পলাশের দেশ কালিমাটি
মর্চাগোড়া, গীতিলতা,
বাহারদারি আর ধলাডিহ অঞ্চলের গ্রামগুলো এই সময় একদম আলাদা রূপে ধরা দেয়। পলাশ গাছের
তলায় জিরিয়ে নেওয়া সেই মানুষগুলোর হাসিমাখা মুখ আর প্রকৃতির এই লাল রঙের মেলবন্ধন।
ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ
থেকে মার্চের মাঝামাঝি - ঠিক এই সময়টায় পলাশের দর্শন মিলবে। হাতে ঘন্টাদুয়েক নিয়ে বেরিয়ে
পড়লেই হয়।
টাটানগর রেলস্টেশন থেকে
সুন্দেরনগর হয়ে তুরামদিহি ছাড়ালেই রাস্তার দুপাশে এক অদ্ভুত রক্তিম আভায় রঙের খেলা
শুরু হয়ে যায়। যেকোনো বাহনে টাটানগর স্টেশন থেকে হাতা-হলুদপুকুর রাস্তায় বেরিয়ে পড়ুন।
কুদাদা ছেড়ে এসে ভুড়িডিহ রেলওয়ে ক্রসিং পেরিয়ে গাড়িটাকে রাস্তার ডানপাশে দাঁড় করিয়ে
বাহারদারি গ্রামের দিকে হাঁটা দিন। রাস্তার দুপাশে মনমাতানো পলাশের সারি। রুক্ষ শুকনো
লালমাটি মাড়িয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলে আদিবাসী গ্রাম বাহারদারি।
পলাশের ছবিতো পাবেনই,
উপরি পাওনা গ্রামের ধুলোমাখা মেঠো পথে আদিবাসী নারী-পুরুষের সহজ জীবন। গ্রামের আদিবাসী
মানুষজনের স্বভাবসুলভ সল্পভাষী বিনয় আপনাকে স্বচ্ছন্দ করবে। রঙ্গিন আঁকা চিত্রে জড়ানো মাটির ঘরবাড়ির সামনে খেলে বেড়াচ্ছে
দামাল শিশুর দল। ওরাই ফটোগ্রাফির মূল পাত্র। ওদের কৌতূহলের শেষ নেই। যা বলবেন তাই শুনবে।
দূর থেকে ছুটে আসবে বা প্রানখুলে হাসবে।
আশির দশকেও এই অঞ্চলের
মানুষের হিন্দি বুঝতে অসুবিধা হতো। সিংভূমের আদিবাসী সম্প্রদায় একসময়ে পাহাড় ও জঙ্গল নির্ভর ছিল। হাইওয়ে থেকে সাত আট কিলোমিটার
দূরের গ্রামে ঢুকলে দেখতে পাবেন একশ্রেণীর মানুষ এখনও আংশিকভাবে জঙ্গল-পাহাড় নির্ভর।
সমতলের মানুষ মানভূমি বাংলা বলে যা আদিবাসী মানুষ ও আত্মস্থ করে নিয়েছে। প্রথম দর্শনে
ধারণা হয় মানভূমি বাংলাটাই বোধহয় আদিবাসী ভাষা।
ঝাড়খন্ড আদিবাসীদের ভাষা মূলত তিনটে; সাঁওতালি, মুন্ডা এবং
হো। অবশ্য সে ভাষা আমরা এক বর্ণ ও বুঝতে পারবো
না। পূর্ব সিংভূম জেলায় (যেখানে জামশেদপুর আছে) সাঁওতালি হলো সর্বাধিক প্রচলিত আদিবাসী
ভাষা। এই অঞ্চলের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সাঁওতালরাই সংখ্যায় বৃহত্তম। সাঁওতালি
ভাষা দাপ্তরিক স্বীকৃতি পেয়েছে যা 'অলচিকি' লিপিতে লেখা হয়।
ইদানিং এই অঞ্চলের লোক
বহিরাগতদের সামনে হিন্দিতে কথা বলে। আপনার সামনে নিজেদের মধ্যেও হিন্দিতে কথা বলবে।
কারণ মানভূমি বাংলা শুনলে আমাদের হাসি পায়। হিন্দিভাষীরা বুঝতে পারে ‘জংলী হায়’।
গীতিলতার গীতা মাহাতো
অধুনা আমার প্রতিবেশী বিয়ে করেছে সাগুন হাঁসদাকে। স্বামী স্ত্রী নিজেদের মধ্যে মানভূমি
বাংলা বললেও ছেলেটার সাথে হিন্দিতে কথা বলে। ছেলের সামনে মানভূমি বাংলা বললে ছেলে বলে
‘কাহে দোস্তো কে সামনে ইজ্জত কা ফলুদা বনা রহে হো’!
ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী সংস্কৃতির
এক অনন্য নান্দনিক নিদর্শন তাদের চিত্রশৈলীতে সাজানো মাটির ঘর। বিশেষ করে সাঁওতাল ও
মুণ্ডা সম্প্রদায়ের ঘরগুলোতে এই শৈল্পিক ছোঁয়া বেশি দেখা যায়। এই চিত্রকর্মের বড় বৈশিষ্ট্য
হলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রঙ; সাদা দুধিয়া মাটি, ম্যাঙ্গানিজ সমৃদ্ধ কালো মাটি বা ছাই,
লাল, গেরুয়া, হলুদ রঙের মাটির ব্যবহার। ইদানিং সিনথেটিক রং ও অনুপ্রবেশ করছে।
এই রকম চিত্রশৈলীর মাটির
ঘরের উৎকৃষ্ট সংস্করণ দেখতে হলে ভূরিডিহ রেলক্রসিং ছাড়িয়ে মেনরোড দিয়ে এক-দু কিলোমিটার এগিয়ে বাঁ দিকের রাস্তায় ধলাডিহ গ্রামে চলে আসুন। দেওয়ালচিত্রের
ঐতিহ্য এই গ্রামে বংশপরম্পরায় চলে আসছে। তাই ধলাডিহ গ্রামের মাটির বাড়ির গায়ে আঁকা
দেওয়াল চিত্র অনেক পরিণত।
সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকে শীতকালে টাটানগরের সৌখিন ফটোগ্রাফারদের দল প্রতি রবিবার ক্যামেরা হাতে এখানে চলে আসতো। ওই অভিযানকে রেম্বলিং নামে পরিচিত। গ্রামের লোকজনকে সাবজেক্ট বানিয়ে ছবি তোলা, পরবর্তী অভিযানে কয়েকজন সেই ছবি কিছু প্রিন্ট করে গ্রামবাসীকে উপহার দেওয়ার চল ছিল। ডিজিটাল ক্যামেরা বা মোবাইল তখনও আসেনি। রোলফিল্মের যুগে ছবি দেখানোর একমাত্র উপায় ছিল পেপার প্রিন্ট সংস্করণ।
পলাশের এক অনন্য প্রজাতি
হলুদ পলাশ, দেখতে চাইলে চলে আসুন কানদরবেড়া রোড বা মানগো রোড ধরে হাইওয়ের উপর। কানদরবেড়া
ছাড়িয়ে তিন-চার কিলোমিটার এগোলেই ডানদিকে দলমা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির প্রবেশ পথ।ওই
পথ দিয়ে চলে আসুন মাকুলকোচার রাস্তায়। গাড়িটাকে হিল রিসর্টএ না ঢুকিয়ে সোজা চলতে থাকুন।
পলাশের মরশুমে রাস্তায় জিজ্ঞাসাবাদ করলেই পৌঁছে যাবেন হলুদ পলাশের কাছে। তবে একটা কি
দুটো গাছ আছে। কবে কাটা পড়বে ঠিক নেই। ওই রাস্তায় আর এক আকর্ষণ দুপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে
পড়ে থাকা আদিবাসী জনজীবন।
ফেব্রুয়ারী থেকে মার্চে
রাস্তার দুপাশের গাছ আগুনে রঙে ফেটে পড়ে। নিশ্চিন্তে ঢুকে পড়ুন যে কোনো গ্রামে।পলাশ
ফুলে লাল রাস্তায় শিশু নারীর আনাগোনায় সময় যেন দাঁড়িয়ে গেছে। আমার বন্ধুর বৃদ্ধা মা
ছেলেকে বলে ‘দিপু তুই এখানে একটা মাটির ঘর কিনে ফেল। আমাদের আর হাঁচড়ে পাঁচড়ে কাশ্মীর
দার্জিলিং যেতে হবে না।’
বিশাল কুসুম গাছের লাল
পাতার ছায়ায় দাঁড়িয়ে একথাই মনে হবে। আমাদের তাজমহল বানানোর ক্ষমতা নেই, তাই
ওই গাছের নিচে প্রিয়জনের ছবি তুলে তাকে মমতাজের মত অমর করে দিতে পারেন। আমাদের দলের
দুচারজন মহিলা এভাবেই ক্যামেরা বন্দি হয়ে অমর হয়ে গেলেন।
হাতা-হলুদপুকুর বা মাকুলকোচা,
যে রাস্তাতেই যান ফেরার পথে একটা বড় আকর্ষণ মানভূমি আলুরচপ, ঘুগনি আর মুড়ি। না খেলে
পুরো যাত্রাটাই বিফল। যেকোনো একটা ঝুপড়ির দোকানে বসে পড়ুন। প্রবাসী ভাগ্নে বলে ‘এই
ঘুগনি আলুরচপ খেতেই আবার আসতে হবে। ইস ক্যালিফোর্নিয়ায় যদি নিয়ে যাওয়া যেত’!
ষাটের দশকে গড়ে ওঠে ফোটোগ্রাফারদের দুটো সংগঠন ছিল ‘বিহার ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস)’ আর ‘লেন্সএন লাইট’। আশির দশকে আমিও ভিড়ে গেলাম বিপিএস-এ। সে সময় কনকনে ঠান্ডায় দুপেয়ে বাহন নিয়ে ভোর সাড়ে পাঁচটায় বেরিয়ে পড়ত ওই বিপিএস টিমের শান্তিদা, ভূদেবদা, সি পি ধাওয়ান আর নব্বই বছরের মাকওয়ানা। নবীনদের মধ্যে আমি, নরেশ নন্দা, বীরেনদর সিং, রবিন ব্যানার্জি, বিবেক দত্ত ওই দলে ভিড়তাম। সে সময়ে ফোটোগ্রাফি এক বিপুল খরচসাপেক্ষ নেশা। ফোটোগ্রাফি নিয়ে উন্মাদনাই নেশাটাকে টিকিয়ে রেখেছিল। নতুন যারা যোগ দিত, ভূদেবদার বারোদোয়ারির স্টুডিওতে ফিল্ম রোল নিয়ে চলে আসত। ভূদেবদা রোল ডেভেলপ করে ছত্রিশটা ছবির কন্টাক্ট সীটে একটা কি দুটো ছবি দাগ দিয়ে দিত, যার অর্থ বাকি ছবিগুলো পাতে তোলার অযোগ্য।
সেটা ছিল এস এল আর ক্যামেরা আর রোল ফিল্মের যুগ। দলের প্রায় সকলের ঘরে নিজের ডার্করুম। সেই লালবালবের ডার্করুমে তরল ডেভেলাপার-এর ট্রেতে একটু একটু করে ফুটে ওঠে ছবিগুলো। ভালো ছবি হলে উত্তেজনা, খারাপ হলে - ‘ধুর শালা’। ডেভেলোপাররের ফর্মুলা আর রসায়ন- মেটল, হাইড্রোকুইনন, সোডিয়াম সালফাইট সব ফটোগ্রাফারের মুখস্ত।
শান্তিদা, ভূদেবদা,
সি পি ধাওয়ান, মাকওয়ানা আজ বেঁচে নেই। ওদের সাথে শেষ হয়ে গেছে রোলফিল্মের যুগের ফটোগ্রাফির
আবেগ এবং উন্মাদনা। ডিজিটাল ফটোগ্রাফির যুগে ঘুচে গেছে মহার্ঘ রোল ফিল্মের ছত্রিশটা
ছবির বাঁধা বন্ধন। স্ক্রিন আজ মহার্ঘ্য ফটো পেপারের জায়গা নিয়েছে। বিংশশতাব্দীর বিলাসী
ফটোগ্রাফির সখ আজ নিখর্চায় প্রতি মুহূর্তে ‘একটা ছেলফি হয়ে যাক’।
আজ আমি সিং ভেঙ্গে নবীন
ফটোগ্রাফারদেড় দলে ভিড়ে গেছি। দল দু- তিন জনে এসে দাঁড়িয়েছে। দুপেয়ের জায়গা নিয়েছে
চারচাকা। কনকনে শীতে গাড়ির ভিতর কত আরামে পৌঁছে যাই। ফোটোগ্রাফি সহজ হয়েছে। এসে গেছে এআই অটোফোকাস, মুভিং
সাবজেক্ট অটো লক। নিখুঁত এক্সপোজার মিটার নির্ধারণ করে দিচ্ছে ক্যামেরার স্পিড আর অ্যাপারচার।
ফাইভ স্টপ ইনবডি ইমেজ স্টেবিলাইজেসন, ক্যামেরা বা হাত কেঁপে ছবি নষ্ট হয়ে যাওয়া আজ
ইতিহাস। ডিজিটাল ক্যামেরা আর মোবাইলে তোলা গরমগরম
ছবি নিয়ে ততক্ষনাৎ গ্রামবাসীকে দেখিয়ে দাও।
ফোটোগ্রাফি আজ অনেক সহজ। এত সুখ ও স্বাচ্ছন্দ এসে পড়ায় আজ অনেক ঠেলাঠেলি করেও নতুনদের বছরে দুই তিনবারের বেশি ওই রেম্বলিং অভিযানে ঘর থেকে বের করা যায় না। বলে ‘চঞ্চলদা! বড্ড ঠান্ডা, আজ বাদ দাও’।
রোল ফিল্মে ছবি তোলা কৈশোরের প্রেমের মত বাসস্টপে দাঁড়িয়ে সংশয়ে ভরা আনন্দঘন অনিশ্চিৎ মুহূর্তের অপেক্ষা। অপ্রাপ্তির হতাশা আর অন্তহীন সুখের সন্ধানে আরও একদিন। কোনোদিন খুব ভালো ছবি পাওয়া গেল, কখন ডেভেলপ করার পর আবিষ্কার হয় পুরো ফিল্মটাই এক্সরের দংশনে আগেই বরবাদ হয়ে গেছে। ক্যামেরা নড়েছে বা ফোকাস ঠিকমত হয়নি অথবা আন্ডার বা ওভার এক্সপোস হয়েছে। কখন অসাধারণ কিছু নিজের তোলা ছবি দেখে উদ্বেলিত হৃদয়। সাদাকালো নেগেটিভ থেকে ভালো প্রিন্ট ছবি হওয়ার আনন্দ আর না হওয়ার সংশয় আজ হারিয়ে গেছে। পুরনো ছবিগুলোর মতই ফিকে হয়ে গেছে ফোটোগ্রাফি ঘিরে আবেগ ও উন্মাদনা। যাযাবরের সেই বহু উদ্ধৃত লাইন - ‘আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। তাতে আছে গতির আনন্দ, নেই যতির আয়েশ।’
বাড়ির লফ্টে তুলে রাখা
পুরনো জঞ্জালে ফটো এনলার্জর, প্যাটরসনের ডেভেলপার ট্যাংক আর ইজেল ট্রেগুলোর দিকে তাকিয়ে
আজ উদাস বিষণ্ণতায়
মনে সুমনের গান বাজে --
আমার ও তো বয়স হচ্ছে
রাতবিরেতে কাশি
কাশির দমক থামলে কিন্তু
বাঁচতে ভালবাসি
বন্ধু তোমার ভালোবাসার
স্বপ্নটাকে রেখো
বেঁচে নেবার স্বপ্নটাকে
জাপটে ধরে থেকো

















0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন