চাকা
হাজোল পুরীতে থাকাকালীন ফাইলেরিয়া নিয়ে পুরীতেই থাকত। একটি লেখায় সে যা যা লিখেছিল সেগুলো খুঁজে পাওয়া গেছে। জগন্নাথ ও ভক্তিভাব ভারতীয় ভক্তিধারার একটি অনন্য বিষয়। জগন্নাথের উপাসনার মূল ভিত্তি আচার বা পাণ্ডিত্য নয়, বরং সরল, সর্বজনীন ও প্রেমময় ভক্তি। জগতের নাথ - এর মধ্যেই নিহিত সর্বজনীনতার ধারণা। জাতি, বর্ণ, ভাষা বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে তিনি সকলের আশ্রয়। এই কারণেই জগন্নাথদেবকে ‘পতিতপাবন’ বলা হয় অনেক সময়। যিনি সকলকেই গ্রহণ করেন। এই দেবতার বড় বড় গোলাকার চোখ ভক্তদের কাছে এক গভীর বার্তা বহন করে- ১) সকলের দিকে সমদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ২) তাঁর দৃষ্টি করুণা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক ৩) তিনি কখনও ভক্তকে অবহেলা করেন না। সহজ অর্থে, ভক্তরা প্রার্থনা করে বলেন, "হে প্রভু জগন্নাথ, আপনি সর্বদা আমার দৃষ্টির পথে বিরাজ করুন"। আসলে এটি একটি বিখ্যাত সংস্কৃত স্তোত্রের পঙক্তির বাংলায় আক্ষরিক অর্থ।
"জগন্নাথঃ স্বামী নয়ন - পথগামী ভবতু মে" শঙ্করাচার্য রচিত জগন্নাথ অষ্টকমের শেষ চরণ। ইষ্টদেবতা জগন্নাথের প্রতি প্রার্থনা করে ভক্ত বলতে চান, হে জগন্নাথ, আপনি আমার দৃষ্টি ,চেতনা এবং স্মৃতিতে সর্বদা উপস্থিত থাকুন"। এবার যদি এর তাত্বিক ব্যাখ্যার দিকে তাকাই, তাহলে অনুভব করব যে,"নয়ন" শুধু শারীরিক চোখ নয়, এটি জ্ঞান, চেতনা ও অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক। আসলে তত্ত্বকথা বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে উঠে আসে না। সেখানে থাকে অন্তর্নিহিত গূঢ়বোধ থেকে উৎসারিত উপলব্ধির কথা।
জগন্নাথ: "জগতের নাথ" যিনি বৃহত্তর অর্থে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর। জগতের চালিকাশক্তি। কোন নির্দিষ্ট
মন্দিরের দেবতা নন। সর্বজনের সর্ব জ্ঞানের অধীশ্বর। রথের দিন দেবতা মন্দির থেকে বেরিয়ে মানবের মাঝে মিশে গিয়ে জনসাধারণের হয়ে যান। অন্তঃপুরে সীমাবদ্ধ না থেকে সকল জীবের হয়ে যান। তখন তিনি আর ব্যক্তি না থেকে সমষ্টির আধার হয়ে ওঠেন। রথযাত্রা উৎসব মনে হয় এই কারণে আরও বেশি তাৎপর্য বহন করে। ভক্তিভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বাস্তব জীবনভাব রথযাত্রাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। অলৌকিক ও লৌকিক সেখানে মিলে মিশে একাকার।
স্বামী: আশ্রয়দাতা অর্থে স্বামী ব্যবহৃত। যিনি নিয়ন্ত্রক, যাকে আমরা ভাগ্যনিয়ন্তা বলে মানি। কর্মযজ্ঞে থাকবার পাশাপাশি আমরা অন্তরের শক্তিরও প্রয়োজন অনুভব করি। যা আসে আস্থা থেকে, বিশ্বাস থেকে। সেই শক্তিই অন্তরের অধিপতি।
নয়ন - পথ্যগামী: যিনি আমার পথের সামনে বিরাজ করবেন। যাকে সর্বক্ষণ অনুভবে স্পর্শ করা যায়, হ্যাঁ, যিনি আমার দৃষ্টিপথ খুলে রাখবেন। সত্য মিথ্যা নির্দেশ দিয়ে আমার ভেতরের দেখাকে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে আরও বড় করে দেখবার জন্য তৈরি করবেন।
ভবতু মে: হোক, আমার জন্য এইরকমই হোক। অন্তর থেকে কেবল এইটুকুই প্রার্থনা! সকাতর এই প্রার্থনা।
আসলে চেতনায় যদি ঈশ্বরভাব লেগে থাকে, তাহলে বাস্তবের মাটিতে পা রেখেও বিষয়ের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি জন্মায় না। দেখাকে তাই যদি সাধারণ চোখে দেখা থেকে বিরত থেকে যদি চেতনায় ধারণ করে সেটি দিয়ে দেখবার কথা ধরি তাহলে দেখা যাবে এখানে ভারতীয় দর্শনের বীজ ভাব রয়েছে। ভক্তরা অনেকে মনে করেন জগন্নাথদেবের দর্শনই চূড়ান্ত। এই শ্লোকে বাহ্যদর্শন অন্তরের দর্শনে স্থায়ী হয়। যেন ঈশ্বর কণাই হৃদয়ে ছেয়ে থাকে। রথের রশি টানা কেবল আচার নয়, এটি নিজের মন, অহংকার, আসক্তিকে ঈশ্বরের দিকে নিবদ্ধ করবার প্রতীক। অদ্বৈত মতে, পরম সত্য সর্বত্র বিরাজমান। ভক্তিভাবের মধ্য দিয়ে ঈশ্বর অনুভূত হয়। জগতের চালিকাশক্তি নাথ ব্যক্তিগত প্রিয় হয়ে ছুঁয়ে থাকেন। উপাসনার ক্ষেত্রে এই চরমভাব উপলব্ধিতে এসে গেলে স্মরণ করা যায় নিবিড়ভাবে। তখন জগতে সর্বব্যাপী ঈশ্বরের প্রকাশ, এমন দৃষ্টি অর্জন করে ফেলা যায়। অহং, ঈর্ষা, লোভ ও বিভেদের পরিবর্তে করুণা, সমতা ও প্রেম বিকশিত হয়।
স্কন্দপুরাণ-এর এই যে গল্পটি রয়েছে, সেটি আমরা কম বেশি সকলেই জানি। পুরীর রাজা ইন্দ্রদুমনো কাঠের একটি মূর্তি পেয়েছিলেন। বিশ্বকর্মা সেই কাঠ থেকে বলরাম, জগন্নাথ এবং সুভদ্রার মূর্তি তৈরি করেন। কথা ছিল দরোজা বন্ধ রেখে কাজ হবে। কিন্তু রাজা কৌতূহলবশত দরোজা খুলে ফেললে অর্ধসমাপ্ত অবস্থাতেই দেবতারা মূর্তিরূপ ধারণ করেন। সেই মূর্তিই ভক্ত দ্বারা পূজিত হন। মানুষকে প্রেমভাব বিলিয়ে ভক্তদের অর্থাৎ মানুষকে দিশা দেখান। রথে চেপে এই তিন দেবতা মাসীর বাড়ি এক সপ্তাহের জন্য বেড়াতে যান। গুন্ডিচার বাড়ি বিশ্রামে থাকেন। আবার সাতদিন বাদে নিজেদের বাড়ি ফেরত আসেন। কথিত আছে কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরা চলে যান, তখন রাধা ও গোপিনীদের বিচ্ছেদ ঘটে। এই রথযাত্রা হল রাধা কৃষ্ণের মিলনের প্রতীক। রথের দর্শন ও আধ্যাত্মিক অর্থ হল, রথ হল দেহ। কঠোপনিষদে এটি পাওয়া যায়। রথে বসা আত্মা হল রথী। আমাদের বুদ্ধি হল সারথী বা চালক। রথে ঘোড়ার লাগাম হল মন। বুদ্ধি যত সুস্থির, মন যত সঠিক। ততই সঠিকভাবে জীবন চলমান। আর রথের চাকা হল সেই চলমানতার প্রতীক।"
পুরী থেকে আনন্দপুরে চলে এসেছে সে বছর দশেক আগে। একটি খড়ের ঘর করেছে হাজোল। একটু এগোলেই জঙ্গল। হাজোল চাকা বানায়। মাটি দিয়ে, পাতা দিয়ে, গাছের ছাল দিয়ে। ওর বাড়ির চারপাশ ভরে গেছে চাকায়। যেন গোটা জগৎ ওর গতির দিকে তাকিয়ে থাকে... কে ঘুরছে হাজোল, নাকি পৃথিবী!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন