ধারাবাহিক উপন্যাস
ছেঁড়া শেকড়ের অন্তরাখ্যান
(১৪)
জলতরঙ্গ রোধিবে কে?
বেশ ফুটফুটে হয়ে উঠেছে শেফালির মেয়েটি। মাথা ভরে কুচিকুচি চুল দেখা দিয়েছে। ক-খানা দাঁত নিয়ে খিলখিল করে হাসে। সকলে ডাকে খুকী বলে। বাচ্চাসহ শ্বশুরবাড়িতে আসার পরপরই এসেছিল বৃহন্নলার দল। কঠিন হাতে তালি দিয়ে মোটা ফাটা গলায় ডেকেছিল,
“ওগো ও মাসি, তোমার নাতি হইল না নাতিন হইল গা?”
“নাতিন অইছে।”
যোগমায়া যদিও মানসিকভাবে খানিক নড়বড়ে, তবু বাচ্চাটি আসার পর ভালো আছেন। নাতনি
কোলে নিয়ে তিনিই এসে দাঁড়িয়েছিলেন উঠোনে। পাড়ার এদিক-ওদিক থেকে আরও অনেকে ভীড় করে এসেছিল।
বাচ্চার মাথায় তখনও চুল গজায় নি, ফোলা-ফোলা মুখ, টুলটুলে হাত-পা। ছেলে বা মেয়ে বোঝা
যেত না। হিজড়াদের প্রধান শিশুর পরণের ছোট্ট নিমাটি তুলে, কোমরের নীচে বাঁধা তিনকোণা
কাপড়টি খুলে লিঙ্গ পরখ করল। তারপর মুখ বেজার করে তাদের দাবী পেশ করল। দাবী মেটাতে না
পারলে তারা ভয়ের আবহ তৈরি করে। অত্যন্ত জঘন্য কথাবার্তা বলে, অভিশাপ দেয়, কাপড় তুলে
নিজের প্রত্যন্ত প্রদর্শন করে। দাবী জেনে যোগমায়া অন্তরে কিঞ্চিৎ স্বস্তির শ্বাস ফেললেন।
নাতি না হওয়ার দুঃখটুকু আপাতত হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। দলটি নেচেকুঁদে, অঙ্গভঙ্গি করে শিশুকে
কোলে নিয়ে, তার মাথায় আশীর্বাদ রাখল। দু-খানা পুরোনো কাপড়, চাল-ডাল-তেল-নুন, অল্প কিছু
টাকা নিয়ে বিদায় হল। ভবিষ্যৎবানী করে গেল আগামীবছর অতি অবশ্য বউমার কোলে ছেলে আসবে
এবং তারা এসে টাকা-পয়সা এবং অন্যান্য জিনিস অনেক বেশী পরিমাণে নিয়ে আশীর্বাদ করে যাবে।
শেফালির অবশ্য এই প্রথম বৃহন্নলাদর্শন নয়। তার দুই দিদির সন্তান হওয়ার সময়ে তাদের চেতলার
বাসাতে এসে দিদিরা থেকেছে, তখনও একদল এসেছিল। এমনকী তার শিশু হওয়ার পর প্রথম দু-মাস
যখন সে মা-র তত্বাবধানে ছিল, তখনও দেখা দিয়েছিল। তার মা অবশ্য শাশুড়ির মতো নির্লিপ্ত
বা নির্বিকার নন। গলা তুলে যথেষ্ট দরদাম করে বাড়াবাড়ি থামিয়েছিলেন। এবাড়িতে যখন তারা
এল, শেফালি বলতে চেয়েছিল তার মেয়ে ইতিমধ্যে বৃহন্নলাকুলের আশীর্বাদ পেয়েছে। কিন্তু
যোগমায়া তাকে ঠেলে ঘরে পাঠিয়ে দিলেন।
সকালে অজস্র কাজের ফাঁকে মেয়েকে স্নান করিয়ে, চুল আঁচড়ে, চোখে কাজল আর কাজলের
টিপ পরিয়ে যোগমায়ার কাছে রেখে দিয়ে যায়। সঙ্গে রেখে যায় এক বোতল দুধ। বোতলে দুধ খাওয়ানো
ব্যাপারে শাশুড়ি এবং মা দুজনেরই ঘোর আপত্তি। কিন্তু ঝিনুকবাটি দিয়ে দুধ খাওয়াতে শেফালি
তেমন পারে না। বার দু-তিন মেয়ের গলায় আটকেছে। তারপর গুরুজনদের অমতে স্বামী বিশ্বনাথকে
দিয়ে নতুন ধরনের বোতল আনিয়েছে। কাচের বোতল, দেখতে নৌকার মতো বাঁকা। দুপাশে খোলা মুখে
রাবারের নিপল লাগিয়ে ফুটো করে দিলে বাচ্চা চুষে চুষে দুধ বা কোনও জলীয় জিনিস খেতে পারে।
যোগমায়াও অবশ্য এই পদ্ধতিতে ক্রমশঃ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। মুখে স্বীকার না করলেও মনে
মনে আরামে আছেন। “আমগ কালে এমুনডা দেহি নাই” বলে আর বকাবকি করছেন না পুত্রবধূকে।
সংসারের কাজ শেষ করে প্রায় অবেলায় স্নানাহার সেরে মেয়েকে নিয়ে নিজের বিছানায় শোয় শেফালি। দক্ষিণে একটা জানালা। বেড়া কেটে কাঠের ফ্রেম, সেখানে তারজালি আটকানো। টিনের কপাট। পেছনে জংলা জায়গায় ময়লা ফেলা হয়, গন্ধ আসে। বড়ো বড়ো মশা আসে দিনের বেলাতেও। ছোট্ট মশারিতে শিশুকে ঢেকে পাশে শুয়ে বিশ্রাম নেয় সে। সম্প্রতি দেওর শম্ভুনাথের বিয়ে ঠিক হয়েছে এক জায়গায়। ফোটো দেখেছে তারা, মন্দ নয় মেয়েটি। বয়সে শেফালির সমান কিম্বা বছরখানিকের বড়োই। মা-বাবা মারা গেছেন শৈশবে। এক মাসির কাছে মানুষ বরাবর। বিয়েতে শম্ভুনাথের মত আছে কিনা শেফালি জানে না, জানার চেষ্টা করেনি। কিন্তু এপর্যন্ত শম্ভুনাথের দিক থেকে কোনওরকম আগ্রহ দেখা যায়নি। একই দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে সে শেফালিকে দেখে কয়েক লহমার জন্য। গা ঘেঁষে আসেনা, স্পর্শ করে না। শুধু তীব্র দৃষ্টি শেফালির মুখের দিকে তাকিয়ে কী অনুসন্ধানে নিবিষ্ট থাকে। শেফালির এখন ভয় করে না, বরং প্রশ্রয়ের হাসি ভাসিয়ে দেয়। শম্ভুনাথ ঘরে থাকলে সে নিজের ঘরের দরজা ভেজিয়ে শোয়।
বাচ্চাকে খানিকক্ষণ বুকের দুধ খাওয়াল শেফালি। চোখ বুজে আসছিল। ঘুম-জড়ানো চোখে
মনে পড়ল রান্নাঘরে কী যেন গুছিয়ে রেখে আসা হয়নি। উঠে দরজা খুলে বেরিয়ে দেখে সরু প্যাসেজে
তার দরজার বাইরে শম্ভুনাথ স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে। এসময়ে শম্ভুনাথের বাড়িতে থাকার কথা
নয়। আধোঘুমে চমকে উঠে দরজার কপাটে শেফালি মাথায় ধাক্কা খেল সজোরে। মাথা ডলতে ডলতে বিস্রস্ত
কাপড়জামা সামলাতে সামলাতে প্রশ্ন করল,
“কখন ফিরলেন ঠাকুরপো?”
সেকথার জবার না দিয়ে কর্কশ, ক্রুদ্ধ, গম্ভীর গলায় শম্ভুনাথ বলল,
“আপনে আমারে সন্দেহ করেন?”
শেফালি কেঁপে উঠল। শাশুড়ি ছাড়া বাড়িতে আর কেউ নেই এখন। ছোটো দেবর দিবানাথও সম্প্রতি
কোথায় যেন কাজ পেয়েছে, সন্ধের পর ফেরে। বাসন্তীর নতুন স্কুল শুরু হয়েছে। সেও ফেরে প্রায়
সন্ধে করে। পরিস্থিতি সামলাতে নম্রভাবে সে বলল,
“এইটা কেমুন কথা কন ঠাকুরপো?”
“তাইলে দুয়ার বন্ধ ক্যান?”
এর জবাবে শেফালি ভাবতে একটু সময় নিয়েছিল। তারপর নরম অথচ স্পষ্ট, দৃঢ় গলায় তির্যকভাবে
বলেছিল,
“খুকী ঘুমাইতে চায়না। টুং শোনলেই উঠে পড়ে। কষ্ট কইরা ঘুম পাতাইছি। উঠে পড়লে
আপনে সামলাইতেন, কেমন!”
থতমতো হয়ে অন্যমনস্ক সুরে শম্ভুনাথ বলে,
“নাঃ।”
“তা-লে সরেন। ভূতের মতো দারাইয়া আছেন কেন? আপনারে দেখে মাথায় জোরে টাক খেলাম।
রান্নাঘরে যাব, কাজ থুয়ে এসছি। আপনি কি চা খাবেন এখন?”
“নাঃ। আপনের সঙ্গে একখান কথা আছে।”
“কথা? বলেন?”
ভয় পেল না শেফালি, যদিও অনুমান করতে পারল না তার সঙ্গে কী কথা থাকতে পারে শম্ভুনাথের।
বাড়ির বড়ো বউ সে, সম্পর্কে শম্ভুনাথের বৌদি। ঠাট্টা-তামাশার সম্পর্ক গড়ে উঠল না শম্ভুনাথের
গোমড়ামুখো, ভয়-ধরানো স্বভাবের জন্য। ইতস্তত করে শম্ভুনাথ জিজ্ঞেস করল,
“আমার মত না জেনে বিয়ার প্রস্তাব আনল কে? আপনি?”
“হায় কপাল! আমি আনব কেন? আমার নাকি আর খাইয়া-দাইয়া কাম নাই! আপনের দাদা গিয়ে
মা-রে বলছিল। তাদের বলেন গিয়া যান, আপনার মত আছে না নাই। সরেন, রান্নাঘরে কাজ আছে।
ছোড়দি ক্লান্ত হয়ে এসে পড়ব। তার জন্য খাওনের ব্যবস্থা করি গিয়া।”
শম্ভুনাথ মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে শেফালির ধমকানি শুনল। এত জোরের সঙ্গে কর্তৃত্ব
নিয়ে আগে কোনওদিন সে কথা বলেনি। খুব বাধ্য শান্ত নিরীহ মেয়ে। শম্ভুনাথ মরিয়ার মতো বলে
উঠল,
“আপনের মত আছে? অ্যা? আপনে রাজি আছেন? বলে যান—!”
“আজাইরা কথা কন কেন? আমার মত না থাকনের কী হল? কী যে কন আপনি! ভালই ত হল, দুই-জা
মিলে কাজ সামলাব। আমার খাটনি একটু কমব।”
মুখে কাপড় দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল শেফালি। হাসতে হাসতেই ভাবী বউয়ের নাম জানিয়ে
দিল শম্ভুনাথকে – আরতি।
ধীরেন্দ্রনাথের স্বপ্নের স্কুল চালু হয়েছে। নাম দিয়েছেন আদর্শ শিক্ষালয়। তাঁদের পাড়া থেকে পায়ে হেঁটে বড়জোর মিনিট দশেক। খালি জমি, কাঁটা, আগাছা-ভরা সে জমির পরিমাণ খুব কমও নয়। জমির মালিক ধনী অবাঙালি। এদিককার বিস্তৃত জমিটা তাদের। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নামমাত্র মূল্যে কিনে, ফেলে রেখেছিল। এখানে বেশ কিছু মানুষ জমি হাসিল করে ঘর তুলেছেন দূরে দূরে। জমির মালিকরা জীবনেও আসে না, কিন্তু জমি বেহাত হয়ে যাচ্ছে শুনে দলবল নিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছিল। তাদের পোষা গুণ্ডাদের সঙ্গে আবাসিকদের মারামারিও হয়েছে। সে সব অবশ্য সদ্য দেশভাগের পরপর প্রথম যুগের কথা। ধারাবাহিকভাবে ঢাল-তলোয়ারহীন তাদের লড়াই করতে হয়েছিল শক্তিমানদের সঙ্গে। প্রাণে বাঁচার লড়াই, উৎখাতের বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই। সহায়-সম্বলহীন নিঃস্ব হয়ে আসা মানুষেরা একে অপরের কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছে। মাথার ওপর একটু ছাদ, পায়ের নীচে একটুকরো জমির জন্য অসম লড়াই। যাদের মালিকানা ছিল তারা এক সময়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। কে যাবে বারবার নিজের কলকাতা শহরের কামধান্দা ছেড়ে বড়ো গাছে-ভরা অন্ধকার, জঙ্গুলে, সাপখোপ, মশা-ভর্তি জমি পাহারা দিতে? তার চেয়ে মামলা ঠুকে দেওয়া সহজ। সরকার হয় এদের উঠিয়ে ছাড়বে না হলে টাকা আদায় করবে। জমির মালিকানা ওপার থেকে তাড়া খেয়ে চলে-আসা লোকগুলো কোনওদিন যাতে না পায়, সেই ব্যবস্থা করবে। লড়াকু মানুষেরা ওসব পাত্তা দেয়নি, দিলে তাদের চলত না। তারা থেকে গেছে। সেখানে সানন্দে খালি জমি দেখিয়ে দিয়েছে ধীরেন্দ্রনাথকে। স্কুল তোইরি হবে, ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করবে – এর চেয়ে ভালো সম্ভাবনার কথা কেউ চিন্তা করেনা। ধীরেন্দ্রনাথ অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। অবশ্য তাঁর স্কুল-স্থাপনের ক-বছর আগেই নিজেদের উদ্যোগে আরও দু-একটি স্কুল স্থাপিত হয়েছে। ধীরেন্দ্রনাথের গ্রাম-সম্পর্কে এক দাদা তেমন এক স্কুলের শিক্ষক। সেই মানুষটির উদ্যম আর পরিশ্রমের কথা ধীরেন্দ্রনাথ জানতেন। বয়স হয়েছে অনেক, শারীরীকভাবেও তত সুস্থ ছিলেন না। তিনি আপাতত সেই স্কুলের প্রেসিডেন্ট পদে আছেন। ধীরেন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গেও দেখা করে পরামর্শ নিয়েছিলেন।
যে জমি পাওয়া গেল, জঙ্গল কেটে তাকে পরিষ্কার করে তৈরি করা আয়াসসাধ্য কাজ। ধীরেন্দ্রনাথ
বুঝেছিলেন এই জমি হাসিল করে ঘর তোলা তাঁর ছোটো দলটির কাজ নয়। কিন্তু পেয়ে গেলেন উৎসাহী
কিছু মানুষকে, খেটে-খাওয়া মানুষ। অল্পস্বল্প ক্ষেতজমি ছিল ওপারে, চাষ করত। ফসল উদবৃত্ত
হলে হাটে বেচে আসত। পুকুর ছিল, শাকসব্জির অভাব ছিল না। কেউ গরু-ছাগল দুইত, তাঁত বুনত,
দু-চারখানা কাপড় গামছা বেচে যা পেত তাতে খুশি থাকত। সহজ, অনাড়ম্বর জীবনে লোভ ছিল না,
পেট ভরলেই যথেষ্ট। তাদের ছেলেরা তাইরে-নাইরে করে, মাঠে-ঘাটে খেলেধুলে বড়ো হয়ে উঠত।
এরা এখানে তথাকথিত শিক্ষিত ভদ্রলোকের সংস্রব বাঁচিয়ে খানিক দূরে ঘর বেঁধে বসেছে। শহরের
দিকে যায় তারা কুলি-কামিনের কাজ করতে। কেউ মোট বয়, কেউ টানে ভাড়া-করা রিকশা। সেখানেও
প্রতিযোগিতা, পাশের রাজ্যের ছাতুজল-খাওয়া মানুষজন তাদের আগে থেকে এরাজ্যের অধিবাসী।
সেই মানুষদের মতো ভারবহনে, শ্রমে অকাতর পোক্ত দেহ এদের নয়। বিনা পারিশ্রমিকে স্বতস্ফূর্তভাবে
ধীরেন্দ্রনাথের পাশে এসে দাঁড়াল তারাই,
“কী করন লাগব কন মাসটারমশয়। আমগ পুলাপানগুলারে আপনের ইশকুলে লইবেন।”
মাটি খুঁড়ে জমি তৈরি হল, ভিত হল ইটের। তার ওপর কাঠামো, বেড়ার দেওয়াল বসল। মাথায়
বসল টালির ছাদ। মাঝখানে মাঝখানে বেড়ার পার্টিশন দিয়ে ছোটো ছোটো ক্লাসঘর – শিশুশ্রেণী
থেকে চতুর্থশ্রেণী। ব্ল্যাকবোর্ড লাগল, চক ও ডাস্টার। স্কুল সাজাতে অর্থসংগ্রহ করেছিলেন
ধীরেন্দ্রনাথ। ছোট্ট সমবায় সমিতি গড়ে নির্দিষ্ট পরিমানে চাঁদা নিয়েছিলেন প্রত্যেক পরিবার
থেকে। সকলেই যে দিতে উৎসুক ছিল তা নয়, তবে তার সংখ্যা কম। যারা বেশী দিতে উৎসাহী বা
সক্ষম ছিল, তাদের বারণ করেননি। অমলার বিয়ের জন্য রাখা অর্থ থেকে যা অবশিষ্ট ছিল তিনি
ঢেলে দিয়েছিলেন স্কুল-গঠনে। যে দু-তিনজন শিক্ষক হয়ে এল তারা জেনেই এল, যতদিন পর্যন্ত
সরকারি অনুদান পাওয়া না যাবে ততদিন বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে হবে। তাদের একজন ধীরেন্দ্রনাথের
অনুগামী বাসন্তী। তার উৎসাহের শেষ নেই। তার কাছে জমা থাকে সমস্ত রেকর্ডপত্র। সকাল ন-টায়
এসে পৌঁছায়। বাড়ি-বাড়ি ঘুরে ছাত্রছাত্রী জোগাড় করে। অনেক সময়ে সঙ্গে করে নিয়ে আসে।
এগারোটা থেকে বেলা তিনটে পর্যন্ত ক্লাস হয়। সকলে চলে গেলে বাসন্তী থাকে আরও এক-দেড়
ঘন্টা। আরও দুটি মেয়ে ও একটি ছেলে শিক্ষক-শিক্ষিকা হিসাবে যুক্ত হয়েছে। লীলা, শান্তি
ও দিলীপ। লীলা বিধবা, নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে বিয়ে হয়ে যায়। ভারী শান্ত মেয়ে, বাসন্তীর
চেয়ে একটু ছোটোই। শান্তির বাবা-মা দাঙ্গার সময় খুন হয়েছেন, কাকা-কাকীর সংসারে আশ্রিত।
অভাবের সংসারে বিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। অনেক আশা নিয়ে এসেছে, স্কুল সরকারি অনুমোদন পেলে
হাতে টাকা আসবে। সে ওপারে কলেজ যাওয়া শুরু করেছিল। তারপর দারুণ ঝড়ে সমস্ত এলোমেলো হয়ে
গিয়েছিল। কাকা-কাকীর হাত ধরে পালিয়ে এসেছে। দিলীপ নামের ছেলেটি বাসন্তীর প্রায় সমবয়সী,
দু-চার বছরের বড়ো। হাতে-পায়ে মুখে সাদা দাগ আছে। কালো, খুব রোগা, লম্বা, মাথায় ঝাঁকড়া
চুল। হাসিমুখ, উজ্জ্বল দু-চোখে অনেক গড়ার স্বপ্ন। কলকাতার কলেজ থেকেই বি-এস-সি পাশ
করেছিল। হাওড়ার কাছে একটা ছোটো লেদ-মেশিনের অ্যান্সিলারি কারখানায় কয়েকবছর কাজ করল।
তারপর শরীর খারাপ হয়, কাজটাও চলে যায়। আপাতত গোপনে সে একটি রাজনীতিক দলের সঙ্গে যুক্ত
হয়েছে। সরকার-বিরোধী দলটি বাস্তুহারাদের পুর্নবাসনের জন্য দাবী-দাওয়া আদায় ও উৎখাতের
বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে চলেছে। দিলীপ একদিন বলছিল,
“জানেন দিদিমনিরা, সেদিন বৈকালে ঘর থেকে বাইর হয়েছি, টিউশনিতে যাব। দেখলাম একপাল
ছোকরা লাফাতে লাফাতে আসতাছে। পিছে পিছে দুইজন মাস্টার। জামা-প্যান্ট দেখে বোঝলাম ইস্কুলের
ছাত্র। পায়ে জুতা নাই, স্যান্ডাল। দুই-একটার পায়ে তাও নাই। তামাশা দ্যাখতে দাঁড়ায়ে
গেলাম। যেটা আগায়ে ছিল তার হাতে বড় শিল্ড। কী কয় জানেন? ‘আমরা জিতা গেছি। আমরা কারা?
বাস্তুহারা। আমরা কারা? বাস্তুহারা।’ বলার মধ্যে কী গর্ব!”
“কোন ইশকুলের ছাত্তর?”
“চিনবেন না। ওইদিকের একটা কলোনিতে, পুরান ইশকুল। এখন তো তারা কিছু সরকারি এইড
পায় শুনছি। আগিয়ে গিয়ে জিগ্যেস করলাম, কিসের আনন্দ? বলে যে, কলকাতার কোন ইশকুলের সঙ্গে
ফুটবল খেলা ছিল। জিতছে, তারই জয়ধ্বনি।”
(ক্রমশঃ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন