| সমকালীন ছোটগল্প |
যেভাবে রুমালগুলো পাখি হয়ে যায়
আজ নির্ঘাত জ্বর আসবে ওর। পুরোপুরি ভিজে গেছে; একবার ডাকব ভেবেও ডাকলাম না, বারণ শোনার মেয়ে তো নয়!
দূরে
এই ছায়ায় বসে বসে ওকে দেখতে থাকি। একটা ফিনফিনে সাদা সানড্রেস আর পনিটেইলের সঙ্গে বাঁধা
রুমাল, যেটা ক্রমাগত বাতাসে উড়ে যাবার পায়তারা করছে,
পেছনে লালচে আকাশ আর ওর পায়ের ওপর নীলচে সাদা লহর; একেবারে রেনোঁয়ার আঁকা ছবি।
একটু আগে বলা সুফিয়ানের কথাগুলো ভেবে হাসি পেলেও মনে হল খুব একটা
ভুল বলেনি। কাজের জন্য ট্যুরে না এলে মৌসুমী নিশ্চয়ই ছাড় দিত না, এতদিনের প্ল্যান ভেস্তে গেলে রাগ করাটাই স্বাভাবিক। না এলে এত সুন্দর
ছবিটা আমার মনে গেঁথে যেত না!
ঘন্টাখানেক হল সৈকতে এসে বসেছি আমরা। মৌসুমী কিছুতেই সময় নষ্ট
করবে না, হাতে মাত্র দুটো দিন, এত
অল্পে ঘোরাঘুরি হয় নাকি? এইসব নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করেই গেল।
রেনোঁয়ার তেলছবিটা বদলে গেছে এখন। চারপাশে একদল কমবয়েসী ছেলেমেয়ে
জুটে গেছে। বোধহয় শিক্ষাসফরে এসেছে ওরা, আলাপ পরিচয় পর্ব
চলছে হয়ত। ওদের দেখতে দেখতে এই এতক্ষণ পর মাথার ভেতর আবার কাজের কথা ঢুকে পড়ল।
সুফিয়ান বলেছে, ময়নাতদন্তে ধস্তাধস্তির কোনো আলামত নেই।
অর্থাৎ এনাম সাহেব খুনিকে চিনতেন। বিজনেস পার্টনারের ওপর নজরদারি চলছে, ছোট ভাইও সন্দেহের বাইরে নন। এখন অবধি সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়েনি। শুধু
সিসিটিভির ফুটেজটাই এখন দরকার। ওটা হাতে পেলে হয়তো একটা মুখ পাওয়া যাবে। এসব ভাবতে
ভাবতে ফোনটা হাতে নিলাম আর মৌসুমীর চিলচিৎকারে থতমত খেতে হল। সে কি মাথার পেছনেও চোখ
নিয়ে ঘুরছে আজকাল? কাজ করতে দেখলেই হুংকার ছাড়ছে। এই নিয়ে
দু’বার হয়ে গেল এমন! হাত নেড়ে বললাম- আসছি, আসছি।
তাড়া খেয়ে দ্রুত হাঁটতে থাকি। বালির রাজ্যে আমার পা দুটো গেঁথে
যাচ্ছে আর হাওয়াই শার্টটা গায়ের ওপর লেপ্টে গেছে। এমন ভ্যাপ্সা গরমের দিনে কে আসে
সমুদ্র দেখতে? এরচেয়ে পাহাড় ঢের ভালো।
হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেলাম জায়গাটা অনেকখানি শুনশান হয়ে এসেছে।
আমাদেরও ফেরা উচিত এবার। কিন্তু মৌসুমী কি রাজি হবে এখুনিই ফিরতে? আমরা যে রিসোর্টে উঠেছি তা অবশ্য এখান থেকে বেশ কাছেই, হাঁটা পথের দূরত্ব। চেক-ইনের সময় জেনেছি আজ রাতে বার-বি-কিউ হবে। কাল
ভোরের দিকেই আবার আমাদের বেরুবার প্ল্যান। কলাতলি হয়ে সুপারিবাগান, তারপর ঝাউবন ঘুরে লাঞ্চ সেরে ফিরে আসা। আমি কাছাকাছি যেতে না যেতেই আবারো মৌসুমীর চিৎকার-এই এই উড়ে গেল,
ধরো, ধরো ওটাকে।
দেখতে পেলাম ওর চুল থেকে রুমালটা উড়ে গিয়ে হাওয়ায় গোত্তা খাচ্ছে।
মনে হল এই মাত্র খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া কোনো পাখি। মৌসুমীর হাতপা ছোড়ার ভঙ্গি দেখে
হেসে ফেললাম আমি।
এই যে রুমালটা আমি এনে দিলাম না তার জন্য যে আরো বহুক্ষণ সে গাল
ফুলিয়ে থাকবে তা ভাবিনি। বার-বি-কিউ পার্টিতেও বুঝতে পারিনি, ভেবেছি ওর মাইগ্রেনের ব্যথাটা হয়েছে, তাই অত
বিরক্তি। কিন্তু রুমে ফিরতেই আমার হুঁশ হল, দেখলাম সে
সত্যিই খুব রেগে আছে। অথচ রুমালটা ঠিক ফিরে পেয়েছিল, শুধু
আমি এনে দিইনি এই যা!
প্রসঙ্গ ঘোরাতে বললাম- লোকটা কে ছিল? পূর্বপরিচিত?
তাতে ফল উল্টো হল। ভীষণ গম্ভীর ভঙ্গিতে চাদর টেনে সে ওপাশ ফিরে
শুয়ে পড়ল। আমি অগত্যা ফোনটা হাতে নিলাম,
কিন্তু এখনিই ব্যস্ত হয়ে গেলে ভীষণ বিপদ ডেকে আনব। এদিকে মন খচখচ
করছে সেই কখন থেকে, সুফিয়ান দু’ঘন্টা আগে লিখেছিল- ভাই,
আছেন?
নাক ডাকার শব্দ পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম আমি। আপাতত
মৌসুমীর রাগ ভাঙাতে হচ্ছে না। কিন্তু সত্যিই তো ওকে রুমালটা এনে দিয়েছিল যে লোকটা
সে কে? পূর্বপরিচিত না হলে কেউ অত কথা বলে!
এখন এসব জানার উপায় নেই, মৌসুমী গভীর
ঘুমে আচ্ছন্ন। কপালে একবার হাত রাখলাম; না, জ্বর আসেনি। ডেকে তুলে মিটমাট করতে চাইলে নির্ঘাত মারতে আসবে আমাকে।
এদিকে সুফিয়ানের ফোনটাও বন্ধ; অথচ ফোন বন্ধ থাকার কথা
আমার! মেজাজটাই বিগড়ে গেল।
রুমের সঙ্গে লাগোয়া বারান্দাটা বেশ চওড়া। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা
সিগারেট ধরালাম। চমৎকার হাওয়ায় গুমোট ভাবটা কেটে যাচ্ছে; শুধু
একটু জোছনা থাকলে হত! ধোঁয়ার রিং ছাড়তে ছাড়তে ঠিক করে ফেললাম পরেরবার শুক্লপক্ষ
দেখেই ট্যুরের প্ল্যান করব।
অন্ধকারটা সয়ে আসছে ধীরে ধীরে। চিকন পাড়ের শাড়ির মত সমুদ্রের ঢেউ
দেখা যাচ্ছে। মনে হল এখনো কেউ বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এত
রাতে কি সৈকতের দিকে হেঁটে যাবে বলে ঠিক করেছে? কে এই
উন্মাদ? পর মূহুর্তেই মনে হল এ শুধুই বিভ্রম, নিশ্চয়ই কোনো রাতচরা প্রাণী।
এবারে ঘুম পেল, বিছানায় কিভাবে গিয়েছি
আর মনে পড়ছে না। এলোমেলো ভাবনা গোত্তা খেতে খেতে আবার এনাম সাহেবের কথাই মনে এলো।
তার ছোটভাই অর্ধেক সম্পত্তির ভাগীদার। স্ত্রীর ভাষ্যমতে একেবারে বনিবনা ছিল না
তাদের৷ ঘটনার আগের রাতেই বিজনেস ট্রিপে ব্যাংককে গেছেন। ভাড়াটে খুনিকে দিয়ে কাজ
করিয়ে নেয়া কোনো ব্যাপার নয়, কাজেই শহরে ছিলেন না বলে
তিনি কিন্তু পার পেয়ে যাচ্ছেন না।
ভোরের দিকে স্বপ্ন দেখলাম, বালির ওপর
দিয়ে ছুটে চলেছি আমরা। তখনো চারদিক অন্ধকার। মৌসুমীর চুল থেকে রুমাল খুলে উড়ে
যাচ্ছে। ও বোধহয় কাঁদছিল, আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম- এখুনিই
রুমালটা এনে দিচ্ছি। মৌসুমী রেগে গিয়ে বলল- ওটা রুমাল নয়, ব্যান্ডানা।
আমি যখন প্রাণপণে রুমালের পিছু পিছু ছুটছি, আর ওটা অনেকটা উঁচুতে ডানা মেলা পাখির মতো ওড়াউড়ি শুরু করেছে তখুনিই
আমার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল; দেখতে পেলাম মৌসুমী ফোনে কথা বলছে।
আমাকে জেগে উঠতে দেখেই কি তাড়াহুড়ো করে ফোন রেখে দিল? এই
ভোরবেলা কার সঙ্গে কথা হচ্ছিল কে জানে!
আর কথা না বাড়িয়ে ঝটপট তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম দু'জনে। ওর পরনে ফ্লোরাল মোটিফের শিফন শাড়ি, চোখে
রেট্রো রোদচশমা। দারুণ দেখাচ্ছে ওকে। আজকে বেশ কিছু ছবি তুলে দেব, তাতে যদি মন কিছুটা গলে। এরই মধ্যে সে আড়চোখে আমাকে কয়েকবার করে দেখে
নিয়েছে। আমি মুখটাকে যতটা সম্ভব নিরীহ করে রেখেছি৷ ছবি তোলার ফাঁকে হঠাৎ বলে উঠল- মতলবটা
কী?
বললাম- কোনো মতলব নেই, আজকে সারাটা দিন
শুধু তোমাকেই সময় দেব।
-ফোনটা ফেলে এসেছ নাকি চার্জ শেষ?
মাথা দুলিয়ে হেসে ওঠে মৌসুমী। চোরের মত মুখ করে বললাম- সাবাশ,
এই না হলে গোয়েন্দার স্ত্রী!
ওর হাসিটা ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকে। আমার কাঁধে মাথা রেখে নিচু
গলায় বলে ওঠে- ‘এত ব্যস্ত তুমি, আমাকে দেখেও দেখো না’৷
পরবর্তী দু'ঘন্টা বেশ সুন্দর সময়
কাটালাম দুজনে। অসংখ্য ছবি তোলা হল। ঘোরাঘুরি শেষ করে একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে
বসলাম, দুপুরের ক্লান্ত কাকের মত। এদিকে আমার মনের ভেতর
থেকে তখন থেকে পিন ফুটে আছে, ফোনটায় চার্জ দেয়া খুব
জরুরি।
বহুক্ষণ ধরে একটা কথাই ভাবছি-’আমাকে দেখেও দেখো না।’ এনাম
সাহেবের কেসেও কি তাই হয়েছে? জিজ্ঞাসাবাদের সময় কাজের
লোকটা বলেছিল, ভদ্রলোক স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতেন, সৎমেয়েটাকেও সহ্য করতে পারতেন না। পুরো ঘটনার নতুন এই অ্যাঙ্গেলটা
মৌসুমীই ধরিয়ে দিল! আমরা হয়ত সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোকে বাদ দিয়ে খুব দূরে কিছু
খুঁজে চলেছি। না, সুফিয়ানের ফোন না আসা অবধি এসব জটলা
কিছুতেই খুলছে না।
খাবারদাবার চলে এলো আমাদের টেবিলে আর আমি কিছুক্ষণের জন্য এসব
ভাবনা বাদ দিলাম। খেতে খেতে দেখলাম ফোনের গ্যালারিতে স্ক্রল করছে মৌসুমী, মনমেজাজ বেশ ফুরফুরে এখন। হঠাৎ বলে উঠল– আরে গতকালকের ভদ্রলোকটা!
আমি মুখ তুললাম, পেছনের দিকে একটা
টেবিলে বসে আছে গতকালকের লোকটা। তখনো দেখেনি ওকে, মৌসুমীই
হাত নাড়ল। লোকটা একবার তাকাল, তারপর হালকা মাথা নেড়ে
অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নিল।
আমাদের ফেরার সময় হয়ে গেছে। সিগারেট ধরিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি
আমি। বাথরুমের দরজার পাশে লেখা ‘জনপ্রতি পাঁচ টাকা’, তার
সামনে লম্বা লাইন। বেসিনের আয়নায় ওদের দুজনকে দেখা যাচ্ছে। মৌসুমীর ফোন এসেছে, হেসে
হেসে কথা বলছে কারুর সঙ্গে। আর লোকটি একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল, কাউন্টারে বিল মেটালো, তারপর ঝটপট বেরিয়ে গেল।
আমি যখন টেবিলে ফিরে গেলাম মৌসুমী তখন কথা শেষ করে বিভিন্ন ভঙ্গিতে সেলফি তুলছে।
সুফিয়ানের ফোনটা এলো আরো কিছুক্ষণ পর। তখন আমরা রিসোর্ট থেকে চেক
আউট করব বলে শেষ মুহূর্তের গোছগাছ সেরে নিচ্ছি। খুব উত্তেজিত শোনাচ্ছে ওর গলা। জানালো সিসিটিভির
ফুটেজ পাওয়া গেছে।
আমার তর সইছে না, জানতে চাইলাম- কিছু
পেলে?
সুফিয়ান বেশি কিছু জানাল না। আগামীকাল সামনাসামনি আলাপ হবে,
শুধু বলল- ব্যাপারটা বোধহয় অন্যরকম।
আমি একটু আগে রেস্টুরেন্টে তোলা ছবিটা ওকে পাঠাব কিনা ভাবছিলাম
তখনো। এসময় মৌসুমী তৈরি হয়ে এসে বলল শেষবারের মত একটু সৈকতে যাবে। আমি বললাম- জো
হুকুম!
সন্ধ্যা নামেনি এখনো। হাত ধরে হাঁটতে থাকি আমরা। আজ এদিকটা
একেবারে নির্জন। মৌসুমী নিজেই চুল থেকে রুমালটা খুলে নিয়েছে, এলোমেলো চুলগুলো ওর চোখেমুখে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। একটা সময় আমরা ঢেউয়ের দিকে
ছুটতে শুরু করি; ততক্ষণে রুমালটা আকাশে উড়ছে। মৌসুমীর
সেদিকে কোন রকম খেয়াল নেই আজ, সে আপনমনে গুনগুন করে
চলেছে। কিন্তু আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম; দেখলাম সাদা গাঙচিলের
ঝাঁকের ভেতর রুমালটা মিশে যাচ্ছে। একসময় আর বুঝে উঠতে পারলাম না কোনটা রুমাল,
কোনটা পাখি।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন