কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ইন্দ্রপুরী রহস্য

 


(আট)

মন্থন

বাঙ্গালোরে যাবার ব্যবস্থা করা গেল। যদিও সময়টা একটু বেতাল গোছের হয়ে গেল কারণ আমরা বাঙ্গালোর কেম্পেগৌড়া বিমানবন্দরে পৌছোলাম রাত আটটায়। একটা বিমানবন্দর একই সঙ্গে কতোটা আধুনিক এবং সাবেকী সুন্দর হতে পারে তা এই বিমানবন্দরে এলে বোঝা যায়। বিমানবন্দরের প্রতিটি কোণায় যত্নর ছাপ। আমার দেশের বিমানবন্দর ভাবতে গর্ব হয়। টার্মিনালে সর্বানন্দ দুজন কনস্টেবল পাঠিয়েছিল। তারা সাদা পোশাকে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল।একজন জগৎ শর্মা। দ্বিতীয়জন সাদিক আনসারি। আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে পুলিশ গেস্টহাউজে। এখান থেকে আরতি গেস্ট হাউজ প্রায় কিলোমিটার পাঁচেক দূরে। জগৎ আর সাদিকই কাল আমাদের নিয়ে যাবে ঠিক হল।

পরদিন সকাল দশটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বাঙ্গালোরের রাস্তা ট্রাফিক জামের জন্য বিখ্যাত। আমাদের ভাগ্য ভালো, আমরা সেই যানজটের কবলে পড়লাম না। গতকাল থেকেই দেখছি আশুদা গভীর চিন্তায় মগ্ন। একটা ছোট পকেট ডায়রি এনেছে সঙ্গে। মাঝেমাঝে সেখানে কী যেন লিখে রাখছে। বুঝতে পারছিলাম অনেকগুলো চিন্তাকে একসঙ্গে সিন্থেসাইজ করছে সে মনে মনে। আমাদের গাড়ি এসে দাঁড়াল একটা ঝকঝকে পাঁচতলা হাসপাতালের সামনে। বাঙ্গালোরের মানুষরা চিকিৎসকদের সম্মান করে অনেক। এখানে চিকিৎসা করতে গিয়ে যখনতখন হুলিগানদের কবলে পড়তে হয় না। অথচ এখানে ডাক্তারদের ভিজিট অনেকটাই বেশি। তভু দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আরোগ্যের খোঁজে এখানেই ছুটে আসে। আমি দেখলাম রিসেপশনে নানান বেশভুষার নানান ধর্মের নানান প্রন্তের মানুষ দাঁড়িয়ে। সর্বানন্দ বোধহয় বলে রেখেছিল। জগৎ সরাসরি আমাদের ফ্লোর ম্যানেজারের কাছে নিয়ে গেল। তিনি ডেস্কটপে সার্চ করতে শুরু করলেন শুভায়ু দের নাম। তিন বছর আগে একবার শুভায়ু এখানে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছিল খিঁচুনি নিয়ে। একবারই। তারপর আর কোনও ফলো আপ এন্ট্রি নেই। আশুদা শুভায়ুর ডিসচার্জ সামারি দেখতে চাইল। রিসেপশনিস্ট সেই সামারির প্রিন্ট আউট বের করে দিলেন। আমরা আরতি ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স থেকে বেরিয়ে এলাম। আশুদা ডিসচার্জ সামারি দেখতে দেখতে বলল, "এরা কতো প্রফেশনাল দেখেছিস। তিনবছর আগেকার ডকুমেন্ট অনায়াসে বের করে দিল। চোখেমুখে কোনও বিরক্তি নেই।"

-ডায়াগনোসিস কী লিখছে?

-আশ্চর্য ঘটনা জানিস অর্ক। এখানে ডায়াগনোসিস লিখছে ট্যুরেট সিণ্ড্রোম উইথ এপিলেপ্সি!

-শুভায়ু দেরও ট্যুরেট সিণ্ড্রোম ছিল?এ তো সুনন্দর ডায়াগনোসিসের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। তাহলে কি...

আশুদা মিটিমিটি হাসে। এবার নিশ্চয়ই বুঝেছিস কেন আমি শুভায়ু আর সুনন্দর জিন পরীক্ষা করতে বলেছি?

ধীরে ধীরে চারপাশ পরিস্কার হচ্ছে যেন। তাহলে কি সুনন্দ শুভায়ুর কোনও আপন আত্মীয়? সেই কারণেই তাকে কলকাতায় নিজের কাছে নিয়ে আসা? হতেই পারে। কিন্তু আমি আরও ভাবছিলাম। একজন মানুষ যে ট্যুরেট সিণ্ড্রোমে ভুগছে, তার তো ঘনঘন হাতে পায়ে অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখা যাবে, মুখ দিয়ে অস্বাভাবিক শব্দ বের হয়ে আসবে, যাকে বলে 'ভোকাল টিক'।এই সমস্ত কাটিয়ে শুভায়ু কীকরে এতো বড় অভিনেতা হতে পারল? আশুদাকে বলতেই আশুদা হাসল।

-শ্লোক বলে, "মূকম করতি বাচালম পঙ্গুম লঙঘ্যতে গিরিম, যতক্রিপা তমাহম বন্দে পরমানন্দ মাধবম।"কে এই মাধব। যদি তুই নাস্তিক হোস, তাহলেও এই 'মাধব'এর ওপর তোকে বিশ্বাস করতেই হবে। এই 'মাধব' হল মানুষের সেই ইচ্ছাশক্তি যা বোবাকে বাচাল করে তোলে আর পঙ্গুকে পাহাড় চড়তে সাহস জোগায়। এই ইচ্ছাশক্তির জন্ম দেয় ক্ষিদে। শুভায়ু দের ভিতরে অভিনেতা হবার ক্ষিদেটা ছিল, তার মেধাও ছিল, ফলত ইচ্ছাশক্তির বলে অনায়াসেই সে ট্যুরেটকে হারাতে পেরেছিল।

আমরা বাঙ্গালোরেই দুপুরের খাবার সেরে ফেললাম। আশুদা সর্বানন্দর সঙ্গে কথা বলছিল। ফোন কেটে বলল, "মহেন্দ্র নাইডুকে পেতে গেলে আমাদের যেতে হবে অনন্তপুর। এখান থেকে প্রায় দুশো কিলোমিটার। পৌছোতে পৌছোতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। সর্বানন্দর তদন্তদল জানিয়েছে মহেন্দ্র নাইডু অনন্তপুরে একটা ছোট ক্লিনিক চালায়। 'মেনতেনু ক্লিনিক'। শুভায়ু সম্ভবত সেখানেই নিয়মিত যেত। কেন যেত কে জানে! সেই খোঁজেই আমরা চলেছি অনন্তপুর। তবে মহেন্দ্রর বাড়ি পেণুকোণ্ডায়। ফলে আমরা যাবার পথে পেনুকোণ্ডা গ্রাম ঘুরে যাব ঠিক করলাম।

সুপ্রশস্ত রাজপথ দিয়ে আমরা চলেছি। আশুদা পেনুকোণ্ডা সম্পর্কে বলছিল।মাত্র এক দিনে একটা গোটা সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। দিনটা ২৬ জানুয়ারি ১৫৬৫। তালিকোটার যুদ্ধে রামা রায়ার হত্যার সাথেসাথে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের পতন ঘটল। আহমৈদনগর, বিজাপুর আর গোলকোণ্ডার ফৌজ ব্যাপক লুঠতরাজ ধর্ষণ আর নরসংহার করতে করতে এসে পৌছোল বিজয়নগর সাম্রাজ্যের কেন্দ্রমণি হাম্পিতে। হাম্পি ধ্বংস করে তারা পাগলের মতো ছুটছে চারিদিকে। সেই সময় বিজয়নগর সাম্রাজ্যের শেষ কূলদীপক তিরুমালা তার পরিবারের সঙ্গে পালিয়ে এসেছিল পেনুকোণ্ডার দুর্গে। পেনুকোণ্ডার দুর্গ পাহাড়ের উপর। তার একদিকে পেনার নদী।অন্যদিকে চিত্রাবতী নদী। তালিকোটার পর আরো ত্রিশ বছর পেনুকোণ্ডায় টিমটিম করে জ্বলতে থাকে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের জীবনপ্রদীপ। তার আদিল শাহি আক্রমণে সেটুকুও নিভে যায়। আমরা ঠিক করলাম পেনুকোণ্ডায় মহেন্দ্র নাইডুর বাড়ি যাবার পথে একবার পেনুকোণ্ডার দুর্গ দেখতে যাব। পাহাড়ের বুক আঁকড়ে এঁকেবেঁকে চলেছে সড়কপথ। মহারাজা কৃষ্ণদেব রায়া এই দুর্গের রক্ষণাবেক্ষণৃর দায়িত্ব দেন দলাবয়ী কোনেটি নাইডুকে। গাড়ি অনেকটা যাবার পর সড়কপথ শেষ হয়ে গেল। বাকিটুকু পথ হেঁটে যেতে হবে। অপরিচ্ছন্ন বন্য ঘাস আগাছার আড়ালে উঁকি দিচ্ছে পাথরের নজরমিনার। আশুদা বলল,"চল। একটু জায়গাটা এক্সপ্লোর করা যাক। শুনেছি এই পাহাড়ের চুড়োয় একটা চমৎকার সানসেট পয়েন্ট আছে।"

পাথরের স্তুপের ভিতর অগোছালো হয়ে পড়ে আছে পেনুকোণ্ডা দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। বড় বড় থামগুলোয় খোদাই করা পাথরের মূর্তিগুলো কেটে কেটে নিয়ে গেছে কেউ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় ভেঙে পড়েছে দুর্গে ঢোকার সদরপথ। আমরা হাঁটতে হাঁটতে তেমনই এক পরিত্যক্ত সভাঘরে ঢুকে পড়লাম। আশুদা মাটির ভিতর খনন করা গর্ত দেখিয়ে বলল,"কতো বোকা আমরা দেখ। গ্রিসে গিয়ে দেখেছিলাম। ওরা এক্রোপলিসের ধ্বংসস্তুপের পাথরগুলোকে আগলে রেখে কেমন পর্যটনকেন্দ্র তৈরি করেছে। আর আমাদের দেখ।  এতো ঐতিহ্যের সাক্ষী এই দুর্গকে কেমন নির্বিচারে ধ্বস্ত করেছে গুপ্তধনসন্ধানীরা। মূর্খরা জানে না, আসল গুপ্তধন হল এই গোটা দুর্গটাই। গুপ্তধন সবসময় মাটিতে পোঁতা থাকে না।"

সভাঘরের থামগুলোয় নন্দী শিভ পার্বতীর মূর্তি। বোঝা যায় এখানে অনেক অসাধু মানুষও আসে। এক জায়গায় মদের বোতল বিয়ার ক্যান ডাঁই করে ফেলে রাখা। দেখতে দেখতে হঠাৎ একটি থামে চোখ আটকে গেল আমার।

-আশুদা। দেখো!

আশুদা থামের কাছে এসে দাঁড়াল। থামে পাথরের উপর খোঁদাই করা উনালোম চিহ্ন। এই খোঁদাই নতুন করে কেউ করেছে বলে মনে হল না। আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে এই চিহ্ন কে আঁকল। আশুদা বিস্মিত না হয়েই বলল,"উনালোম একটি প্রাচীন চিহ্ন।বিজয়নগর সাম্রাজ্যে জৈন ও বৌদ্ধদের প্রভাব ছিল। উনালোম নির্বাণের পথ দেখায় বলে হয়তো এই সভাঘরে ওই চিহ্ন আঁকা..."

আমরা হাঁটতে হাঁটতে পৌছে গেলাম 'সানসেট পয়েন্ট'এ। ভাবছিলাম কেমন ছিল সেই সকাল যার আগের দিন তালিকোটা ধ্বংস করল হাম্পিকে। নগর জ্বলছে, প্রাসাদ জ্বলছে। রাজকুমার তিরুমালা এই টিলাখণ্ডে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে কী ভাবছিলেন? হয়তো এটাই ভাবছিলেন, এই সাম্রাজ্য বৈভব পরাক্রম আস্ফালন, সব ক্ষণিকের। জীবনের মতোই সাম্রাজ্যও ক্ষণস্থায়ী!

ছোট্ট গ্রাম পেনুকোণ্ডা পৌঁছোতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ধাবায় চা খেতে খেতে কয়েকজন জার্মান পর্যটকের সঙ্গে আলাপ করল আশুদা। আশুদা ভালোই ডয়েশ বলতে পারে। কথোপকথনে বুঝলাম সেই পর্যটকরা গগন মহলের প্রভূত প্রশংসা করছে। এই গগন মহল হল মহারাজা কৃষ্ণদেব রায়ার গ্রীষ্মের প্রাসাদ। চুন আর বেলেমাটি দিয়ে তৈরি আশ্চর্য প্রাসাদ। ধাবা থেকে বেরিয়ে আমরা চললাম মহেন্দ্র নাইডুর ঘরের খোঁজে। সাদিক জায়গাটা চেনে। পেনুকোণ্ডা গ্রামের ভিতরেই টিম্মুরাসু সমাধির পাশেই তার বাড়ি। ঘরের উপর লেখা 'মেনতেনু ক্লিনিক।অনন্তপুর'।সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম মহেন্দ্র সেখানে থাকে না। থাকে তার বুড়ি মা আর বিধবা মাসি। সাদিক আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে জানাল, অনন্তপুরে গেলে মহেন্দ্রকে পাওয়া যাবে। এখান থেকে অনন্তপুর আরও এক ঘন্টার পথ। সদর সড়কে গাড়ি উঠতেই আশুদা বলল, "বিজয়নগর সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এই টিম্মুরাসু এক আশ্চর্য চরিত্র, জানিস অর্ক! টিম্মুরাসু ছিলেন রাজা কৃষ্ণদেব রায়ার মহাপ্রধান। আশ্চর্য যুদ্ধবিদ্যা ছিল তাঁর। তিনি না থাকলে রায়ার সম্রাট হওয়া অসম্ভব ছিল। রায়া তাকে 'আপ্পা' বলতেন। অথচ এই টিম্মুরাসুকেই একদিন বিশ্বাসঘাতক সন্দেহে বন্দি করলেন রায়া। তাঁর দুই চোখ অন্ধ করে দেওয়া হল। তাঁকে দিনের পর দিন কারাগারে ফেলে রেখে একদিন হঠাৎ রায়া জানতে পারলেন তার যাবতীয় সন্দেহ ভুল ছিল। রায়া টিম্মুরাসুকে মুক্ত করলেন বটে, কিন্তু মুক্তি পাবার পর টিম্মুরাসু আর বেশিদিন বাঁচলেন না। কেউকেউ বলে এই টিম্মুরাসুর অভিশাপেই বিজয়নগর সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।" অন্ধকার সড়ক দিয়ে আমরা অনন্তপুরের দিকে চলেছি। দূরে পাহাড়ের উপর পেনুকোণ্ডা দুর্গ যেন রহস্যময় হাতছানি দিয়ে আমাদের ডাকছে। আর আমরা কালের অববাহিকায় ক্রমশ মোহনার দিকে এগিয়ে চলেছি।

(ক্রমশ)


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন