ধারাবাহিক উপন্যাস
দ্য ক্লাউড
(২৫)
রাতটা বোধহয় পৃথিবীর ছিল না। উৎপল পরে মনে করতে পারেনি, কখন সে স্কুলের মাঠে এসে দাঁড়িয়েছিল।
শুধু মনে আছে, সেদিন আকাশের সমস্ত মেঘ গোল হয়ে বসেছিল। মেঘেরও যে আসন হয়, সে আগে জানত না।
মেঘালয়ের পাহাড় থেকে একটি কালো মেঘ ধীরে ভেসে এলো। তার পিছু পিছু মিজোরামের অরণ্যের গন্ধ। ত্রিপুরার বাঁশবনের বাতাস। বরাক উপত্যকার আর্দ্রতা। ব্রহ্মপুত্রের দীর্ঘশ্বাস। তারপর ডুয়ার্সের চা-বাগানের কুয়াশা, তিস্তার ভেজা হাওয়া, মহানন্দার কাদামাটি, গঙ্গার ধারে জমে থাকা মানুষের নিশ্বাস। সব মেঘ এসে একটি মাত্র আকাশে জড়ো হলো। উৎপল মনে করলো— এরা সবাই যেন অনেকদিন ধরে একে অপরকে খুঁজছিল। মাঝখানে জাতীয় পতাকা। পতাকার নিচে ভাঙা বিজ্ঞাপনের টিন। আর ঠিক তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আনন্দ। আজ তার গায়ে কোনো বিজ্ঞাপন নেই। কোনো বাজার নেই। কোনো বৃদ্ধাবাস নেই। শুধু তার সেই চেনা, নির্ভার হাসি। সে দুই হাত তুলে বললো—
শুনুন...
মুহূর্তেই বাতাস থেমে গেল। ফটিকজল পাখিরা উড়তে উড়তে স্থির হয়ে রইলো। দূরে বজ্র গড়িয়ে গেল। বিদ্যুৎ আকাশের গায়ে একটানা সাদা রেখা টেনে দিল। মনে হলো, অদৃশ্য কোনো হাত আলপনা আঁকছে।
আনন্দ আবার বললো—
আজ কোনো একক ধর্মের অনুষ্ঠান নয়। আজ কোনো রাষ্ট্রের অনুষ্ঠানও নয়। আজ পৃথিবী তার হারিয়ে যাওয়া দুইজন নাগরিককে পাশাপাশি দাঁড়াতে দেবে।
উত্তর দিকের মেঘ সরলো। একজন তরুণী এগিয়ে এলো। খাকি পোশাক আর ভেজা নয়। জল শুকিয়ে গেলেও, তার সমস্ত শরীর জুড়ে সূর্যের টকটকে লাল রং। এতদিন ধরে সে যে কেবলই পৃথিবীতে তদন্তের অংশ হিসেবে থেকেছে, তার চোখে তদন্তের ক্লান্তির পরিবর্তে এক অপার শান্তির বাতাস। শুধুই যেন দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা মানুষের শান্তি গঙ্গানদীর মতো বহমান সে চোখে।
দক্ষিণ দিক থেকে বাবলু। আজও তার পায়ের নিচে ছায়া নেই। তবু সে এগিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে, আলোই তাকে বহন করছে। দুজন এসে থামলো। মাঝখানে আনন্দ। কেউ কথা বললো না। শুধু পতাকাটা ধীরে ধীরে দুলতে লাগলো। উৎপল তখন বুঝলো— আজ এই মাঠে শুধু মানুষ আসেনি। এসেছে ঋতু। বসন্ত তার শিমুলফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বর্ষা ভিজে মেঘের আঁচল মেলে দিয়েছে। শরৎ কাশফুল নামিয়ে রেখেছে মাঠের একপাশে। হেমন্ত ধানের গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে। শীত শিশির নিয়ে নীরবে বসে আছে। ফাল্গুন পলাশের আগুন নিভিয়ে আজ সাদা হয়ে গেছে।
আনন্দ ধীরে বললো— ভারতবর্ষ শুধু মানচিত্র নয়। মানুষ চলে যায়। ঋতু থেকে যায়। নদী থেকে যায়। গান থেকে যায়।
ঠিক তখনই উৎপল অনুভব করলো— চারদিক ভরে উঠছে অদৃশ্য উপস্থিতিতে। কেউ দৃশ্যমান নয়। তবু বাতাসে কত কণ্ঠ। কোথাও যেন বাউলের একতারা। কোথাও বাঁশির দীর্ঘ সুর। কোথাও শঙ্খ। কোথাও আজানের ঢেউ। কোথাও মন্দিরের ঘণ্টা। কোথাও পাহাড়ি বাঁশির ডাক। কোথাও গির্জার নীরব প্রার্থনা। সব শব্দ এসে একসময় শব্দহীন হয়ে গেল।
আনন্দ মৃদু হেসে বললো— আজ সবাই অতিথি। যাদের নাম ইতিহাসে লেখা আছে... যাদের নাম ইতিহাস ভুলে গেছে... যারা যুদ্ধ করেছে... যারা মাঠে ধান কেটেছে... যারা শুধু সন্তানকে মানুষ করেছে... যারা কোনোদিন নিজের নাম কোথাও লেখেনি... আজ সবাই একই আসরে।
নিমচাঁদ দাগার কণ্ঠ ভেসে এলো— আমি উপস্থিত। মনিরত্না— আমিও। তারপর আরও কত কণ্ঠ। কোনোটার নাম নেই। নামের দরকারও নেই। কারণ বাতাস কারও পরিচয়পত্র চায় না। আনন্দ দুই হাত বাড়িয়ে বাবলু আর তরুণীটির মাঝখানে বাতাস রেখে বললো— — এই বাতাসই সাক্ষী। এই মেঘই অগ্নি। এই বজ্রই মন্ত্র। এই বিদ্যুৎই মঙ্গলপ্রদীপ। আর এই পতাকা... আজ শুধু রাষ্ট্রের নয়। আজ এটি সমস্ত অসমাপ্ত মানুষের শ্বাসে ভরা একটি কাপড়। বাবলু প্রথমবার তরুণীটির দিকে তাকালো। তরুণীটিও তাকালো। কেউ কারও হাত ধরলো না। প্রয়োজনও হলো না। ঠিক তখনই উৎপলের ডেটা-ডায়েরি নিজে থেকেই খুলে গেল। কোনো নাম লেখা হলো না। কোনো নথি নয়। শুধু দুটি ফাঁকা পৃষ্ঠা ধীরে ধীরে একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে মিললো। উৎপল বুঝলো— সব বিবাহ মানুষের সামনে হয় না। কিছু কিছু বিবাহের সাক্ষী থাকে কেবল আকাশ।
দূরে মেঘ আবার গর্জে উঠলো। কিন্তু আজ সেই গর্জন ভয়ের নয়। মনে হলো— ভারতবর্ষ নিজেই আশীর্বাদ করলো।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন