| সমকালীন ছোটগল্প |
অপারেশান
মুর্দানগর
টিকিট কাউন্টারের সামনে গিয়ে 'সোহাগপুর - একটা' বলতেই
বুকিংক্লার্ক মাথা না তুলেই বলল-- ও, মুর্দানগর যাবেন?
-- না, না। সোহাগপুর।
--ওই হল। লোকে এই নামটাই চেনে। ৮ নম্বর থেকে ছাড়বে।
ছোট লাইনের গাড়ি। সবগুলো কোচই জেনারেল কম্পার্টমেন্ট।
দ্বিতীয় কামরাটায় উঠে জানলার পাশে গুছিয়ে বসে খেয়াল হল -- কামরার বাতিগুলো নিভু নিভু।
অনেকক্ষণ চা খাওয়া হয়নি। কিন্তু এদিকের প্ল্যাটফর্মে
মনে হয় কিছুই পাওয়া যায় না।
ট্রেন চলতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে পেরিয়ে যাচ্ছে
রায়পুর জংশনের আলো, সিগন্যাল। এবার একটা ছোটলাইনের আলাদা লুপ দিয়ে গাড়ি চলেছে। হেমন্তের
শীতের রাত। বোধহয় ন'টা হবে। চারদিকে ধান কেটে সাফ হওয়া ক্ষেতের আভাস। কিছু খাপরার চালের
গেঁয়ো বাড়ি। সবাই ঘুমুচ্ছে। কখনও কোথা থেকে একটু লন্ঠনের আলো বা মাঠের মধ্যে টর্চের
ফোকাস জ্বলছে নিভছে।
সুবিমল কাঁধের ঝোলা থেকে একটা শাল বের করে জড়িয়ে বসল।
হ্যাঁ, এবার বেশ আরাম লাগছে। শুধু যদি এক কাপ চা পাওয়া যেত। গরম চা, যেমনই হোক।
হটাৎ খেয়াল হল যে এই কামরায় অন্ততঃ আরো জনা চারেক যাত্রী
আছে। সবাই গরম চাদর জড়িয়ে গুটিশুটি হয়ে ঝিমুচ্ছে। আলো আগের মতনই কালচে হলদে। একটুও
বাড়ে নি, হয়ত কিছুটা কমেছে।
জানলার কাঁচ নামিয়ে ও ঘুমুতে চেষ্টা করে। সোহাগপুর
আসবে রাত চারটের সময়। সে নিয়ে কোন চাপ নেই। কারণ, ওটাই লাস্ট স্টপ।
না, পাবলিক যে নামেই ডাকুক, ও কিছুতেই অমন অলুক্ষুণে
নাম মুখে আনবে না।
ঘুম এত সহজে এলো না। তার চেয়ে এই 'অপারেশান সোহাগপুর'
ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা যাক।
দশবছর পরে ট্রান্সফার হয়ে ও নিজের ছোটবেলার শহর বিলাসপুরে
এসেছে। ছত্তিশগড়ের দ্বিতীয় বড় শহর। বাবার রেলের
চাকরির সূত্রে বিলাসপুরের রেলওয়ে স্কুলে ভর্তি হওয়া। রেলস্টেশনের কাছেই ইউরোপিয়ান ক্লাব, সবুজ মাঠ আর একশ' বছরের
পুরনো গথিক গির্জা।বৃটিশ জমানার লাল ইঁটের কোয়ার্টার, লোহার জাল লাগানো জানালা-দরজা
আর ফুটবল মাঠ। রেলওয়ে ইনস্টিটুটের লাইব্রেরি, ক্যারম, টেবল টেনিস।
স্টেশনের কাছের এই পাড়াটা মূল শহর থেকে কিছু দূরে।
লোকজন অধিকাংশই রেলের চাকুরে। আর রয়েছে স্বাধীনতার পর মাইনরিটি স্ট্যাটাসে অসহজ হয়ে
ওঠা কিছু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবার। এভাবেই পরিচয়
হয়েছিল স্ট্যানলি আর তার বোন জেনির সঙ্গে। ওদের রেল ড্রাইভার বাবা ইন্দোর বিলাসপুর
এক্সপ্রেসকে নিশ্চিত দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচাতে এমার্জেন্সি ব্রেক কষে ছিলেন। যাত্রীরা
বড় দুর্ঘটনার হাতে থেকে রক্ষা পেল। কিন্তু উনি হেড -ইঞ্জুরির অভিঘাতে কয়েকমাস পরে রেলের
হাসপাতালে মারা গেলেন।
ওদের মা চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারির চাকরি পাওয়ায় সংসারটা
ভেসে যায়নি।
স্ট্যানলির বাবা নেই, তো সুবিমলের মা। ওর বাবা দ্বিতীয়
বিয়ে করেছেন। দুই ভাইবোনও হয়েছে।
সৎমা একেবারেই গল্পের বই বা সিরিয়ালের মত ন'ন। সুবিমলের
সঙ্গে ভালই ব্যবহার করেন। কিন্তু যেন দর্জির ফিতে দিয়ে মেপে।
সুবিমল স্ট্যানলির বাড়িতে এসে আদর পায় ক্যাথি অ্যান্টির
থেকে। উনি ছেলেমেয়েদের বলেন--ট্রু ক্রিশ্চান হতে। ক্রিশ্চান ধর্মের মূল কথা হল কমপ্যাশন।
যিশু পাপীদেরও ত্রাণ করেন। উনি করুণার অবতার।
স্ট্যানলিদের বাড়িতে সুবিমলের যাওয়া আসা লেগেই ছিল।
সময়ের সঙ্গে সেটা আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠল।
হ্যাঁ, স্ট্যানলি ওর সঙ্গে রেলওয়ে স্কুলে একই ক্লাসে
পড়ত বটে। খেলাধূলোয় বেশ ভাল। ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের ইভেন্টগুলোতে ইন্টাররেলওয়ে টুর্নামেন্টে
বিলাসপুরের হয়ে নিয়মিত প্রাইজ পাওয়া স্ট্যানলি যে একদিন স্পোর্টস কোটায় রেলের চাকরিতে
ঢুকে পড়বে সে নিয়ে কারও কোন সন্দেহ ছিল না। এই নিশ্চিন্তি বোধহয় পড়াশুনোয় ওর আগ্রহ
কমিয়ে দিল। শেষে সুবিমল যখন বারো ক্লাসে পড়ছে তখন স্ট্যানলি মাধ্যমিকের বেড়া টপকানোয়
ব্যস্ত।
আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য পাঁচিল উঠতে
লাগল। দুজনের বইপত্র আলাদা, বন্ধুবান্ধব আলাদা।
তবু সুবিমল ওদের বাড়িতে আগের মতই আসতো যেত, তার একটা
কারণ স্ট্যানলির বোন-- পঞ্চদশী জেনি।
ভাইয়ের থেকে একেবারেই আলাদা । প্রত্যেকবার ক্লাসে প্রথম
দশজনের মধ্যে থাকে, কিন্তু অংক সে সুবিমল ভাইয়ার কাছেই বুঝতে চায়। স্কুলের কোন স্যারই
নাকি ওর মত বোঝাতে পারে না।
দিন গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর।
স্ট্যানলি স্কুলের পড়া শেষ করে নি। খেলার জগত থেকেও
হারিয়ে গেছে। জেনি নার্সিংএর কোর্স করে ঝাড়খন্ডের চক্রধরপুরে রেলওয়ে হাসপাতালে স্টাফ
নার্স।
সুবিমল ব্যাংকের বদলির চাকরিতে ইন্দোর।
না, জেনি বা সুবিমল কেউ বিয়ের কথা ভাবে নি। ওরা জানে
যে অ্যাংলো- ইন্ডিয়ান পরিবারের মেয়ে ইউপির সরযুপারী ব্রাহ্মণের ঘরে বউ হয়ে যেতে পারে
না।
সুবিমল প্রায় ভুলে গেছে ওর কথা। তবু কখনও মনে পড়ে
--একদিন খালি বাড়িতে জেনি ওকে একটু আশকারা দিয়েছিল, ব্যস্।
কেটে গেছে দশ বছর ।
সুবিমল ফিরে এসেছে বদলি হয়ে বিলাসপুরের রেলওয়ে ব্র্যাঞ্চে।
ও এখন হেড ক্যাশিয়ার। বাবা রিটায়ার হয়ে সবাইকে নিয়ে ফিরে গেছেন আজমগড়ের পৈতৃক বাড়িতে।
সেখানে দু-ফসলী চাষের জমি আর ফলবাগান। এই শহরে সুবিমল এখন ঝাড়া হাত-পা।
সেদিন পেনশনের কাউন্টারে লম্বা লাইন।
পান খাবে বলে দুমিনিটের জন্যে ও বাইরে বেরোচ্ছে তখন
একজন বুড়ি মহিলার সঙ্গে সামান্য ধাক্কা লাগায় ওঁর হাত থেকে পাসবই পড়ে গেল। ও সরি বলে
বইটা তুলে ওঁর হাতে ধরিয়ে দিল। ছোট করে ছাঁটা সাদাচুল তোবড়ানো গাল মহিলাটি কিছু না
বলে ওর দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন।
ব্যাপারটা হয়ত এভাবেই শেষ হত; কিন্তু সেদিন ছিল শনিবার।
হাফ-ডে।
সন্ধ্যেবেলা ওর কোয়ার্টারের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে
ও একটু অবাক হল। যে এসেছে সে একটু উঁচুতে লাগানো কলিংবেলের সুইচটা খেয়াল করেনি।
দরজা খুলে আরও অবাক। দুপুরের সেই পেনশনের লাইনে দাঁড়ানো
সাদা চুলের মহিলাটি।
--- আপনি?
উনি কষ্ট করে হাসলেন।
-- ডোন্ট য়ু রিকগনাইজ মি, মাই সন?
হ্যাঁ, ক্যাথি আন্টিকে চিনতে সুবিমলের বেশ কয়েক সেকেন্ড
সময় লেগেছিল।
ঘরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে নিজের হাতে কফি বানিয়ে খাইয়ে
দিল।
শরীর ভেঙে গেছে আন্টির।
জেনি ভাল আছে। বিয়ে করে নি। নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে মায়ের
চিকিৎসা করিয়েছে। কিন্তু ক্যাথি ফিরে এসেছেন। রিটায়ারমেন্টের পর এই শস্তা কোয়ার্টার
অল্প দামে কিনে নিয়ে এখানেই আছেন।
ওঁর একটাই আশা। স্ট্যানলি যদি কোন দিন ফিরে আসে।
--সেকি! স্ট্যানলি কোথায়?
আস্তে আস্তে অনেক কথাই বললেন ক্যাথি। হাঁপ ধরে, বুকে
ব্যথা ওঠে। মাঝে মাঝে এক ঢোঁক জল খান, তারপর বলতে থাকেন।
স্ট্যানলি রেলের চাকরি পেয়ে যেত, গ্যাংম্যানের। কিন্তু
ও বলল চাকরি করবে না।
ওর নতুন সব বন্ধুবান্ধব জুটেছে। ওরা মিলে কী সব কথাবার্তা
বলে, বইপত্তর লেনদেন করে ক্যাথি বোঝেন না। মাঝখানে একদিন প্রতিবেশি পি এল রাও এসে ক্যাথিকে
বললেন--ছেলেকে সামলাও, ও আজকাল লোকক্ষ্যাপানোর দলে ভিড়েছে। পরে মুশকিলে পড়বে।
সে রাত্তিরে খাওয়াদাওয়ার পর উনি স্ট্যানলিকে চেপে ধরলেন।
-- আমি যতদিন আছি এই কোয়ার্টার আর পেনশনে কোন মতে দিন
চলে যাবে। তারপর? য়ু আর নো চাইল্ড! হোয়াট আর য়ু গোইং টু ডু?
স্ট্যানলি হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে।
-- ডোন্ট য়ু ওরি মম! উই উইল লিভ টুগেদার,ফর এভার!
--ওন্ট য়ু ম্যারি? ওন্ট য়ু রেইজ ইয়োর ওন ফ্যামিলি?
টেল মি!
ও আবার হাসে।
-- ওনলি ওয়ান? নো মম! আই উড বিকাম এ ব্যানিয়ান ট্রি।
দেয়ার উইল বি মেনি ফ্যামিলিজ উইথ মি। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি!
ক্যাথির বুক দুর দুর করে। কিন্তু উনি বিশ্বাস করেন
যে ওঁর ছেলে কোন খারাপ কাজ করবে না।
দুটো মাস গেল না, ভোর রাত্তিরে পুলিশ এসে ক্যাথির দরজায়
ঘা দিল। স্ট্যানলি তার দু'রাত্তির আগে বন্ধুদের সঙ্গে অমরকন্টক বেড়াতে গেছে।
ক্যাথির স্টেটমেন্ট পুলিশ অফিসার বিশ্বাস করলেন না।
ওঁকে বললেন--বেশ, আপনার মোবাইল থেকে ছেলেকে ফোন করুন, দেখি ও কেমন অমরকন্টক গেছে!
ক্যাথি ফোন লাগিয়ে কানে ধরলেন-- এই নম্বরটি আপাততঃ
বন্ধ।
--- তাতে আশ্চর্যের কি আছে অফিসার। জঙ্গলে এমন হতেই
পারে।
--- তা তো বটেই। তবে কিনা ওর দুই বন্ধু, মানে যাদের
সঙ্গে বেড়াতে গেছে বলছিলেন-- ধরা পড়ে গেছে। তবে অমরকন্টকে নয়, উল্টো দিকে, মেইনপুরের
জঙ্গলে।
ঘরের বিছানাপত্তর, আলমারি, তোরঙ্গ, কাপড়চোপড়-- সব তহস-নহস
করে ওরা গেল।
যাবার আগে ফ্যামিলি অ্যালবাম থেকে স্ট্যানলির কিছু
ছোটবেলার ফোটো ও বইপত্তর সঙ্গে নিয়ে গেল।
আর হ্যাঁ, পাড়ার দুজনকে সাক্ষী রেখে জিনিসপত্তরের একটা
লিস্টি বানিয়ে তাতে ক্যাথিরও সই নিয়ে ওঁকে এককপি ধরিয়ে দিয়ে ওরা চলে গেল।
যাবার আগে পরামর্শ দিয়ে গেল যে স্ট্যানলি এলে যেন ওকে
আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়।
তারপর বছরখানেক গড়িয়ে গেছে। ওর কোন খোঁজ নেই। এখন আর
থানা থেকেও জিজ্ঞেস করতে আসে না।
ক্যাথি কোয়ার্টার ছেড়ে বেশিদূর যান না। যদি স্ট্যানলি
কখনও ফিরে আসে! এক তোরঙ্গ বোঝাই শীতের কাপড় ছেড়ে গেছে যে!
-- সুবু! আই হ্যাভ এ রিকোয়েস্ট। কুড য়ু গেট সাম নিউজ
অব হিম? টেল হিম টু সেন্ড মি সাম লেটার। টেল হিম টু টেক ব্যাক উইন্টার ক্লোদস্। হি
ইজ ভালনারেবল টু ব্রংকাইটিস, ইউ নো।
-- আমি আন্টি? কী করে?তাছাড়া আমার তো রিলিভার না আসলে
ছুটি পাওয়াও মুশকিল।
-- সুবু! ইউ ওয়্যার হিজ বেস্ট ফ্রেন্ড। য়ু আর অ্যান
অফিসার নাউ। সিওরলি য়ু ক্যান ডু সামথিং ফর মাই সেক।
বৃদ্ধা কাঁপতে কাঁপতে ওর হাত চেপে ধরেন।
সুবিমল কী করবে ভেবে পায় না। কিন্তু আন্টি হাল ছাড়েন
নি। মাঝে মাঝেই হানা দেন ওর কোয়ার্টারে।
-- এনি নিউজ, সুবু? সে সামথিং সুবু? ইজ হি ওয়েল?
কতবার মিথ্যে বলা যায়? শেষে কি এই শহরে থেকেও বাড়ি
পাল্টাতে হবে?
তবু সুবিমল হয়তো মাথা ঘামাতো না। গোল বাধালো জেনির
একটি ফোন --ব্যাংকের ঠিকানায়।
তাতে আশকথা পাশকথার পর ও বলল-- আমি জানি মম তোমাকে
বিরক্ত করছে। ভেবে দেখ তোমার এসব ব্যাপারে নাক গলানো উচিত হবে কি না।। আফটার অল, দাদা
নিজের পথ নিজে বেছে নিয়েছে।
এই কথায় ওর কোথায় যে ঘা লাগল তা ও নিজেও জানে না। শুধু
দেখল ও কোথা থেকে কার কার সূত্র ধরে একটা খোঁজ পেয়েছে।
বন্ধ খনি অঞ্চলের দুর্গম জায়গা--রেলস্টেশন সোহাগপুর।
ওর কন্ট্যাক্ট ওকে পাখি পড়া করে পড়িয়েছে-- কীভাবে যেতে
হবে, কোথায় কী কোড বলতে হবে, তবে স্ট্যানলির সঙ্গে দেখা হলেও হতে পারে।
এরপর সাতদিনের ছুটি নিয়ে ও রওনা দিয়েছে সোহাগপুর। আশা
-- স্ট্যানলির নিজের হাতে লেখা দু'লাইন চিঠি এনে ক্যাথি আন্টিকে দেবে।
তারপর জোনাল অফিসে বদলি চেয়ে দরখাস্ত পাঠাবে।
গাড়ির দুলুনিতে কখন যে ঘুম এসে গিয়েছিল!
এমন সময় ঝটকা দিয়ে গাড়িটা থামল। কেউ যেন হেঁড়ে গলায়
হেঁকে যাচ্ছে-- মুর্দানগর! মুর্দানগরকী সওয়ারি এহি উতর যাইয়ে।
কাঁচাঘুম ভেঙে গিয়ে সুবিমলের কেমন বোদা বোদা লাগছিল।
কী বিচ্ছিরি নাম স্টেশনটার! মুর্দানগর।
ও তো যাবে সোহাগপুর। হেঁড়ে গলার আওয়াজটা প্ল্যাটফর্মের
গা বেয়ে দুরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
গাড়ি আর এগুবে না, এই শেষ। তাহলে?এখানে নেমে পড়লে সোহাগপুর
কী করে যাবে? বাস পাওয়া যাবে? কিন্তু কোন দিকে? দূর ছাই! লোকটা পই পই করে অনেক কিছু
নির্দেশ দিয়েছিল।শুধু সোহাগপুর যেতে হলে যে মুর্দানগর নামতে হবে তা বলে নি!
আরে! হেঁড়ে গলার আওয়াজটা আবার ফিরে আসছে যে!
- সোহাগপুর কী সওয়ারি ভি এহি উতর জাইয়ে।গাড়ি আগে নেহি
জায়েগী।
এ কী শুনছে! জানলার কাঁচ তুলে লোকটাকে জিজ্ঞেস করতে
যাবে তার আগেই ওর আওয়াজ অনেক দুরে চলে গেল।
ধেত্তেরি!
ফেব্রুয়ারির শেষ রাত। ছত্তিশগড়ের এদিকটায় বেশ ঠান্ডা
পড়ে। ও হাতব্যাগ থেকে একটা পুলওভার বের করে গলিয়ে নেয়। তারপর ব্যাগটা কাঁধে তুলে প্ল্যাটফর্মে
নেমে আসে।
প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই ছোটলাইনের ডিজেলে চলা গাড়িটা
হুস হাস করতে করতে শান্টিং করে সম্ভবতঃ ইয়ার্ডের দিকে এগিয়ে গেল। গালের উপর ঠান্ডা
হাওয়ার থাপ্পড়! ওর ঘুম-টুম একেবারে কর্পূর।
আরে হ্যাঁ, এইবার মনে পড়েছে। টিকিট কাউন্টারে তো এই
নামই বলা হয়েছিল। টিকিটে ছাপা সোহাগপুর, লাস্ট স্টেশন; কিন্তু লোকে চেনে মুর্দানগর
নামে। যাকগে, ও ঠিক জায়গাতেই নেমেছে।
এখনও বেশ অন্ধকার।প্যান্টের চোর পকেটে হাত ঢুকিয়ে সুবিমল
বের করে আনে একটা চিরকুট।তাতে পেন দিয়ে আঁকা পথ-নির্দেশিকা। ল্যান্ডমার্কগুলো সংক্ষিপ্ত
নাম দিয়ে লেখা।
মনে হচ্ছে দেড় কিলোমিটার। হেঁটেই মেরে দেওয়া যেতে পারে।
তবে ভোরের ঠান্ডা গায়ে না লাগিয়ে রিকশা নেওয়াটাই ঠিক হবে। স্ট্যান্ডটা কোন দিকে? কাউকে
জিজ্ঞেস করলে হয়।
কাকে?
সোডিয়াম লাইটে ঝকঝক করছে স্টেশন। কিন্তু একটাও লোক
নেই। তবে কি ও একাই এই হতচ্ছাড়া স্টেশনের টিকিট কেটেছে? তাহলে যে জনাচারেক লোক ওর কামরায়
ছিল! নিশ্চয়ই আগের কোন স্টেশনে নেমে গেছে।
নাঃ; সমস্ত খিড়কি বন্ধ। সকালের আগে বোধহয় কোন গাড়ি
নেই।টিকিট কাউন্টারের বন্ধ কপাটে ঠুক ঠুক করেও লাভ হল না। ওয়েটিং রুম খালি। চায়ের দোকান
বন্ধ।
বাইরে বেরিয়ে আরও অবাক। একটাও রিকশা নেই। চৌমাথা খাঁ
খাঁ করছে।
সুবিমল ল্যান্ডমার্ক মিলিয়ে নেয়। পকেট থেকে সিগারেট
বের করে ধরায়। একমুখ ধোঁয়া ছাড়ে। এবার ও হাঁটতে শুরু করে।
কুয়াশা বাড়ছে। উঁচু উঁচু থামের উপর সোডিয়াম বাতিগুলো
সএকঠেঙে দৈত্যের মত ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
খানিকক্ষণ পরেই শীতবোধটা চলে যায়।এবার যেন অন্ধকার
পাতলা হয়ে আসছে।
কতদূর হেঁটেছে ও? আবার কাগজটা দেখে। আর পাঁচশ' মিটার।
হটাৎ মনে হল ও একা নয়। পেছনে পায়ের শব্দ। ও থেমে গিয়ে
পেছনে ঘুরে দাঁড়ায়। ছিনতাইবাজ?
নাঃ; ওরই মনের ভুল।
কিন্তু দু-দুবার একই রকম ভুল?
আর দুটো গলি পরেই ডাইনে মুড়ে গলির ভেতর একটা গ্যারেজের
গায়ে লাগা ঘর। জানলায় থেমে থেমে তিনটে টোকা।ব্যস্, দরজাটা খুলে যাবে। স্ট্যানলি হোক
বা ওর কোন কমরেড,-- চা খাওয়াবে নিশ্চয়ই।
কিন্তু সুবিমল প্রথম গলিটা পেরোতে পারল না।
পেছন থেকে কে বা কারা ওর হাতটা মুচড়ে ধরেছে।আর একটা
হাত চেপে ধরেছে ওর কলার। ওর গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না।
সাঁড়াশির মত কঠিন হাতের চাপে ওর শরীর সামনে এগিয়ে চলল-
কিন্তু ঠিক পায়ে হেঁটে নয়, যেন হাওয়ায় ভেসে।
ও পৌঁছে গেছে একটা মাঠের মাঝখানে। এই কাকভোরেও জায়গাটা
গিজগিজ করছে লোকে। একটা বিশাল জনসভা?
হ্যাঁ, অন্য প্রান্তে একটা মঞ্চের মত, তাতে তিনজন বসে
আছে। এত দুর থেকে মুখগুলো দেখা যাচ্ছে না।
ওঁরা বোধহয় কোন হাসির কথা বললেন।প্রত্যুত্তরে গোটা
মাঠ জুড়ে ধানখেলানো হাওয়ার মত এক নিঃশব্দ
কহকহা বয়ে গেল।
ও ঘাড় ঘোরাতে পারছে না। কিন্তু অনুভব করছে যে চারপাশে
অনেক লোক।
কারো অদৃশ্য হাতের ঠেলায় ও পৌঁছে গেল মঞ্চের উপর।
সাদা কাপড়ে ঢাকা টেবিলের ওপাশে তিনজন। তার মধ্যে একজন
নারী।
এবার ওর হাত ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বৃদ্ধ লোকটির থুতনিতে ছুঁচলো দাড়ি।
-- কে তুমি?
প্রশ্নটি উচ্চারিত হতেই চারদিকে ফিসফিসানির ঝড় উঠল--
গুপ্তচর! গুপ্তচর!
সুবিমল আঁতকে উঠল-- না, না। আমি গুপ্তচর-টর নই, বিশ্বাস
করুন।
-- বিদেশি! সত্যি কথা বল। তুমি এখানে ঢুকলে কী করে?
পাসপোর্ট?
আছে, আছে।
সুবিমল প্রাণপণে প্যান্টের পকেট হাতড়ায়।
নেই! চিরকুটটা কখন পড়ে গেছে। বোধহয় যখন ওর হাত মুচড়ে
ধরেছিল।
দ্বিতীয়জনের বয়েস কম। ও মুচকি হেসে বলে-- ত্তুমি কোন
দলের লোক? বলেই ফেল। চালাকি করে লাভ নেই।
-- আমি কোন দলের না, কাউকে ভোট দিই না।
পেছন থেকে আওয়াজ ওঠে-- মিথ্যে কথা ! ওর দলের নাম হল
"হৃদয়ের দিকে হলুদ সাবমেরিন"।
-- কী সব বলছেন! ওরকম কোন দলের নাম জীবনে শুনিনি।
-- ফের চালাকি!
দ্বিতীয়জনের ইশারায় একজন এগিয়ে এসে ওর পুলওভার, শার্ট
আর গেঞ্জি একের পর এক পট পট করে টেনে ছিঁড়ে ফেলে।
দ্বিতীয়্জন হাসে,-- বলেছিলাম, আমাদের ভুল হয় না।
সুবিমল অবাক হয়ে দেখে ওর বুকের বাঁদিকে একটা উল্কি
করা-- ছোট্ট একটা হলুদরঙা সাবমেরিনের আভাস।
সুবিমল হতাশায় কেঁদে ফেলে।
-হুজুর, আমায় ছেড়ে দিন। আমি স্পাই নই। ভোর হলেই--।
ওর কথা শেষ হয় না।
-- ভোর? নতুন শব্দ শুনছি। ভোর কাকে বলে?
-- ভোর মানে প্রভাত, মানে সকাল। মানে রাত্রি শেষ, দিনের
শুরু। অন্ধকার কেটে গিয়ে আলো ফুটে ওঠা।
সুবিমল খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মত করে বোঝাতে চায়।
- অল গিবেরিশ! এখানে ওসব কিছুই হয় না। আলো কমে বাড়ে
না।
বৃদ্ধ লোকটি বিরক্তিতে মুখ বেঁকায়।
সুবিমল এবার আতংকে দিশেহারা। এ কোথায় এসে পড়েছে?
দ্বিতীয় লোকটি বলে--এখানে কার কাছে এসেছিলে? সত্যিটা
বলে ফেল। লাস্ট চান্স!
-- বন্ধুর কাছে।
-- বন্ধু! বন্ধু কাকে বলে? ফের নতুন নতুন শব্দ দিয়ে
ভড়কি দেওয়া?
-- বন্ধু মানে দোস্ত, মানে সাথী। মানে যার কাঁধে মাথা
রেখে কাঁদা যায়। মানে যাকে সুদুমুদু ভালবাসা--!
-- ভালবাসা! উয়ো কিস্ চিড়িয়া কে নাম?
প্রশ্নটা আচমকা এল এতক্ষণ চুপ করে থাকা নারীটির কাছ
থেকে।
সুবিমলের মাথা বুকের উপর নুয়ে পড়েছে।
এবার নারী উঠে দাঁড়ায়।ওর চোখে ছুরির ধার।মাপা পায়ে
সুবিমলের সামনে এসে ওকে হিমশীতল আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলে। ওর চুম্বনে বাসি রক্তের স্বাদ
আর পচা মাংসের গন্ধ।
চেতনা হারানোর আগে সুবিমল শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে
ওকে ধাক্কা দেয়। আর মঞ্চের থেকে লাফিয়ে নেমে দৌড়তে শুরু করে।
ওর শরীরে কোত্থেকে এত তাগদ এল ও জানে না।
মুর্দানগরের রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে সুবিমল। পেছনে
নেকড়ে বাঘের গর্জন।এ গলি, ও গলি। কিন্তু ওরা প্রায় ধরে ফেলেছে। দুপাশের ফুটপাথে সারি
সারি লোক শুয়ে আছে। সাদা কাপড় মুড়ি দিয়ে।কিন্তু কারও কোন হেলদোল নেই।
সামনে একটা বাতিঘর। আর একটু, আর একটু! কিন্তু বুকটা
যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। দম ফুরিয়ে আসছে।
ওকে নেকড়ে বাঘের গায়ের বোঁটকা গন্ধ তাড়া করছে। এবার
গরর্ গরর্ কানের কাছে।
একটা ফুটপাথের পাশ দিয়ে পড়িমড়ি করে ছুটে যেতে যেতে
কিসে যেন হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল সুবিমল।
অমনি সাদা কাপড়ের নীচ থেকে বেরিয়ে আসা একটা ঠান্ডা
হাত ওকে নিরাপদ আশ্রয়ে টেনে নিল।
কানের গোড়ায় ফিসফিস করছে স্ট্যানলির চেনা গলার স্বর।
-- বড্ড হাঁফিয়ে গেছিস দোস্ত। আয়, একটু রেস্ট নে এবার।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন