কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

 

কবিতার কালিমাটি ১৫৭


রবীন্দ্রসঙ্গীতের রৌদ্ররাগ

 

আমি এমন কোনো জনপদে যেতে চাই না যেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের রৌদ্ররাগ নেই—যেখানে পৌষের আকাশ আহ্বানের সংকেত শেখেনি।

জয়তীর কণ্ঠ পতিসরের নাগরকে স্রোতোময় করে তোলে—তার ঢেউয়ে মিশে থাকে রবীন্দ্রনাথের বোটের ছলচ্ছল, পাতার আলো ও মগ্নতা।

মনের ছড়ানো লেনগুলো তখন সবুজ মাঠে এসে দাঁড়ায়, তাদের সম্মুখে রংধনু-আলোয় প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে দশদিক।

ধুলোকণায় কম্পন সৃষ্টি হয়—প্রতিটি কণায় লুকিয়ে থাকা গান প্রাকৃত সুরে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে।

জয়তীর কণ্ঠধ্বনির ভেতর উচ্ছলিত কম্পন থাকে। তার কণ্ঠ ধুলোকণাকে দীর্ঘক্ষণ আন্দোলিত রাখে। প্রতিটি কণা সুরের গোপন সারেঙ্গির ভেতর আশ্রয় খোঁজে।

রবীন্দ্রনাথের গান জলরঙের সমস্ত ঐশ্বর্যে পূর্ণ। শব্দ সুরমণ্ডিত হলে আকাশের বর্ণে সূচিত হয় পরিবর্তন—কিছুক্ষণের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে সময়ের জঙ্গমতা।

ইউটিউবের গানের ভিড়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত দীর্ঘ শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কাছে যেতেই একটি আশ্চর্য জানালা খুলে যায়—দৃশ্যমান হয় ঋতুচক্র, নীড়ের পাখি, অঘ্রাণের মাঠ ও ফাল্গুনের শিরীষ।

বস্তুত অস্তিত্বের গোপন নির্দেশে আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীতের কাছে ফিরে আসি—আমরা সেখানে সঞ্চিত রেখেছি সংবেদের সূক্ষ্ম দলমণ্ডল।

জিঙ্গোয়িস্টদের চিকিৎসার জন্য রবীন্দ্রসুরের রেডিয়েশন প্রয়োজন।সৈনিকের আঙুল থেকে এ সুর মুছে ফেলতে জানে ট্রিগারের দুর্গন্ধ।

রবীন্দ্রসুর ব্যালিস্টিক মিসাইলের বিস্ফোরণ প্রতিহত করতে জানে। উন্মাদের বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অন্ধকার নির্মূল করতে পারে রবীন্দ্রসঙ্গীত।

রবীন্দ্রনাথের গান নীরব শক্তির আধার। সুরের অদৃশ্য জাদুবল অলক্ষ্যে সারিয়ে তোলে পৃথিবীর ক্ষত।

গীতবিতানের গান থেকে নিয়ত বেরিয়ে আসে স্রোত-অতিক্রমী হরিণ—তার নাভিচক্র ছড়ায় অর্থের

অভিনব কস্তুরী।

সুর পৃথিবীর অন্তঃস্থ কাঠামোকে কালসহ করে তোলে। সুরের শ্রাব্যতা রুদ্ধ হলে পৃথিবীতে নেমে আসে কালনেমি অন্ধকার।

অবসন্নতার জীর্ণ ব্লাঙ্কেট আমার আচ্ছাদক হলে, প্রত্যঙ্গ বিস্মৃত হবে প্রতিক্রিয়ার শুদ্ধ সংকেত—তখনও অদৃশ্য পথে সুরের ধাবমানতা যেন অনুভব করি।

কালচিহ্ন প্রকট হলে আমার শ্রবণ-করটেক্সে ঝরুক রবীন্দ্রনাথের গান—এ গানের সারথ্য নিশ্চিত করুক অন্তহীন সবুজ মাঠে আমার প্রত্যাবর্তন।

 

বৈশাখ ও বিগত ঋতুর স্বরলিপি

 

চৈত্রের উষ্ণতার পরিকল্পনা উপেক্ষা করে বৈশাখের রোদ প্রতাপী হয়ে উঠেছে—আকাশ লিখে রাখছে আগুনের অদৃশ্য বিধান।

সূর্যের নিচে হেঁটে নিজের শক্তি মেপে নিই—দশ মিনিটের ভেতর সমস্ত কোষে জেগে ওঠে পরাজয়ের ঘণ্টাধ্বনি।

বাতাস সঙ্গীতহীন। পাতার মৃদু কম্পনে আবছা দৃশ্যমান বিগত ঋতুর স্বরলিপি।

গ্রামের আমগাছগুলো যত্নশীল হয়ে উঠেছে। ফলের পরিপক্বতা নিশ্চিত করার জন্য তারা গলদঘর্ম।

সকালে পাখিদের ক্ষণস্থায়ী অধিবেশন—রোদ প্রখর হবার আগেই তারা নৈমিত্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করে; পাখি-কমিউনিটির স্বার্থের দিকে দৃষ্টি রেখে সিদ্ধান্ত নেয়।

তাদের সভার কার্যবিবরণী জুড়ে থাকে অরণ্য, আবাসন ও আবহাওয়ার প্রতিফলন। তারা সময়ের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রস্তুত করতে জানে নিজস্ব রেকর্ড।

মধ্যাহ্নে তাদের কলধ্বনির ডেসিবেল অবরোহী হয়ে ওঠে। কণ্ঠশক্তির অপচয় রোধে তারা সচেতন।

নীরবতা শূন্যতা নয়—অনুচ্চারিত জ্ঞান। নীরবতা একটি পরিসর সৃষ্টি করে যেখানে উপলব্ধি কেলাসিত হতে থাকে। নীরবতা পাখিদের অভিনিবিষ্ট করে তোলে। তারা ভাবনার বিন্দুগুলোকে গন্তব্যের স্বচ্ছতার সাথে সমন্বিত রাখে। নীরবতার ভেতর তারা বহির্জগতের ও তাদের অন্তর্লীন স্বরের প্রকৃতি অনুধাবনে করে।

পাশের ফ্ল্যাটে টাইলস পরিবর্তন করা হচ্ছে। ক্রমাগত আঘাতে ভেঙে পড়ছে পৃষ্ঠতলের নিশ্চয়তা।

ধাতব সময় থেকে অসহনীয় শব্দ উদ্গিরিত হচ্ছে। খনিত অতীত নিক্ষিপ্ত হচ্ছে বর্তমানের ওপর।

সিমেন্ট মিশ্রিত ভাঙা টাইলস ভবনের নিচে স্তুপীকৃত—স্থায়িত্বের ভগ্নাংশের ভেতর কাঁপে আলো ও অন্ধকার। উঁকি দেয় পুনর্গঠনের অনবস্থ প্রস্তাবনা।

সিঁড়ি বালুময়—ঊর্ধ্বগমন ঝুঁকিপূর্ণ। আবাসের ভেতর লুকিয়ে থাকে অদ্ভুত ট্র্যাপ। প্রতিটি ট্রেড গতিময় হয়ে ওঠে—সুরক্ষা ও বিপত্তির সীমাচিহ্ন প্রায় অস্পষ্ট হয়ে যায়।

স্বাচ্ছন্দ্য এক অদৃশ্য ক্ষুধা—যা ক্রমাগত সঞ্চারিত হতে থাকে এবং পরিবর্তনে নিবৃত্তি খোঁজে।

সম্পদ ও বিলাসপ্রিয়তার ভেতর সুসম্পর্ক রয়েছে। সম্পদ ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য সৃষ্টি করে—ভাঙনের পুনরাবৃত্তি থেকে উদ্ভিন্ন হতে থাকে সৌন্দর্য।

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন