কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

শুভ্রজিৎ চক্রবর্তী

 

কবিতার কালিমাটি ১৫৭


পিতৃস্মৃতি

(১)

শব্দেরা স্রোত হয় স্মৃতি যত অমলিন আলো

ছায়াঘেরা শূন্যতা আঁধার

প্রান্তরে বিছিয়ে রাখে স্নেহজল আলপনা যত।

খুঁজে ফিরি প্রিয় ডাক।

কিছু স্পর্শ, কাতর হলে

স্থবির ওষ্ঠবর্ণের গায়ে স্তব্ধতা জমে।

উষ্ণতা সন্ধানী হাত আঁকড়ে ধরে অন্ধ দেওয়াল

অভ্যস্ত অভ্যেস যত বিষাদভাষা চিনে নিয়ে

মাটি, নুড়ি, বালুকণা ছুঁয়ে ছুঁয়ে

বুকের ওপর নিস্পন্দ পাথর।

অজস্র বোবা কথার পাহাড় পেরিয়ে

হাঁটতে হাঁটতে পাতাঝরা বিকেলের আলোয়

শোনা যায় ব্যর্থ ইচ্ছের গান।

বিবর্ণ অস্পষ্ট অক্ষরে নীলাভ শূন্যতা নামে

ডালপালা জড়িয়ে ধরা বিবর্ণ হলুদ রোদ্দুর

লোনাজল বাতাসের গায়ে মধুগন্ধ  ছড়ায়

তারপর সারারাত তারাভরা আকাশের সাথে

শীতল কথোপকথন,

স্তব্ধ মেদুর রূপকথার স্মৃতি

নিভে আসে নিঝুম রাত

মাদুর তুলে উঠে পড়ে চতুর্থীর চাঁদ

ভোর হয়

চারিদিকে কাহিনির মতো সবুজ উপত্যকা শুয়ে থাকে চিনারের ছায়া,

রুক্ষ পাথুরে পথ, অনুরণিত কলধ্বনি 

মেঘ বৃষ্টি‌ কুয়াশা‌ পেরিয়ে

হেঁটে চলে কেউ

নতুন একটা ভ্রমণকাহিনি‌ পড়বে বলে।

(২)

শূন্যতার শেষ প্রান্তের গায়ে

যেখানে মনকেমনের আলো ছড়িয়ে থাকে,

পাতাঝরা গাছেদের পাশে

তার কাছে যে নদীটির বাড়ি

সেইখানে লেনাদেনা শেষে কানে চুরুটের মত

সোনার নল গোঁজা তামাটে মগেরা বাড়ি ফেরে। 

'পউট্টাখালি'র নদীর ঘাটে ক্লান্ত নৌকোরা শুয়ে আছে ভাতঘুম চোখ,

শ্রান্তির খোঁজে ধোয়ো ধোয়া জলরঙে লোনাজল ছুঁয়ে পারি দেবে এইবার বুঝি। দেশান্তর...

বানাড়িপাড়ার বুলবুল ভাজা, আখড়াবাড়ির বুড়োর মুখের কেচ্ছা,

কাউয়াবাগানের পাশে আতাউল্লার দোকান, টাইম কলের জল,

ইঁট পাতা রাস্তার ধারে দোতলা টিনের বাড়ি,

স্মৃতিভেজা সুপুরি গাছের সারি। কথা মোড়া ভোরে সেই সব ছুঁয়ে ছুঁয়ে

হেঁটে হেঁটেই ফিরে যাবে, যেখানে ছায়া পেতে বসে আছে

সেই বুড়ো অশ্বথ গাছ আকন্ঠ তেষ্টা নিয়ে মিঠাপুকুরের জল।

হাট-বাজার, মড়কখোলার ধূ ধূ মাঠ পেরিয়ে অজস্র বিস্ময় হাতে নিয়ে

শুয়ে আছে নদী কীর্তনখোলা, দেশান্তর...

ইঞ্জিনের ধস ধস শব্দ ছুটে চলেছে স্টিমার,

বরিশাল থেকে খুলনা, সার্চ লাইটের আলোয় দেখা নদীর পার,

পার ভাঙার শব্দ, ব্যস্ত স্টিমারঘাটা আজও সে খুঁজে চলে

খুঁজতে খুঁজতে, খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে যায়

যে নদী চলে গেছে  বড়ো নদী পেরিয়ে আরো বড়ো কোনও

নদী হয়ে গাঢ় নীল সাগরের দিকে, সেই দিকে। দেশান্তরে...

(৩)

রেলিং আঁকড়ে লোডশেডিং রাত

হ্যারিকেনের আলোয় ভিজে তোষক

পড়াতে মন নেই।

জ্যাম বুঝি আজ খুব, কিংবা মিছিল, ওভার টাইম

কোথাও আটকে আছে বাস

প্রতীক্ষা গলে গলে বারান্দা থেকে রাস্তায়

দূর অন্য কোনো গোলার্ধের থেকে

ক্লান্ত শরীর হাতপাখার আদুরে বাতাস

বাবা ফেরে,

চা, মুড়ি মধ্যবিত্ত যাপন শেষ

আলো আসে, পাখা ঘোরে

উড়তে থাকে সঞ্চয়িতার পাতা

গোলাপেরা সুন্দর হয়, কর্ণের পাশে কুন্তী হয় মা।

বাবা তার হেঁটে যায় কিনু গোয়ালার গলি থেকে

ধলেশ্বরী নদী হয়ে আদিম আফ্রিকায়

মঞ্জুলির বিয়ে হয়, ছেলেটাও কানাই মাস্টার সাজে,

শোনে "যাহা কিছু ঘটিতেছে তাহার অবিকল

নকল রাখিবার জন্য কেহ তুলি হাতে..."

তারপর ছুটে দেখতে ছোটে শ্যামলী নদী, পাঁচমুড়ো পাহাড়।

চুনকাম ওঠা সাদা দেওয়ালের

গা বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসে

বিনা ভাড়ার সেই টিকটিকিটাও।

তারপর হাওয়া বয়

পেরেকে টাঙিয়ে রাখা একটা রবীন্দ্রনাথের ছবি

শাল পাতায় জড়ানো বেল ফুলের মালা

অন্য, অন্য একটা গ্রহ

যদিও সেটা কোনো পঁচিশে বৈশাখ নয়

আমাদের পঁচিশে বৈশাখ হত অহরহ।

 

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন