বিপ্লবের মরমিতা
আপাতদৃষ্টিতে 'বিপ্লব' ও 'মরমিবাদ' বা মিস্টিসিজম-কে দুটি বিপরীতমুখী বিষয় মনে হতে পারে। 'বিপ্লবের মরমিতা' কথাটিকে মনে হতে পারে স্ববিরোধী বা প্যারাডক্সিকাল: কারণ বিপ্লব হলো বাইরের জগতের বৈপ্লবিক পরিবর্তন, ভাঙাগড়া আর রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলন; অপরদিকে মরমিবাদ হলো মানুষের অন্তর্জগতের নীরব রূপান্তর, আধ্যাত্মিক সাধনা ও পরম সত্যের সাথে একাত্ম হওয়া। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যায়, এই দুটি ধারার মিলনস্থলেই জন্ম নেয় 'বিপ্লবের মরমিতা'। এটি মূলত বাহ্যিক লড়াইয়ের পেছনের সেই গভীর আত্মিক তাড়না, যা একজন বিপ্লবীকে নিজের জীবনের চেয়েও বড় কোনো আদর্শের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করে। বাহ্যিক শৃঙ্খলমুক্তির বস্তুগত লড়াই যখন মানুষের অন্তরাত্মার অবিনশ্বর তৃষ্ণা, মহাজাগতিক ন্যায় এবং এক পরম নিঃশর্ত প্রেমের রূপ নেয়, তখনই ‘বিপ্লবের মরমিতা’র জন্ম হয়।
মরমিবাদের মূল কথা হলো নিজের 'অহং' বা ক্ষুদ্র সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে এক বৃহত্তর সত্যের সন্ধান করা। বিপ্লবের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। একজন প্রকৃত বিপ্লবী নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ, সুখ ও সুরক্ষাকে বিসর্জন দেন সামষ্টিক মুক্তির জন্য। এই যে নিজের ভেতরের লোভ, ভয় ও স্বার্থপরতাকে জয় করা— এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক বা মরমি সাধনা।
মরমি সাধকেরা স্রষ্টা বা পরম সত্তার প্রতি যে গভীর, নিঃশর্ত প্রেম বা 'ইশকে হাকিকি' অনুভব করেন, বিপ্লবের মরমিয়া ধারায় সেই প্রেমের স্থান নেয় 'মানবপ্রেম' বা 'শোষিতের প্রতি ভালোবাসা'। চে গুয়েভারা বলেন, "একজন প্রকৃত বিপ্লবী পরিচালিত হন এক গভীর ভালোবাসার অনুভূতি দ্বারা।" এই ভালোবাসা যখন সাধারণ মানুষের সীমানা ছাড়িয়ে এক পরম আদর্শে রূপ নেয়, তখন তা মরমি রূপ পরিগ্রহ করে।
মরমি দর্শনে সুফিদের 'ফানা' তথা নিজেকে বিলীন করা বা ভারতীয় দর্শনে 'মোক্ষ' লাভের যে আকাঙ্ক্ষা, বিপ্লবের মাঠে তা দেখা যায় দেশের বা শোষিত মানুষের মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমে। একজন বিপ্লবী যখন হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি বরণ করেন বা বুলেট বুকে নেন, তখন তাঁর মধ্যে মৃত্যুভয় কেটে যায়। তিনি বিশ্বাস করেন, এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে তিনি এক চিরন্তন আদর্শের অংশ হয়ে উঠছেন। এটি মরমি চেতনারই এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
বিপ্লবের মরমিতা আমাদের শেখায় যে, কেবল তরবারি বা বন্দুক দিয়ে প্রকৃত বিপ্লব হয় না; বিপ্লবের আসল উৎসস্থল মানুষের হৃদয়। যখন কোনো ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন বা বিপ্লবের পেছনে গভীর আত্মিক সত্য, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর ন্যায়ের প্রতি মরমি টান থাকে, তখনই সেই আন্দোলন মানুষের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এটি রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে এক পবিত্র আত্মিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
বিপ্লবের মরমিতার প্রথম স্তম্ভ হলো একটি অন্তর্দৃষ্টিমূলক আকাঙ্ক্ষা বা ভিশন। বর্তমানের জরাজীর্ণতাকে ভেঙে এক তাত্ত্বিকভাবে 'অসম্ভব' সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখা। তারপর এক অগ্নিদীক্ষা বা শপথ অর্থাৎ বায়াত গ্রহণ। দুঃখ-কষ্ট ও নিপীড়নকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করে, সম্ভাব্য আত্মদানকেও মেনে নিয়ে, নিজেকে বিপ্লবের উপযোগী করে তোলা। এরপর একটি সর্বজনীন ঐক্য উপলব্ধি করা। শোষিত মানুষের কান্নার মধ্যে মহাজাগতিক এক সুর খুঁজে পাওয়া যা সবাইকে একসূত্রে গাঁথে।
বিপ্লবের এই দর্শনে মনে করা হয় যে, পরিবর্তন কেবল মানুষের ইচ্ছায় নয়, বরং ইতিহাসের এক অমোঘ নিয়মে (হিস্ট্রিক্যাল নেসেসিটি) ঘটবে। এই 'অমোঘ নিয়ম'-এর প্রতি বিপ্লবীর যে অগাধ আস্থা, তা অনেকটা ঈশ্বরবাদীদের 'তকদির' বা 'বিধিলিপি'র প্রতি বিশ্বাসের মতো গভীর। এখানে মার্ক্সীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ আর মরমিবাদের এক অদ্ভুত মিলন ঘটে। বিপ্লবের মিস্টিসিজমে 'ব্যক্তি আমি' এবং 'সামষ্টিক আমি'-এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও মিলনই হলো মূল আধ্যাত্মিক যাত্রা। সাধারণ আধ্যাত্মিকতায় যেখানে মোক্ষ বা নির্বাণ ব্যক্তিগত, বৈপ্লবিক দর্শনে সেখানে মুক্তি হলো সামষ্টিক।
বিপ্লবের প্রথম ধাপ হলো ব্যক্তির আমিত্বকে চূর্ণ করা। এখানে 'আমি' মানে কেবল একটি শরীর বা নাম নয়, বরং ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, ভয় ও সংকীর্ণতা। একজন মরমি সাধক যেমন নির্জনে উপাসনা করে রিপু দমন করেন, একজন বিপ্লবী তেমনি রাজপথে মিছিল, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধমূলক বিবিধ কার্যক্রম এবং জেল-জুলুমের মধ্য দিয়ে নিজের ভয়কে জয় করেন।
যখন ব্যক্তি নিজের অস্তিত্বকে শোষিত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিলিয়ে দেয়, তখনই জন্ম নেয় 'সামষ্টিক আমি'। এটি একটি অতীন্দ্রিয় অনুভূতি— যেখানে অন্যের ক্ষুধা নিজের পেটে অনুভূত হয় এবং অন্যের বিজয় নিজের আনন্দ হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতীয় দর্শনে 'সোহং' অর্থাৎ 'আমিই সেই পরমাত্মা' বা সুফির 'আনাল হক' তথা 'আমিই পরম সত্য' ধারণার মতো বিপ্লবের মরমিবাদেও এক ধরনের একাত্মতা কাজ করে। এখানে পরমাত্মার বদলে বিরাজ করে 'জনগণ'।
একা একজন মানুষ দুর্বল, কিন্তু যখন সে নিজেকে লক্ষ-কোটি মানুষের অংশ হিসেবে অনুভব করে, তখন তার মধ্যে এক 'অলৌকিক' সাহস সঞ্চারিত হয়। এই অজেয় মানসিক অবস্থাই হলো বিপ্লবের মিস্টিসিজম।
আদর্শ সমাজ ও সাম্যবাদী সমাজের ধারণা যখন মিস্টিসিজম বা মরমিবাদের সাথে মিলিত হয়, তখন তা কেবল একটি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কাঠামো থাকে না; বরং তা মানুষের আত্মিক ও সামাজিক বিবর্তনের এক চরম লক্ষ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়।
মরমিবাদের মূলে রয়েছে 'একত্ববাদ'—সবকিছুর মধ্যে এক পরম সত্তাকে অনুভব করা। সাম্যবাদী সমাজে যখন শ্রেণীহীনতা ও সম্পদের সমান বণ্টনের কথা বলা হয়, তখন তার দার্শনিক ভিত্তি হলো : 'সবার উপরে মানুষ সত্য।'
মরমিবাদীরা বিশ্বাস করেন যে মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই কারণ সবার উৎস এক। সাম্যবাদ এই আধ্যাত্মিক সত্যকে জাগতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চায়। যেখানে শোষণ নেই, সেখানে মানুষের আত্মিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় না।
আদর্শ সমাজ একটি ইউটোপিয়ান কল্পনা। আদর্শ সমাজের কল্পনা সবসময়ই কিছুটা মিস্টিক বা রহস্যময়। প্লেটোর 'রিপাবলিক' থেকে শুরু করে আধুনিক সাম্যবাদী স্বপ্ন— সবই এক ধরনের অতি-জাগতিক সুন্দরের আকাঙ্ক্ষা।
একটি আদর্শ সমাজ গঠনের জন্য যে ত্যাগ ও সংগ্রামের প্রয়োজন, তা অনেকটা সুফি বা সন্ন্যাসীদের কঠোর সাধনার মতো। এখানে ব্যক্তিগত লোভ-লালসা বিসর্জন দিয়ে একটি পবিত্র লক্ষ্য তথা সাম্য অর্জনই হলো মূল আরাধনা।
মরমিবাদে 'খোদাপ্রেম' বা 'ব্রহ্মজ্ঞান' মানুষকে স্বার্থপরতা থেকে মুক্তি দেয়। একইভাবে, সাম্যবাদী সমাজে একজন ব্যক্তি নিজের স্বার্থের চেয়ে সমাজের স্বার্থকে বড় করে দেখে।
যখন মানুষ নিজের শ্রমের ফল কেবল নিজের জন্য না রেখে অন্যের জন্য বিলিয়ে দিতে আনন্দ পায়, তখন সেখানে এক ধরনের 'সেক্যুলার মিস্টিসিজম' কাজ করে। এটি মানুষের ভেতরের পাশবিক প্রবৃত্তি জয় করে দেবত্ব বা উচ্চতর মনুষ্যত্বে পৌঁছানোর এক প্রক্রিয়া।
সাম্যবাদের বিপ্লবী ভাবধারাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটিতে ধর্মের মতোই উপাদানরাশি কাজ করে। বিপ্লব বিজয়ী হবে, সাম্যবাদী সমাজ আসবে, এটা প্রায় ধর্মীয় ইমানের মতোই একটা বিশ্বাস। এই ভাবধারার নিজস্ব প্রতীক (কাস্তে-হাতুড়ি, লাল পতাকা), শহিদগণ (যেমন চে গুয়েভারা), নগর সঙ্কীর্তনের মতন র্যালি ও গান (‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে', ১ 'আমরা করব জয়' কিংবা 'জাগো অনশন বন্দও ওঠো রে যত') এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যে আদর্শ সমাজের প্রতি অটল বিশ্বাস থাকে। এই যে অজানাকে জয় করবার এবং না-দেখা এক সুন্দর পৃথিবীকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার যে স্বপ্ন, এটাই মূলত মিস্টিসিজমের বৈপ্লবিক সংস্করণ।
বিপ্লবের সন্ত চে গুয়েভারা
আর্নেস্তো চে গুয়েভারা (১৯২৮-১৯৬৭) ছিলেন একাধারে চিকিৎসক, লেখক, গেরিলা তাত্ত্বিক এবং লাতিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও অবিসংবাদিত প্রতীক। আর্জেন্টিনার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া চে-র দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে যায় তাঁর ছাত্রজীবনের এক মোটরসাইকেল ভ্রমণের মাধ্যমে। লাতিন আমেরিকার প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে দেখার সময় তিনি সাধারণ মানুষের চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বহুজাতিক পুঁজিবাদের নির্মম শোষণ সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। এই মানবিক বিপর্যয় তাঁর সংবেদনশীল হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তিনি উপলব্ধি করেন যে, কেবল চিকিৎসার মাধ্যমে নয়, বরং সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমেই এই সামাজিক ব্যাধির স্থায়ী নিরাময় সম্ভব।
১৯৫৫ সালে মেক্সিকোতে থাকার সময় চে গুয়েভারার সাথে ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি কিউবার স্বৈরশাসক বাতিস্তাকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে গঠিত '২৬শে জুলাই আন্দোলনে' যোগ দেন। চিকিৎসক হিসেবে শুরু করলেও নিজের অদম্য সাহস, কঠোর শৃঙ্খলা এবং যুদ্ধকৌশলের দক্ষতায় তিনি দ্রুতই গেরিলা বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার পদে উন্নীত হন। ১৯৫৯ সালে কিউবান বিপ্লবের সাফল্যের পর তিনি নতুন সরকারের শিল্পমন্ত্রী ও সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তবে চে-র বৈপ্লবিক সত্তা কেবল কিউবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বৃত্তে আটকে থাকার মতো ছিল না। তাঁর কাছে বিপ্লব ছিল বিশ্বমানবতার শৃঙ্খলমুক্তির এক অনন্ত আত্মিক ইবাদত। তাই কিউবার সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ও মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে তিনি কঙ্গো এবং পরবর্তীতে বলিভিয়ায় আন্তর্জাতিক বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলতে চলে যান। ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর বলিভিয়ার জঙ্গলে সিআইএ-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর হাতে তিনি আহত ও বন্দি হন এবং পরদিন ৯ অক্টোবর তাঁকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর শান্ত ও নির্ভীক অবয়ব একজন ঘাতককে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। চে-র কাছে বিপ্লব ছিল মানুষের প্রতি এক তীব্র ও নিঃশর্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। আলবার্তো কোর্দার ক্যামেরায় বন্দি তাঁর সেই চিরতরুণ, দ্রোহী চাউনির ছবি আজ বিশ্বজুড়ে সমস্ত অন্যায়, শোষণ আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষের অবিনশ্বর আত্মার এক জীবন্ত ইশতেহার।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন