কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

মৌ চক্রবর্তী

 

মিডিয়া, সমাজ সংস্কৃতি মঞ্চাভিনেত্রীদের অনুষঙ্গ # লেখা

 


প্রতি,

হে দর্শক,

মিডিয়া শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘মাধ্যম’। এই মাধ্যমের দ্বারাই সমাজ নিজের প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করে এবং সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাকে প্রকাশ ও প্রচার করে। নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে বিশেষত মঞ্চাভিনেত্রীদের সামাজিক অবস্থান, গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিচিতি গঠনে মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মিডিয়ার রূপ পরিবর্তিত হলেও তার প্রভাব কমেনি; বরং আরও বহুমাত্রিক হয়েছে।

উনিশ শতকের বাংলা নাট্যসমাজে যখন আধুনিক থিয়েটারের সূচনা ঘটে, তখন অভিনেত্রীদের উপস্থিতি ছিল একপ্রকার সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সেই সময় মিডিয়া বলতে মূলত প্রিন্ট মিডিয়াকেই বোঝানো হত—সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রিকা ছিল প্রধান প্রচারমাধ্যম। তত্ত্ববোধিনী, হিন্দু পেট্রিয়ট, সুলভ সমাচার, সাধারণী, কলিকাতা রঙ্গালয় প্রভৃতি পত্রিকায় নাটক, অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং মঞ্চসংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হত। এইসব পত্রিকার প্রতিবেদনে শুধু নাট্যজগতের খবরই নয়, বরং সমাজের নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটত।

বিশেষ করে অভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে এই প্রতিফলন ছিল দ্বৈত প্রকৃতির। একদিকে তাঁদের প্রতিভা ও শিল্পসত্তার প্রশংসা করা হত, অন্যদিকে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে নানা সমালোচনা ও প্রশ্ন তোলা হত। ফলে মিডিয়া একদিকে যেমন তাঁদের পরিচিতি বাড়িয়েছে, তেমনি অন্যদিকে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতাকেও প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, মিডিয়া ছিল সমাজের আয়না—যেখানে অভিনেত্রীদের গ্রহণযোগ্যতা ও বিতর্ক দুটোই সমানভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

পরবর্তীকালে, বিশেষত বিংশ শতকের মধ্যভাগে গণনাট্য আন্দোলনের আবির্ভাব নাট্যচর্চার ধরনকে আমূল পরিবর্তন করে। গণনাট্য সংঘের মাধ্যমে থিয়েটার হয়ে ওঠে জনসচেতনতার হাতিয়ার। এই সময় মিডিয়া শুধু তথ্যপ্রচারক নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। থিয়েটার সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে যায়—গ্রাম থেকে শহর, উন্মুক্ত মঞ্চ থেকে ভ্রাম্যমাণ পরিবেশনায়।

এই প্রেক্ষাপটে মঞ্চাভিনেত্রীদের ভূমিকা নতুন মাত্রা পায়। থিয়েটারের অভিনেত্রীরা শুধু অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; তাঁরা সমাজ-রাজনীতি, শ্রেণীসংগ্রাম এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাঁদের অভিনয় হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। এখানে মিডিয়া এবং থিয়েটার একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে—থিয়েটার হয়ে ওঠে জীবন্ত মিডিয়া। আর মিডিয়া সেই থিয়েটারকে বৃহত্তর সমাজে পৌঁছে দেয়। এবং ইতিহাসেও। তাই না আজকে আমরা আলোচনা করছি লিখছি ভাবছি এবং থিয়েটার করছি।

কিন্তু সময় পেরিয়ে এসে এক যুগে  মিডিয়ার চরিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ইলেকট্রনিক মিডিয়া, টেলিভিশন, এবং পরবর্তীতে ডিজিটাল মিডিয়ার আগমনে তথ্যপ্রচারের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি তার প্রকৃতিও বদলেছে। এখন তথ্য শুধু প্রচারিত হয় না, তা নির্মিতও হয়। এই নির্মাণ প্রক্রিয়ায় অনেক সময় শিল্পের গভীরতা ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ আড়ালে পড়ে যায়।

বর্তমান মিডিয়ায় মঞ্চাভিনেত্রীদের উপস্থাপন অনেক ক্ষেত্রে তাদের শিল্পসত্তার চেয়ে বাহ্যিক রূপ ও গ্ল্যামারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এও মিডিয়ার এক ভূমিকা, যা থিয়েটারের মতো গভীর ও চিন্তাশীল মাধ্যমকে অনেক সময় গৌণ করে দেখায়। এসব তথ্য সত্ত্বেও বেশি সময় ধরে আলোচনায় উঠে আসে অভিনেত্রীদের নায়িকা-সুলভ ইমেজ। হ্যাশ ট্যাগ তৈরি করা অভিনেত্রীদের সুলভ বিজ্ঞাপন দেখে দেখে মিডিয়ার পাতা ভারি হয়। বা, এসব যেন বোঝায় মিডিয়া ট্রেন্ড হল, বিনোদন বিনোদন বিনোদন, হ্যাঁ বিনোদন শিল্পের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে দর্শকের কাছে অভিনেত্রীদের প্রকৃত শিল্পীসত্তা আংশিকভাবে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

এই প্রবণতার পেছনে অন্যতম কারণ হল পুঁজিবাদী কাঠামোর প্রভাব। দেখা যায় মিডিয়া অনেকাংশেই কর্পোরেট মালিকানার অধীনে পরিচালিত। যেখানে মূল লক্ষ্য থাকে লাভ এবং দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধি। ফলে যে বিষয়গুলিসস্তা, সুলভ, অতি দ্রুত হারিয়ে যাওয়া অথচ বেশি আকর্ষণীয় বা জনপ্রিয়, সেগুলিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় থিয়েটারের মতো গম্ভীর শিল্পমাধ্যম এবং তার সঙ্গে যুক্ত অভিনেত্রীদের কাজ অনেক সময় পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না।

এছাড়াও, মিডিয়া এখন শুধুমাত্র প্রতিফলক নয়, বরং প্রভাবকও। এর দ্বারা সমাজের রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত। যখন মিডিয়া কোনও  অভিনেত্রীকে নির্দিষ্ট এক ছাঁচে উপস্থাপন করে, তখন দর্শকের মনেও সেই ছাঁচ স্থায়ী হয়ে যায়। ফলে অভিনেত্রীদের বহুমাত্রিকতা ও সৃজনশীলতার পরিসর সংকুচিত হতে থাকে। অভিনেত্রী হিসেবে উপস্থিত থেকেও বেশি হয়ে যায় ফিমেল জেন্ডার বা মেয়ে ট্যাগের প্রতিনিধি।

তবে এই প্রেক্ষাপটে মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। ডিজিটাল যুগে সমাজমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থিয়েটার ও মঞ্চাভিনেত্রীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এখন তাঁরা সরাসরি দর্শকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারেন।  নিজেদের কাজ প্রচার করতে পারেন এবং বিকল্প পরিসর তৈরি করতে পারেন। এই স্বাধীনতা অনেকাংশে প্রচলিত মিডিয়ার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে সাহায্য করছে।

সুতরাং বলা যায়, মিডিয়া ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে মঞ্চাভিনেত্রীদের অবস্থান এক জটিল ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতা। উনিশ শতকের প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে বর্তমান ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত, এই সম্পর্ক নানা রূপে প্রকাশ পেয়েছে। কখনও তা শিল্পের বিকাশে সহায়ক হয়েছে, আবার কখনও তা শিল্পকে প্রান্তিক করেছে।

মিডিয়া ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গেলে এক গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন উঠে আসে—মিডিয়া কি কেবল সমাজের প্রতিফলন, না কি সে নিজেই বাস্তবতা নির্মাণ করে? আধুনিক গণমাধ্যমতত্ত্ব অনুযায়ী, মিডিয়া শুধু তথ্য পরিবেশন করে না; বরং তা নির্বাচন, বিন্যাস এবং উপস্থাপনার মাধ্যমে এক নির্দিষ্ট বাস্তবতার কাঠামোও তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে মঞ্চাভিনেত্রীদের চিত্রায়নও অনেকাংশে ‘নির্মিত বাস্তবতা’, যেখানে তাঁদের শিল্পীসত্তা, ব্যক্তিসত্তা এবং সামাজিক অবস্থান মিডিয়ার দৃষ্টিকোণ দ্বারা নির্ধারিত হয়।

এখানে ‘ফ্রেমিং’ এবং ‘অ্যাজেন্ডা-সেটিং’ তত্ত্বের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। মিডিয়া কোন বিষয়কে কতটা গুরুত্ব দেবে এবং কীভাবে উপস্থাপন করবে, তা নির্ধারণ করে দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে মঞ্চাভিনেত্রীদের ক্ষেত্রে যদি বারবার তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন, চেহারা বা গ্ল্যামারকে সামনে আনা হয়, তবে দর্শকও তাঁদের সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই মূল্যায়ন করতে শুরু করে। আবার এর উলটোটাও সত্যি যে মিডিয়া দেখালেও মানুষ ওরফে সমাজ নিচ্ছে কেন? ফলে শিল্পের গভীরতা ও মঞ্চ-প্রদর্শনের জটিলতা আড়ালে থেকে যায় অভিনেত্রী সত্তা।

তাই একইসঙ্গে, ‘গেজ’ বা দর্শন-রাজনীতির প্রসঙ্গও এখানে প্রাসঙ্গিক। সমাজে নারীর প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান, মিডিয়া অনেক সময় সেটাকেই পুনরুৎপাদন করে। মঞ্চাভিনেত্রীদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, তাঁদেরকে এক নির্দিষ্ট নান্দনিক কাঠামোর মধ্যে বন্দি করা হয়—যেখানে তাঁদের শরীর, সৌন্দর্য ও আকর্ষণীয়তা বেশি গুরুত্ব পায়, অথচ তাঁদের কণ্ঠ, দেহভঙ্গি, সংলাপ-উচ্চারণ বা অভিনয়শৈলীর বিশ্লেষণ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে নাট্যচর্চার মান এবং দর্শকের রুচির উপর প্রভাব ফেলে।

তবে এই পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিরোধের সম্ভাবনাও নিহিত রয়েছে। বিকল্প মিডিয়া বা ‘অল্টারনেটিভ মিডিয়া’—যেমন স্বল্পবাজেটের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, স্বাধীন পত্রিকা, ব্লগ, এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—মঞ্চাভিনেত্রীদের জন্য নতুন নতুন পরিসর তৈরি করেছে। এখানে তাঁরা নিজের কাজ, মতামত এবং অভিজ্ঞতা সরাসরি প্রকাশ করতে পারেন, যা মূলধারার মিডিয়ার একমুখী উপস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এই পরিসরে দর্শকও আরও সচেতন ও অংশগ্রহণমূলক হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবেও মিডিয়ার চরিত্র বদলেছে। আন্তর্জাতিক বিনোদন শিল্প, ডিজিটাল স্ট্রিমিং এবং ভিজ্যুয়াল কালচারের প্রভাবে স্থানীয় থিয়েটার এবং তার সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের উপস্থাপনায় এক ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজড’ রূপ দেখা যায়। এর ফলে অনেক সময় আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য, ভাষা এবং সংস্কৃতির স্বকীয়তা ক্ষুণ্ণ হয়। মঞ্চাভিনেত্রীদের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব কাজ করে, যেখানে তাঁদের অভিনয়ের ধরণ বা উপস্থাপনা আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ডে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়।

এই প্রসঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাট্যশিক্ষা এবং মিডিয়া স্টাডিজের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীরা মিডিয়ার কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। একইসঙ্গে গবেষণামূলক লেখালেখি, সমালোচনা এবং আর্কাইভ তৈরির মাধ্যমে মঞ্চাভিনেত্রীদের কাজকে নথিভুক্ত করা জরুরি। এতে তাঁদের শিল্পীসত্তা দীর্ঘস্থায়ী স্বীকৃতি পাবে এবং মিডিয়ার ক্ষণস্থায়ী উপস্থাপনার বাইরে এক স্থায়ী মূল্যায়নের পরিসর তৈরি হবে।

বলা যায়, মিডিয়া যদি সত্যিই সমাজ ও সংস্কৃতির যথার্থ প্রতিফলন হতে চায়, তবে তাকে শুধু প্রচারের যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বশীল সাংস্কৃতিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে হবে। মঞ্চাভিনেত্রীদের উপস্থাপনে তাদের শিল্পীসত্তা, শ্রম এবং সামাজিক অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তবেই মিডিয়া, সমাজ এবং থিয়েটারের মধ্যে এক সুস্থ ও সৃজনশীল সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

সবশেষে বলা যায়, মিডিয়া-সমাজ-সংস্কৃতির এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের মধ্যে মঞ্চাভিনেত্রীদের অবস্থানও ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনকে বোঝার জন্য প্রয়োজন সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দায়িত্বশীল মিডিয়া চর্চা। মিডিয়া যদি সচেতনভাবে শিল্পের গভীরতা, বৈচিত্র্য এবং মানবিক দিকগুলোকে গুরুত্ব দেয়, তবে তা শুধু মঞ্চাভিনেত্রীদের নয়, সমগ্র নাট্যসংস্কৃতির বিকাশে সহায়ক হবে। আরও দৃঢ় প্রত্যয় যে সমাজ সংস্কৃতির সদর্থক বিকাশেও ভূমিকা পালন করবে। অন্যথায়, প্রচারের আধিক্যে শিল্পের মৌলিকতা এবং সামাজিক তাৎপর্য আড়ালেই থেকে যাবে।

আর ট্রোল করবে নাটক, নাটকীয় ড্রামা কদর্থকভাবে।

ইতি _

একুশ শতকের এক সত্তাধিকারী


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন