ভারতের আধুনিক শিক্ষার সংস্কারক স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
(আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ শতবর্ষে বিশেষ রচনা)
উনিশ শতকের ভারতের নবজাগরণের ইতিহাসে যে ঢেউ উঠেছিল এদেশের সমাজদর্শনে, সমাজজীবনে তার অন্যতম পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়ের উত্তরসূরী হিসাবে বিদ্যাসাগরের পরই যাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, তিনি হলেন বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। ভারতের রেনেসাঁসের যুগান্তকারী বলিষ্ঠ পুরোহিত, পরাধীন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী শিক্ষার উন্নয়নের কান্ডারী স্বাধীনচেতা বলিষ্ঠ পুরুষ। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একাধারে প্রসিদ্ধ গণিতজ্ঞ, স্বনামধন্য আইনজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, শিক্ষা সংস্কারক - অপরদিকে ভারতের নির্ভীক এক দেশপ্রেমিক।
ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন এই মহান পুরুষের জন্ম সম্পর্কে লিখেছেন, "পিতা-মাতা ও বংশের অনেক পূর্ণ না থাকিলে আশুতোষ-এর মত পুত্র জন্মে না"। 'হিন্দু পেট্রিয়ট' পত্রিকার সম্পাদক হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বংশধর পিতা গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, মাতা জগত্তারিনী দেবী আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে গড়ে তুলেছিলেন সোনার খনি থেকে তুলে আনা সোনা থেকে তৈরি স্বর্ণ অলংকারের ন্যায়। এই মহান মানুষের জন্ম হয় ২৯ শে জুন ১৮৬৪ সাল বউবাজারের ১৭ নম্বর মঙ্গলা লেনে। প্রকৃতিদত্ত প্রতিভা নিয়ে জন্মানো আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন শিক্ষা ও সমাজ মননে গড়ে ওঠা নৈতিকতার তীব্র আকুতির বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থাকেও নতমস্তক হতে হয় সুউচ্চ গর্জনে 'রয়েল বেঙ্গল টাইগার' আশুতোষ মুখোপাধ্যায়-এর সামনে। ভারতের বিরুদ্ধে অন্যায়ের আপসহীন এক লড়াকু সৈনিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্মের দ্বারা ভারতবর্ষের প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব মানবতার মহত্ত্বে।
অতুলচন্দ্র ঘটকের 'নোট' থেকে জানা যায় যে, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বাল্য-অবস্থা থেকেই এক 'ভরেসাস রিডার'। সাত-আট বছর বয়সেই কন্ঠস্থ ছিল হোমারের ‘ইলিয়ড', ক্যাম্বেলের 'প্লেজার অফ হোপ’, মিলটনের 'প্যারাডাইস লস্টের' মতন গ্রন্থগুলি। তাঁর অতি আশ্চর্য বুদ্ধিমত্তার জন্য দশবছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় উপহার দিয়েছিলেন ‘রবিনসন্স ক্রুশো’ বইটি। এছাড়া পিতা গঙ্গাপ্রসাদের কাছ থেকে প্রাতঃভ্রমণ কালে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী শুনতে শুনতে এই সমস্ত ধর্মগ্রন্থগুলির পঙক্তি কণ্ঠস্থ হয়েছিল আশুতোষের, যা পরবর্তীকালে শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাষা ও ধর্মগ্রন্থকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সুনামের সঙ্গে। বাল্য-অবস্থা থেকেই বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার জন্য শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি বিভিন্ন দুঃসাহসিক শিক্ষাপ্রথার প্রচলন করেছিলেন সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে।
অতুলচন্দ্র ঘটক মহাশয়ের নোট থেকে আরও জানা যায় যে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বাড়িতে প্রথম ভাগ শেষ করেই ভবানীপুর চক্রবেড়িয়া শিশু বিদ্যালয় ভর্তি হন। ১৮৬৯ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত বঙ্গ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। এগারো বছর বয়সে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় সাউথ সুবারবান স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ন্যায়নীতি, ব্রাহ্মজ্ঞান ও গণিতে পারদর্শিতা অর্জন করেন নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব পন্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর কাছ থেকে। এই স্কুল থেকেই ১৮৭৯ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে লাভ করেন কুড়ি টাকা বৃত্তি। ১৮৮০ সালে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হয়ে প্রচন্ড গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও ১৮৮১ সালে এফ.এ পরীক্ষায় তৃতীয় স্থান অর্জন করে ২৫ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। এছাড়া ১৮৮৪ সালে ‘এ’ কোর্সে পাঁচদিন পরীক্ষা দিয়ে বি.এ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে ১৫০ টাকা বৃত্তি পান এবং গণিতে সর্বাধিক নাম্বার পাওয়ার জন্য ‘হরিশচন্দ্র পারিতোষিক’ লাভ করেন তিনি। দ্বিতীয়বার বিশুদ্ধ গণিত, মিশ্র গণিত ও পদার্থবিদ্যা এই তিন বিষয়ে একত্রে এম.এ পরীক্ষা দিয়ে সর্বোচ্চ নাম্বারের জন্য ‘প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ’ বৃত্তি লাভ করেন। এছাড়া ১৮৮৮ সালে বি.এল পরীক্ষায় পাস, ১৮৯৩এ অনার্স-ইন-ল উপাধি লাভ এবং ১৮৯৪ সালে ডক্টর অফ-ল (ডি.এল) উপাধি লাভ করেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বাল্য অবস্থা থেকে যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন পরবর্তীকালে তা পরিণত হয়েছিল পর্বত সমান পাণ্ডিত্যে। ছেলেবেলা থেকেই যে সকল বৃত্তি ও পারিতোষিক পেয়েছিলেন তার সবটা থেকেই বহু বই কিনে সমৃদ্ধ করেছিলেন তাঁর গ্রন্থাগারকে। দিনেশচন্দ্র সেনের সাক্ষ্য থেকে জানা যায় যে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির সর্বত্র ছিল বইভর্তি আলমারি। তরুণ বয়সেই আশুতোষ গণিতে নতুন আবিষ্কার করে বিশ্ব বিখ্যাত গণিত বিশেষজ্ঞ মিস্টার গ্লেসিয়ার, মিস্টার কেলি প্রমূখ অধ্যাপকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। সেই সময় গণিত নিয়ে তাঁর অনেক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল ইউরোপের বড় বড় কাগজে। গণিতে পারদর্শী আশুতোষ তেইশ বছর বয়সে ১৮৮৭ সালে 'লন্ডন মাথামেটিকাল সোসাইটির' সদস্যপদ লাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯০৮ সালে ভারতবর্ষে প্রথম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে 'ক্যালকাটা ম্যাথামেটিক্যাল সোসাইটি'। ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেনের নোট থেকে জানা যায় যে তৎকালীন প্রখ্যাত গণিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আর.পি পরঞ্জযাবে মন্তব্য করেছিলেন, "যদি আশুতোষ গণিতের অধ্যায়নে ও গবেষণায় নিযুক্ত থাকতেন তাহলে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গণিত শাস্ত্রবিদদের সমকক্ষ হতে পারতেন"।
ছেলেবেলার 'ভোরেসাস রিডার' আশুতোষ পরবর্তীকালে নিজেকে প্রতিষ্টিত করেছিল একটি স্বাধীনচেতা সমাজ উন্নয়নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রূপে। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের প্রথম থেকেই স্বপ্ন ছিল দেশের শিক্ষা পদ্ধতির আমূল সংস্কার করে উচ্চশিক্ষার ঢেউকে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বের জগত সভায় বাংলা তথা ভারতবর্ষকে উজ্জ্বল স্থানে প্রতিষ্ঠা করা। এই সম্বন্ধে তিনি বারবার বলতেন, "It had always been my ambition to be allowed to do something something great as I flattered myself in my youthful dreams for the good and glory of my Alma Matter."
প্রখর চিন্তাশক্তি হিমালয় সদৃশ পাণ্ডিত্যের মতনই আশুতোষ ছিলেন সিদ্ধান্তে অটল এক শিক্ষাসারথী। তাঁর প্রথম ভাবনাই ছিল বিদেশি শক্তির হাত থেকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিচালনার ভার মুক্ত করে শিক্ষা ব্যবস্থার শীর্ষ থেকে স্বাধীন ভাবনার অধিকার নিয়ে এসে, বুনিয়াদি শিক্ষা থেকে বিদ্যালয়ের স্তর পর্যন্ত স্বাধীন শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করা এবং দেশে গবেষণার দিগন্ত খুলে দিয়ে ভারতবর্ষকে বিশ্বের শিক্ষা জগতের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দেওয়া।
১৯০৬ সাল থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। সব্যসাচীর মতন আশুতোষ একদিকে শিক্ষা বিস্তার অপরদিকে শিক্ষা সংস্কারে ব্রতী হন। তাঁর প্রচেষ্টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে সামান্য একটি পরীক্ষাশালা থেকে উচ্চ শিক্ষার জ্ঞানপীঠে পরিণত করেন। মাত্র একজন রেজিস্ট্রার ও তিনজন করণিক নিয়ে কাজ চালানো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় পেয়েছিল স্নাতকোত্তরের ২৫টি বিভাগে ২৫জন অধ্যাপক ও ১৫০জনের বেশি কর্মচারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতির জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে পরিকাঠামগত উন্নতির চেষ্টা করেছিলেন তিনি। সরকারি অর্থ সাহায্যের উপর নির্ভর না করে দেশের বহু ধনী ও শিক্ষা অনুরাগী ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের জন্য আবেদন করেন। তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে পালিত ঘোষ, খয়রার রাজা, নির্মলেন্দু ঘোষ, গিরিশ ঘোষ, ময়মনসিংহ শেরপুরের জমিদার গোপাল দাস চৌধুরী প্রমুখ ব্যক্তিগণ কয়েক লক্ষ টাকা দান করেন যা পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সার্বিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল।
আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রথমেই সংস্কৃত বিভাগটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপদানে সচেষ্ট হয়েছিলেন। বেদ-বেদান্ত, স্মৃতি উপনিষদ, সাংখ্যযোগ, লিপিতত্ত্ব বিষয়ে যেমন শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন ঠিক তেমনি সচেষ্ট হয়েছিলেন বৌদ্ধশাস্ত্র, পালি শিক্ষার ক্ষেত্রেও। পন্ডিত সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ-এর সহযোগিতায় আশুতোষ মুখোপাধ্যায় পালি বিভাগের প্রবর্তন করে এদেশের গবেষকদের কাছে নালন্দা বিক্রমশীলা, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, শীলভদ্র, সমুদ্রগুপ্ত, রাজগৃহ, পাটলিপুত্র প্রভৃতি বিষয়ে গবেষণার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন আগ্রহী শিক্ষার্থীদে। ইসলামের জন্য তিনি শিক্ষার স্থায়ী পথ তৈরি করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা আলাদাভাবে ব্যবস্থা করেছিলেন মুসলিম ধর্ম শাস্ত্র দর্শন অলংকার ব্যাকরণ ও বিজ্ঞান বিষয়ের।
উচ্চশিক্ষা বিষয়ে ইংরাজি, সংস্কৃত, পালি, আরবি, পার্সি সহ ভারতীয় বিভিন্ন ভাষা সহ তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, নীতিশাস্ত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, বাণিজ্য গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, শরীরতত্ত্ব প্রভৃতি ছাড়াও বিজ্ঞান বিভাগে রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, উচ্চতর গণিতশাস্ত্র, জড়বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার দ্বার তিনি উন্মোচন করেন। ফলে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে শিক্ষিত-জ্ঞানী-গবেষক উৎসাহী দৃঢ় নব্য বঙ্গ সম্প্রদায়গগণ।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় আশুতোষ মুখোপাধ্যায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপকদের কলকাতায় নিয়ে এসে ছাত্রদের সামনে বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও জ্ঞানের বিকাশের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। রাশিয়ার ব্যবহার শাস্ত্রের অনন্য পণ্ডিত ভিনগ্রেভফ, ফরাসি পণ্ডিত ফুসে, সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস লেখক ম্যাগডোনা, জার্মান পন্ডিত জেকবি প্রভৃতি পন্ডিতেরা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আহ্বানে উদ্দীপ্ত করে যেতেন এদেশের পড়ুয়া ও উৎসাহী মানুষদের জ্ঞান সাধনায়। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃত উচ্চশিক্ষা ও মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে ভারতের সঠিক উন্নতি সম্ভব এবং শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমেই দেশের সঠিক স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব।
ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন সংক্ষিপ্ত আকারে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের শিক্ষা চিন্তা বিষয়গুলি লিপিবদ্ধ করেছিলেন যেমন- প্রথমতঃ জলের ধর্ম যেমন নিম্নগামী তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সঞ্চারিত হলে সর্বজনীন শিক্ষাও প্রসারিত হবে। দ্বিতীয়তঃ আশুতোষ মুখার্জি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সংজ্ঞা ও আদর্শ নির্ণয় করে ঘোষণা করেছিলেন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পরস্পর নির্ভরশীল ও পরিপূরক সম্পর্ক থাকলেই প্রকৃত শিক্ষা প্রসারিত হবে। তৃতীয়তঃ আশুতোষের মতে শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র অবশ্যই দরকার। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদের স্বাধীনচিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা থাকা ও দরকার। চতুর্থতঃ সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়ভার বহন করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্র সরকারি নিয়ন্ত্রণ মুক্ত রাখতে হবে। পঞ্চমতঃ ছাত্ররা যেমন রাষ্ট্রনীতি পাঠ করলেও রাজনীতি করবে না, শিক্ষকরাও তেমনি রাজনীতি মুক্ত হয়ে নিজেকে আচার-আচরণ নৈতিকতা ও আদর্শে সমৃদ্ধ করে ছাত্রদের সামনে নিজেকে আদর্শবান শিক্ষক হিসাবে তুলে ধরবেন। ষষ্ঠতঃ স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা ব্যবস্থায় করাকরি যেমন থাকবে না তেমনি শিক্ষককেও দেখতে হবে তিনি কেমন পড়িয়েছেন, ছাত্র কতটুকু শিখেছে সেই মতো পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। ছাত্ররা অহেতুক যেন ভয় না করে পরীক্ষার ক্ষেত্রে ও পড়াশোনার ক্ষেত্রে। সপ্তমতঃ আশুতোষ মনে করতেন স্কুল কলেজে মাতৃভাষায় শিক্ষার মাধ্যম হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও মাতৃভাষায় পঠন পাঠন, পরীক্ষা গ্রহণ ও ডিগ্রি দান করলে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। অষ্টমতঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা না হলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যাবে না বলেই আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মনে করতেন। নবমতঃ দেশ ও সমাজ গঠনে ও সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত ও নিবেদিত প্রাণ হিসাবে মানুষ তৈরি করতে পারলে শিক্ষার উদ্দেশ্য সার্থক হবে। দশমতঃ স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত সার্বিক শিক্ষার উন্নতি ও প্রসারের মাধ্যমে তৈরি হওয়া শিক্ষিত জ্ঞানী গবেষক ও যুক্তিবাদী নাগরিকগণই দেশের স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে।
শিক্ষিত মেধা সম্পন্ন নাগরিক ও দেশ গঠনের যে স্বপ্ন প্রথম থেকেই আশুতোষ মুখোপাধ্যায় দেখেছিলেন তা নিপুণভাবে বাস্তবায়ন ঘটিয়েছিলেন বহু সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠে। ব্রিটিশ সরকারের কেরানী তৈরি করার বিপরীত ভাবনায় গিয়ে শিক্ষিত জ্ঞানী মেধা সম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত গবেষক তৈরি করতে তিনি বদ্ধপরিকর ছিলে্ন। ব্রিটিশ সরকারের বহু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বাধা সত্বেও স্বাধীনভাবে শিক্ষার সংস্কারের কাজ করে গিয়েছেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। এমনকি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জ-এর ডাকে যখন ছাত্ররা স্কুল-কলেজ থেকে বেরিয়ে আসছেন তখনও দেশবন্ধুর "education can wait, swaraj can't" স্লোগানের সমর্থন করেননি তিনি। কারণ তাঁর আশঙ্কা ছিল শিক্ষাঙ্গন থেকে বেরিয়ে এলেই সব শিক্ষার্থী স্বদেশের সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবে না, তারা বিপথগামী হবে এবং দেশের মেধা সম্পদ বিঘ্নিত হবে। বহু অপমান কুৎসা সমালোচনা সত্ত্বেও তিনি তার ভাবনা এবং পরিকল্পনা থেকে শেষদিন পর্যন্ত সরে যাননি। তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত সঠিক পরিকল্পনায় তৈরি হওয়া উচ্চশিক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষিত নাগরিক সম্প্রদাই ব্রিটিশ শাসনকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রকৃত শিক্ষিত জ্ঞানী ভারতের নাগরিক তৈরি করে সুকৌশলে তুলে ফেলতে চেয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজত্বকে। তার অন্যতম উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বোস। সুভাষচন্দ্র বোস এক চিঠিতে তাঁর প্রতি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বদ্যানতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছিলেন।
ভারতবর্ষের জাতি গঠনের অন্যতম পুরোহিত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সময়ের সাথে সাথে তাঁর নাম ম্লান হতে বসলেও ভারতবর্ষের শিক্ষা সংস্কারের ইতিহাসে ভারতের আধুনিক শিক্ষার সারথী হিসাবে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নাম চির প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে। ভারতবাসীর প্রিয়জন হয়ে সকলের গৌরবের হৃদয় আসনে প্রতিষ্ঠিত থাকবে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব পুরুষে। কবির ভাষায় বলা যায় -
বিরাট ভূবন মাঝে আজি
জলে তব বিরাট সুকৃতি,
অন্তরের অনুতে অণুতে
জাগে তব অতুলন প্রীতি!
যা ছিল কল্যাণকর শুভ
তাহাতেই ছিলে তুমি ধ্রুব;
গৌর আসনে তব চির প্রতিষ্ঠিত,
স্বদেশ তোমাদের ধন্য, ধন্য তোমাতে স্মৃতি।
তথ্যসূত্র
১) আশুতোষ ইতিকথা - ডঃ দিনেশচন্দ্র সেন
২) স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও বঙ্গ সাহিত্য - অধ্যাপক যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত
৩) আধুনিক শিক্ষার সারথী - শ্যামল দাস
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন