| সমকালীন ছোটগল্প |
এক রাতের কাঁদরী
বাবুয়া প্রচণ্ড রেগে গেছে। কার ওপর, কেন, কিসের জন্যে কিছুই জানে না কিন্তু রেগে গেছে। হাতের কাছে যা পাচ্ছে, চোখের সামনে যা দেখছে-- সব কিছুকেই কেমন অগোছালো অপ্রয়োজনীয় মনে হতেই মনে মনে একটাই রগরগে খিস্তি উঠছে বার বার। এই কাঁচা গালাগালের মুখোমুখি এক নম্বর সভ্য দেশের মানুষেরা স্কুল কলেজ অফিস বাজারে প্রায়শই হয় কিন্তু কেউ কিছুই মনে করে না। শুধু বাবুয়া যদি গোদা বাংলা ভাষায় কারও মুখের উপর এ শব্দটা উচ্চারণ করে বসে, তবে তার গোত্র পরিচয় সব কিছুই একেবারে ঘেঁটে যাবে। ফাক ইট ব্লাডী শীট। বাংলা অনুবাদ আপাতত করছি না। তবে পৃথিবীর এক নম্বর সভ্য দেশের এক নম্বর রাষ্ট্রনেতা সরাসরি মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক নিয়ে গর্বের সঙ্গে 'ফাকিং এস' বললেও সেটা খবর হবে, কেউ নাকে রুমাল দিয়ে বলবার প্রয়োজনই রাখে না 'দেখেছো কেমন কাঁচা খিস্তি দিচ্ছে'!
সে সব থাকগে, আপাতত প্রসঙ্গ বাবুয়া, সে চেতে আছে। ঘুম
থেকে উঠেই মনে পড়ে আজ কিছু করতে হবে। কি করতে হবে, জানে না। কিছু করতে হবে। চারপাশের
সবকিছুই কেমন বালছাল অর্থহীন কাঁইকিচিমিচি। জিভ বার করে কুকুরের মত সব ছুটছে। রাস্তায়
বেরিয়েই ইচ্ছে হলো মানুষের এই অপ্রয়োজনীয় দৌড়টাকেই সে আর সহ্য করতে পারছে না। জান্তব
নিয়মতান্ত্রিকতা। 'চু** দে শালা'। ফুলহাতা জামাটা পুরনো হলেও রঙে জেল্লা আছে, কলারটা
তুলে দিতেই কেমন মেজাজটা ফুরফুরাস হয়ে গেলো। পথে বেরিয়ে কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা হাঁটতে
থাকে। সামনে কিলবিল করতে করতে একঝাঁক কচি বয়সের ছেলেমেয়ে সাইকেল চালিয়ে তাকে অতিক্রম
করে যাচ্ছে। বোধহয় টিউশন পড়ে বেরোলো। সবার শেষের মেয়েটি পাশের ছেলেটিকে বলছে, স্যারের
সেদিনের নোটটা দিবি, তাহলে তোর বাড়ি গিয়ে নিয়ে আসব। তৎক্ষণাৎ ছেলেটি সাইকেল একটু আস্তে
করে মেয়েটিকে বললো, টিপতে দিবি তো, তাহলে দেবো। মেয়েটিও চমকায় না একেবারেই, পাল্টা
বলে, সেদিনও তো দিয়েছি। ছেলেটি মহাখুশিতে সাইকেলে জোরসে প্যাডেল কসে বলে ওঠে, বিকেলে
চলে আয়।
বাবুয়ার রাগ কেমন গলে ধুস হয়ে যায়। আন্দাজ করে এগুলো সেভেন-এইটে
পড়া গেঁড়েগুগলি। বয়স ১৮ পেরোলে এরা কি করবে আর ভাববার ইচ্ছেই হয় না। নিজেকে কেমন ক্যালাচোদার
মত লাগে। পাঁচদিন আগে সেই কাঁদরি 'কালকেই আসবো' বলে যে কোথায় চলে গেলো, খুঁজেই পাচ্ছে
না। ফোন করলে 'আউট অফ নেটোয়ার্ক এরিয়া', হোয়াটস এপে নেই, ফেসবুকে নেই, বাঞ্চোত পুরো
মুরগী বানিয়ে দিয়ে ভ্যানিশ। বাড়ি চিনলেও যাওয়া বারণ, ওর বাপ নাকি তাকে দেখলেই গুলি
করে দেবে। ড্রাগ পাচার, মাগীর দালালী থেকে খুনেরও দু-একটা কেস নিয়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছে,
কারণ সে শাসক করে। মানে শাসকের দলের সম্পদ। বাবুয়া তবে কি করবে! সুযোগ পেয়েও শোয়ায়নি
মালটাকে কারণ কাঁদরী তাকে অনেক বড় স্বপ্নে লটকে দিয়েছে। বাবার বন্ধুকে বলে তার জন্যে
মাসে ৪০-৫০ হাজার টাকার কাজ ব্যবস্থা করে দেবে। মাসখানেক কাজ হয়ে গেলে তার সাথে পালিয়ে
গিয়ে তারপর বিয়েটা করে নেবে, ইত্যাদি। এসব হেজিয়ে পাঁচদিন আগে নাকে মাই ঘষে দিয়ে সেই
যে গেলো আর কোনো যোগাযোগ নেই। বাবুয়া ক্রমেই তার রেগে যাওয়ার কারণের ক্লু খুঁজে পেতেই
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে-- তার একটা মেশিন দরকার। কোমড়ে সাঁটিয়ে মাগীর বাড়িতে ওর বাপের
সামনে দিয়ে ঢুকে মালটার চুলের মুঠি ধরে নিয়ে এসে বিছানায় ফেলে আগে ন্যাংটো করবে। ওর
বাপ বাধা দিলে বা কিছু গরম দেখাতে এলে মেশিন বার করে খুপড়িতে ঢুকিয়ে দেবে গোটা চারেক
দানা। কিন্তু এমন ভাবনা কিছুটা গরম করলেও যেই ভাবতে বসে মেশিনটা পাবে কোথায়, চোখের
কোলে কালি জমে যায়। কে দেবে-- দুহাতে চুলগুলো একবার খামচে নিয়ে কিছুটা এগিয়ে যেতেই
দেখে এক ভোট কোম্পানির মিছিল থেকে বিরাট হল্লা হচ্ছে, জ্যায় ছিরাম...জ্যায় ছিরাম। পেছন
পেছন যেতে যেতেই মিছিল থেমে যায়। গাড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে এক লম্বাচওড়া রঙচঙে ফু্ল পাতায়
চোবানো নেতা মাইক নিয়ে ভাষণ দিতে শুরু করে-- ভাইয়ো অর বহেনো, ইধার হিন্দু খতরে মে হ্যায়।
ঠিক বোলতা হ্যায় কি নেহি? মিছিল থেকে তীব্র আওয়াজ ওঠে-- ঠিক বোলা, ঠিক বোলা। আবারও
নেতা চীৎকার করে ওঠে-- তো হিন্দুকো বাঁচানে কে লিয়ে তুমলোগ হামারা পার্টীকো ভোট দেগা
কেয়া নেহী? মিছিলের আওয়াজ-- দেগা দেগা, সব ভোট হামারা পার্টিকো দেগা।
বাবুয়া এই হল্লাকে আর নিতে পারে না। হিন্দু খতরে মে, বালের
কথাবার্তা, আমি নিজেই শালা গাড্ডায় পড়ে আছি, এখন হিন্দু খতরে মে ভাবতে হবে। সে পাশের
ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে দ্রুত মিছিলকে টপকে চলে যায়। সামনে মিছিল ছাড়িয়ে, মাইকের ভাষণ ছাড়িয়ে
আরও কিছু দূর যেতেই চোখে পড়ে আরও এক মিছিল, তবে বহরে ছোটো। দূর থেকেই দেখা যায় লম্বা
লম্বা বাঁশের লাঠির মাথায় লাল পতাকা উড়িয়ে চলেছে আরও এক মিছিল আর তীব্র গর্জন উঠছে
'ইনকিলাব জিন্দাবাদ'। শুনলেই মন মেজাজ কেমন গরম হয়ে যায়। মার শালা, সব গাঁড় মেরে দে।
কিছুটা যেতেই মিছিল থামিয়ে আবারও ভাষণ। বন্ধু, আজ আমাদের সামনে এক মহাদুর্যোগ। রাজ্যে
চোর, দুর্নীতিবাজ এক সরকার। কোনও আইনের শাসন নেই। কয়লা চোর, সোনা চোর, চাকরি চোর, ধর্ষকেরা
এখানে শাসকের সহযোগী। আবার দেশ চালাচ্ছে দেশ বেচে দেওয়া, সাম্প্রদায়িক কিছু বেনিয়ার
দল। সুতরাং, এবারের ভোটে আমাদের (আগমার্কা) প্রতীকে আপনারা ভোট দিয়ে জেতান, আমরাই সব
অপশক্তিকে শক্ত হাতে রুখব। আমাদের একটাই মন্ত্র 'লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে
চাই'।
বাবুয়ার কান মাথা ঝাঁঝাঁ করছে এমন গরম ভাষণ শুনে। তবে
শেষ শ্লোগানটা বেশ মনে গিঁথে যায়-- লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই। কাঁদরীর
বাপের গরম আমি ভাঙ্গবই, প্রয়োজনে লড়াই করে টেনে হিঁচড়ে বার করে আনবো মাগীটাকে, ওর কোন
বাপ আমাকে ঠেকায় দেখবো। সে রাস্তা ছেড়ে পাশের এক গলিতে ঢুকে যায়। গলির ওপিঠে আরও এক
সমান্তরাল বড় রাস্তা। ওই রাস্তার দুপাশেই ছড়ানো বাজার বস্তী সবকিছু। দ্রুত হেঁটে গলি
পেরোতেই দেখে আরও এক মহা-মহামিছিল। আর মাইকে গান চলছে, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা/মমতাই ভরসা।
মাঝে মাঝেই তীব্র হুঙ্কার-- যতই করো হামলা/ আবার জিতবে বাংলা/ জয় বাংলা। এদের আবার
অন্য সুর, গানের ফাঁকে প্রায়ই উড়ে আসছে গম্ভীর গলার আওয়াজ, বাঙলা বাঙালীর থাকবে নাকি
হিন্দী-হিন্দু-হিন্দুস্থানীদের দখলে চলে যাবে, সেটা এবারের ভোটে ঠিক করবেন আপনারাই।
ওরা বাঙলার বাইরে বাঙলা ভাষায় কথা বললে অত্যাচার করছে, বাংলাদেশী বলে সীমান্ত পার করে
দিচ্ছে। বাঙালীকে এই অপমান কি আপনারা মেনে নেবেন? অমনি মিছিল থেকে গর্জন উঠছে, না,
মানব না-- জয় বাংলা। কি আওয়াজ যেন আকাশ ফাটিয়ে ফেলবে বাঙালী। বাবুয়া কলারটা একবার ঝেড়ে
নিয়ে নিজেকে বাঙালী ভেবে সাহস পায়।-- তবে বারবার বাংলা বাংলা শুনতে শুনতে মনে এক গভীর
নেশা কিলবিল করে ওঠে। জয় বাংলা। পকেটে যা টাকা আছে পাঁইট একটা হয়ে যাবে। জয় বাংলা।
কিন্তু এই ভীড় থেকে বাঁচতে গেলে তাকে মিছিলের বিপরীত দিকে হাঁটতে হবে, কারণ আপাতত এই
একা পায়ে পৃথিবী মাড়িয়ে যেতে সে নিজেকে একটা মানুষ মানুষ মনে করছে। হাঁটতে হাঁটতেই
রাস্তার উল্টোদিকে একটা মোটরগাড়ী সারাইয়ের দোকান চোখে পড়ে। সে রাস্তাটা টপকে উল্টোদিকের
দোকানটার কাছে গিয়ে বাইরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর সেখানে কাজ করছে এমন একজন লোককে
দোকানের মালিকের মতো মনে হতেই সে তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে সরাসরি বলে বসে, আপনার এখানে
কি আমার একটা কাজ হবে?
-- মানে? মালিকের মতো লোকটা উলটো তাকেই প্রশ্ন করে।
-- মানে, আমি আপনার এখানে কাজ করতে চাই, খুব দরকার একটা
কাজের।
-- লেখাপড়া কী করেছো?
-- বিকমের প্রথম বছরে ভর্তি হয়েছিলাম, কিন্তু নানা কারণে
শেষ করতে পারিনি।
-- মোটর গ্যারাজের কাজ তো আর সবাই করতে পারে না, তার জন্য
ট্রেনিং নিতে হয়। সেরকম কোন ট্রেনিং কি কোথাও নিয়েছো?
-- না, কাকা। তেমন কোনো ট্রেনিং নেই। বলছিলাম, যদি আপনিই
আমাকে এখানে ট্রেনিং করিয়ে নেন, আমার খুব উপকার হয়।
-- আমি করিয়ে নিতে পারি, কিন্তু কম করে তিনমাস কোনো পয়সা
তুমি পাবে না। অবশ্য ট্রেনিং কোথাও নিতে গেলে নিজেদেরই টাকা দিতে হয়, সে টাকাটাও বেশ
অনেকটা। আমি তোমাকে না হয় বিনে পয়সাতেই ট্রেনিং দিয়ে দেবো। তবে শর্ত একটাই, এই তিনমাস
নিয়ম করে সময়মতো গ্যারাজে আসতে হবে এবং যখন যে কাজ করতে বলবো মুখ বুঁজে সে কাজ করে
যেতে হবে। কোনো আড্ডা, কোনো অজুহাত কিন্তু আমি মেনে নেবো না। যদি রাজি থাকো, কাল সকাল
আটটায় এখানে পুরনো জামা-প্যান্ট থাকলে পরে চলে আসবে কিংবা ব্যাগে করে এনে এখানেও বদলে
নিতে পারো। কারণ এখানে সবই তেল-কালি ধুলো-কাদার কাজ। তোমার খাওয়া দাওয়া আমাদের সাথে
আমাদের মতো করেই হবে, তার জন্য তোমায় কোনো পয়সা দিতে হবে না। ঠিক আছে! এখন আসতে পারো,
আমার হাতে কাজ আছে। কথাটা বলেই একটা ভাঙাচোরা গাড়িকে নিয়ে সেই মালিক ভদ্রলোক ব্যস্ত
হয়ে পড়লেন।
বাবুয়া গ্যারাজ থেকে বেরিয়ে গ্যারাজের ফুটপাথ ধরে হাঁটতে
হাঁটতেই সকালের রাগটা একেবারেই উবু হয়ে যায়। সে একটা কাজ তো জুটিয়ে নিতে পেরেছে, এবার
কি করা যায় দেখতে হবে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে একবার মেপে নেয় পয়সাকড়ি কি আছে, কিছু খাওয়া-দাওয়া
করা যাবে কিনা। যা পায় পকেট খামচে বার করতেই দেখে একটা একশো টাকার নোট আর দুটো দশ টাকা।
মন চাঙ্গা হয়ে যায়। পথের পাশে একটা দোকানে দেখে এখনও পরোটা ভাজছে। লোভ সামলাতে পারে
না, দোকানে ঢুকে প্রয়োজন মতো খেয়ে নেয়। কুড়ি টাকাতে পেট একেবারে ঠাণ্ডা। মাথায় এখনও
সেই জয় বাংলা বাজছে। বাংলা না খেলে এই ধুনকিটা কাটবে না। দোকানের পাশেই এক বিহারী ট্রলিয়ালা,
গাড়িটা রেখে খালি গায়ে গা মুছছে কাঁধের গামছা দিয়ে, লুঙ্গি গুটিয়ে পরা। কি সহজ পোষাক।
বাবুয়ার ভালো লাগে। কাছে গিয়ে জানতে চায় কাছাকাছি দেশি মদের দোকান কোথায় পাওয়া যাবে?
বিহারী একবার ঝারি মেরে আঙ্গুল দিয়ে একটা গলি দেখিয়ে বলে, ও রেণ্ডী গলি হ্যায় না, উধার
মিল যায়েগা। বাবুয়া আবার কেমন চেতে ওঠে। গ্যারাজের কাছেই মাল মাগী সব পাওয়া যাবে! সোজা
গিয়ে গলিটায় ঢুকে দেখে একটা কান্ট্রির দোকান। একবোতল ক্যাপ্টেন নিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে এবার
ভূগোলটা একটু হিসেব করে বাড়ীর দিকে হাঁটতে থাকে আর মাথায় খলবল করতে থাকে মিছিলের সেই আওয়াজ-- লড়াই লড়াই লড়াই
চাই / লড়াই করে বাঁচতে চাই। পরদিন সকাল আটটায় কাজে আসতে হবে, সুতরাং তাড়াতাড়ি বাড়ি
ফিরে ছিপি খুলতে হবে। পকেটে হাত দিয়ে বোতলটা হাতে ঠেকতেই তার মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে
যায় অন্য মিছিলের শোনা সেই তীব্র আওয়াজ-- জয় বাংলা, জয় বাংলা। আর সেই উচ্চারণের সাথেই
তার মনে হয় স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি জোরে সে হাঁটছে। হাঁটছে নাকি দৌড়চ্ছে। মনে মনে
বলে, কাঁদরীর বাপের পেছন মারি সাতবার। কাল থেকে আমিও এক গ্যারাজের শ্রমিক। তেল কালি
ধুলো কাদায় হাতুড়ী চালাবো ভাঙা গাড়ীর বনেটে। আর কোন কাঁদরী নয়, হাতে টাকা পেলে ওই রেণ্ডী
গলিতে গিয়ে মাগী করে আসবো হাত পা ছড়িয়ে। চল শালা, হ্যাট, ওসব কাঁদরী ফাদরীর ন্যাকড়াবাজীতে
মুতে দিই আমি।
যেহেতু লেখাটি কোন উপন্যাসের অংশপাঠ নয়, তাই বাবুয়াকে
দেখা যায় পরদিন সেই মোটর গ্যারাজের ধুলোকালিতে মালিকের সাথে হাত মিলিয়ে সে লড়ে যাচ্ছে
গ্যারাজের কাজ সব শিখে নেওয়ার নিবিষ্ট তাগিদে। কখনও গাড়ীর নীচে জাগ লাগিয়ে কিছুটা উঁচুতে
তুলে দেবার জন্য মালিক তাকে চিৎ কোরে ঢুকিয়ে দিয়েছে গাড়ীর নীচে, কখনও হাতে হাতুড়ী পিটিয়ে
যাচ্ছে চারচাকা কোন ছোটগাড়ীর ভাঙ্গাচোরা সাইড ডোর। বাবুয়া নিয়ম করে আসে মন দিয়ে সব
কাজ শেখে, মালিক খাবার ছাড়াও তার হাতে দুশো একশো টাকাও মাঝে মাঝে তুলে দেয়। মালিকের
এই ছেলেটাকে ভালো লেগেছে। বাবুয়া যেন তাকে ছেড়ে না যায়, সেটাই ভাবছে সে। কারণ ছেলেটি
পড়াশুনো জানে, গায়ে গতরে খাটতে পারে এবং প্রতিদিন সময় মত কাজে আসে। তার কাজ শেখার তাগিদটা
খুব বেশি। মালিক বোঝে এই ছেলেটা খুব তাড়াতাড়িই একটা ভালো মোটর মেকানিক হয়ে উঠবে কারণ
সে খুবই বুদ্ধিমান, একবার দেখিয়ে দিলেই মনে রাখতে পারে সব।
কখনও কখনও কাজ করতে করতে বাবুয়া আপন মনেই আওড়ে ওঠে ছোটবেলায়
মুখস্থ করা এক বিজ্ঞাপনী ক্যাচলাইন, 'এভারেডী কাজ করে যায়, কাজ করে যায়'। সে নিজেও
সে ভাবেই কাজ করে যায়, কাজ করে যায়। গ্যারেজটাকে সে শুধু পয়সা রোজগারের উপায় হিসেবে
নয় কেমন যেন তার অস্তিত্বের মতোই ভালোবেসে ফেলেছে। তিনমাস দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। মালিক
তার হাতের অনেকটা কাজ এখন বাবুয়াকে দিয়েই করায়, পাশাপাশি ড্রাইভিং শেখারও ট্রেনিং চলছে
তার। গাড়ীর গ্যারেজে কাজ করতে গেলে এটা শিখতে হবেই। সব মিলে এক রাজকীয় ব্যাপার। মাঝে
দুএকবার বাংলা খাওয়ার ফাঁকে গলির মেয়েদেরও ঠুকিয়ে এসেছে এবং তার পৌরুষের পরীক্ষাতেও
সে পাশ করেছে মর্যাদা সহকারেই। বাড়ীর একমাত্র বৃদ্ধা মা বিছানা ছেড়ে আর উঠতে পারে না।
তার সময়ও প্রায় শেষের দিকে। যেকোন একদিন বাড়ী ঢুকে দেখবে মা মরে পড়ে আছে, বাবুয়া সেটা
জানে।
ভালোই চলছিল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কব্জী শক্ত করে দাঁতে
দাঁত দিয়ে থেকে যাওয়ার লড়াই। এখন সে স্বাধীন এবং অনেকটাই নিয়মতান্ত্রিকও বটে। মদ ও
মেয়েছেলে দুটোকেই সে ভালোবাসে কিন্তু কেউই তার নেশা নয়। তার এখন নেশা গ্যারাজের কাজ,
কোনও জটিল সমস্যাকে সহজ হাতে সমাধান করবার তাগিদটাই তার নেশা। আর এই কাজের ফাঁকেই রাত
ন-টার দিকে একদিন রিপেয়ার করতে আসা একটা গাড়ীর দরজা খুলে বেরিয়ে আসা ঝকঝকে গহণায় মোড়া
মহিলাকে তার চিনতে ভুল হয় না। কাঁদরী। জাঁদরেল এক চকচকে ফর্সা চামড়ার ব্যাটাছেলে তার
স্বামী বা মালিক বলে সে বুঝে নিতে বাবুয়ার ভুল হয় না। গাড়ীর সমস্যা বুঝে নিয়ে গাড়ী
থেকে তাদের নামিয়ে ঘন্টা খানেকের মধ্যেই গাড়ী ঠিক করে নিজেই সেটা চালিয়ে টেস্ট করে
ড্রাইভারের হাতে তুলে দেয়। কাজ শেষ হয়ে গেলে মালিককে বুঝিয়ে দিয়ে বাড়ী যাবার জন্য কোনদিকে
না তাকিয়ে বেরিয়ে যায়। সে গিয়ে সোজা সেই যৌনপল্লীতে ঢুকে একটা দেশী পাঁইট নিয়ে যে মেয়েটাকে
সে সারারাতের জন্য ভাড়া নেয়, তাকে সে কাঁদরী নামে ডাকতে থাকে। একরাতের জন্য এই মাগীটাই
আজ তার কাঁদরী...
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন