কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

 


কালিমাটি অনলাইন / ১৪২ / চতুর্দশ বর্ষ : তৃতীয় সংখ্যা   

   


 

 

এই সময়ের ভারতীয় শ্রেষ্ঠ ফটোগ্রাফার এবং ফটোসাংবাদিক রঘু রাই সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল তিরাশি বছর। তাঁর জন্ম হয়েছিল ইংরেজ শাসনকালীন ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের ঝাং  গ্রামে (বর্তমানে পাকিস্তানের অন্তর্গত)। তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে সিভিল ইঞ্জিনীয়ারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন যদিও মাত্র তেইশ বছর বয়সে পেশাগতভাবে ফটোগ্রাফিকে গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফটোগ্রাফার অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁর শিষ্য।

রঘু রাই ১৯৬৬ সালে একজন ফটোগ্রাফার রূপে নয়াদিল্লির 'দ্য স্টেটসম্যান' হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি 'দ্য স্টেটসম্যান' ছেড়ে দেন এবং একজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার হন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি 'ইন্ডিয়া টুডে'-র ফটোগ্রাফি পরিচালক ছিলেন। ভারতীয় আধুনিক ইতিহাসের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যেমন ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ শরণার্থী সংকট এবং ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির ছবি তোলার তিনি জন্য বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তার ফটো প্রবন্ধগুলি নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত পত্র-পত্রিকায় -- 'টাইম', 'লাইফ', 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস', 'দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট' এবং 'দ্য নিউ ইয়র্কার' ইত্যাদি। এর পাশাপাশি তিনি ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর জুরিতে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁর প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে বিশেষ করে ‘ইন্ডিয়া: রিফ্লেকশনস ইন কালার এবং ‘রিফ্লেকশনস ইন ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালে প্যারিসে তাঁর কাজের একটি প্রদর্শনী দেখে মুগ্ধ হয়ে অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ ১৯৭৭ সালে রঘু রাইকে ম্যাগনাম ফটোসে যোগদানের জন্য মনোনীত করেন।

প্রসঙ্গত আরও উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৮৪ সালে ‘ইন্ডিয়া টুডের সাংবাদিক হিসেবে তিনি ভোপালের  রাসায়নিক বিপর্যয় এবং গ্যাস আক্রান্তদের জীবনের উপর এর চলমান প্রভাব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ  তথ্যচিত্র প্রকল্প সম্পন্ন করেন। এই কাজের ফলস্বরূপ 'এক্সপোজার: এ কর্পোরেট ক্রাইম' নামে একটি বই এবং তিনটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়, যা বিপর্যয়ের ২০তম বার্ষিকী, অর্থাৎ ২০০৪ সালের পর ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রদর্শিত হয়েছিল। এছাড়া তিনি ভারতের সংস্কৃতি  ও জনগণের উপর আলোকপাত করে ১৮টিরও বেশি বই রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে দিল্লি, দ্য শিখস, কলকাতা, খাজুরাহো, তাজমহল, তিব্বত ইন এক্সাইল, ইন্ডিয়া এবং মাদার টেরেসা। তাঁর  ফটো প্রবন্ধগুলি প্রকাশিত হয়েছিল টাইম, লাইফ, জিও, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, সানডে টাইমস, নিউজউইক,  দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং দ্য নিউ ইয়র্কার সহ আরও অনেক সংবাদপত্র এবং পত্র-পত্রিকায়। তিনি ১৯৯০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর জুরিতে এবং ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক ফটো প্রতিযোগিতার জুরিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনের করেছিলেন, ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত করেছিল।

রঘু রায় প্রয়াত হয়েছেন সম্প্রতি দিল্লিতে ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে। বিগত দুবছর তিনি প্রোস্টেট ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করার পর তিরাশি বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদন করি আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম।  

 

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

kajalsen1952@gmail.com

দূরভাষ যোগাযোগ : 9835544675

 

 


<<<< কথনবিশ্ব >>>>

 

কথনবিশ্ব


সাইদুর রহমান

 

ভারতের গণতন্ত্রে ধর্মীয় রাজনীতি: সংকট ও উত্তরণের পথ

 


ভারতবর্ষকে বুঝতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয়ে একমত হতে হবে যে এই দেশ একরৈখিক নয়, বহুমাত্রিক। একইসঙ্গে এই দেশ বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু বিশ্বাস ও বহু ইতিহাসের বৈচিত্র্যময় সমাবেশ। এই বহুত্বই ভারতের প্রাণশক্তি, আবার এই বহুত্বই তার দুর্বলতার সম্ভাবনাও বহন করে। গণতন্ত্র এই বহুত্বকে একত্রে ধরে রাখার একমাত্র রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের ভিতরেই যখন বিভাজনের বীজ বোনা হয়, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যিই গণতান্ত্রিক, নাকি শুধুই গণতন্ত্রের আচার পালন করি?

ভারতের সংবিধান রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে ঘোষণা করলেও, এই ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো শূন্যতায় জন্মায়নি। এটি এসেছে এক দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্য দিয়ে, যেখানে ধর্ম কখনও মুক্তির ভাষা হয়েছে, কখনও আবার বিভেদের। ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ব্রিটিশরা যে কৌশলে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপান্তরিত করেছিল, তার অভিঘাত আজও কাটেনি। পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক বিভাজন—সবই এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল যে, স্বাধীনতার পরেও তার প্রভাব সমাজের গভীরে থেকে যায়। দেশভাগ সেই ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম পরিণতি, যেখানে ধর্ম শুধুমাত্র বিশ্বাস নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি, উদ্বাস্তু জীবন, আর অসংখ্য মানুষের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি — ভারতীয় সমাজের চেতনায় এক স্থায়ী ছায়া ফেলে রেখেছে।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রনির্মাতারা সেই ছায়া কাটিয়ে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের ক্ষত এত সহজে মুছে যায় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষতকে নতুন করে উসকে দেওয়া হয়েছে—কখনও রাজনৈতিক স্বার্থে, কখনও সামাজিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। বিশেষত বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে দেখা যায়, ধর্মীয় পরিচয় ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে চলে আসছে। রাম জন্মভূমি আন্দোলন বা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মতো ঘটনাগুলি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলি এমন এক রাজনৈতিক ধারার প্রতীক, যেখানে ধর্মকে জনমত সংগঠনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

এই ব্যবহার কেবল নির্বাচনী কৌশলে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, চিন্তাভাবনা ও পারস্পরিক সম্পর্কের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। যখন মানুষ নিজেকে প্রথমে নাগরিক হিসেবে নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ভাবতে শুরু করে, তখন গণতন্ত্রের মূল ধারণাই বিপন্ন হয়ে ওঠে। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো সমান নাগরিকত্ব—যেখানে সকলের অধিকার সমান, এবং সেই অধিকার কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের উপর নির্ভর করে না। কিন্তু ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়, মানুষের মধ্যে এক অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি করে, যা কখনও প্রকাশ্য সংঘর্ষে, কখনও নিঃশব্দ অবিশ্বাসে রূপ নেয়।

এই প্রক্রিয়াটি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কারণ, যা সমাজ, অর্থনীতি, মনস্তত্ত্ব এবং রাজনীতির জটিল আন্তঃসম্পর্কের ফল। আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তন অনেক মানুষের মধ্যে একধরনের পরিচয় সংকট তৈরি করেছে। যখন সামাজিক কাঠামো বদলে যায়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন মানুষ এমন কিছুতে আশ্রয় খোঁজে যা তাকে স্থিরতা ও নিরাপত্তা দেয়। ধর্ম সেই আশ্রয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই আশ্রয়কে যখন রাজনৈতিক শক্তি সংগঠিত করে, তখন তা সহজেই আবেগের জোয়ারে পরিণত হয়, যা যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়।

অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং সামাজিক অবহেলা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এই ক্ষোভকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত না করা যায়, তবে তা সহজেই অন্য কোনো গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ায়। তখন ধর্মীয় পরিচয় সেই ক্ষোভের একটি সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে শিক্ষার সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব মানুষকে গুজব ও প্রোপাগান্ডার প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে। আজকের ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুততর করেছে, যেখানে অল্প সময়ের মধ্যে অসত্য তথ্যও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিও চাপে পড়ে। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যম—যেগুলি গণতন্ত্রের স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত—তাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে। যখন রাজনৈতিক শক্তি ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগায়, তখন এই প্রতিষ্ঠানগুলির উপরও সেই আবেগের চাপ পড়ে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যুক্তির পরিবর্তে আবেগ ও রাজনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পেতে থাকে। এর ফলে আইনের শাসন দুর্বল হয়, এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে। একই সঙ্গে সংখ্যাগুরুদের মধ্যেও একধরনের কৃত্রিম হুমকির বোধ তৈরি করা হয়, যা আরও মেরুকরণ সৃষ্টি করে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি গণতন্ত্রের ভিতকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে। এটি কোনো হঠাৎ বিপর্যয় নয়; বরং ধীরে ধীরে জমে ওঠা এক সংকট, যা অনেক সময় চোখে পড়ে না। কিন্তু যখন তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন অনেক ক্ষতি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। গণতন্ত্র তখন শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিণত হয়, যেখানে নির্বাচন হয়, সরকার গঠিত হয়, কিন্তু নাগরিকদের মধ্যে সমতা ও বিশ্বাসের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই অবস্থায় উত্তরণের পথ খোঁজা সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। বরং এই সংকটই আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—গণতন্ত্র আসলে কী, এবং আমরা তাকে কীভাবে রক্ষা করতে পারি। এর জন্য প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষা—শুধুমাত্র তথ্যের নয়, মূল্যবোধের শিক্ষা। এমন শিক্ষা যা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখায়, এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে সহাবস্থানকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। সমালোচনামূলক চিন্তা ও মানবিকতা—এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া কোনো গণতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

একই সঙ্গে সংবিধানের মূল আদর্শগুলিকে নতুন করে জীবন্ত করে তুলতে হবে। সমতা, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্ব—এই তিনটি শব্দ কেবল কাগজে লেখা নয়; এগুলি সমাজের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। ধর্মের নামে ঘৃণামূলক বক্তব্য বা বিভাজনমূলক রাজনীতিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে। গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তথ্যের সঠিক উপস্থাপনই জনমতকে প্রভাবিত করে।

নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণও অপরিহার্য। গণতন্ত্র কেবল সরকারের উপর নির্ভর করে না; এটি নাগরিকদের সচেতনতা ও অংশগ্রহণের উপরও নির্ভরশীল। আন্তঃধর্মীয় সংলাপ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সামাজিক উদ্যোগ—এইসব মাধ্যমের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো সম্ভব। মানুষ যখন একে অপরকে কাছ থেকে জানে, তখন বিভাজনের দেয়াল ভাঙা সহজ হয়।

সবশেষে, ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে একটি মৌলিক প্রশ্নের উপর—আমরা নিজেদের কীভাবে দেখি? যদি আমরা নিজেদের প্রথমে নাগরিক হিসেবে দেখি, তবে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। কিন্তু যদি আমরা নিজেদের শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করি, তবে সেই গণতন্ত্র ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে সম্মান পাওয়া উচিত, কিন্তু রাষ্ট্র ও রাজনীতির ক্ষেত্রে নাগরিকত্বই হওয়া উচিত প্রধান পরিচয়।

ভারতবর্ষের শক্তি তার বহুত্বে, এবং সেই বহুত্বকে ধারণ করার ক্ষমতাই তার গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা। ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান সেই পরীক্ষাকে কঠিন করে তুলেছে, কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি সুযোগও তৈরি করেছে—নিজেদের ভুলগুলো বুঝে নতুন করে পথচলা শুরু করার সুযোগ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সুযোগ গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

গণতন্ত্র শেষ পর্যন্ত কোনো যন্ত্র নয়, যা একবার তৈরি হলে নিজে নিজে চলতে থাকবে। এটি একটি জীবন্ত প্রক্রিয়া, যা প্রতিদিন নতুন করে নির্মিত হয়—আমাদের চিন্তায়, আমাদের কথায়, আমাদের কাজে। সেই নির্মাণ যদি যুক্তি, সহনশীলতা ও মানবিকতার উপর ভিত্তি করে হয়, তবে ধর্মীয় বিভাজনের অন্ধকারও তাকে থামাতে পারবে না। আর যদি আমরা সেই ভিত্তিকে উপেক্ষা করি, তবে সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রও ভিতর থেকে ভেঙে পড়তে পারে।

ভারত আজ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—যেখানে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সে কি বিভাজনের পথ বেছে নেবে, নাকি সহাবস্থানের। সেই সিদ্ধান্ত কেবল রাজনীতিবিদদের নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত রূপ কোনো সংসদ ভবনে নয়, মানুষের মনেই নির্ধারিত হয়।


রামতনু দত্ত

 

সব মানুষই সেকুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) যদি না অস্বীকার করে

 


সেকুলার শব্দের অর্থ ঠিক ধর্মনিরপেক্ষ নয়। তবে ভারতীয় সংবিধান শব্দটি ধর্মনিরপেক্ষ অর্থেই ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ সব ধর্মের ব্যাপারে রাষ্ট্র নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে। রাষ্ট্র সব ধর্মকে সমান গুরুত্ব দেয় এবং সমস্ত ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষের নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার মর্যাদা মেনে নেয়। প্রয়োজনে রাষ্ট্র তাঁদের পাশে থাকবে এবং জনগণের বিকাশে সাহায্য করবে। লক্ষণীয়, ধর্মের উপরে মানুষকে সত্য বলা হয়নি। সংবিধান প্রণেতারা ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্য বুঝতেন এবং জানতেন যে ধর্ম তা সে প্রাতিষ্ঠানিক ও লোকিক হোক, তা গণজীবনের অংশ। ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রাষ্ট্র ধর্ম থেকে দূরত্ব রক্ষা করে তত্ত্বগতভাবে। বাস্তব কিন্তু অন্যকথা বলে। আধুনিক রাষ্ট্রভাবনা ইউরোকেন্দ্রিক। অসাধারণ চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্ব পুরোপুরি খৃষ্টীয়। এই রাষ্ট্রতত্ত্ব গোটা পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। হিব্রু বৌদ্ধ  হিন্দু ইসলাম সর্বত্র এই আধুনিক খ্রিষ্টীয় রাষ্ট্রতত্ত্ব চলছে অনুকরণের কারণে, ঔপনিবেশিকতার কারণে।

আসলে সেকুলারিজম হল ইহসর্বস্বতা, জাগতিক লৌকিক ব্যাপার। মন্দির মসজিদ গীর্জা এসবও ইহজাগতিক। ঈশ্বর প্রসঙ্গ থাকলেই তা পারলৌকিক হয়ে যায় না। ঈশ্বর ও রাষ্ট্র মানুষের দুই অপূর্ব অত্যাশ্চর্যান্বিত সৃষ্টি। এবং মানুষসহ যা কিছু জাগতিক ইহলৌকিক তা প্রকৃতিজাত। আমাদের , সমস্ত মানুষের সমাজজীবনে রয়েছে ইহসর্বস্বতা। জগৎ হল এক গতিশীল ব্যাপার। জন্ম(জ) গমন(গ) ও উল্লম্ফন (ৎ) থাকে যাতে তাই জগৎ। যা জন্মায় বিকশিত হয়, পরিণত হয় এবং মরণ পরবর্তী অধ্যায়ে লাফ দেয় তা জগৎ।

জ-গ-ৎ করে বলে  এই বিশ্বসংসারের বা তার প্রতিটি সত্তাকে জগৎ শব্দে চিহ্নিত করা হয়। যা কিছু গমনশীল চরাচরলক্ষণ ভুবন তাই জগৎসংসার। জগৎ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা বাইবেল কোরানে (=< করণীয়?) ও বিভিন্ন পুরাণ লোকপুরাণে তা বর্ণিত হয়েছে। অবশ্যই ক্রিয়াভিত্তিক ভাষায়।

এমনি সেকুলারিজম বলতে বোঝায়, রাষ্ট্রনীতি শিক্ষা প্রভৃতি ধর্মীয় শাসন হতে মুক্ত থাকা উচিত এমন মতবাদ। আগেই বলেছি বাস্তবে এমন হয় না। খৃষ্টান মিশনারীরা আধুনিক খৃষ্টীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে লেগে থাকে। হিব্রু বৌদ্ধ ও ইসলামী দুনিয়ার দেশগুলি এবং ভারতের জাতীয়তাবাদী ও হিন্দুত্ববাদীরা তা ভালোই লক্ষ করেছে। আর তাই ঐসব ধর্মে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা না থাকলেও তা গ্রহণ করেছে। ওপার বাঙলায় যে ইসলামী জাতীয়তাবাদের শ্লোগান ওঠে এবং এখানে ভারতে হিন্দুত্ববাদী উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিরন্তর প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায় তার কারণ এই। তবে ভারতীয় সংবিধানে এর সমর্থন নেই। সংবিধান প্রণেতারা পাশ্চাত্য রাষ্ট্রতত্ত্ব গ্রহণ করলেও সংবিধানের রচনায় অনেক মৌলিকত্বের পরিচয় দিয়েছেন বলা যায়। কারণ ভারত হল বহু জাতি বহু ভাষা ও বহু ধর্মের দেশ। দেশভাগ হওয়ার পর ভারত রাষ্ট্র মিশ্র অর্থনীতির পথে পা বাড়িয়েছিল। অর্থাৎ ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রভাবনার সমন্বয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের পথে যাত্রা করেছিল। যেকারণে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গণতন্ত্র ও একধরনের স্বাধীনতা এদেশের মানুষ সর্বাংশে না হলেও উপভোগ করে গেছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু এখন আর তা নয়।  এখন বিশ্বায়নের উন্নয়ন তার ঘাড়ে এসে পড়েছে এবং ভারতীয়  যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিশ্বায়ন নামক কর্পোরেট ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণবাদী রাজনীতির দ্বারা সর্বাংশে পরিচালিত হচ্ছে। খুব আশ্চর্যজনক ব্যাপার যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নেই অথচ ভোটরাজনীতির খোলনলচে পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন গণশোষণ গণপ্রতারণা ও গণনিপীড়ণ চালানোর চালানোর জন্য। ইতরবিশেষ থাকলেও ভারতীয় উপমহাদেশের ছবিটা একইরকম। ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ও তার রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনতা পার্টি হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস, নৃতত্ত্ব, পুরাণ, ঐতিহ্যের রাজনীতিকরণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমের অনুশীলন শুরু করে দিয়েছে। এরমধ্যে দ্বিমুখী বিপদ লুকিয়ে আছে।

১) সত্যি সত্যিই ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়ে যেতে পারে।

২) যে বিষয়গুলির আর এস এস ও বিজেপি রাজনীতিকরণ করে চলেছে সেগুলি একটাও তাদের নয়,

সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্য সংস্কৃতি সংস্কার ও সুসংস্কৃত উত্তরাধিকার। বিজেপি বাদ দিয়ে অন্য দলগুলি যদি তা গ্রহণ করে অলরেডি অনেকেই শুরু করে দিয়েছে তাহলে বিজেপি হঠাৎ করে রহস্যজনকভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। কারণ হিন্দুত্ববাদীরা পড়াশোনা পছন্দ করে না , মেয়েদের পছন্দ করে না , দলিত আদিবাসী উপজাতিদের পছন্দ করে না এবং প্রাচ্যের ইসলামকেও পছন্দ করে না। এসব বলছি কারণ বৃহত্তর জনসাধারণেরও অপছন্দের অধিকার আছে।

৩) এর বাইরে তৃতীয় একটি বিপদ ঘটতে পারে। এবং সেটা হলেই ভালো। সবাইকে চমকে দিয়ে গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ থেকে এর জন্ম হতে পারে। এর বাইরেও কোনো সম্ভাবনা থাকতে পারে।

আমাদের বক্তব্য যে সব মানুষ সেকুলার বা ইহজাগতিক লৌকিক। সেকুলার শব্দের মূলে গেলে জেনারেশন অর্থ পাওয়া। পুরুষ ও পর্যায় না বুঝলে জেনারেশন বোঝা যায় না। পুরুষ-পরম্পরায় বিশেষ এক স্তর। কর্মচঞ্চল পৃথিবীতে কর্ম ও ক্রিয়ার সবকিছুর মূল। মহাশয় কাজ করে খেতে হয়। কর্মই ধর্ম। ধর্মকর্ম করে বেঁচে থাকতে হয় এই পৃথিবীতে। কর্মের জগৎ ইহজগৎ। বৃত্তিজীবী মানুষদের কথা ভাবুন। বর্ণ আজে ক্লাস আছে কাস্ট আছে কিন্তু বৃত্তিহীন কিছু আছে কি সিস্টেমে? সিস্টেম তো আজকের নয়। এবং উৎপাদন কর্মযজ্ঞই ভুবনের নাভি বা কেন্দ্র। যখন চয়ন ছিল শিকার ছিল তখনও যেমন এখনও তাই। উৎপাদন কর্মযজ্ঞই সব সমস্তকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। সেকুলার না হয়ে যাবেন কোথায়। সার্কেল শব্দের সঙ্গে সেকুলার শব্দের তুলনা করা হয়। বৃত্ত তো সার্কেল এবং তার কেন্দ্র উপেন্দ্র পরিধি থাকে। একটি আবর্তন। পুনরাবর্তনজনিত কর্মের আবহমান জগৎ। কর্পোরেট লুণ্ঠন দস্যুরা সব গোলমাল করে দিচ্ছে। ভয় নেই আবার থিতিয়ে যাবে।

বৃত্ত না থাকলে বৃত্তান্ত জানা যায় না, সামাজিক কর্মের সঙ্গে দায়বদ্ধ করে লোকে যে মানসলোকের চক্রপথে আবর্তিত হচ্ছে, বোঝা যায় না। যেমন অনুধাবন করা যায় না যে জীবিকা পেশা চাকরির মূলে মনের শক্তি বা ধর্ম যাকে ফ্যাকাল্টি বলে। জীবিকাহানি কিন্তু বৃত্তিভঙ্গ।

সেকুলার শব্দের সঙ্গে রেগুলার শব্দেরও তুলনা করা হয়। নিয়মিত প্রথানুযায়ী অভ্যাস অনুযায়ী কাজ , সময়ের ব্যবধানে নিয়মিত সংঘটিত। সেকুলার স্টেটকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ লোকায়ত রাষ্ট্র বানাতে পারি আমাদের দেশকাল মেনে। তারজন্য পুনর্বিবেচনার পুনরাবিষ্কারের ও পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন আছে আমাদের যা কিছু। তাই বলছিলাম, মানুষ মাত্রেই সেকুলার যদি সে করেকম্মে খেতে চায় এবং নতুন এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে।


শান্তনু গঙ্গারিডি

 

শিবোলেথ

 


(১)

ব্রিটিশদের ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস ও ভূগোলের দিকে নজর দিলে দেখা যায় যে ডিমাসা রাজ্য এবং আহোম রাজ্য সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা দিনে আলাদা আলাদা চুক্তি মারফত ব্রিটিশরাজের অধীনে এসেছিল। ৬ মার্চ ১৮২৪-এর স্বাক্ষরিত বদরপুর চুক্তির ফলে ডিমাসা অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনে আসে। তার প্রায় দু’বছর পর ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮২৬ তারিখের ইয়ান্ডাবু চুক্তির দৌলতে ইংরেজরা আহোম রাজাদের রাজ্য  নিজেদের অধিকারে আনতে সফল হয়। এই দুই অঞ্চলকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, ১৮২৪এর বদরপুর চুক্তি মারফৎ ইংরেজ শাসকেরা সর্বপ্রথম উত্তর পূর্ব ভারতের বুকে পা রাখতে সক্ষম হয়।

আজকের আসামের অন্তর্ভুক্ত বর্তমান করিমগঞ্জ জেলা ছিল অবিভক্ত বঙ্গভূমির সিলেট জেলার অংশ। কাছাড় ও হাইলাকান্দি জেলা দুটি ছিল ডিমাসা রাজাদের শাসনাধীন। আবহমান কাল থেকে এই অঞ্চলের আম জনতার মুখের ভাষা ছিল বাংলা এবং ডিমাসা রাজারা বড়ইল পাহাড় সন্নিহিত অঞ্চলে বসতি স্থাপনের পর হয়তো বা তুলনামূলকভাবে উন্নত স্থানীয় লোকেদের মুখের জবান নিজেদের রাজ্যের রাজভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়। বড়াইল পাহাড়ের দক্ষিণে বাংলার চল না থাকলে ডিমাসা রাজারা এই ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতে গেলেন কেন? বাংলা শিখলেন কীভাবে? তখন রেডিও টিভি বা ইন্টারনেট পরিষেবা মানুষের কল্পনায়ও ছিল না যে লোকে বহির্রাঞ্চলের একটি ভাষা অনলাইনে শিখে নেবে। কৃষ্ণচন্দ্র বর্মণ গোবিন্দচন্দ্র বর্মণ প্রমুখ ডিমাসা রাজারা ভাষাটাকে ভালোবেসে বাংলা সাহিত্য চর্চা করতেন। ইংরেজ শাসনকালেও এ অঞ্চলের সরকারি ভাষা ছিল বাংলা।

পরবর্তী কালে প্রশাসনিক প্রয়োজন বোধে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভেঙে আসাম প্রদেশ গঠনের সময় বাঙালি অধ্যুষিত সিলেট জেলাকে আসাম প্রদেশের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিশ্রুতি ছিল নতুন প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হলেও শ্রীহট্টের ভাষা সংস্কৃতি রক্ষা করা হবে।

এছাড়া গোয়ালপাড়া এবং বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলগুলি নবগঠিত আসাম প্রভিন্সের সঙ্গে একীভূত করে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, আহোম রাজাদের কাছ থেকে অধিকৃত ভূমির যে পরিমাণ ইরেজরা দখল করেছিল তার চাইতে অনেক বৃহৎভূমি জুড়ে দিয়ে আসাম প্রদেশ গঠন করা হয়েছিল। সেই সকল "জুড়ে দেওয়া ভূমি"-র সঙ্গে সঙ্গে সেই সেই অঞ্চলের বিভিন্ন জাতি জনজাতীয় ভূমিপুত্রদেরকেও আসামের বাসিন্দা হতে হয়েছিল। এ সকল কার্যকারণে আসাম নামক রাজ্যটি শুরুর থেকেই একটি বহুভাষিক রাজ্য। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের মতোই তার ভাষা বৈচিত্র্য। নানান গন্ধ বর্ণের সমাহার নিয়ে তৈরি হয়েছে এই অপরূপা অলকা আসাম।

(২)

ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, ভাষিক, কৃষ্টি ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিচার করলে বোঝা যায় বরাক উপত্যকা বঙ্গভাষাভূমির পূর্বপ্রাঙ্গণের স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। যেখানে বাঙালি ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীর জাতিজনজাতির মিলিজুলি বসবাস। ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি আসামকে প্রদেশ হিসাবে গঠন করার সময় নতুন প্রদেশের রাজস্ব ঘাটতির সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে বঙ্গভাষী সিলেট ও কাছাড় জেলাকে কেটে এনে আসাম রাজ্যের সাথে জুড়ে দেয়। ফলস্বরূপ অবিভক্ত কাছাড় জেলা ও অবিভক্ত সিলেট জেলা দুটি নিয়ে "সুরমা উপত্যকা" নামে কমিশনার শাসিত একটি নতুন প্রশাসনিক বিভাগের জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালের রেফারেন্ডাম মারফত এই বিভাগের সিলেট জেলার সিংহভাগ অংশ চলে যায় পূর্বপাকিস্তানে। সেই কমিশনার শাসিত "সুরমা উপত্যকা"র এপারে পড়ে থাকা বাকি অংশকে ইদানিং "বরাক উপত্যকা" নামে ডাকা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, সুরমা-বরাক অঞ্চল অর্থাৎ বিভাগ-পূর্ব সিলেট ও অখণ্ড কাছাড় স্মরণাতীত কাল থেকেই একটি অভিন্ন কৃষ্টি সাংস্কৃতিক ভৌগোলিক ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এবং ইংরেজ শাসনের সৌজন্যে একদা আসাম প্রভিন্সের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

এই পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে পারলেই "আজকের আসাম"-এর এই দক্ষিণ অঞ্চলটির ভাষিক সাংস্কৃতিক পরিচয় উপলব্ধি করা সম্ভব। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দশকে দশকে এ রাজ্যের ক্ষমতা দখলে রাখা সমস্ত রাজনৈতিক দল এই ভৌগোলিক অঞ্চলের ভাষিক সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অস্বীকার করে ইতিহাস বিকৃত করার চক্রান্ত করে এসেছে। ভাষা কেড়ে নেওয়ার এই আক্রমণের মোকাবিলা করতে গিয়ে এখানকার বাংলা ভাষার চিহ্নগুলি কিছুটা রূপান্তরিত হয়েছে। হয়ত কিছুটা ভিন্নখাতে বয়ে চলা সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। মোদ্দাকথা, দক্ষিণ আসামের এই ভূখণ্ড আসলে যে বাংলা ভাষাকৃষ্টির বৃহৎ ভূগোলেরই অংশ সেটা অল্প আয়েসেই বোধগম্য হয়।

প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে, ১৯১৭ সালে অসম সাহিত্যসভা এবং ১৯১৯ সালে অসম ছাত্রসম্মেলন অসমিয়াদের ভাষাগত আঞ্চলিক পরিচয়ের রক্ষাকবচ দাবি করেছিল। তারাই প্রথমবার আসামে সরকারি চাকুরিতে "অসমিয়া"-দের নিযুক্তির দাবি তুলেছিল। সেই লক্ষ্য পূরণের স্বার্থে এই দুটি সংগঠন আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত বাংলাভাষী জেলাগুলোকে বঙ্গদেশের সঙ্গে যুক্ত করার দাবিও উত্থাপন করেছিল। বাংলাভাষী জেলাগুলো বলতে অবশ্যই শ্রীহট্ট কাছাড় ছাড়াও আরো কিছু অঞ্চলকে ইঙ্গিত করা হয়েছিল।

আসাম রাজ্যের অসমিয়া বাঙালি ভাষা-বিরোধ আসলে ইংরেজ সৃষ্ট। রাজস্ব আদায়ের অজুহাতে সেদিন বাংলাভাষাভাষী অঞ্চলগুলোকে নব গঠিত আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত না করা হলে এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধিতার জন্মই হতো না। বঙ্গ ভূখণ্ড হতে নির্বাসিতা না হলে মাতৃভাষায় কথা বলার "দোষে" বাঙালিকে অভিসম্পাত কুড়োতে হতো না। একষটি, একাত্তর, বাহাত্তর, ছিয়াশি, ডি-ভোটার, ডিটেনশন ক্যাম্প, এনআরসি— সব সময় বাঙালিকেই অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

১৯৬১র ঘটনার পর কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ পদক্ষেপে তৎকালীন কাছাড় (বর্তমানে কাছাড় করিমগঞ্জ হাইলাকান্দি) জেলার জন্য বাংলাভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ভাষা বিধির ৫ নং ধারার ৫ নং উপধারায় বলা আছে যে কাছাড় জেলার জন্য জেলাস্তরে এবং জেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রশাসনিক ও অন্যান্য সরকারি কাজকর্মে বাংলা ব্যবহৃত হবে।

কিন্তু তারপরও দশকে দশকে চোরাগোপ্তা ও সরাসরি আক্রমণ শানানোর কাজ চলতে থাকে। সার্কুলার ইত্যাদি ছাড়াও হঠাৎ হঠাৎ সরকারি ব্যানার সাইনবোর্ডে অন্য ভাষা লিখে খোঁচাখোচি চলে। বরাকবাসীরা নার্ভ পরীক্ষা করা হয়। বরাকের বাঙালিকে অসহিষ্ণু তকমা দেওয়া হয়। এদের সঙ্গে ধুন দেবার লোকেরাও বরাকে ক্রমে ক্রমে বেড়ে চলেছে। সরকারি ভাষা আইন ভঙ্গকারীরাই যেন সঠিক --সত্যমেব জয়তের এই পরিণতি এই রাজ্যেই সম্ভব।

বিষয়টি নিয়ে আমাদের অভিভাবক প্রয়াত সুজিৎ চৌধুরীর বক্তব্য খুব স্পষ্ট। আজ থেকে বহু বছর আগেই তিনি সতর্ক করে বলে গেছেন:

"১৯৬১, ১৯৭২ বা ১৯৮৬ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের সেই শিক্ষাই দিচ্ছে যে রাজ্যের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসাবে ও রাজ্যের প্রশাসন যাঁরা চালান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি কোনও সহজাত আনুগত্য তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়, ন্যায়বিচারের খাতিরে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ভাষিক সংখ্যালঘুদের প্রতি তারা গণতান্ত্রিক আচরণ করবেন, এমন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত সুদূরপরাহত। বরঞ্চ উল্টোটাই অহরহ দৃষ্টিগোচর– আন্দোলনের মাধ্যমে বরাক উপত্যকার মানুষ যে অধিকারগুলো অর্জন করেছে, অবলীলায় সেগুলোকে লঙ্ঘন করাটাকেই তাঁরা শ্রেয় বলে মনে করছেন, এমন দৃষ্টান্ত অহরহ তৈরি হচ্ছে। এই কারণেই অন্যধরনের একটি কর্তব্য সম্পর্কে বরাক উপত্যকার মানুষের অবহিত হওয়া প্রয়োজন। কথা হচ্ছে, বড় রকমের আক্রমণ যখন আসে, বড় রকমের আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে প্রতিহত করা যায়। সে ক্ষমতা যে বরাক উপত্যকাবাসীর ছিল, তা অতীতের ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত। এই ধরনের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে হানাদাররা তাদের আক্রমণের কৌশল পাল্টে ফেলে, তারা তখন সরাসরি আঘাত না করে চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালায়। আমাদের ক্ষেত্রে এখন সেই চোরাগোপ্তা আক্রমণটা চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ সরাসরিভাবে আইনের মাধ্যমে সংরক্ষিত আমাদের অধিকারকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে না, কিন্তু কিছু না বলে না কয়ে প্রতিদিন ভাষা আইনের সমস্ত বিধানকে লঙ্ঘন করে বরাক উপত্যকার শাসনকার্য নির্বাহ করা হচ্ছে। এর পেছনে যে প্রকল্পটি রয়েছে তা হচ্ছে এই যে যদি দেখা যায় যে ভাষা আইনের পরিপন্থী ওই সমস্ত কাজকর্মের বিরুদ্ধে তেমন কোনও প্রতিবাদ হচ্ছে না, তাহলে সময় ও সুযোগ মতো আরো ব্যাপক অসমিয়াকরণের কাজে হাত দেওয়া। মনে রাখা দরকার যে নিত্যদিনের ওই সমস্ত আক্রমণের প্রতিরোধে প্রয়োজন নিত্যদিনের আন্দোলন। অর্জিত অধিকার টিকিয়ে রাখতে হলেও দরকার সতত সজাগ সতর্কতা। বলা প্রয়োজন যে নিত্যদিনের এই প্রতিরোধ বজায় রাখার ব্যাপারে আমাদের যথাযথ সচেতনতা গড়ে ওঠেনি, তাই শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের সাংস্কৃতিক ও ভাষিক অধিকার প্রতিদিনই নিত্যনতুন বিপন্নতার মুখোমুখি হচ্ছে।"

ভাষিক আগ্রাসনের আরেকটি রূপ রয়েছে, যা মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আসামে বসবাস কারি বাঙালিরা ঠিক কী পরিচয় দেবেন সেটাও নির্ধারণ করে দেবার লোকের অভাব নেই। কেউ বলছেন অসমিয়া বাঙালি কেউ বলতে চাইছেন বঙ্গভাষী অসমিয়া! বুঝতে অসুবিধা নেই যে এই এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি করা হয় আসামবাসি বাঙালির অস্তিত্বকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবার জন্য।‌ বাঙালির সমস্যা  তাদের বেশির ভাগই নিজের মাতৃভাষা বিসর্জন দিয়ে অসমিয়া ভাষায় লীন হতে রাজি না। অসমিয়া ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা প্রর্দশন করেও বাঙালিরা নিজের জাতিগত পরিচয় ভুলতে পারে না। না, কিছুটা ভুল বললাম। স্বাধীনতার দেড় দশকের মধ্যে একদল বাঙালি নিজেদেরকে অসমিয়াভাষীতে পরিবর্তন করে ছিলেন এবং ন-অসমিয়া (নতুন অসমিয়া) নামে অভিহিত হয়েছিলেন। ষাটের দশকে উত্তাল বঙাল-খেদা আন্দোলনের সময় বঙ্গমূলের কৃষিজীবী মুসলমানদের অধিকাংশ নিজেদেরকে অসমিয়াভাষী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন হয়তো বা ভিটেমাটি রক্ষার খাতিরে। বলা যায় তাদের কেউ কেউ সত্যি সত্যি মিশে যেতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষতক দেখা গেল এলিট অসমিয়া সমাজের কাছে তারা অনেকাংশে ব্রাত্য রয়ে গেলেন। সাম্প্রতিক অতীতে আসাম জুড়ে যে এনআরসি হয়ে গেল সেখানে বঙ্গমূলের মুসলিমদের খিলঞ্জিয়া (ভূমিপুত্র) বলে মান্যতা দেওয়া হয়নি। নামেই "নতুন অসমিয়া" কাজের বেলা স্বীকৃতি নেই।

(৩)

একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ কথার অবতারণা করার আগে বলে রাখি, অসমিয়া ও বাংলা এই দুটি ভাষার লিপি প্রায় এক হলেও উচ্চারণগত দিক থেকে বহুলাংশে সম্পূর্ণ আলাদা। ওদের চ দিয়ে ইংরেজি S  এবং ছ দিয়ে Sh বোঝানো হয়। অন্যদিকে শ স ষ গুলো শব্দের মাঝখানে অনেকটাই উর্দু খ় এর মতো উচ্চারণ করা হয়। শব্দের শুরুতে থাকলে হ উচ্চারণ করা হয়।‌ অসম অসমীয়া বানান লিখলেও ধ্বনিগত ভাবে অখ়োম অখ়োমীয়া বলা হয়। একজন অসাধারণ অসমিয়া যখন অসমিয়াতে কথা বলেন তখন অখ়োম অখ়োমীয়া উচ্চারণ করেন। তারাই আবার ইংরেজি / বাংলা / হিন্দিতে কথা বলার সময় রাজ্যের নাম আসাম বলেন। জাতির নাম অসমিয়া বলেন। এটাই দস্তুর। সে যাইহোক, ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিকের সৌজন্যে তিন দশক ধরে আম বাঙালির লব্জের আসাম নামক রাজ্যটি রাতারাতি অসম-এ পরিণত হয়ে গেছে। মনে রাখতে হবে, বাঙালির কণ্ঠে অসম উচ্চারণ যে কোনো অসমিয়ার কানে লাগে। বাংলা অসম শব্দটি অসমিয়াতে অচম বানানে লেখা হয়। প্রতিবেশী রাজ্যের ভুল নাম শিখিয়ে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছে।

অতিমারির সময়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশার কথা দেখে সারা পৃথিবী চমকে উঠেছিল। বলে রাখা ভালো, আসাম রাজ্যেও এক ধরনের পরিযায়ী মজদুর রয়েছেন। এই শ্রমিকদের বিশেষত্ব হল এরা একটু ভালো পারিশ্রমিকের আশায় "নিজভাষা অঞ্চল" থেকে বেরিয়ে "অন্যভাষা অঞ্চল"-এ চলে যান কাজের সন্ধানে।

হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে একটু উন্নত মজুরি জোটে হয়ত। আর এই হতভাগাদেরকেই মাঝে মধ্যে পাকড়াও করা হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদীদের চেলা চামুণ্ডাদের হাতে এরা বাংলাদেশি হিসেবে "চিহ্নিত" হয়ে যান। কারণ এরা অসমিয়া ভাষায় ততটা সড়গড় না। কাগজপত্র দেখিয়ে কেউ যদি বলেন: আমি হোজাই  লংকা বা বরাক অঞ্চলের বাসিন্দা তাহলে বলা হয়: তুই যে অসমিয়া তার প্রমাণ দে। বল: "জয় আই অখ়োম"। (আসামের সকল বাসিন্দা অসমিয়াভাষী আর কি!)

অসহায় লোকগুলো ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বলে: "জয় আই অসম। জয় আই অসম"। অসম বলতে পারলেও অখ়োম বলতে অনভ্যস্ত কণ্ঠ আটকে যায়। ফলস্বরূপ কান ধরে উঠবোস নাকে-খৎ এবং পুলিশে সোপর্দ। শুধু কী দিন মজুর বা কনট্রাক্ট লেবার? অনেক কলেজ ছাত্রকেও এই পরীক্ষা দিতে হয়। এটাই হল চূড়ান্ত শ্যভিনিস্ট প্রবণতা। আমার ভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতির বাইরে আর কোনো কিছুই আমরা সহ্য করতে পারব না। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরু তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা কিন্তু টু শব্দ করেন না।

অনেকেই শুনলে বিস্মিত হবেন মূলস্রোতের অসমিয়া শ্রোতাদের বোধগম্যতার জন্যে গানের কথা ও ভাষা বদল করতে বলা হয়েছিল প্রতিমা বড়ুয়াকে। তাঁর কথায়: "গৌহাটির আকাশবাণী থেকে বলল, গোয়ালপাড়িয়া গানগুলো তর্জমা করে গাইতে হবে। আমার রাগ হল— এ আবার কোনদেশি কথা? গোয়ালপাড়িয়া গানের অসমিয়া অনুবাদ করে গাইব? রাজি হলাম না। ... গানের বিকৃতি ঘটাব নাকি? গানের সুরের কোনো দাম নেই? ভাষার কোনো দাম নেই?"

আমরা জানি আকাশবাণী কলকাতা এবং আকাশবাণী গুয়াহাটিতেও গোয়ালপাড়ার নদীজলমাটির গানগুলো ভাষা বা উচ্চারণ কোনো কিছু না বদলেই সম্প্রচার করা হয়।

সবচেয়ে মজার কথা হল অসমিয়া ভাষার নিয়ন্ত্রণক সংস্থাটির বিচারে এখন গোয়ালপাড়ার ভাষা অসমিয়ার একটি উপভাষা স্বীকৃতি লাভ করেছে! (এদিকে গোয়ালপাড়িয়াদের অনেকেই ইদানিং রাজবংশী পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করছেন।)

গোয়ালপাড়ার অসমিয়াকরণ সেই ষাটের দশকেই সম্পূর্ণ হয়েছিল। অবিভক্ত কাছাড়েও নিরন্তর চেষ্টা চলছে। এদের নাম বরাকিপন্থী। এরা বলেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষা আমাদের মাতৃভাষা না! বরাক উপত্যকার এই "সুসন্তানেরা" আসামের বিজেপি অগপ মেলবন্ধন জমানায় আরো বেশি সক্রিয়। বরাকি / সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আদাজল খেয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এরা। প্রথমে সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা ঘোষণা  এবং তারপর অসমিয়ার উপভাষা বানানো --এটাই হল লং-টার্ম প্লান। আমরা যেন ভুলে না যাই যে, উনিশে মে-র পাল্টা হিসেবে এরাই ঘটিয়ে ছিল উনিশে জুন, হাইলাকান্দি শহরে। উনিশে জুনের মেঘে বরাক ধলেশ্বরী কুশিয়ারার কূলকে প্লাবিত করতে পারলেই এরা সফল। বরাক জুড়ে হিন্দুত্ববাদী শক্তির উত্থানের ফলে কাজটা সহজতর হবে বলে এদের আন্তরিক বিশ্বাস।

ইহুদিদের বাইবেলে বর্ণনা করা আছে, পরাজিত এফ্রাইল জনজাতির লোকজন মুক্তির আশায় স্থান ত্যাগ করে জর্ডান নদী পার হচ্ছিল। দুর্ভাগ্যবশত তারা বিজেতা গিলিয়ড অঞ্চলের লোকেদের হাতে ধরা পড়ে যান। এফ্রাইলদের চিহ্নিত করার সহজ সরল উপায় হিসেবে গিলিয়ড-রা এফ্রাইলদের কেবলমাত্র একটি শব্দ উচ্চারণ করতে বলে। শব্দটি: "শিবোলেথ"।

গিলিয়ডদের কণ্ঠে শব্দটির যে উচ্চারণ এফ্রাইল-রা বহু কসরত করেও নিজেদের মুখে সেই উচ্চারণ ধ্বনি আনতে ব্যর্থ হয় এবং বিজেতার হাতে ধরা পড়ে অশেষ দুঃখ নির্যাতন সইতে হয়।

বাগ্বৈশিষ্ট চিহ্নিত করে বাঙালিকে বহিরাগত বলে মার্কামারার রাজনীতি চলছে দশকের পর দশক। ওহো,  বছর চল্লিশ হল বাঙালিরা শুধু বহিরাগত না। বিজেপি আরেসেসের বরাভয় লাভের পর যে কোনো বাঙালিকেই সরাসরি বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র অপরাধ বোধ জাগে না যাদের, তাঁরাই এখন আসামের ক্ষমতার অলিন্দে।

ভুল বোঝাবুঝি ও অবিশ্বাসের বাতাবরণের মধ্যেই আসামের বাঙালিরা বেঁচে বর্তে আছেন।


অরিজিৎ হাজরা

 

অসত্যের ইতিহাসে চাপা পড়ে যাওয়া সত্যের সুভাষ


 

ভারতের স্বাধীনতা লাভের একটি ইতিহাস রয়েছে। যেখানে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে বহু অসত্য তথ্যকে। একাধিক ভুল তথ্যকে জোর করে ভারতের ইতিহাসের পাতায় স্থান দেওয়া হয়েছে একশ্রেণীর ক্ষমতালোভিদের অঙ্গুলী হেলনে। ভারতের প্রজন্মের পর প্রজন্ম এটা জেনে আসছে যে, ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মহাত্মা গান্ধী ও জওহারলাল নেহরুর অবদান সবচেয়ে বেশি। অথচ স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজী   সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভূমিকাকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে ভারতের প্রচলিত ইতিহাসে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেণ্ট এটলির কথা থেকে পরিষ্কার ভাবে জানতে পারি, ১৯৪৬ সালের ১৫ই  মার্চ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, "today the national Idea has  spread in all the branches and inspired by a new spirit of patriotism not least per heps among some of this INS soldiers who have done such wonderful service in all war."। এছাড়া স্বাধীনতার পর যখন ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ভারতে আসেন তখন ভারতের স্বাধীনতায় গান্ধীজী ও নেহরুর অবদান প্রসঙ্গে বলেছিলেন, 'very minimum'। এরপরও ইতিহাস রচনাকারীরা কংগ্রেসের চাপে ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনা করেছে তাদের মনোমতো। আসলে নেহরুর পরিকল্পনায় ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে চিরতরে ভারতবর্ষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা। এবং সেই সঙ্গে সকলের কাছে নিজেকে একজন সৎ ও জাতীয় নেতা রূপে প্রতিষ্ঠিত করা। এছাড়া স্বাধীন ভারতের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতার মালিক হওয়ার বাসনা ছিল নেহরুর একমাত্র উদ্দেশ্য। তাই নেহরুর ক্ষমতা পাওয়ার একমাত্র পথের কাঁটা সুভাষচন্দ্রকে ভারতের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার জন্য ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনার সাজানো কথা সফলভাবে ভারতবাসীর কাছে প্রচার করেছিলেন। যা আজও বেশিরভাগ জনগণই মনে প্রাণে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে বহু তথ্য প্রমাণের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে সকলের কাছেই যে, ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় কথা ছিল নেহেরু ও গান্ধীজীর এবং কংগ্রেসের একটি গভীর ষড়যন্ত্র। আমেরিকার গুপ্তচর বিভাগ C.I.Aএর একটি গোপন রিপোর্টে পরিষ্কার বলা হয়েছে--' The government and people of USA do not believe that so called death of Subhash Chandra Bose is that reported plan crash is true. more over some people including a field nurse have seen after the incident there is very possibility that Subhash is alive।' এছাড়া pmo file no 915/11/0/6/96 এর page no  ২৭৮ এর ৫ পয়েন্টে আরো বিস্ময়কর তথ্য বর্ণিত হয়েছে-' British intelligence submitted a secret report to wave government on 8 April 1946 which noted that probably Bose reached Russian territory and that Gandhiji and Nehru also received some secret communication from him।' উল্লেখিত দুটি তথ্যই কি যথেষ্ট নয় যে নেতাজীকে নিয়ে ভুল ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন নেহরু ও গান্ধীজী।

সর্বশেষ নেতাজিকে নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশন বিচারপতি মনোজকুমার মুখার্জির নেতৃত্বাধীন কমিশন অফ দা রেকর্ড স্বীকার করেছেন যে ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের মৃত্যু হয়নি। ২০০৫  সালে কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়া রিপোর্টের উপসংহারে তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছেন- ১. বর্তমানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র জীবিত নেই, প্রয়াত হয়েছেন। ২. বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু হয়নি। ৩. জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রাখা চিতাভস্ম নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নয়। এছাড়া মুখার্জি কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তৎকালীন ভারতের প্রতিরক্ষা ও বিদেশ মন্ত্রী প্রণব মুখার্জী, প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী নটবর সিং, লক্ষ্মীসায়গল প্রভৃতিরা নেতাজীর বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন মুখার্জী কমিশনের সামনে।  এমনকি বসু পরিবারের সদস্যরা (যাঁরা নেতাজীর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বীকার করে প্রচার করতেন) কেউ  সশরীরে হাজির না হয়ে শুধুমাত্র একটি চিঠির মাধ্যমে কমিশনকে জানিয়ে দেন যে, তাঁদের কাছে ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যুর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। অর্থাৎ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে মিথ্যার গল্প বারবার রচনা করে গিয়েছে একশ্রেণীর কংগ্রেস-নেতারা। সুভাষের প্রতি যে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল তৎকালীন নেহরু বাহিনীর মাধ্যমে আজও তার অন্যথা বা সমাপ্ত হয়নি। একাধিকবার লোক দেখানো নেতাজীর মৃত্যু রহস্য কমিশন গঠন করা হয়েছে আর নেতাজির বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর কথা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ১৯৭৮ সালের ২৮এ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই সংসদে দাঁড়িয়ে  নেতাজীর মৃত্যু রহস্য সম্পর্কিত খোসলা কমিশন ও সাহানাজ কমিশনের রিপোর্ট খারিজ করে দেন এবং  বলেন দুটি রিপোর্টই মিথ্যা। এছাড়া ১৯৮৩ সালের ৬ জুলাই প্রকাশ্য এক সমাবেশে বলেন, নেতাজী জীবিত  রয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি এক সন্ন্যাসী। দেশের প্রধানমন্ত্রীর এত বড় স্বীকারোক্তির পর আর কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয় কোনো ভারতীয়র মনে।

ভারতের স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পরও কি কংগ্রেসের তৈরি ইতিহাসকে মান্যতা দিয়ে ভুল ইতিহাসকে শিখব আমরা? প্রতিমুহূর্তে নেতাজীকে নিয়ে যে ভুল ইতিহাস সৃষ্টি করা হয়েছে তার পরিসমাপ্তি হওয়া একান্ত প্রয়োজন। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের একান্ত উচিত নেতাজীকে নিয়ে যে নেতিবাচক ইতিহাস  সৃষ্টি করে গেছে কংগ্রেস, তার বিরুদ্ধে সঠিক সত্য ইতিহাস প্রকাশ করা প্রতিটি ভারতবাসীর সামনে। নেতাজীকে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার বিষয় থাকুক সংসদের উভয়কক্ষে। প্রতিবছর একটি করে স্বাধীনতা দিবস  উদযাপিত হয় আর ঠিক পরক্ষণেই নেতাজী আবার ঢাকা পড়ে যান অসত্য ইতিহাসের জঞ্জালে। যে মানুষটির  জন্য ভারতবর্ষের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে আজ সেই বিশ্ববরেণ্যকে অবহেলা করে চলেছি  আমরা। এটা অত্যন্ত দুঃখ ও ক্ষোভের ব্যাপার। আর তাই অবিল্পম্বে প্রকাশ পাক অসত্যের ইতিহাসে চাপা পড়ে যাওয়া সত্যের সুভাষ।


গোলাম কিবরিয়া পিনু

 

কবিতা : বাস্তবতা, স্বভাব কবি ও আধুনিক কবি

 


আমরা মনে করি না-- কবিরা নক্ষত্রালোকের বাসিন্দা, তারা দূর নক্ষত্রালোক থেকে আসা কোনো প্রাণী! তারা তো এই সমাজের মানুষ, এই সমাজের মানুষের বোধ, স্বপ্ন-আশা, আকাঙ্ক্ষা, জীবনের দ্বন্দ্ব, মানুষের সভ্য হয়ে ওঠার ক্রমাগত সংগ্রামকেই অন্বেষণ করেন।

শিল্পসৃষ্টি রহস্যময়, তা দূরালোকের কোনো বিষয় নয়, হয়তো কখনো কখনো প্রহেলিকাময়, সবসময়ে তার জট হয়তো খোলা যায় ন, তবু তা মানুষেরই সৃষ্টি। কবিতার তো বিভিন্ন ধরনের ভুমিকা থেকে যায়-- কল্পনা শক্তি বাড়ায়, বোধ জাগ্রত করে, আনন্দ দেয়, মনের বিভিন্ন দিগন্ত প্রসারিত করে, স্বপ্প জাগায়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে টেনে আনে, মননশীলতা ও জীবনী শক্তি বাড়ায়, ইত্যাদি।

কবিতা নিছক আনন্দের বিষয় নয়, চৈতন্যের বহু স্তর উন্মোচিত করে। জীবনের স্ব-স্ব অনুভূতির মধ্যে দিয়ে জীবনের তাৎপর্য উন্মুক্ত করতে পারে কবিতা। কবিতা মানুষকে ভাবায়, ভাবতে শেখায়, জাগিয়ে তোলে, কৌতুহল সৃষ্টি করে। কবিতা সমকালের হয়েও- আগামীকালের ও চিরকালের হয়ে উঠতে পারে। ভালো কবিতার শিল্প-সৌন্দর্য স্বতঃস্ফুর্ত ও আনন্দময় অনুভূতির জন্ম দেয়। কবিরা অগ্রজ্ঞান নিয়ে অগ্রগামী থাকেন। নিছক আত্মসর্বস্বসুখকে গুরুত্ব না দিয়ে জীবনবোধের প্রেষণায় কবিরা কবিতা লেখেন। যা কিছু অনৈতিক, অন্যায়, নৈরাজ্যপূর্ণ ও নেতিবাচক-- তার বিরুদ্ধে এক ধরনের নিজের বিবেচনাবোধ তুলে ধরার জন্য মানুষের কণ্ঠলগ্ন হয়ে কবিরা কবিতা লেখেন। মানুষের চেতনা ও ভাবজগৎ ছুঁয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে তারা কবিতা রচনা করেন। এজন্য নিজেকেও তারা  রূপান্তর করেন-- কবিতাকেও  রূপান্তরিত করেন।

আজকে প্রযুক্তির নজিরবিহীন উন্নতি হয়েছে, সে-কারণে অর্থনৈতিক, সামাজিক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও  অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, সেই অনুপাতে মানুষ সভ্য হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে-- কাঙ্ক্ষিতভাবে তার নৈতিকমান উন্নত করেনি। মানুষ সেইভাবে মানবিকও হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতা দূরবর্তী হয়েছে। নারকীয় ও দুর্বৃত্তায়ন প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। সেইসাথে যুদ্ধের বিভিন্ন রকম প্রস্তুতিতে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও বেপরোয়া হয়ে মানুষের সর্বজনীন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে না এসে  পারমাণবিক যুদ্ধের প্রতিযেগিতায় মেতে উঠেছে।

আমরা জানি, শত বছর আগেও মানুষ এক ভূখণ্ড থেকে আর এক ভূখণ্ডে যোগাযোগহীনতায়, বিচ্ছিন্নতায়, কী দূরবর্তী ছিল! যুগযুগ ধরে, শত শত বছর ধরে, এই বিচ্ছিনতার কারণে অঞ্চলে অঞ্চলে মানুষ বিভক্ত হয়ে ছিল-- কত রকমের ভাষা, ধর্ম, আচরণ ও শাসনপদ্ধতিতে অভ্যস্ত থেকেছে, এযুগে তা আমরা জেনে হতবাক হই।

বিংশ শতাব্দীতে-- পরিবর্তন হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থায়-- রাস্তাঘাট তৈরি হলো, রেল তৈরি হলো, বিদ্যুৎ এলো। আজ বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক ভাবে মানুষের মধ্যে যাতায়াত বেড়েছে, মেলামেশা বেড়েছে। অভিজ্ঞতার বিনিময় শুধু হচ্ছে না, একই ভূখণ্ডে কত ভাষার মানুষ, কত দেশের মানুষ থিতু হয়ে শুধু জীবননির্বাহ করছে না, যুথবদ্ধ হয়ে বসবাস করছে ঐকসূত্র নিয়ে। পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা জ্ঞানের মূলভিত্তি, তারপরও-- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সুযোগ নিয়ে আজকের সভ্যতা এক বিশেষ জায়গায় দাঁড়িয়েছে।

সমুদ্র ও পর্বতের খবর মানুষের আয়ত্বে, নভোম-লের জ্ঞানও আয়ত্বে। জন্ম-জীবন-মৃত্যুর বিভিন্ন তত্ত্ব আমরা জানছি। কোষ ও জিন তত্ত্ব জানছি। অনুজীব ও অনুজীবের জগৎ সম্পর্কে নতুন অনেককিছু জানছি। ডারউইন, ফ্রয়েড ও কাল মার্কস, বিবতর্নবাদ, বস্তুবাদ, মনস্তত্ত্ব আজ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে। আইনস্টাইনের কোয়ান্টাম থিওরি ও থিওরি অফ রিলেটিভিটি, হকিং-এর বিগব্যাং থিওরিও জানছি। উদ্ভিদবিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যার বিকাশ হয়েছে বেশ। এসময়ে-- বিজ্ঞানের বিশাল সমৃদ্ধি, প্রযুক্তি বিদ্যারও অকল্পনীয় সাফল্য এসেছে। আমরা জানি,  এখনকার সময়-- দুটি বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়।

মানুষ আধুনিক জীবনযাপন করছে-- ধর্মের বাইরে থেকে-- বিদ্যুৎ নিচ্ছে, শিক্ষা নিচ্ছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছে কিন্তু এসবই ধর্মের ঊর্ধ্বে। কিন্তু মানুষকে ধর্মে ধর্মে খণ্ডিত করছি। অহংবোধ, ক্ষমতার দর্প, সংকীর্ণ চিন্তাধারা, ধর্মান্ধতা, জঙ্গীবাদ, কুপমন্ডুকতা-কুসংস্কার ও পরমত অসহিষ্ণুতা--আমাদের সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বাধাগ্রস্ত করছে। যুক্তিবাদী ও মানবিক হওয়া জরুরি। যা ভালো তা সবার জন্য ভালো হওয়া উচিত।

মানুষ নতুনকে গ্রহণ করছে--পুরনোকে বর্জন করে এগুচ্ছে। নতুন সমস্যা সমাধানে নতুন নতুন সমাধানের পথ খুঁজছে। জন্ম, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, আবাস, যোগ্যতা প্রভৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও মানুষ এক অভিন্ন হয়ে উৎকৃষ্ট মানবিক গুণের অধিকারী হয়ে সভ্যতা এগিয়ে নিয়ে যেতে আজ বদ্ধপরিকর। একসাথে বাঁচা, সুষমভাবে বাঁচা, মানবিক ও যুক্তযুক্তভাবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-স্থানের ঊর্ধ্বে থেকে বাঁচা; আজকের মানুষের আরও সভ্য হয়ে ওঠার জন্য পরিপূরক ও জরুরি বিষয়।

আজ তো স্বভাব কবির যুগ নয়, যারা স্বভাব কবি, তাঁরা সবসময়ে অস্থির, তাঁদের নেই গভীর পঠনপাঠন, নেই আধুনিক জীবন-দৃষ্টিভঙ্গি, নেই সমাজ নিয়ে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা, নেই বৈজ্ঞানিক স্বচ্ছ ধারণা ও সভ্যতার প্রতি মনোযোগ। তাঁরা  ভাবেন কবির ক্ষমতা অলৌকিক! এখনকার যুগ--স্বভাব কবির যুগ নয় বলে আমরা মনে করি।

‘ছিলো এক সময়, যখন কবিতা হয়ে উঠেছিলো গোলকধাঁধার রহস্যলহরী, অধ্যাত্মিকতার ধরি মাছ--না-ছুঁই পানি গোছের অস্পষ্ট জবুথবু উচ্চারণ, মানুষের সমাজ থেকে একশো হাত দূরে স’রে গিয়ে গিয়ে এক দুর্ভেদ্য প্রহেলিকা, তখন থেকে কবিতার পাঠক গিয়েছিলো ক’মে।’--বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, দেশ, ১৭ জুন ২০১৮

‘কবিতা, কল্পনালতায় আমি বিশ্বাস করি না। যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি, অর্থাৎ চোখ-কান-স্পর্শ কি ঘ্রাণেনিদ্রয়ের যোগাযোগ তৈরি হয়নি তাকে নিয়ে আমি লিখতে পারি না। আমি এমন কোনো মানুষের মুখ আঁকবার চেষ্টা করিনি যা আমার মাথা থেকে বেরিয়েছি। আমি শুধু আমার সামনে যে লোকটাকে দেখছি, তার মুখটাকেই ধরবার চেষ্টা করছি। সে ছাড়া আর কেউ আমাকে নাড়া দিতে পারে না।’--নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কালি ও কলম, পৃষ্ঠা ৮৭, চৈত্র ১৪২৫

‘একজন বড় কবি এবং ছোট কবির মধ্যে ঈৎধভসধহংযরঢ় ব ঝশরষ এ তফাৎ হয় না। তফাতটা হচ্ছে অভিজ্ঞতার বিভিন্ন শেকড় বা রেঞ্জকে কতখানি স্পর্শ করেছে।’ ‘কোনো কোনো কবির প্রয়োজন হয় একটা ভালো কবিতা লেখার আগে দশটা মাঝারি কবিতা লেখা’-- শহীদ কাদরী, তাঁর সাক্ষাৎকার, ভোরের কাগজ, ১৩.৮.২০০৪

মোটা দাগে আমরা বলতে পারি কবিতায় আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা, বিশেষ পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, ছন্দ ও বিবিধ অলংকার থাকে। কবিতার চারিত্র্য বিভিন্নমুখী হয়ে থাকে, অর্ন্তমুখীও হতে পারে, বহির্মুখীও হতে পারে। কবিতা গদ্যের মত স্পষ্ট  হতে পারে, নাও হতে পারে। কবিতায় একটিমাত্র অর্থ খোজা সমীচীন নয়, একই কবিতার বহু অর্থ, বহু রকমের দ্যোতনা থাকতে পারে। কবিতায় ইঙ্গিত থাকবে-- চিন্তা, কল্পনার বহুবিধ দিগন্তও থাকবে। একটি কবিতার অনুভব ও ব্যাখ্যা--বিভিন্ন রকমের পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন হয়-- রুচি, শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক অবস্থানের কারণে।

শিল্প বা কবিতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেই পুরনো তিনটি জিজ্ঞাসা এখনো গুরুত্বপূর্ণ, এক ধরনের দিশা খুঁজতে সাহায্য করে।

১. কী ভাবলাম?

২. কেমন করে বললাম?

৩. আর কেন বললাম?

আমরা জানি, শিল্পসৃষ্টিকে অনুভব করেন-- ভোক্তা, শিল্পের সাথে ভোক্তার যোগসূত্র তৈরি হয়, সেই শিল্পবোধে তিনি কবিতাকে গ্রহণ করেন।

শিল্প বা রচনার ভিত্তিমূলে থাকে-- আঙ্গিক ও ভাষাশৈলী, থাকে ভাববস্তুর গভীরতা ও শিল্পের অন্যান্য সৌকর্য। থাকে লেখক ও শিল্পীর নিজস্ব সৃজনশীলতা।

বার্নাড শা’র কাছে প্রশ্ন ছিল, সাহিত্যে কন্টেনের গুরুত্ব বেশি, না ফর্মের? তিনি বলেছেন-- ‘সাইকেলের আগের চাকার গুরুত্ব বেশি না, পিছনের চাকার?’

 

 


ড. শিবশঙ্কর পাল

 

জীবনানন্দের কবিতায় গল্প-সংলাপ-নাট্যধর্মিতা


 

সেই গল্প কারো মনে নাই?’

জীবনানন্দ কবি কথাসাহিত্যিক গল্পকার আবার তাঁর উপন্যাস গল্পে প্রবেশ করলে সহজেই পাওয়া যায় এক কবিমন৷ বিপরীতক্রমে কবিতায় গল্পের আমেজ বা আভাসটাও ধরা যায় কবি, লাবণ্য দাশকে বলেছিলেন তাঁর কবিসত্তার আড়ালে উপন্যাসগুলি চাপা পড়ে যাবে যদিও তা মৃত্যুর পরে জনসমক্ষে বেরিয়ে এসেছিল তথাপি কবিতার অন্তরে কাহিনি গল্পের অনেক টুকরো অবতংশ রেখে ছিলেন কবি সেখানে যেমন প্রাচীন মিশরের টুকরো কাহিনি, বাংলার লোক উৎসবের খণ্ড খণ্ড ছবি আছে তেমনি আছে ব্যক্তিক জীবনের নানা সম্পর্কের খতিয়ান, তার গল্প তবে সবই কবিতার শব্দে এমন করে আত্মসাৎ করা আছে; তাকে অন্বেষণ করতে গেলে কিছুটা অনুমানের আশ্রয় নিতে হয় অনুমান ধারণার সঙ্গে কবির জীবনের ওঠানামা মিলিয়ে দেখলে সেসব কথাকে অমূলক মনে হবে না যেমন সুবিনয় মুস্তফী, অনুপম ত্রিবেদী, লোকেন বোসের জার্নাল প্রভৃতি কবিতায় আমাদের মনে হয় কবির সঙ্গে তাদের ব্যক্তিক সম্পর্ক ছিল এই সুবিনয় মুস্তফী কে? যে ভুয়োদর্শী যুবকটা ইঁদুর-বেড়ালের খেলা দেখাতে পারত? কে ওই অনুপম ত্রিবেদী যার কথা মৃত জীবিত পৃথিবীর ভিড়ে কবির মনে পড়েছে? সুজাতাকে ভালবাসত সেই লোকেন বোস কে? জীবনের কোনও এক খাতে হয়তো তাদের সঙ্গে কবির পরিচয় হয়েছিল, যারা কবিতায় এসে দাঁড়িয়েছে অথচ তাদের গল্পটি আঁচ করা যায় তারা কল্পনায় এলেও বাস্তবের ভূমির সঙ্গে তাদের যোগ পাওয়া যাচ্ছে— উত্তরপাড়া, ব্যান্ডেল, বেহালা তার পরিচায়ক লোকেন বোসের জার্নালে আসছে বারো তেরো কুড়ি বছর আগে লেখা পুরনো চিঠির কথা

স্মৃতি অভিজ্ঞতা কল্পনার মিশ্রণে কবিতার উৎপত্তি, একথা অস্বীকার করা যায় না জীবন প্রকৃতিবোধের আলোকে কবি যে সব কথা বলেন তাও তো এই মাটি আকাশ গাছের গল্প রূপসী বাংলার মাঠের গল্প একা প্রকৃতি ও একা কবির আন্তঃসম্পর্কের লেনদেন সেসব বাকবিভূতির আশ্চর্য মুন্সিয়ানায় জীবনানন্দ যে ছবি আঁকেন, বুনে দেন জীবনের স্বাদ তার বিবরণ গল্পকেও স্পর্শ করে যায় সেকারণে কবিতার নাম রাখছেনমাঠের গল্প

তাদের মাটির গল্প—তাদের মাঠের গল্প সব শেষ হলে

অনেক তবুও থাকে বাকি,—” (মাঠের গল্প) এ কবিতা তো মেঠো চাঁদ, পেঁচা, পোড়ো জমি নিয়ে মাঠের ফসলের গল্প ফসল বোনা, ফসল কাটা, তারপর শূন্য মাঠে অঘ্রাণের মাঠে যে পাখি জেগে থাকে সে তো কবির সঙ্গে আত্মলীনসুন্দরবনের গল্পকবিতায় এসেছে হরিণ ও চিতা বাঘিনীর গল্প, বনের রঙের বাহার, আবার সেখানে রাখা আছে রূপক বলতে গেলে জীবনানন্দের কোনও কবিতায় গল্পের স্থানকালপাত্রের সুসামঞ্জস্য অবস্থান নেই নেই তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ যা আছে তা কাব্যের শ্রীমণ্ডিত গল্পাংশ যদি তা না থাকত কেন কবিতার নামকরণেগল্পশব্দের অবস্থান? যেখানে বিষয়কে রূপকের মোড়কে তুলে ধরার, কিছুটা গল্পের ধাঁচে শব্দ বোনার অভিপ্রায় আমাদের ভাবিয়ে তোলেসোনালি সিংহের গল্পআসলে তো সমাজের সেইসব মানুষের গল্প যারা আমাদের শস্যবেহাত করে ফেলে সবসেখানে কিছুটা যে হেঁয়ালি আছে সে কথা স্বয়ং কবিই বলে দিলেনযদি না সূর্যাস্তে ফের হয়ে যায় সোনালী হেঁয়ালি

কবিপত্নী লাবণ্য দাশ বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যে কাব্যলোক প্রতিষ্ঠা করতে চাইছিলেন; তাতে প্রতিষ্ঠা বা কবিতাকে নতুন পথের দিশারি করে তোলা সে সময়ে সহজ ছিল না তাই গল্প লেখার দিকেও ঝুঁকেছিলেন কবি লিখেও ছিলেন লাবণ্য দেবীর মতে এবং আমাদেরও মনে হয় কবিতা গল্প বা উপন্যাসের মাঝে জীবনানন্দ পৃথক সত্তা নিয়ে উপস্থিত হতে পারেননি গল্প উপন্যাসে কবির আওয়াজ বারবার মনে করিয়ে দেয় জীবনানন্দ মূলত কবি গল্প বা উপন্যাসে ঠাঁসবুনট, কাহিনি-উপকাহিনির নানান উপকরণ নেই নেই ঘটনার ক্রমান্বয়ী ঘনঘটা নেই রোমাঞ্চ বা বিচ্ছেদের ধস্তাধস্তি কিন্তু কবির মনস্তাত্বিক পরিচয় অবশ্যই আছে যেমন তাঁর কবিতায় কোনও কিছুর একমুখী বা এককেন্দ্রিক বিস্তার নেই তা বিভিন্ন অভিমুখ বিভিন্ন ভাবলোকের সমন্বয় যদিও ব্যতিক্রম আছে তথাপি তাঁর অধিকাংশ কবিতায় বহু দিক খুঁজে পাওয়া যায় অর্থাৎ গল্পের মাঝে কবিতার বা কবিতায় গল্পের সামপতন আশ্চর্যের বিষয় নয় ধরা যাক বহুচর্চিতবনলতা সেনকবিতা সেখানে তিনি যে পাণ্ডুলিপির আয়োজন করলেন তা

গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;’ করে উঠল সেটা এক পথভ্রমণ ক্লান্ত বা ইতিহাসচারী প্রেমিকের কথা হয়ে উঠল এই যে প্রেমের গল্প সেখানে প্রেমিকাও কণ্ঠস্বর নিয়ে জেগে উঠল—এতদিন কোথায় ছিলেন?’ এই জিজ্ঞাসা আমাদেরও বনলতা সেনের ভিতরে কি কোনো পুরনো গল্প লুকানো আছে দাম্পত্য জীবনে অসুখী প্রেমহারা জীবনানন্দের জীবন গল্প কি এখানে নেই? জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহ বনলতার মাঝে কবির পুরনো বা হারানো প্রেমিকাকে দেখেছেন ওই পুরনো বা প্রাচীন প্রেমিকা কি কবির কাছে হাজার হাজার বছরের চিরন্তনতা নিয়ে উপস্থিত হল তাই কি কবি হাজার বছর ধরে প্রাচীন স্থানে অন্বেষণ করলেন? তাকেই কি খুজে পেলেন গ্রাম বাংলার প্রান্তে যখন সে অন্বেষণ শেষ হল তখন বললেন জীবনের আর কোনো লেনদেন নেই তবুও বাস্তব জীবনে হারিয়ে ফেলা প্রেমিকার স্মরণে সৃজন করলেন অন্ধকার— ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেনবাস্তবের সঙ্গে এ কবিতায় লুকিয়ে রাখা গল্পকে আমরা একেবারে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি না আবার আমাদের এও মনে হয় এই কবিতার গল্পে যেন প্রকৃতি রমণী প্রেমবাদের প্রতীক হয়ে ফিরে এসেছে বনলতা যেন গ্রামবাংলার লতাবিতানের প্রতীক সেন পদবি যোগ করে তাকে মানবী করা হল যেন এটাও হতে পারে কবি যে প্রকৃতির অন্বেষণ করছিলেন, সেই প্রকৃতির সন্ধান মিলল বাংলার পাখির নীড়ে, সন্ধ্যাকাশে, শিশিরের জলে কবিতাটিতে আমাদের মনে হয় সময়ের গল্পও নিহিত হয়ে আছে এখানে যে হালভাঙা দিশাহারা নাবিক, ‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক,’-এর উচ্চারণ সেখানে সময়কে বুঝে নেওয়া যায় বনলতা সেন কবিতাটি প্রকাশকালে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পালাবদলের প্রচেষ্টা, রবীন্দ্র প্রভাব মুক্তির অভিপ্রায়, কল্লোলের অভিযাত্রা, দেশীয় আইন অমান্য আন্দোলনের ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক ফরাসি ও নাৎসিবাদের বিকাশ; সর্বোপরি জীবনানন্দের ব্যক্তিক পথ অন্বেষণ, তাতে দুদণ্ড শান্তি কামনার গল্প ডুবে থাকা অসম্ভব নয়!

সুরঞ্জনা, অরুণিমা, শেফালিকা প্রভৃতি মানবীর উল্লেখ কি হারানো প্রেমের গল্পে পুষ্ট? যতই সেখানে কবির চেতনালোক জেগে উঠুক না কেন! সেই বোধ কি তাঁকে সর্বদা তাড়া করেছিল? তাই কি বোধ কবিতায় বলছেন

ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে...

আমারে সে ভালোবাসিয়াছে,

আসিয়াছে কাছে,

উপেক্ষা সে করেছে আমারে,

ঘৃণা করে চলে গেছে— যখন ডেকেছি বারে-বারে

ভালোবেসে তারে;” — এই কথার স্বর আমরা পাচ্ছি তাঁরসঙ্গ, নিঃসঙ্গগল্পে

কেনোদিন কাহাকেও ভালোবাসিয়াছিলাম, হারাইয়া ফেলিয়াছি— একি তাহারই হ্লাদিনী?..অনন্ত অপরিসীমের দিকে চলিতে-চলিতে নারিকেলের পাতায়, চিলের ধবল গলায় খয়েরি ডানায়, ভোরের নৌকার রঙিন পালে, খর রৌদ্রে, মেঘনা-ধলেশ্বরীর স্ফীত স্তনের বন্যায়, মধুকূপী ঘাসে, কাশের সমুদ্রে, দ্রোণফুলের ভিড়ে, মৃতা রূপসীর ললাটের সিন্দুরে, গোধুলির মেঘে, শীতসন্ধ্যায় কুয়াশায়, স্থবিরের বিষণ্ন চোখের নির্জন স্বপ্নতন্তুর ভিতর, তাহারা যে সুর বাজাইয়া যায়— এ শুধু তাহারই ধ্বনিজীবনানন্দের হাতে কবিতা ও গল্প কখন যেন এক হয়ে যায়

জীবনানন্দ কবিতার যে বিস্তার ঘটান, সেখানে মননের অভিক্ষেপ থাকলেও তা কখনই সময় বহির্ভূত নয় মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, বেলা অবেলা কালবেলা কাব্যগুলিতে সময়ের অবস্থান অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে সময়জাত নানা গল্প-কথা স্বাভাবিক কারণে সেখানে চলে আসে— ‘গণমানুষ, নারীপুরুষ, মানবতা, অসংখ্য বিপ্লব / অর্থবিহীন হয়ে গেলে, —তবুও আর এক নবীনতর ভোরে সার্থকতা পাওয়া যাবে ভেবে মানুষ’ (যতিহীন) পথ চলে সেখানের গল্প-কথার আভাসে কিছুটা আশাবাদও থেকে থেকে জেগে ওঠে কবিতার কথায় চলে আসে সমস্ত মহাদেশ ব্যাপী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কথা সময়চিহ্নিত কবিতায় থাকে সময়ের ছাপ চলে আসে জনসাধারণ আমরা যদিএই সব দিনরাত্রি’,  ১৯৪৬-৪৭ প্রভৃতি কবিতাগুলি দেখি তাহলে দেখব সেখানে ইয়াসিন মকবুলরা আছে আছে দাঙ্গা ও দেশভাগজনিত মানুষের বিব্রতার গল্পকথা তবে তা আভাসে বর্ণিত গল্পের পূর্ণাঙ্গ রূপ কবিতায় আশা করাও যায় না আবার কবিতায় সেসব দিনের গল্পকে এড়িয়েও যাওয়া যায় না সমাজ সময়ের যান্ত্রিকতা নিয়ে অজস্র মানুষের কথা তুলে ধরছেন জীবনানন্দ শুধু প্রেম নয়, শুধু মৃত্যু নয়, জীবন যুদ্ধে সামিল গণরা সেখানে এসে দাঁড়াচ্ছে—

অনেক শ্রমিক আছে এইখানে

আরো ঢের লোক আছে

সঠিক শ্রমিক নয় তারা

স্বাভাবিক মধ্যশ্রেণী নিম্নশ্রেণী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিধি থেকে ঝরে

এরা তবু মৃত নয় ; অন্তবিহীন কাল মৃতবৎ ঘোরে” (এই সব দিনরাত্রি) এদের মাঝে আমরা কি তাদের জীবনযাপনের গল্পকথা অনুভব করতে পারি না? এদের ভাবনায় কি কবি বলছেন না—এসো মানুষ, আবার দেখা যাক / সময় দেশ ও সন্ততির কি লাভ হতে পারে’ (শতাব্দী) কবিতার মাঝে কবি কখনও ফিরে যান ইতিহাসের গল্পেমিশর’, ‘পিরামিডপ্রভৃতি কবিতা-গল্পে চিরকালের ইতিহাসকে সামনে রেখে লেখক যে কথা বলেন, তা তো ইতিহাস থেকে বর্তমানের সারাংশ বা গল্পালাপ—

একে-একে ডুবে যায় দেশ, জাতি,—সংসার, সমাজ,

কার লাগি হে সমাধি, তুমি একা বসে আছো আজ

কী এক বিক্ষুব্ধ প্রেতকায়ার মতন!” (পিরামিড) কখনওলঘু মুহুর্ত’-এ তিনজন ভিখিরির গল্প বলছেনজুহুকবিতায় রাখলেন সোমেন পালিত সম্পর্কিত গল্পসামান্য মানুষকবিতার তুলে ধরলেন ছিপ-হাতের এক সামান্য মানুষকে জীবনানন্দের কবিতায় গল্পের যে সব টুকরো ছবি তা সম্পূর্ণ না হলেও ইঙ্গিতবাহী কোনও পরিপ্রেক্ষিতে বা পরিস্থিতিতে তিনি কবিতা লিখছেন সেটাও আমরা অনুমান করতে পারি তাঁর গল্প বা উপন্যাসে আমরা যেমন থেকে থেকে কবিতার স্বাদ পাই, তেমনি কবিতায় গল্পের আভাস পাওয়া যায় যেমন সমারূঢ় বা কবি প্রভৃতি ব্যঙ্গাত্মক কবিতার প্রেক্ষাপট আমরা অনুমান করতে পারি প্রথাবিরুদ্ধ হয়ে সেখানে সমালোচকদের কাছে তার বিরোধের আঁচ অনুমান করা যায়আট বছর আগের একদিনকবিতা দেখি তাহলে বুঝতে পারি বরিশালের শ্মশান বা লাসকাটা ঘর সম্বন্ধীয় কবির পূর্ব অভিজ্ঞতা সেখানে মিশে আছেশবগল্পে কবি রাখলেন রঙের খেলা তার শেষে মৃণালিনী ঘোষালের মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধীয় গল্পটিকে রঙের পোঁচে রাখলেন লুকিয়ে

সংলাপ কবিতারও আধার এই কথনভঙ্গিতে কখনও কবি নিজে নিজের ভিতর বাহিরের সঙ্গে আলাপে, আত্মউন্মোচনে লিপ্ত হন কখনও সেই সংলাপে আমি তুমি আমাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় কবির আমি আমাদের সকলের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে তুমির মাঝে থাকে জগত প্রকৃতি আপামর মানুষ তবুও অধিকাংশ কবিতায় কবি কেন সংলাপরীতি ব্যবহার করছেন সেটাও জানা দরকার সংলাপের মাধ্যমে বক্তব্যের ভার যেমন অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়, তেমনি সংলাপ থাকলে আমাদের উপস্থিতিও মাঝে মাঝে জেগে ওঠে সংলাপের হাত ধরে বিষয় থেকে ভাবের আদানপ্রদান অনেকটা সহজ হয়ে যায় আবার বলতে গেলে কবিতাও একপ্রকার সংলাপ শুধু তার গঠনভঙ্গি কথনশৈলী কথাসাহিত্য থেকে কিছুটা আলাদা তাঁর বহু কবিতায় উদ্ধৃতিসহ সংলাপ আছে কবি সেই সংলাপের মধ্যে নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন যেখানে নিজের অনুভূতি অন্য চরিত্রের মাঝে আত্মগোপন করে যেমনসে’, ‘কী যেন কখন আমি অন্ধকারে’, ‘আমার এ ছোটো মেয়েপ্রভৃতি কবিতার যে সংলাপধর্মিতা সেখানে কবির সঙ্গে যারা সংলাপে অংশ নিচ্ছে তারা কবিরই অন্তর বা অনুভবের কথা কখনও অন্যদের আবছা অবস্থান সে কবিতায় কবিকে যে ডেকে নিল, সে কে? সে কি কবির অনুভূতি নয়! আবার পুরো একটা সংলাপের উপর দাঁড়িয়েকে এসে যেনকবিতায় যে বাতি জ্বালিয়ে দিল তা কি কবির চেতনা নয়!

কে এসে যেন অন্ধকারে জ্বালিয়ে দিল বাতি,

বললে, ‘আমার অপার আকাশবলয় থেকে স্বাতী

তোমার ঘরে এসেছে আজ নেমে;

তবুও দূরে সরে গিয়ে তুমি

হারিয়ে যেতে চাও কি আত্ম-প্রশ্নে ঘুরে-ফিরে?” এখানের এই আত্ম-প্রশ্ন তো কবির নিজের চেতনার আর ওই চেতনার পরিণতি ঘটছে চরিত্রে, সংলাপে

তাহলে কবি তার চেতনা, অবচেতনাকে চরিত্রের চেহারা দিচ্ছেন সংলাপ বসিয়ে তাতে কবিতায় বৈচিত্র্য যেমন আসছে তেমনি সংলাপ বিনিময়ে তা হয়ে উঠছে বিশ্বাসযোগ্য। ‘আমার এ ছোটো মেয়েকবিতায় যে মেয়েটি বিছানায় শুয়ে আছে সে তোমৃত মেয়েতবুও তার পুরনো কথা, তার অন্তরের কথা কবির বাচনভঙ্গিতে তাকে চরিত্রের রূপ দিল সেও বলে উঠল কথা—ব্যাথা পাও? কবে আমি মরে গেছিআজও মনে কর?’ এই উক্তি সেই মেয়েটির কথা যাকে কবি আজও ভুলতে পারেন নি জীবিত কালে সে কবির প্রাণের প্রিয় ছিল, কেননা সে ছোট্ট তাকে জীবন্ত করা হল সংলাপ বসিয়ে কিন্তু একেবারে শেষে জানতে পারলাম ওটা কবির মৃত্যুভীতি, মেয়েটি কিন্তু বাস্তবে জীবিত— ‘কখন উঠেছে ডেকে দাঁড়কাক— / চেয়ে দেখি ছোটো মেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে খেলে— আর কেউ নাই।’ এভাবে সংলাপ না দিলে বক্তব্য এত বেশী প্রত্যক্ষ হয়ে উঠত না মেয়েটিও কবিতার মাঝে জ্যান্ত হয়ে উঠত না কবির অনুভূতিও মর্মন্তুদ হয়ে উঠত না জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় সংলাপ এনেছিলেন সচেতন হয়ে তাঁর চেতনালোককে বাস্তবমুখী করে তুলতে সেকারণে বৈতরণীর পারে দেখা শকুনরাও বলে গেল বাস্তব জীবনের কথা—  ‘কোথায় যেতেছ তুমি? পৃথিবীতে? সেইখানে কে আছে তোমার?’  (কী যেন কখন আমি অন্ধকারে) কখনও এই সংলাপে হাজির হচ্ছে কবির মানবীরা তারা এখানে কেউ বনলতা বা অরুণিমা নামে আসছে, আসছে নামহীন চরিত্র হয়ে অথচ সংলাপে অংশ নিয়ে তারা যেন রক্তমাংসের মানবী হয়ে উঠছে

উষ্ণতা নেইকো চোখে— শান্ত আলো— দুএকটা ঝরা পাতা আধো-খসা বিনুনিরপরে

পড়ে আছে—

আমাকে সে : ‘চলো ঐ ভরা ঘাসে ঐখানে প্রান্তরের পথে;” (এখন এ পৃথিবীর) এই নারী আরেক রূপ নিয়ে জেগে উঠলপরস্পরকবিতায় সেখানের সংলাপে কবি আশ্রয় নিলেন রূপকথার সেখানে রূপকথার নারীরা নানা উপমায় জেগে উঠল রূপকথার আশ্রয়ে গল্প বলার আদলে চলতে থাকল সংলাপ যে বর্ণনা দেওয়া হল সেখানে ছবির মতো সত্যবত মনে হল সেই নারীকে— ‘দেখে না অনেকে এই ছবি!’ এখানের কবিতায় যে বিভিন্ন জনের সংলাপ বিনিময় হল তারা হল কবি, কুমার, আর-একজন সংলাপের বাক্যজালে কবি নিজেই যেন সেই তিনটি চরিত্রের রূপ নিলেন কেননা সব কথা বর্ণনা কবির নিজের অতীত ও বর্তমান বীক্ষার— ‘দিন যায় তাহাদের অসাধে,— অসুখে!— / দেখিতেছিলাম সেই সুন্দরীর মুখ, / চোখে ঠোঁটে অসুবিধা—ভিতরে অসুখ!’ এই সুন্দরী আসলে একালের মেয়েদেরও ছবি কেননা শুধু অতীতের দেবতা গন্ধর্ব নয়, একালের মানুষেরা পশুর মতোলয় শুষে

জীবনানন্দ সংলাপ সৃজন করে কবিতায় চিত্রকল্পও রচনা করেছেন কথার আদান প্রদানে এসেছে প্রকৃতির রূপ প্রকৃতিকে আশ্রয় করে জীবনানন্দ তাঁর ভাবনার বিস্তার ঘটান প্রকৃতি একটি প্রধান চরিত্র তাঁর কবিতার সংলাপ সেই পৃথিবীর গতি প্রকৃতি তুলতে গিয়ে সৃজন করছে চিত্রকল্পদুজনকবিতায় নিজেদের বিচ্ছিন্নতাকে তুলে ধরা হলেও সেখানে জীবন আর প্রকৃতিকে এক করে গড়া হল চিত্রকল্প সেখানে নারী তার সঙ্গীকে যে হৃদয়ের কথা ব্যক্ত করলেন তারপরেই এল চিত্রকল্প যা সংলাপকে প্রতিষ্ঠা করল

এই বলে ম্রিয়মাণ আঁচলের সর্বস্বতা দিয়ে মুখ ঢেকে

উদ্বেল কাশের বনে দাঁড়ায়ে রহিল হাঁটুভর

হলুদরঙের শাড়ি, চোরকাঁটা বিধে আছে, এলোমেলো অঘ্রাণের খড়

চারিদিকে শূন্য থেকে ভেসে এসে ছুঁয়ে-ছেনে যেতেছে শরীর ;

চুলের উপর তার কুয়াশা রেখেছে হাত, ঝরিছে শিশির ;—” (দুজন) বর্ণনা ও সংলাপের সমানুপাত ব্যবহার আছে এখানে তিন স্তবকের সংলাপ ও তিন স্তবকের বিবরণ দুজন-কে পাশাপাশি নিয়ে এল মিশে গেল প্রকৃতিতুমিকবিতায় প্রকৃতির কোলে রাখা থাকল সংলাপ কবি কেন এরকম সংলাপ ব্যবহার করছেন? কবিতাকে স্বয়ংক্রিয় করে তুলতে? কবিতার যে বক্তব্য তাকে কি একটু গতিশীল করার প্রবণতা? সংলাপে আমরা একটু গতিউষ্ণতা যেমন পাই তেমনি তা প্রত্যক্ষ বাস্তবমুখী ও আরও বিশ্বস্ত হয় যেন! জীবনানন্দের সে প্রয়াস কার্যকরী ছিল কিনা তার হদিশ পাওয়া যায় ওই সংলাপেইবলিল অশ্বত্থ সেইকবিতায় সেই গতি আছে পঞ্চাশ বছরের মানুষের চলমানতার গতিরেখা সেখানে স্পষ্ট— ‘পঞ্চাশ বছরও হায় হয়নিকো—এই-তো সেদিন .../ দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে সব দেখেছি যে,— মনে হয় যেন সেই দিন!’ বনলতা যখন বলেনএতদিন কোথায় ছিলেন?’ তখন বোঝা যায় ওই ক্ষুদ্র সংলাপ বহু বহু দিনের অপেক্ষার কথা বলছে বহুদিন ওখানে ডুবে আছে শুধু তাই নয়, আমাদের মনে হয় জীবনানন্দের কবিতায় যে সংলাপ তা থেকে কবির একার নয়, সেখানে অন্যান্য চরিত্ররাও উপস্থিত হয়েছে কখনও তারা প্রত্যক্ষ কখনও কবির কণ্ঠস্বরে বিলীন তাঁর কবিতায় সংলাপ আছে বলে, সেখানে একটা নাট্যাভাস আমাদের ভাবিয়ে তোলে তাঁর সংলাপ কবিতাগুলি যদি গভীর অনুধ্যানে পাঠ করা যায়, তাহলে সেখানের নাট্যধর্মিতা সহজেই ধরা পড়ে যেমনকনভেনশনকবিতাটি এখানে ছয় জন বক্তা চরিত্র হয়ে উঠে এল প্রত্যেকে তাদের মতামত বক্তব্য বিস্তৃত করেছে শেষে পঞ্চম বক্তার অতিরিক্ত বক্তব্য রেখে কবিতার শেষ ওটিকে কবি উপসংহার বলেছেন এখানের যে সংলাপ সেগুলিকে নাট্যধর্ম প্রদান করা যেতে পারে কনভেনশন কবিতায় নানাজনের মতবাদের একটা সিরিজ আছে তাদের প্রত্যেকের অভিমতকে মঞ্চ উপযোগী করে তোলা যেতে পারে ইঙ্গিতবাহী প্রতীকধর্মী কথাগুলি ব্যঞ্জনা নিয়ে নাট্যরূপ লাভ করতে পারে কিছুটা রূপক নাটক করে কবিতাটির নাট্যিক উপস্থাপনে, কথার স্রোত তুলে ধরতে পারে জগতের সাহিত্যিক চলাচল ব্যঙ্গে বেবুনের মনীষীর জাতে ওঠা, বাকিটা বুঝিয়ে দেয় প্রথম বক্তা যে সুরে কথা শুরু করলেন, দ্বিতীয় বক্তার কথায় সেসব বাছুরের ষাঁড়ে পরিণত হওয়া, মাথায় শিঙ গজানো প্রভৃতি সংলাপ নাটকটিকে জমিয়ে দিতে পারে যদিও এখানে কাব্যের স্বর ধরে বক্তাদের সংলাপ উপস্থাপনে দক্ষতা থাকতে হবে তৃতীয় বক্তার সংলাপ যখন এল সেখানে যারা সভাসমিতি কাউন্সিল গ্যালারিতে বক্তৃতা দিয়েছে তাদেরকথা বলেকথা বলে— কথা বলে—অনেক সময় কেটেছে জানানো হল কিন্তু সেখানে তৃতীয় বক্তা শেষ দুটি চরণে যা বলল তা তো নাটকে নিসে এল ব্যজস্তুতির প্রলেপ

আমদের চেয়ে ঢের হালুবালু ভালো জানে বলে

বেবুন চালাবে মাইক্রোফোনএসব বক্তব্য সংলাপ আমাদের শ্রুতিবিশোধন ঘটায় বর্তমানের সাহিত্য সাধনা শুধু নয়, সময়ের রাজনৈতিক বা সামাজিক পাণ্ডাদেরও মনে হয় এখানে গাঁথা হয়েছে চতুর্থ বক্তা যখন মুখ খুললেন তখন সেটা বোঝা গেল গরিলা বানাতে গিয়ে প্রকৃতি যাদের মানুষ বানিয়ে ফেলেছে তাদের সম্বন্ধে যা বলা হল— তা যেন কাবিতাটিকে আরও বাস্তব করে তুলল হেঁয়ালি থাকলেও সেখানে আছে নাটকের উচ্চগ্রাম— তারা মদ পেলে খুশি হয় ভাঁড়ের মতো রসিকতা করতে জানে নারী হত্যা দালালের ঋণ শোধ করে শান্তির দেবতাও এদের ভুল শোধরাতে পারে নাএটি যেন নাটকের কেন্দ্র নাটকের কথাকে একেবারে পরিষ্কার করে তোলা পঞ্চম বক্তার সংলাপে শিঙ প্রসঙ্গ, ষষ্ঠ বক্তার কথায় বাজার ব্যাঙ্কের তেজি-মন্দা, কাঁচা-পাকা মাল প্রভৃতি কথায়মুকুরের মতো মুখে চোখ চেয়েদেখা আছে এ কি আমাদের প্রত্যেকের নিজে নিজেকে একটু বিচার করে দেখে নেওয়ার ইঙ্গিত ব্যাঙ্গাত্মক বা প্রতীকি নাটকে তো এরকম করেই কথা বলা হয় জীবনানন্দ কবিতার মধ্যে নাটকের সেই আভাস কিছুটা হলেও রেখেছেন অবশেষে পঞ্চম বক্তা এলেন বললেন — ‘বর্তমান টপকায়ে / অতীতই আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে;’ একথার গভীরতা কাব্যনাট্যকে ব্যঙ্গাত্মক থেকে করে তুলল বিপর্যস্ত সময়ের কথা গোটা কবিতাটিতে একটি বিদ্রুপের চোরা স্রোত বয়ে চলেছে কবিতার মতো নাটকেরও এরকম একটা স্রোত থাকে, যা এখানে বহমান চরিত্রের অবস্থান, সময়ের চলমানতা, বেবুন মনীষী, শান্তির দেবতা, বিপর্যস্ত পৃথিবী, দেবদূত ধর্মযাজক প্রভৃতি শব্দরা কবিতায় লুকানো অভিপ্রায়কে তুলে ধরছে তাদের অবস্থান বলে দিচ্ছে সেখানে কবির অভীপ্সা কবিতাটিতে ব্যবহৃত ধুঁয়াপদ সংগীতের একটা আবহ প্রস্তুত করতে পারে এখানে—

আমাদের জাহাজের—উড়োজাহাজের

লস্কর ও মিস্ত্রিদের জ্ঞাপন করেছি ভালোবাসা

স্থান কাল সংলাপ চরিত্র বিষয় নিয়ে কবিতাটিকে একাঙ্ক নাটকে পরিণত করা যেতে পারে ব্যঙ্গের কষাঘাত খেয়েও আমাদের কি বিবেক ব্যাথিত হবে না কবির নাট্যধর্মী সংলাপ পড়ে বা মঞ্চস্থ পাঠ শুনলে?

জীবনানন্দ তাঁরআমার জীবন ও কবিতাপ্রবন্ধে তাঁর নাটক লেখার প্রসঙ্গে বলছেন—না পারছি নাট্য-সমালোচকের নীতিবাচক নিরাশা ভঙ্গ করে তেমন কিছু নাটক লিখতেঅর্থাৎ নাটক লিখতে না পারার কিছুটা আক্ষেপ তাঁর ছিলকবিতাগুলি যেন তাই বলছেমকরসংক্রান্তির রাতেকবিতায়মহান তৃতীয় অঙ্কে : গর্ভাঙ্কেলুপ্ত হওয়ার কথা বলেছেন অন্যান্য কবিতায় থাকছে ওইতৃতীয় অঙ্ক’, ‘গর্ভাঙ্ক— যা নাটকের ইঙ্গিতবাহী তাঁর সংলাপ কবিতাগুলি কি নাটক না লিখতে পারার আক্ষেপকে কিছুটা মিটিয়েছিল? ‘এ ও সেকবিতার নির্মল সংলাপ কি নাটকের চেহারা নিতে পারে? বা আদৌ তাকে নাট্যরূপ দেওয়া যায়? কবিতাটিকে ধীর লয়ের, বোধের, ভাব বিনিময়ের, অভিব্যক্তি বিনিময়ের নাট্যাঙ্গিকে তুলে ধরা যেতে পারেএ ও সে’-এর সংলাপে সংলাপে কাব্যিক উচ্চারণ আমাদের মনে একটা আস্বাদ জাগিয়ে যায় শীতের সকাল, নীল বই, মাখন তোলার শব্দ যেন প্রকৃতির রূপ ছবিকে তুলে ধরেসবুজ চোখের স্বপ্নেকবিতার কথা কাব্যনাট্য হয়ে ওঠে তৃপ্তি পাওয়া যায় এসব সংলাপ শুনে কেও কোথাও নেই যেন এ ও সে মাত্র দুটি চরিত্র নিজেদের মধ্যে বিভোর হয়ে থাকেশীতের সকালবেলা রোদের ভিতরসেই কথকতা শুরু হয়ে পৌঁছে যায় সন্ধ্যায়

যখন দু-চোখ তবু বুজে আসে সন্ধ্যায়,

আমার মাথার স্বপ্ন রূপার জালের মতো হয়ে

হাওড়ের অন্ধকার জলের উপর থেকে

ছায়া ধরে আপন!” কবিতাটিতে কোথাও কোনও নাট্যমুহূর্তের চড়াই উতরাই নেই সরলরেখার মতো সহজ সরল সোজা সুন্দর পরিপাটি জগতের ছবি তুলে ধরে সংলাপ যেন কুলুকুলু শব্দে বয়ে চলে কবিতা-নাটকের পদে পদে এ ও সে-এর ভাবের আদান-প্রদানকে এই কবিতা স্বল্প দৈর্ঘ্যের নাট্যে উপস্থাপন করতে পারে কেননা এই কবিতার হৃদয়গ্রাহী সংলাপ জগতের নাটক হয়ে উঠে আসতে চাইছে তার সেই গঠনগত বা ভাবগত বৈশিষ্ঠ্য এখানে রাখা আছে যা শুধু অনুভব যোগ্য

আজ তবু এখানেই আছে;

তোমার হৃদয় থেকে হয়তো কাহারও হাত এসে

মেয়েমানুষের পেটে সন্তানের মতো

বাঁচায়ে রেখেছে তারে!” তবুও বলতে হয় কবিতাটিকে নাট্যে রূপান্তরিত করতে গেলে কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় কবিতায়যখন তৃতীয় সংলাপটি বলে তখন ঠিক বোঝা যায় না সেখানের কোন সংলাপে’-এর কথা ফুটে উঠছে তবে চরণগুলির মধ্যস্থ স্পেশগুলি যদি সংলাপের অন্তর হিসাবে ধরে নিই, তাহলে সংলাপকে নাটকে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা করা যেতে পারে আবার সংলাপ কবিতাশিকারকে আমরা যদি নাট্যগঠনে সাজাতে যাই তাহলে সেটা একটা রূপ নিতে পারে তবে সেখানেও জীবনানন্দের সংলাপ রচনার ওই পূর্বোক্ত বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যেখানেআর জনএর সংলাপেআর জনএক জনমিশে যায়যদি আমরাআর জনশিকারির তৃতীয় সংলাপ দেখি, তাহলে দেখব ওখানে ওই দুজন শিকারির সংলাপ মিশে গেছে তখন ওই চরণের অন্তরে স্পেশ দেখে কার কোনটা সংলাপ সেটা একটু অনুমান করে নিতে হয় গোটাশিকারনামক সংলাপ কবিতাটি আমরা যদি নাটকের আদলে দেখি তাহলেও সেখানে কোন ঘনপিনদ্ধ ভাব গড়ে ওঠে না হয় ভাসা ভাসা একটা বোধ উপলব্ধ হয়, নয়তো বা কিছুই পরিষ্কার হয়ে ওঠে না জীবনানন্দের বহু চেতনার মিশ্রণে তাঁর কবিতার যে ঘরানা, সেই বহুমুখী বক্তব্য নিয়ে কবিতাটি নাটকের গায়ে মনস্তত্ত্বমূলক হয়ে ওঠে যেন

সেই জলে কার যেন মুখ ভেসে ওঠে!

চেয়ে দেখ,—

তবু তারে কোথাও কি দেখা যায়?”

সে জাহাজ দেখেছে কি কেউ?’ জীবনানন্দের আরেকটি দীর্ঘ সংলাপ কবিতা কথার পর কথার ঢেউ এসে সবকিছু যেন ওলটপালক করে দেয় কবি কেন চেতনায় এসব কথা তুলে ধরছেন তার হদিশ পাওয়া প্রায়ই যায় না তবুও এখানে সংলাপ আছে নাবিক ছাড়াও আরেকজন আছে, সর্বোপরি প্রচ্ছন্ন হয়ে আছেন কবি চরণ স্তবক ও স্পেশগুলি ধরে ধরে কবিতাটিকে পড়া যায় তবে কোনটা কার উক্তি সেটা মাঝে মাঝে কুয়াশাছন্ন হয়ে ওঠে তবুও পাঠের পর পুনঃপাঠে কবিতাটিকে নাটকের পর্যায়ে দেখা যেতে পারে যেখানে সমুদ্রযাত্রার নানা অভিজ্ঞতা, জীবনের পৃথিবীর মেয়েমানুষের কথা নিয়ে একটা গল্পও বলে যায় তবে সবই আধো আধো আর ওখানেই জীবনানন্দের কবিতা, জীবনতত্বের নানা কথা টুকরো টুকরো করে ছিটিয়ে রাখে কবিতায় কবিতার কথাচলন নাটক হয়ে ওঠে যেন এখানে তার কিছুটা আভাস আছে অদ্ভূত হয়েও জীবনকে ছুঁয়ে যায় সেসব কবিতার কথা জীবননাট্যের ধারাভাষ্য হয়ে সেসব কথা ঘোরাফেরা করে আমাদের মনের ভিতর কখনও হয়ে ওঠে শ্রুতিনাটক

ঘুম নাকি সবচেয়ে ভালো?

তবুও ঘুমের থেকে ভালো এই জেগে থাকা,— এই জেগে থাকা!

আমরা বাঁচিয়া থাকি আমাদের হৃদয়ের দোষে,—

অবসাদ ধরে গেলে অবসন্ন হতে চাই আরও!” যদি কোনও চরিত্র কবিতার এই চরণগুলি মঞ্চে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করে তাহলে কি নাটকীয় একটা মুহুর্ত তৈরী হবে না? হয়তো হবে হয়তো ওই হওয়াটাও জীবনানন্দের মনে নাটক লেখার সুপ্ত বাসনার বহিঃপ্রকাশ যার কোনও প্রতিউত্তর আমরা জীবনানন্দ থেকে পাই না শুধু তার কবিতা বলে দেয় সেখানে চিরাচরিত নাটকের একটা শ্রতিবিশোধন করার প্রয়াস থাকতে পারে

গর্ভাঙ্কে ও অঙ্কে কান কেটে-কেটে নাটকের হয় তবু শ্রুতি বিশোধন’ (পরিচায়ক) আবারসবারই হাতের কাজকবিতায় জীবনানন্দ বলছেন—

নাট্যের লিখন তারা— তবু তারা পড়েছিল মৃগশিরা নক্ষত্রের নিচে,

কথোপকথন গান স্বগতোক্তি নেপথ্যের রব

শিশিরবিন্দুর মতো শব্দ করে দর্শকের কানে;’