এক রাজকুমারী ও তার বারো জোড়া সোনার জুতো
লেখিকাঃ ড.মারী লুই ফন ফ্রানৎস মূলগ্রন্থঃ Archetypal Patterns in Fairy Tales (রূপকথায় পুরাবিন্যাসের ধাঁচেরা)
কিন্তু কীকরে এই ভুল থেকে রক্ষা পাওয়া যায়? ধরা যাক আমি যদি বলতাম, “পুরাবিন্যাসের প্রতিমা ‘ক’ পুরাবিন্যাসের প্রতিমা ‘খ’কে তার খাবার দিল”। এরকম করে ভাবতে শুরু করলে উন্মাদ হয়ে যেতে হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে এইজন্যই আমি বলেছিলাম যে গল্পের নায়কের সঙ্গে একাত্মতা কিছুটা মন্দের ভালো কারণ প্রাথমিক এই সংযুক্তি ছাড়া কাহিনির অভ্যন্তরে প্রবেশই করতে পারা যাবে না।
এভাবে ভুল বুঝতে পারার পর নিজেদের ঠিক করে নিয়ে আমাদের বলা উচিত যে, যৌথ অবচেতনে একটি পুরাবিন্যাসের ঘাতশক্তি উৎপন্ন হল, উচ্চতর চেতনের দিকে একটি অত্যাবশ্যকীয় প্রণোদনা প্রেরিত হল। কিন্তু তাতে অন্তর্দৃষ্টি ও প্রাজ্ঞতা সংযুক্ত ছিল না। অবচেতনের মধ্যেই তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সে অন্তর্দৃষ্টি ও প্রাজ্ঞতা প্রাপ্ত হল।
ভাগ করে নেওয়ার প্রকৃত অর্থ হল এটাই। এবং এরকম সবসময় অবচেতনে চলতে থাকেঃ কিছু জিনিষ অন্য কিছু জিনিষের সঙ্গে আকর্ষিত বা বিকর্ষিত হতে থাকে। যৌথ অবচেতন বা মানুষের সমগ্র অন্তর-সত্তা যাই বলা হোক না কেন, অবচেতন একটা পরমাণুদের শক্তিক্ষেত্রের মতো যেখানে কিছু কণারা পরস্পরকে আকর্ষণ করে আর কিছু কণারা বিকর্ষণ করে। তারা একসঙ্গে সংযুক্ত হয়ে জৈব-রাসয়নিকের ন্যায় গঠন তৈরি করে আর তারপর আবার বিচ্যুত হয়ে যায়। এই খেলা আজন্মকাল থেকে চলে আসছে, এর মধ্যেই তাদের ক্ষতিপূরণ বা চেতনের সম্পূর্ণতার দিকে অভিমুখ থাকে।
`ঠিক এরকমই আমাদের কাহিনিতে হয়েছে। সেই বুড়ো নায়ককে ছড়ি আর বল দিয়েছে, আর সেই বল যুবকটিকে সেই রাজ্যে নিয়ে গেছে যেখানে সবকিছু উলটোপালটা হয়ে আছে, তার কাজের জন্য অপেক্ষা করে আছে। সুতরাং বৃদ্ধটি ছড়ি আর বলের মাধ্যমে যুবকটিকে একটি অভিমুখ দিচ্ছেন। সেই জায়গায় তিনি তাকে পাঠাচ্ছেন যেখানকার সমস্যাগুলি মেটাতে হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, যৌথ অবচেতনে শুরুতে ছিল নতুন কিছুর জন্য একটি প্রণোদনা, কিন্তু নিজে থেকে তার কোনও লক্ষ্য ছিল না। তারপর সে অবচেতনের উচ্চতর প্রজ্ঞার সঙ্গে সংযুক্ত হল। প্রজ্ঞাময় বৃদ্ধটির এখানে বেশি শক্তি ছিল, অন্তত যুবকটির থেকে বেশি। জ্ঞানী বৃদ্ধটি ছিল অবচেতনের প্রজ্ঞা, আত্ম-শক্তির পুরাবিন্যাস, যে নায়কের সেই লক্ষ্যহীন প্রণোদনাকে দিল অবচেতনের জীবনীশক্তির ঠেলা, যা সঠিক পথে সেই শক্তিকে পরিচালনা করল যাতে যৌথ অবচেতনে যা যা সমস্যা তার নিরাময় হতে পারে। অবচেতনের প্রজ্ঞা সেই যুবককে সাহায্য করল কারণ সে ইচ্ছুক ছিল, তার উদ্দীপনা দিয়ে সে খাবার ভাগ করে নিল, সেই বৃদ্ধ চরিত্রটিকে কিছু জীবনীশক্তির ভাগ দিল।
এইধরনের পুরাবিন্যাসের মূর্তিগুলির সঙ্গে সংযুক্তি ভারি অদ্ভুত। যেমন আমি মনে করতে পারি একটি রুশদেশের রূপকথা যেখানে নায়ককে শয়তানি এক ড্রাগনের হাত থেকে রাজকন্যেকে উদ্ধার করতে হত। একইরকম মনে হলেও এই কাহিনিতে সেই ড্রাগনের সঙ্গে রাজার বৈরিতা থাকায় সে রাজকন্যাকে অভিশপ্ত করেছিল। সেই গল্পে শত্রুতা ছিল জার ও ড্রাগনের মধ্যে। নায়কের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল সাদামাঠাভাবে রাজ আদেশ পালন করে ড্রাগনকে মারা। ঘটনাগুলো এরকমই ঘটে কিন্তু সামান্য কিছু বিচ্যুতির সঙ্গে, যেমন ড্রাগন সোজাসুজি রাজার উপর প্রতিশোধ না নিয়ে তার কন্যার উপর নিয়েছিল। নায়ক তার প্রেমে পড়ে গেল আর সরাসরি শত্রুতা না থাকলেও ড্রাগনকে মারতে বাধ্য হল।
সুতরাং অবচেতনের উপাদানগুলির মধ্যে একরকম মজার খেলা চলে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরোগ্য সরাসরি হয় না, ঘুরিয়ে হয়। কখনও কখনও মানসের এক জায়গার সমস্যা আর এক জায়গাকে সমস্যান্বিত করে তোলে। সেরকম আরোগ্যকারী প্রক্রিয়াও ঘুরপথে শুরু হয়, হয়ত মানসের দূরতম কোনো প্রান্তে, তারপর ধীরে ধীরে সমস্যার কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে চলে। যেভাবে ইউক্লিডের জ্যামিতির সোজা রেখার ন্যূনতম দূরত্বের বদলে আলো ঘোরালো হলেও সবথেকে কম রোধযুক্ত পথই বেছে নেয়।
আরোগ্যকারী প্রক্রিয়াও মানসে সবসময় সবথেকে সোজা সম্ভাব্য পথই বেছে নেয়, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে তা বিচ্যুতির সঙ্গে করে। এবং এই বিচ্যুতি প্রয়োজনীয় হয়ে পরে কারণ সোজাপথে হয়ত কোন মানসিক বাধা থাকে যাকে সেই শক্তি অতিক্রম করতে পারে না।
এক সমীক্ষণে আসা ব্যক্তি হয়ত তার বিবাহ নিয়ে চেতনের সমস্যার কথা ঘন্টা ঘণ্টা ধরে বলে যাবেন। মনে হবে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তই বোধহয় সঠিক। কিন্তু তার স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে দেখা যাবে তার হয়ত সৃজনশীল কিছু কাজ শুরু করা দরকার। তাকে ঝুঁকি নিতে হবে আর এভাবে নতুন ওষুধ নতুন সম্ভাবনা খুলে দিয়ে সৃজনশীলতার তথা আরোগ্যকারী প্রক্রিয়া শুরু করে দেবে।
পরে যখন অবস্থা উন্নতির দিকে যায় বোঝা যায় সেই ছিল একমাত্র সূত্র যার মাধ্যমে অবচেতন অহং-এর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে পারত। এবং সেই বিন্দু থেকে গোটা সমস্যার সব অংশগুলি নিজে থেকেই সমাধান হয়ে যেতে থাকে। সেই বিষয়গুলিতে দেখা যায় সমাধান শুরু হয়েছে একটি দূরবর্তী অংশে যেখানে সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকবে তা আশাই করা যায়নি। তাই সবাই জিজ্ঞেস করে, কেন যে স্বপ্ন চেতনের সমস্যাগুলো নিয়ে কিছু সরাসরি বলে না? আসলে বাস্তবে যেভাবে কার্যপরম্পরায় ঘটনা ঘটে তার সঙ্গে আমরা এতই অভ্যস্ত যে আমরা ভুলে যাই যে কখনো কখনো আমাদের অভিযান করার মতো মনোভাব নিয়ে সামনের দিকে তাকানো উচিত।
আবার আমাদের গল্পে ফিরে আসিঃ সেই জ্ঞানী বৃদ্ধ যুবকটিকে বলেনি যে তুমি অমুক দেশে যাও আর দৈত্য মেরে রাজকন্যাকে উদ্ধার কর। সে শুধু তাকে একটি ছড়ি দিয়েছিল যা তুললে সে অদৃশ্য হয়ে যাবে আর দিয়েছিল একটি বল যাকে ছড়ি দিয়ে আঘাত করলে সে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। তাই এবার আমরা ওই ছড়ি আর বলের দিকে নজর দেব।
ছড়ি বা লাঠি হল মানুষের ব্যবহৃত আদিমতম যন্ত্র। এগুলি শিম্পাঞ্জীরাও ব্যবহার করে, এ হল পশু-সভ্যতারও আবিষ্কৃত আদিমতম যন্ত্র। কঙ্গোতে একধরনের বনমানুষরা থাকে যারা ডাল দিয়ে দূর থেকে বিষাক্ত পিঁপড়েদের বাসা থেকে টেনে তুলে চেটে খায় যাতে তাদের বিষ কামড় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ব্যবহারবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি যন্ত্র ব্যবহারের একটি মোক্ষম উদাহরণ। সুতরাং মানুষ যে পশু সত্তা থেকে বিরাট একটি উচ্চাবস্থা প্রাপ্ত হয়েছে এমন ভাবারও কোন কারণ নেই। এমনকি পাখিরাও যন্ত্র হিসাবে ডাল ব্যবহার করে। ছড়ি তাহলে অবশ্যভাবেই সহজতম একটি যন্ত্র এবং আদিমতমও বটে। এটা যেন হাতেরই বর্ধিত এক অংশ, এবং যেন ইচ্ছাশক্তিরই এক বর্ধিত রূপ বা বা দেহকে অতিক্রম করে কোনো উদ্দেশ্যসিদ্ধির একটি বিরাট আবিষ্কার।
প্রাচীন সভ্যতাগুলিতে গোচারণের জন্যই লাঠি বেশি ব্যবহৃত হত। তার থেকেই বিবর্তিত হয়ে লাঠি এখন রাজদণ্ডরূপে শোভা পায়ঃ রাজা তার প্রজার উত্তম চারণকারী। তাই একজন রাখালের মতোই তার রয়েছে রাজলাঠি যার মাধ্যমে সে শাসন করে। রাজদণ্ড শাসনযন্ত্রের প্রতীক হয়ে যায়। রাখালের লাঠিই উন্নততর এক রূপ পায়।
আরো উদাহরণ দিলে বলা যায়, ক্যাথলিক গীর্জার খ্রিস্টীয় ধর্মাধ্যক্ষদেরও লাঠি থাকে। মধ্যযুগে এই ধর্মাধ্যক্ষদের লাঠিকে ক্যাথলিক গীর্জার ক্ষমতার প্রতিভুরূপে দেখা হত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে ধর্মাধ্যক্ষরাও আধ্যাত্মিক রাখাল, খ্রিস্টীয় মতবাদের প্রভু যারা সাধারণ মানুষদের ভুল পথে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে একটি আধ্যাত্মিক দিশা দেখান।
জার্মানদের মধ্যে স্থানীয় সালিশি সভায় হত্যা বা বড়রকমের চুরির বিচার হত। রাজা বা শাসনকর্তার বদলে গোষ্ঠীর কিছু মান্যগণ্য ব্যক্তিরাই এটা করতেন। বিচার শুরু করবার আগে কোন এক ব্যক্তি ছোলানো ডাল বিচারকদের হাতে তুলে দিত। তারা সেই ডাল তুলে ধরে প্রতিজ্ঞা নিত যে তারা ব্যক্তিগত ভালো লাগা বা খারাপ লাগা দিয়ে আসামির বিচার করবে না বরং নিরপেক্ষ ও নিয়মনিষ্ঠভাবেই বিচার করবে।
এই ছড়ি বিচারকের মধ্যে এক কর্তৃত্বের অনুভূতি জাগায় যা তার ব্যক্তিগত অহং থেকে অনেক বড়, যা তার খামখেয়ালি মন আর ভালোমন্দ লাগার থেকেও অনেক ব্যাপক, এতই ব্যাপক যেন তা খ্রিষ্টীয় ধর্মাধ্যক্ষদের হাতে থাকা দণ্ডের মতো যেখানে বাস্তব সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয় ব্যক্তিগত মতামতের উর্দ্ধে গিয়ে, আর রাজার হাতে ধরা রাজদণ্ডের মতো যার কাছে সবাই নতজানু হয়। সুতরাং ছড়ি হল এক নৈর্ব্যক্তিক ধারণা, যার এক বাস্তব অভিমুখ আছে। এইভাবে ছড়ি ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তি ও জীবনের লক্ষ্যকে আরো উন্নততর ও বাস্তবসম্মত করে তুলে তাকে শুধুমাত্র মুহুর্তের উত্তেজনার থেকে অনেক উচ্চস্তরে নিয়ে যায়।
ছড়ির মাধ্যমে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া একটু কম প্রচলিত, সাধারণত তা টুপি বা পোশাকের মাধ্যমেই করা হয়। তাই অদৃশ্য হওয়া আর বাস্তবিক অভিমুখ পাওয়ার ক্রিয়া দুটিকে একটু আলাদা করে দেখা উচিত। অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার সঙ্গে ব্যক্তি অহংকে বা ব্যক্তিগত ভালোমন্দ গুণাবলীকে পুরোপুরি বর্জন করা বা পুরোপুরি পশ্চাৎপটে চলে গিয়ে কোনো বড় কাজ করার সম্পর্ক রয়েছে। ফরাসি ভাষায় কেউ যদি খুব ভালো কর্মী হয়েও খুবই বিনয়ী হয় বা কাজকেই নিজের অহং-এর থেকে বেশি গুরুত্ব দেয় তাহলে তারা বলে “ সে নিজের মুখ লুকিয়ে ফেলেছে”। সে বলতে গেলে অজ্ঞাত পরিচয় হয়ে যায়, রূপকার্থেই সে অদৃশ্য হয়ে যায়।
আমি আমার এক বন্ধু চিত্রশিল্পীকে চিনি যে নিজেকে চিত্রতেই সম্পূর্ণ নিয়োজিত করেছিল। সে নিজে ছিল শুধুমাত্র যেন এক যন্ত্র। যতক্ষণ না চিত্রটি পূর্ণাঙ্গতা পাচ্ছে সে যেন কোথাও নেই। সে সবসময় নিজের স্ত্রীকে বলত ‘ সবার আগে শিল্প, তারপর মহিলারা’। তার কাছে নিজের সৃজনশীলতার সামনে নিজস্ব যাবতীয় ঐহিক চাহিদা ও বাস্তবতার কোনো মূল্য নেই।
এই জাতীয় মনোভাব খ্রিষ্টীয় ধর্মে এতই ব্যাপক ছিল যে এখন একে খুব খারাপ গুণ হিসাবেই দেখা হয়। ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মনসমীক্ষককে তার রোগীকে শেখাতে হয় যে সে কিভাবে আবার অস্তিত্ববান হয়ে উঠবে, সে যেমন তেমনই হয়ে উঠবে, কিকরে আবার তার উপস্থিতিকে পুনরায় প্রকাশ করবে। তবুও যদি কারো কোনো বৃহৎ কর্ম করার থাকে বা সৃজনশীলতার ডাকে পরিপূর্ণভাবে সাড়া দেওয়ার থাকে তবে তাদের কাছে এরূপ মানসিকতা এখনও অর্থপূর্ণঃ কখনও কখনও নিজের ক্ষণিকের সুখদানকারী ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাগুলোকে ত্যাগ করতে হয়। কোনো শিল্পী বা বিজ্ঞানী বা কবি- সৃজনশীল মানুষরা এর সাক্ষ্যবহন করে চলে; নিজেকে তারা প্রথমেই নিজের থেকে সরিয়ে রাখে।
এমনকি শিকারের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে যখন পশুটি এগিয়ে আসছে, তখন হাঁচি পেলেও তা চেপে রাখতে হয়। নিজের অহং আর শারীরিক প্রয়োজনগুলো ভুলে যেতে হয়। নাহলে বৃহত্তর প্রয়োজন, শিকারটি সম্পন্ন হয় না। সুতরাং এমন অনেক জায়গাই আছে যেখানে অহং বা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াকে দমিয়ে রাখতে হয়, আরো বড় কোন স্বার্থে। সেইসব সময়ে এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা যথার্থতা পায়।
সুতরাং আমরা দেখছি যে ছড়ির কার্যকারিতার একটি হল এমন এক মনোভাব যা ব্যক্তি অহংকে সরিয়ে রাখে। আবার আমরা দেখেছি যে ছড়ি একটি লক্ষ্য খুঁজতেও সাহায্য করে। ছড়িকে হাত দিয়ে কোনোদিকে তুলে ধরার অর্থ হল সেই দিশাটিকে আধ্যাত্মিকতাময় করে তোলা, নিজের ব্যক্তিগত লোভ-লালসাকে ত্যাগ করা।
অন্যভাবে বললে, সেই জ্ঞানী বৃদ্ধটির হস্তক্ষেপে, জীবনীশক্তি যৌথ অবচেতনকে ভেঙে বেরিয়ে এসে খুব একটা পরিষ্কার নয় এমন একটি জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পায় যার মধ্যে আধ্যাত্মিকতার পরশ রয়েছে। বৃদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাতের মুহুর্তটি যেন স্থির সিদ্ধান্তের ও সৃজনশীলতার এক চরম মুহুর্ত। এইজাতীয় সৃজনশীল শক্তি হয়ত রাজনৈতিক বিপ্লব আনে না, কারণ সেগুলি সবই ঐহিক প্রয়োজনের তাগিদে। তার বদলে এটি আনে মানস বিপ্লব, একটি পরিবর্তন যা অনেক উপরের স্তরে ক্রিয়া করে।
মানবসভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যাবে যে একমাত্র মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই বিরাট মাপের কোনো সৃজনশীল পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে। শুধুমাত্র মূর্ত বাহ্যিক পরিবর্তন যেমন রাজনৈতিক বা সামাজিকস্তরে পুনর্গঠন, সবসময় ততটাই খারাপ এনেছে যতটা ভালো; শেষপর্যন্ত সাধারণ মানুষ যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। এই বিপ্লবগুলির সঙ্গে সঙ্গে যদি মানসিক পরিবর্তন না হয় তবে শেষপর্যন্ত কোনকিছুরই বদল হয় না। আর তাই চেতনের এবং সংস্কৃতির বিরাট পরিবর্তনকারীরা সেইসব লোকেরাই হন যারা ছড়ি তুলে ধরে অদৃশ্য হয়ে যান আর সেইভাবেই মানস নামক অদৃশ্য বস্তুটির মধ্যে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের বীজ বপন করে দেন।
ছড়ির গুরুত্ব এখানেই যে সে একটি বাস্তব লক্ষ্যের দিকে দিগ্নির্দেশ করে, এক অতিক্রমণকারী উদ্দেশ্যের দিকে, একটি লক্ষ্যের দিকে স্থিরীকৃত থাকে যা শুধুমাত্র কোন ব্যক্তিমানবের সাময়িক ইচ্ছার থেকে অনেক বড়। সেইজন্যই এ রাজার রাজদণ্ডের প্রতিভূ, তার সার্বভৌমত্বের প্রতীক। রাজা তার রাজ্যের একনায়ক হ্লেও তাই তিনি তার ব্যক্তিগত লাভের জন্য সবকিছু করতে পারেন না। আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থহীন উদ্দেশ্য বা শাসনের প্রতিনিধিরূপেই তার সত্যিকারের রাজা হয়ে ওঠা।
অদৃশ্য হয়ে যাওয়াও অনেকটা এরকমই ব্যাপার। কিছু কিছু পরিস্থিতিতে ব্যক্তিকে তার যাবতীয় আত্মকেন্দ্রিকতা ত্যাগ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় আই চিং-এর(চৈনিক ধর্মগ্রন্থ) একটি বাণীর কথা যেখানে বলা হয়েছে বৃহত্তর কোন লক্ষ্যকে পূরণ করার জন্য ব্যক্তিকে বাহ্যিক বা ব্যক্তিগত আনন্দ-সন্তুষ্টি ইত্যাদি সরিয়ে রাখতে হয় এবং এর মাধ্যমে চতুর্পাশ্বস্থ থেকে সে আপনিই অদৃশ্য হয়ে যায়। কারো যদি জীবনে এরকম কোন উচ্চ ও আত্মঅতিক্রান্ত লক্ষ্য থাকে তবে সে সেই লক্ষ্যের পিছনেই অদৃশ্য হয়ে যায়। চারপাশের মানুষ তখন তাকে বুঝতেই পারে না, তার কাজকর্ম বা উদ্দেশ্য বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত থাকার ফলে তারা এমনকি তার কাজটিকেও বুঝতে পারে না। আর তার ফল এই হয় যে তার ফলে তারা ব্যক্তিটিকে বাধাও দিতে পারে না। সে অদৃশ্য হয়ে তার কাজ করে চলে।
এটি যৌথঅবচেতন ও পুরাবিন্যাসের ক্রিয়াগুলির ক্ষেত্রেও সত্য। ১১৯ খ্রিস্টাব্দে প্লিনি, যার উপর বিদ্রোহী ও সাম্রাজ্যের পক্ষে ভয়ঙ্কর বলে অভিযুক্ত হওয়া খ্রিস্টানদের নিয়ে তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছিল, তিনি রোমান সম্রাটকে হাল্কাভাবে লেখা চিঠিতে জানান যে এই ধরণের কিছু পুরুষ ও নারীকে তিনি তুলে নিয়ে এসে যথেষ্ট অত্যাচার করেছেন এবং তারপর তার মনে হয়েছে যে এরা কোনভাবেই ক্ষতিকারক নন বরং এরা অদ্ভুত সব কুসংস্কারাছন্ন মানুষ, সম্রাট যেন এদের নিয়ে ভাবিত না হন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে সেই প্রথম পর্যায়ের খ্রিস্টানরা রোমান সাম্রাজ্যের কাছে প্রায় অদৃশ্য হয়ে ছিল। কেউ তাদের খবরাখবর রাখত না যদিও তারা ছিল নতুন আলোর আর নতুন সভ্যতার বীজের বাহক। আমাদের গল্পের নায়কের মতোই তারা ছিল নতুন চৈতন্যের বাহক। কিন্তু সেইজন্যই তারা ছিল অন্যদের কাছে ধারণাতীত। তাদের আসল লক্ষ্য বা পরিচয় তাই বোঝা যায়নি, নতুবা রোমান সাম্রাজ্য তাতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠত আর তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হত। সেই আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তা অনেক পরে, যখন আর সেই বলিষ্ঠ খ্রিস্ট আন্দোলনকে দমানো সম্ভব ছিল না। কিন্তু শুরুর দিকে এই অদৃশ্য হয়ে থাকাটা তাদের অনেক লাভজনক হয়েছিল। তারা যে অদৃশ্য হয়ে থাকতে পেরেছিল তার কারণ হল “ তারা ছড়িটা তুলে ধরে রেখেছিল” ঃ তাদের ঐহিক স্বার্থের কথা ভেবে নয়, বরং ব্যক্তিঅতিক্রান্ত কোন বৃহত্তর উদ্দেশ্যে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, মাটি থেকে কিছুকে শূন্যে তুলে ধরার মাধ্যমে তাকে পার্থিব বাস্তবের থেকে মুক্ত করে ফেলা যায়। প্রারম্ভিক খ্রিস্টান আন্দোলনের একটি প্রবণতাই ছিল যে এই আদর্শকে মাটির সংস্পর্শে রেখে তাকে যথাযথভাবে লালন করা। সন্ত পলকে দাসত্ব নিয়ে তার মতামত জানতে প্রশ্ন করা হয়েছিল যাতে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য বের করা যায়। রাজনৈতিক মতামত বিষয়ক এই পার্থিব প্রশ্ন তিনি সযত্নে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। এটিই একটি উদাহরণ যে কিভাবে নিজের ছড়ি তুলে নিজেকে অদৃশ্য করে রাখতে হয়। বুদ্ধিটি হল নিজের মতামত ও উদ্দেশ্য কোনভাবেই প্রকাশিত হতে দেওয়া। কাউকে সেই সুযোগই না দেওয়া যাতে সে এইজাতীয় কর্মের পরিষ্কার ও আক্ষরিক অর্থ জানতে চাইতে পারে। কিছু কিছু পরিস্থিতিতে আর সঠিক সময় না এলে অবচেতন থেকে আসা বার্তাগুলিকে সুস্পষ্ট করে ব্যক্ত না করাই ভালো।
একেবারে আক্ষরিকভাবে চিন্তাভাবনা করা মানুষদের স্বপ্ন বিশ্লেষণ করতে গেলেও এইজাতীয় ব্যাপার ঘটে। তারা ব্যাখ্যা শুনে বলেঃ হ্যাঁ, তা তো সত্যি, কিন্তু এবার আমার করণীয় কি? নারীর অ্যানিমাস(নারীর মধ্যস্থিত পুরুষসত্তা) বারবার এই প্রশ্ন করতে ভালবাসে। তাই ইয়ুং বলেছেন যে কোনো নারী এরকম প্রশ্ন করলে বুঝতে হবে যে সে তার অ্যানিমাস দ্বারা আক্রান্ত। কিছু কিছু স্বপ্নের প্রতীকগুলি সত্যিই কী করতে হবে সে বিষয়ে কোন দিকদর্শন করে না। সেইসব স্বপ্নের বার্তাগুলিকে শুদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক বার্তা হিসাবেই মেনে নেওয়া উচিত। একে নিজের মতো চলতে দিয়ে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনের অপেক্ষা করা উচিত। আর যখন তা ঘটে তখন সেই ব্যক্তি অন্য এক সত্তা হয়ে ওঠে যে জানে যে তাকে কী করতে হবে। তোমার মনে পরিবর্তন এসেছে, এখন তোমার বাহ্যিক সমস্যাগুলোও অন্যরকম হয়ে যেতে বাধ্য। কিন্তু প্রত্যেকটি স্বপ্ন থেকে যদি তার আক্ষরিক মানে জানার চেষ্টা করা হয়, তবে তো আপনি স্বপ্নকে স্বপ্ন না ভেবে তাকে প্রত্যাদেশ ভেবে বসছেন, যা অবচেতনের প্রতি এক শিশুসুলভ ব্যবহার। তাই কোনো স্বপ্ন যদি খুব স্পষ্টভাবে কোন দিকনির্দেশ না করে তবে তার মধ্যে তাকে না খুঁজে বরং তাকে রহস্যের মধ্যেই ছেড়ে রাখা উচিত।
বেশিরভাগ সময়েই আমি যখন ইয়ুঙের সঙ্গে কিছু ঘণ্টা সময় কাটিয়েছি, বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভেবেছি এই কথাগুলি তো খুবই চিত্তাকর্ষক, মনকে খুবই নাড়া দিয়ে যাওয়ার মতো কথা, কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে তার যোগ কোথায়? জোর করে এই সংযোগ ঘটাতে আমি চাইনি। স্বপ্নটির আবেগময় বার্তাটির দিকেই মনোযোগ দিয়েছি। তারপর সাধারণত আরো এক এক করে স্বপ্ন আসতে থেকেছে, আর শেষে একদিন এমন একটি স্বপ্ন এসেছে যে বাস্তবের সঙ্গে তার সম্পর্ক বুঝিয়ে দিয়েছে। তার আগে পর্যন্ত সেই ছড়িই আমাকে চালনা করছিল ঃ সেই ব্যক্তিঅতিক্রান্ত উদ্দেশ্যের দিকে স্বপ্নগুলি আমাকে নিয়ে চলেছিল। আর সেই উদ্দেশ্য পার্থিব ছিল না; বরং তা শূন্যেই অবস্থান করছিল।
সুতরাং কোনোকিছুকে শূন্যে তুলে ধরা মানেই সেখানে কিছু আধ্যাত্মিক সংযোগ আছে। আমরা বলতে পারি যে আমাদের গল্পের যুবক ছড়িটি তুলে ধরে একটি ব্যক্তিঅতিক্রান্ত উদ্দেশ্যকে প্রতীকায়িত করেছিল, একটি পদক্ষেপ যা যৌথঅবচেতনকে পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিল। সে যেহেতু ভবিষ্যতে রাজা হতে চলেছে, তাই তার লক্ষ্যের দিকে যাত্রাটি ছিল সাধারণ মানুষের কাছে অস্পষ্টতাময়। তাই লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে সে এগিয়ে যেতে পেরেছিল, নাহলে তৎক্ষণাৎ তার উপর হিংস্র আক্রমণ নেমে আসত, ঠিক যেভাবে রোমানরা প্রারম্ভিক খ্রিস্টানদের উপর নির্মম আক্রমণ চালাত যদি তারা জানত খ্রিস্টানদের উদ্দেশ্য আর নতুন চৈতন্যের বীজগুলিকে যা তারা বহন করে নিয়ে চলেছিল তার পরিণতির কথা আগে থেকে বুঝলে রোমানরা তাদের শিকড় থেকে উপড়ে ফেলত।
এটি হয়ত একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ, কিন্তু সর্বত্রই এরকমভাবেই এগুলো ঘটে। নতুন ও সৃজনশীল কোন শক্তি যখনই সংস্কৃতিতে জন্মায়, তক্ষুণি তাকে চেনা যায় না। সাধারণ মানুষ যতরকমের যা ব্যাপার তাই নিয়ে ব্যস্ত থাকে আর ত্রাণকর্তা নিভৃত কোনো আস্তাবলে আবির্ভূত হন যখন তাকে নিয়ে ভাবার মতো সময় কারোরই থাকে না। এটাই প্রকৃতির ধ্রুব সত্য যেন, উদ্ধারকারী শক্তিরা মানসের সেই প্রান্ত থেকে আসে যেদিকে কারোরই কোন লক্ষ্য থাকে না।
এটি ব্যক্তিমানসের ক্ষেত্রেও একইরকম। মনসমীক্ষণে আসা হয়তো কোনও অতিমাত্রায় বুদ্ধিমান ব্যক্তি যার মাথাই তার অস্তিত্বকে গ্রাস করেছে। আর সবরকম আরোগ্যকারী বা উদ্ধারকারী শক্তিরা তার অনুভূতির স্থানে সঞ্চিত হয়েছে। তাকে সে বিষয়ে অবহিত করা হলে সে তৎক্ষণাৎ তার বুদ্ধি বিদ্যা যুক্তি দিয়ে সেই শক্তিকে ধ্বংস করে ফেলবে। তাই সেই সত্য তাকে আলগোছে বলা হলেও সাধারণত তার মানে সে বুঝতে পারবে না। আর এই বুঝতে না পারার মধ্য দিয়েই সেই অনুভূতির শক্তি তাকে আরোগ্যের পথে নিয়ে যাবে ধীরে ধীরে।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন