কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ইন্দ্রপুরী রহস্য

 


(বারো)

 জলধিবলয়ং

আসিফের এই আকস্মিক মৃত্যুর জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। দুদিন কেটে গেল, আসিফের পিঠে এঁকে রাখা হাতির চিহ্নটা আমাকে ঘুমোতে দিল না। আততায়ী চিহ্ন এঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছে তার শিকার কীভাবে মরবে। এটা তখনই সম্ভব, যখন সে হবে সেই শিকারের পূর্বপরিচিত। কে হতে পারে সেই ব্যক্তি ভাবতে ভাবতে দুদিন কেটে গেল। ইতিমধ্যেই আসিফের ময়নাতদন্তর রিপোর্টটি এসেছে হাতে। সুনন্দর মতোই তার শরীরেও খুব বেশি মাত্রায় বেনজোডায়াজেপিন পাওয়া গেছে। এর অর্থ খুনের আগে তাকে কোনও উপায়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে ফেলেছিল আততায়ী। তার উপর উনালোমের উপরের তিনটি বিন্দুতেও পারদের মাত্রা বেশি থাকায় আশুদা সন্দেহ করছিল পাচাই কুথু পদ্ধতিতে ট্যাটুর আড়ালে পারদগাছের রস মিশে আছে। টেলিগ্রামে বিনতার পাঠানো সেই অদ্ভুত গ্রুপের ভিতরেও কোনও হেলদোল নেই। এই ক'দিনে নেই কোনও পোস্ট। কোনও কথোপকথপন। আসিফের মৃত্যু আশুদাকে যে বেশ খানিকটা ধন্দে ফেলে দিয়েছে বুঝতে পারছিলাম। এতোদিন একসঙ্গে সত্যব্যাবচ্ছেদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি আশুদাকে যে জিনিসটা ভাবাচ্ছে, তা হল 'মোটিভ'। কেন হত্যাগুলো করছে আততায়ী? আশুদা আমাকে বুঝিয়েছে, একজন সিরিয়াল কিলারেরও অবচেতনে নানান উদ্দেশ্য থাকে। শুধুই নিছক হত্যা করে না। একজন সিরিয়াল কিলার আসলে একজন শিল্পী। এই প্রসঙ্গে আসিফের পিঠের হাতিচিহ্ন নিয়েও আশুদার সঙ্গে কথা হল আমার।

-আসিফের পিঠের ওই হাতির উল্কিটা খানিকটা সামোয়া ঢঙে আর খানিক আমাদের বাঁকুড়ার বোঙা হাতির ঢঙে করা, বুঝলি অর্ক।

-বোঙা হাতি মানে?

-'বোঙা' শব্দের অর্থ অশরীরী শক্তি। সাঁওতার দেশে সিঞ বোঙা হল সূর্যদেবের নাম। এই বোঙা হাতি একবার নিজে হাতে বানিয়ে আমার জন্য নিয়ে এসেছিল এক রোগী। তার বাড়ি ছিল গন্ধেশ্বরী নদীর তীরে। গ্রামের নাম সম্ভবত সেন্দ্রা...

-এর থেকে কী বোঝা যায়?

-আততায়ী আমাদের ক্লু দিচ্ছে। সে বাঙালি।নিশ্চিতভাবেই বাঙালি।

-আর ব্রজলাল?

-তাকেও জেরা করতে হবে। তথাগত এখন ছুটিতে। তাই নাসিমাকে বলেছি। খুব শিগগিরই ওর চিৎপুরের গোডাউন রেইড করবে পুলিশ।

আশুদা আমাকে বলেছিল এই ট্যাটু বা উল্কি নিয়ে খানিক পড়াশোনা করতে। আজকাল প্রযুক্তির উন্নতি এআই, ইউটিউব গবেষণার কাজ অনেক বেশি সহজ করে দিয়েছে। তবু আমি শরণ নিলাম ন্যাশানাল লাইব্রেরি আর ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরির কাছে।সেখানে ট্যাটু নিয়ে অনেক অজানা তথ্যর সন্ধান পেলাম।

এই ইংরাজি 'ট্যাটু' শব্দটি আসলে 'ট্যাটাউ' বলে একটি তাহিটিও শব্দ থেকে জন্ম নিয়েছে। এই শব্দর অর্থ 'চামড়াকে ভেদ করে চিহ্ন তৈরি করা'। উল্কি বা ট্যাটুর ইতিহাস জানতে গেলে দক্ষিণ আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের মাঝে লুকিয়ে থাকা অজস্র আগ্নেয় দ্বীপের আদিবাসীদের কথা আমাদের জানতে হবে যাদের ভৌগোলিকভাবে 'পলিনেশিয়া' বলা হয়। উল্কির অস্তিত্বর কথা আমরি মহাভারতে পাই, তবে সেখানে এই উল্কি প্রধানত রাক্ষসদের ভিতর পাওয়া যায়। ভীমপুত্র বীর ঘটোৎকচ বা হিড়িম্বা বর্ণনায় এই উল্কির অস্তিত্ব অনুমান করা যায়। তবে অর্য সম্ভ্রান্ত সভ্যতায় উল্কিকে ব্রাত্যই থাকতে দেখা যায়। ১৯৯১ সালের অক্টোবর, ইতালি ও অস্ট্রিয়ার মাঝখানে এক বরফাবৃত পাহাড়ের কোলে পাঁচ হাজার বছর পুরনো একটি উল্কিধারী শিকারীর দেহ পাওয়া যায়। হয়তো শিকার শেষ করে ঘরে ফেরার পথে তুষারঝড়ে পড়ে সেই হতভাগ্যের প্রাণ যায়। তাঁর শরীরে যকৃত বরাবর ও গোড়ালিতে পরপর সমান্তরাল কয়েকটি উল্কিবিন্দু দেখে ইন্সব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কনরাড স্পিণ্ডলার অনুমান করেন এই উল্কি সেই মানুষটির দেহে শুশ্রুষার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছিল। তার মানে আমাদের দেখা অনন্তপুরের 'মেনতেনু ক্লিনিক'এর 'ট্যাটুথেরাপি'র ভীত বহু শতাব্দীপ্রাচীন। নৃতত্ত্ববীদরা খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ থেকে ৩৮,০০০ সালে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি উদ্ধার করে অনুমান করেন এই উল্কি করতে ব্যবহৃত হতো হাড়ের তৈরি সূঁচ আর মাটির পাত্র। এরপর মিশরে মেলে 'আমুনেত'এর উল্কি আবৃত দেহ। আমুনেত (খ্রিস্টপূর্ব ২১৬০ থেকে ১৯৯৪) কারো কারো চোখে মিশরীয় অলৌকিক শক্তির দেবী হলেও আসলে ছিলেন থিবেসের দেবী হাথোরের পুরোহিত। দেবী হাথোর প্রাচীন মিশরীয় বিশ্বাসে সমস্ত জগৎ সংসারের জন্মদায়িনী। আমুনেতের শরীরের হাতে ও উরুতে বেশ কয়েকটি সমান্তরাল উল্কিবিন্দুর নিদর্শন পাওয়া যায়।মিশরীয় গবেষক রবার্ট বিয়ানচির মতে এইধরণের উল্কি মূলত কামনার উদ্দীপক। মিশরে উল্কির ব্যবহার হতো পুনর্জন্ম ও সন্তান উর্বরতার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু শুধুই নারীরা নয়, মিশরে পুরুষ রাজাদেরও উল্কি কাটা হতো। আগেই বলেছি মিশরীয় লিপিতে এই উল্কিকাটার নাম ছিল 'মেনতেনু' যার অর্থ 'খোদাই করা'। প্রাচীন মিশরীয়দের শরীরে 'বেস' চিহ্ন ছাড়াও নানান জীবজন্তু ও নর্তকীর ছবি পাওয়া যেত। এরপর ১৯২০ সালে গবেষকরা পেরুতে কয়েকটি ইনকা সভ্যতার মমি আবিষ্কার করলেন।  কোনও লিখিত প্রতিবেদন না থাকলেও গবেষকদের অনুমান, ইনকানরা এই উল্কিবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিল ১৯৪৮ সালে রাশিয়ার গবেষক সার্গেই ইভানোভিচ রুদেঙ্কো চীন ও রাশিয়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে খুঁজে পেলেন বেশ কিছু প্যাজিরিক সমাধিমন্দির। এই প্যাজিরিক গোষ্ঠীর আ মূলত লৌহযুগের মানুষ ছিলেন। নানান অলঙ্কার, ষড়ৈশ্বর্যের ভিতর রুদেঙ্কো পেলেন এক প্যাজিরিক প্রধানের দেহ। যখন তাঁর মৃত্যু ঘটেছিল, সম্ভবত তখন তাঁর বয়স পঞ্চাশ।রুদেঙ্কো দেখলেন তার সারা শরীরে অজস্র আশ্চর্য জীব অতিজীব উল্কি করা রয়েছে। তার ডান পা ধরে পায়ের চেটো অবধি বিস্তূত একটি প্রকাণ্ড মাছ, একটি পাহাড়ি ছাগলের চিহ্ন আর পিঠের মেরুদণ্ড ঘিরে গোল গোল করে আঁকা আঁকা বেশ কয়েকটি বৃত্ত। রুদেঙ্কোর মতে এই বৃত্তগুলিও চিকিৎসার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে কারণ প্রাচীন সভ্যতায় উল্কিকরণে পিঠের ব্যথা সারানোর প্রথা ছিল। ১৯৯৩ সালে সাইবেরিয়ার উমোক মালভূমিতে আরেকটি প্যাজিরিক মমি উদ্ধার হয় যা প্রায় ২৪০০ বছর পুরনো। এটি একটি তরুণীর দেহ। হয়তো তাকে সমাধিস্থ করবার ঠিক পরেই প্রবল বৃষ্টি আর বরফে সেই সমাধি ঢেকে যাওয়ায় তা এতোগুলো বছর পরেও পার্মাফ্রস্টে অক্ষত থেকে গেছে। এই অপরূপা তরুণীর দেহেও অজস্র উল্কিচিহ্ন ছিল।

উল্কি বা ট্যাটুর কথা হেরোডোটাস, প্লুটার্চ, গ্যালেন, প্লেটোর মতো গ্রিক ও রোমান লেখকদের লেখনিতে পাওয়া যায়। গ্রিকরা প্রধানত এই বিদ্যা অর্জন করে পারস্য থেকে। তখন এই উল্কিকরণ প্রধাণত ক্রিতদাস আর আসামীদের চিহ্নিত করতে ব্যবহার করা হতো। ষষ্ঠ শতাব্দীর রোমান চিকিৎসক ইটিয়াসের 'মেডিকা আর্টিস প্রিন্সিপেস' থেকে জানা যায় রোমান সৈন্যদের মুখে চোখে এই উল্কিকরণের মাধ্যমে নানান চিহ্ন এঁকে দেবার পদ্ধতিকে বলা হতো 'স্টিগমেটাস'। মিশরীয় পাইন কাঠ, পোড়া পিতল, গল, ভিট্রিওল, আর ভিনিগার একত্রিত করে মিশিয়ে তৈরি হতো ট্যাটুর কালি। সেই কালি, জল আর পলাণ্ডু জাতীয় গাছের রস, যাকে 'লিক জ্যুস' বলা হতো, একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হতো কালি।

এরপর সতেরো ও আঠারো খ্রিস্টাব্দে ফরাসী, ব্রিটিশ, স্পেনীয় ও জার্মান বাণিজ্য অভিযানের ফাঁকে আবিষ্কৃত হল অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যাণ্ড ও দক্ষিণ আমেরিকার মাঝে ফিজি, সামোয়া, টোঙ্গা, তাহিটি, মার্কেসাসের মতো অজস্র দ্বীপ। যেই বাণিজ্যতরিই নামল সেখানে, তারা তাদের নিজস্ব পতাকা পুঁতে তাদের অস্তিত্ব কায়েম করতে চাইল। দ্বীপের অধিবাসী আদিবাসীরা পেল সভ্যতার ঘ্রাণ। পাশাপাশি এল ক্রীতদাসপ্রথা, সিফিলিস, বসন্তরোগ আর গোলাবারুদ। আর সভ্যতা তাঁদের কাছে শিখল আশ্চর্য উল্কিশিল্প! শোনা যায় ১৭২২ সালে জেকব রোগেওয়েনের নেতৃত্বে তিনটি ডাচ বাণিজ্যতরি সামোয়ার মানুয়া নামক একটি দ্বীপে নোঙর ফেলেছিল। সেখানে দূর থেকে তারা সিল্কের  ভূষণাবৃতা অপূর্ব এক রমণীকে দেখে চমকে যান। পরবর্তী মুহূর্তে তারা বুঝতে পারেন, রমণীটির শরীরে যেটি তারা রেশমের আভরণ ভাবছিলেন, তা আসলে তার সমস্ত শরীর জুড়ে ছেয়ে থাকা ট্যাটু। এরপর ১৭৬৮র ফরাসী অভিযানে ব্যোগানভিলও সামোয়ানদের ভিতর এই আশ্চর্য উল্কি আবিষ্কার করলেন। ধীরে ধীরে সামোয়া য়ুরোপের 'উন্নত' দেশগুলির কলোনিতে পরিণত হলো। সামোয়ার প্রাচীন অধিবাসীরা সেইসব অত্যাধুনিক ও বর্বর সাহেবদের সঙ্গে সংগ্রামে পেরে উঠল না। ১৮৩০ সালে রেভেরাণ্ড জন উইলিয়ামস সামোয়া পাড়ি দিলেন মিশিনারি হিসেবে। সামোয়াবাসীকে খ্রিস্টান ধর্মান্তকরণ তাঁর লক্ষ্য। সামোয়াবাসীদের মনে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হল যে খ্রিস্টান হলেই দীর্ঘায়ু হওয়া যাবে। খ্রিস্ট ধর্মযাজকরা এই উল্কিকরণকে ভালো চোখে দেখতেন না। আসলে প্রাচীন গ্রিক ও রোমান অপরাধী চিহ্নিতকরণের ধারণা তাদের মগজে শিকড় গেঁথে রেখেছিল। তাই ধর্মযাজকরা সামোয়াবাসীদের ভিতর উল্কিকরণ নিষিদ্ধ করে দিলেন। কিন্তু এই নিষিদ্ধকরণ সক্রিয় করা সহজ ছিল না। প্রাচীন সামোয়া রীতিতে এই উল্কিকরণ ছিল পৌরুষের প্রতীক। যে পুরুষের শরীরে উল্কি ছিল না, তাকে কোনও কন্যার পিতা তার মেয়েকে অর্পণ করতে চাইতেন না। ট্যাটুবিহীন পুরুষ প্রাচীন সামোয়া ধারণা অনুযায়ী ছিল নেহাতই বালক। তাকে বালক থেকে পুরুষ হতে গেলে উল্কিবিশেষজ্ঞ 'টুফুঙ্গা'কে দিয়ে উল্কীকরণ করতেই হবে। পরবর্তীতে জার্মানরা সামোয়ায় এসে এই ধর্মযাজকদের মতো অধৈর্যতা দেখাননি। বরং তারা এই ট্যাটুইং সম্পর্কে বিশেষ গবেষণায় আগ্রহী হয়েছিলেন। তেমনই এক জার্মান চিকিৎসক ও গবেষক ক্রেমারের নথি থেকে আমরা জানতে পারি, এই উল্কিকরণে সামোয়াবাসী অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। এক ঘন্টায় পুরো একটি হাত উল্কিতে ভরিয়ে ফেলত তাঁরা। কখনও কখনও হপ্তার পর হপ্তা চলত এই প্রক্রিয়া। এই নিয়ে ১৯২৫ সালে রবার্ট ফ্ল্যাহার্টি একটি তথ্যচিত্র বানান। সেখান থেকেই ডিজনির জনপ্রিয় চরিত্র 'মোয়ানা' জন্ম নেয়। সামোয়ান টুফুঙ্গারা উল্কিকরণকে শুধুই পৌরুষের পারতীক হিসেবে নয়, এক শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। ঝিনুক আর হাড়ের তৈরি যন্ত্র দিয়ে এই উল্কি করা হত। বাদাম পুড়িয়ে নারকেলের মালায় তৈরি হতো কালি। 'আউতা' নামক যন্ত্র দিয়ে সেই রঙ ঢুকিয়ে দেওয়া হতো শরীরে। এই প্রক্রিয়া বেশ কষ্টকর ছিল। এতে যার শরীরে উল্কি করা হচ্ছে, তাঁর যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা পরীক্ষা করা হতো। সামোয়ার মতোই আরো একটি দ্বীপ মার্কেসাসেও এই উল্কিশিল্পের প্রভূত প্রচলন ছিল। স্টাইনেনের গবেষণাগ্রন্থ থেকে জানা যায়, মার্কেসাসের অধিবাসীরা তাদের সমস্ত শরীরে এমনভাবে ট্যাটু করত যে আপাতদৃষ্টিতে তারা ভূষণাবৃত না নগ্ন, সেটাই বোঝা যেত না।পুরুষ ও মহিলা শরীরে অপূর্ব কারুকাজ করে আঁকা হত সেই উল্কিগুলি। এই দ্বীপ থেকে ট্যাটুশিল্প ছড়িয়ে পড়ে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে।

এশিয়াতে উল্কিকরণ কিন্তু প্রাচীন গ্রিক রোমের মতোই ছিল অপরাধচিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়া। জাপানের উল্কিকরণের একটি প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় ২৯৭ সালে। সেখানে চৈনিক ইতিহাসবিদরা জাপানের এই উল্কিকরণকে মোটেই ভালো চোখে দেখেননি। খ্রিস্টিয় ৭২০র নথিতে পাওয়া যায়, জাপানের এক সম্রাট এক হামাকো (আজুমির মুরাজি নামক এক সাধারণ শ্রমিক)কে ডেকে বলছেন,"তুমি দেশের রাজশাসনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছ। তবে আমি পরম ক্ষমাশীল হয়ে তোমাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে তোমাকে উল্কিকরণের শাস্তি দিলাম"।জাপানে বহুদিন উল্কি এমনই অপরাধের চিহ্ন হিসেবে বেঁচে থাকে। কখনও কুকুর এঁকে দেওয়া হতো অপরাধীর কপালে। মানুষ দেখা মাত্র চোখ ঘুরিয়ে নিত তার থেকে। সমাজে একঘরে করে দেওয়া হতো তাকে। এরপর জাপানে উল্কি জনপ্রিয় হল পুরোহিতদের ভিতর। পুরোহিতরা অনেকে তাদের শরীরে 'নামু আমিদা বুৎসু' লিখিয়ে নিতেন। এই শব্দগুলি বৌদ্ধমন্ত্র। এরপর এডো যুগে উল্কিকরণ হয়ে ওঠে শিল্প। কাঠের ব্লক প্রিন্ট শিল্পী আর উকোয়ে শিল্পীরা ধীরে ধীরে উল্কিকরণেও আগ্রহী হয়ে পড়েন। কখনও কখনও কুখ্যাত 'ইয়াকুজা' দল, যারা পরবর্তীতে জাপানে সামুরাইদেরশ সমান্তরালবর্তী হয়ে ওঠে, তাদের পরিচিতি হিসেবে উল্কি বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। চৈনিক উপন্যাস 'সুকোদেন'এ চীনের ১১১৭ থেকে ১১২১ মধ্যবর্তী অরাজকতায় বেড়ে ওঠা ১০৮ জন বিপ্লবীর অভিযানের উল্লেখ আছে। সেখানে সুকোদেনের নায়কদের শরীরে বর্ণাঢ্য উল্কি আঁকা থাকত। শিশিন নামক নায়কের শরীরে ছিল নটি পেঁচিয়ে থাকা ড্র্যাগন, বুশোর শরীরে বাঘের ছবি আর প্রেমিক রচোশিনের শরীরে ফুলের তোড়া।

ভারতে উল্কিকরণ প্রাচীন যুগ থেকেই প্রচলিত। আদিবাসীরা এই উল্কিকরণকে তাঁদের সামাজিক প্রতিপত্তির চিহ্ন মনে করত। কখনও কখনও পরজন্মে পদার্পণের পাথেয় হিসেবেও এই উল্কিকরণকে দেখা হত। কখনও দুষ্ট শক্তির হাত থেকে রক্ষা পেতে উল্কির সাহায্য নিতেন তাঁরা। ছাই, গোবর, গাছের রস ও জল মিশিয়ে তৈরি হত কালি। যে পদ্ধতিতে সেই রঙ ঢোকানো হত শরীরে, তার নাম ছিল 'গুড়না'। কখনও বীরত্বের প্রতীক হিসেবেও উল্কি আঁকা হত শরীরে। নাগাল্যান্ডের কোনিয়াক গোষ্ঠীর সৈনিকরা এই উল্কি আঁকতেন বিজয়চিহ্ন হিসেবে। সাঁওতাল রমণীরা ফুল এঁকে নিতেন শরীরে পরজন্মের কথা ভেবে, আর আপাতানি গোষ্ঠীর মেয়েরা মুখে উল্কি আঁকতেন নিজেদের কুৎসিত করে তুলতে, যাতে অপহরণকারীরা তাঁদের তুলে নিয়ে না যায়। মধ্যপ্রদেশের বৈগা আদিবাসীরা কিন্তু উল্কি আঁকতেন চিকিৎসার পদ্ধতি হিসেবে। হলুদ আর গোবর ব্যবহার করা হতো সেখানে।  গুজরাতের যাযাবর 'রাবাড়ি' গোষ্ঠী তাদের সারা শরীরব্যাপী 'ত্রাজভা' উল্কির জন্য বিখ্যাত। এই উল্কি তাদের অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে রক্ষা করত।

কখনও পৌরুষ, কখনও সৌন্দর্য, কখনও অপরাধ, কখনও পারলৌকিক ক্রিয়া। বিচিত্র ট্যাটুর প্রয়োগ। তবে এরই ভিতর এক বিস্ময়কর কাহিনী পড়লাম। গল্পটি 'গ্রেট ওমি' নামক একজন বিখ্যাত শোবিজের। ওমি প্রথম জীবনে ছিলেন একজন সৈনিক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ধনী বাবার কনিষ্ঠ পুত্র ওমি অংশগ্রহণ করেন। সার্কাস আর স্পেনের বুলফাইট তাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত। যুদ্ধফেরত ওমি কাজ খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। যুদ্ধপারদর্শিতা ছাড়া অন্য কোনও কাজে তাঁর তেমন দক্ষতা ছিল না। সার্কাস তাকে আকর্ষণ করলেও সেখানে অ্যাক্রোব্যাট হিসেবে খেলা দেখানোর মুনশিয়ানা তাঁর ছিল না। ফলে ওমি ঠিক করলেন, তিনি নিজেকে এমনভাবে তৈরি করবেন যাতে মঞ্চে উঠলেই মানুষ শুধু তাঁর দিকেই তাকিয়ে থাকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তিনি শরণাপন্ন হলেন ট্যাটুশিল্পী জর্জ বার্শেটের। বার্শেট গভীর মনোযোগ ও ধৈর্যশীলতার সঙ্গে ধীরে ধীরে সাজিয়ে তুললেন ওমিকে। আগের কিছু অনভিজ্ঞ হাতে করা ট্যাটু ঢেকে দিতে বার্শেট ওমির নির্দেশে তার সমস্ত শরীরজুড়ে তৈরি করলেন জেব্রার মতো রেখা। ওমির মুখ মুণ্ডিত মাথা দেহ ভরে উঠল উল্কিতে। এই কঠোর পরিশ্রম আর সাধনার অন্তরালে ওমিকে সাহস জুগিয়ে গেলেন তার স্ত্রী 'ওমলেট'। ওমির স্বপ্ন সফল হয়েছিল। তিনি একদিন সত্যিই মঞ্চশিরোমণি হতে পেরেছিলেন তাঁর সেই ট্যাটুর দৌলতে। আমার এই সুবিস্তৃত ট্যাটুগবেষণা আশুদাকে পড়ে শোনালাম। আশুদা শুনে মুচকি হেসে বলল,"বেশ বেশ। খাসা হয়েছে অরিন্দম।" আমি মনে মনে পরিতৃপ্ত হলাম। আশুদা খুশি হলে আমাকে 'অরিন্দম' বলে। অরিন্দম আশুদার প্রিয় চরিত্র মেঘনাদের নাম।

মাঝরাতে এই ট্যাটু উল্কি ও তার বিচিত্র জগত নিয়ে ভাবছি, ঠিক তখনই আমার মোবাইলে নোটিফিকেশন এল। বিনতার ম্যাসেজ। এতো রাতে! খুলে দেখি একটা ছবি। বিনতাকে জড়িয়ে ধরে আছে এক পুরুষ শরীর। সেই শরীরের অনাবৃত পিঠে ভীড় করে আছে অজস্র ট্যাটু। কখনও হাতি, কখনও মাছ, কখনও ঈগল, কখনও বা ড্রাগন। এই কি তবে পুরন্দর? বিনতার প্রেমিক? ছবি তুলেছে বিনতাই। কিন্তু এতো রাতে এই ছবি আমাকে পাঠানোর উদ্দেশ্য কি? খানিক পরেই ফুটে উঠল টেক্সট।

-অর্ক। আমার খুব বিপদ। আমাকে বাঁচাও। পারবে না আমাকে বাঁচাতে?

আমি কী করব ভেবে পেলাম না। লিখলাম,"বলুন। কী করতে হবে?"উত্তরে বিনতা লিখল,"এখন নয়। সময় এলে বলব। একটা লোকেশন পাঠাব। চলে আসবে। আর একটা কথা। আশুদাকে জানাবে না।"

(ক্রমশ)

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন