকে আমি বুঝেছি সময় একটা বড় বিষয়।
এই যে পাড়ার পথে আমি হেঁটে যাচ্ছি এই পাড়া একদিন জেগেছিল নকশাল আন্দোলনে মেনিফেস্টো পড়ত লোকে চারু .মজুমদারের ঘরের ভেতর এখানে ইনকিলাব জিন্দাবাদের কিস্তি হাতুরি আঁকা থাকত দেওয়ালে। ভেসে আসত গন সঙ্গীত হেমন্ত বিশ্বাসের গলা। সময়ের ম্যাজিক ।আজ সেই খানেই বাজছে অন্য রাজ্যের ভাষার কুৎসিত যৌন অশালীন চটুল গান। ধর্ম আমাদের পুঁজি কুসংস্কার আমাদের ভিত্তি।
ধর্মের স্লোগান ধর্মকেই মূলধন করে ব্যবসা করা সবই সময়ের ব্যাপার। তখনও মনসা পুজো শ্রাবণ মাসের শনি পুজো,তখনও চরকের মেলা পীর বাবার মেলা চৈত্র সংক্রান্তীর মেলা রান্না পুজো বিশ্বকর্মার পুজো হতো। কোনও জেহাদি বাম কমরেড এসে কোনোদিন হামলা করেনি মার্কসের তত্ত্ব নিয়ে। নিজ ধর্মকে কোনও নয়ানজুলির জলে ফেলতে দেখিনি সেদিন। ধর্ম আমাদের সমাজে কোনও টপিক ছিলো না কখনও। আমাদের উৎসব ছিল পুজো ঘিরে। সময় স্থির নয় এইকথা ভুলে ভুলে যাই। অনেক যুগ হয়ে গেলো দুটি শ্রেণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। থিংকার্স আর স্টেট্সম্যান এখন যা কিছুই জনপ্রিয় তাই আমাদের ব্যবসার মূলধন। তাই নিয়ে ব্যবসা শরীর ভাঙিয়ে বেশ্যাবৃত্তির মতো ঠাকুর দেবতা পথে নেমেছে আদর্শ টাদর্শ কাশীবাসে। ইতিহাস পাল্টে যাবে ভূগোল বিপন্ন। we see but we don't observe...একটা জীবন অনেক জীবন। যে কোনও বাড়িতে টাঙানো থাকত বড় বড় ছবি। একটা শব্দ ছিল ,প্রাতঃস্মরণীয়। সকালে চোখ খুলে সারাদিন যেতে আসতে চোখে পড়া মুখ যাতে পথ ভ্রষ্ট হতে না দেয়। আমাদের রামমোহন আমাদের বিদ্যাসাগর আমাদের রবীন্দ্রনাথ আমাদের নেতাজি। গৃহস্থের ঘরের থেকে সেসব ছবি উধাও। মহানতা নিয়েই এমনকি প্রশ্ন উঠে গেছেন। আদর্শ নিয়ে! প্রাতঃস্মরণীয় বলে শিশুরা আর কিছু দেখে বড়ো হয় না।তারা জানে ভোগই জীবন জানে না ভোগেই মরণ।
"Virtue how frail it is
Friendship how rare
Love how it sells poor bliss
For proud despair." (P.B.Shelly)
যাইহোক, জীবনে ফিরে দেখি ঝুলিতে জমা আছে কত অনুতাপ কত ভুল কত বোকামি। শোচনা নাস্তি। অনুতাপ কোনও ভাল কথা নয় তবু মানুষ মাত্রেই অনুতাপে দগ্ধ হয়। আমরা চলতে চলতে চলাটাই আসল ভেবে ফেলি দুপাশে তাকাতে ভুলে যাই। ভুল করি ভুলের মাশুল দিই আবার ভুল করি এভাবে সূর্য তার কক্ষপথে ঘোরে। জীবন আমার কাছেও একটা এক্সপেরিমেন্ট সব থিয়োরি আর ফরম্যাটের বাইরে। সব মাটি চাপা দিলেও একটা ঘটনা বুকের ভেতর বিঁধে আছে যার কোনও নিরাময় নেই।
একদিনের কথা সেটা। প্রেমিকের সঙ্গে এতোই মগ্ন বাবা এসে বাইরে থেকে ডাকছে দরজা খুলছি না পেছনের দ্বিতীয় দরজা দিয়ে এসে মায়ের পাঠানো তরকারি রেখে গেলো। মনটা দোটানায় রইল ভাবলাম বাবা তো পাড়াতেই থাকে যখনই চাইব দেখা সামনেই তো আছে কিন্তু প্রেমিকের সঙ্গ পাওয়াটা যে দুর্লভ! এই ভেবে খচখচ ভুললাম।
সেদিন ঈশ্বর হয়ত মাফ করেনি অথবা ডেস্টিনি, নিয়তি অলক্ষ্যে হাসিলেন। বাবা এসেছে মন্থর বৃদ্ধ আমার বাবা আরও দু একবার। দেখা। কথা। তার কিছু মাসের মধ্যেই এলো কোভিডের মরক মায়ের বাড়িতে মা আর ভাই ছাড়া সকলেই আক্রান্ত হলো। আমার যাওয়া নিষেধ হলো ঘরে একাকী শিশুদের নিয়ে থাকি তাই। বাবা ভর্তি হলো নার্সিংহোমে। বেড থেকে আইসিসিউ_বাইপ্যাপ আইসি সি ইউ_ভেন্টিলেশন ...শেষ। দেখা হয়নি তার আগে পনের দিন। সামনেই তো থাকে পাড়াতেই। যখন খুশি।বাবা তো আছেই!! হায় জীবন। নার্সিং হোমে অনুমতি নেই দেখার কোভিড পেশেন্ট। কোভিড! কে জানে! বুড়ো হয়েছিল বাপ তাই তার মৃত্যু দণ্ড হলো! ঘরেই রাখলে ওই জল্লাদদের যাদের মাথা আর হৃদয় ওষুধ প্রস্তুতকারক এম এন সি রা কিনে রেখেছে, নার্সিংহোম মালিক কিনে রেখেছে তাদের ষরযন্ত্র থেকে কি বাঁচানো যেত আর কটা বছর। যা ভেবে মন কালো হয় তা ভাবতে মা নিষেধ করেছেন। কিন্তু যে বিশেষ সময় বিশ্ব বাজারে ব্যাপক মন্দা চলছিল অধিকাংশ ব্যবসা লোকসানে কিম্বা বন্ধের মুখে সেখানে একমাত্র ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো ফুলে ফেঁপে উঠলো। ভুলি না।
যাইহোক সেসব আমরা আদার ব্যাপারী। তারপর সেই বৃষ্টির ভোরে দুই ভাই বোন দিনভর বসে নার্সিং হোমের রিসেপশনের সামনে। বাবা তখন বডি। যখন দিল তখনও দেখি প্লাস্টিকের ভেতর মোড়া,জীবনের শাস্তি বড়ো ভয়ানক। প্লাস্টিকের ভেতর বাবা। ছোঁয়া যায়নি শেষবারেও। চলে গেলো শববাহী স্পেশাল গাড়ি আমরা দূরে দাঁড়িয়ে রইলুম ভাই বোন। বাবা একাই চলে গেল আমাদের ছেড়ে। সেসময় লকডাউন। ঝিপঝিপ বৃষ্টি শুনশান রাতের শূন্য দীর্ঘ রাস্তা। অনেক কিছু হয়েছিল সেই কোভিড মহাকালে। কিন্তু আমার মনের অন্ধকোণ মুখ ভেঙচে উঠল বিদ্যুৎ।অনুশোচনার তীর বিদ্ধ করে আমাকে।
জীবন ক্ষমা করেনি। করে না কাউকেই। তবু ভুল হয়ে যায়। মা বললেন ওসব ভাবনা বাদ দিয়ে কাজ করো। প্রেম আবার পায়ের কাছে এসে বসল।ঋতু বদল হলো। পৃথিবী সাময়িক শান্ত হলো। একটা কন্যা বুকের ভেতর তবু বেদনা চাপে। আমার বাবাটাকে একবার এনে দাও। সে এলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
(চলবে)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন