কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

পি.শাশ্বতী

 

রাঢ়বাংলার গাজন


 

(গত সংখ্যার পর)

এবার ধর্মরাজের কথা। ইনি হলেন রাঢ়ের অধিদেব। ধর্ম ঠাকুর, রাঢ়ের গ্রামদেবতা। ধর্মের গাজন হল গ্রামের জনসাধারণের উৎসব। ডঃ সুকুমার সেনসহ বিভিন্ন গবেষকের মতে দামোদরের প্রাচীন খাত ভল্লুকা নদীর তীরে প্রাচীন বর্ধমান ‘বরোয়াঁ’ গ্রামে ধর্মপূজার মহিমা প্রচারক হিসেবে প্রসিদ্ধ রামাই পণ্ডিত খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে ভল্লুকা তীর্থে উপাসনা ক্ষেত্র নির্মাণ করে শূন্যপুরাণ, ধর্মপূজা বিধান প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন।

শূন্যপুরাণে দেখা যায়—

‘বাড়ি মোর বল্লুকা পূজি শ্রী নৈবাকার

শূন্য মূর্তি ধ্যান করি সাকার মূর্তি পূজা করি।’

রাঢ়ের জাতীয় কাব্য হিসেবে প্রসিদ্ধ ধর্মমঙ্গল কাব্য প্রধানত বর্ধমান জেলার অবদান। ধর্মরাজের মহিমা প্রচারক বিভিন্ন ধর্ম মঙ্গলের কবি বর্ধমান জেলাতেই জন্মগ্রহণ করেছেন। ধর্মরাজের অধিদেবি তাঁর সঙ্গিনী— যিনি নানা স্থানে নানা নামে আছেন। কোথাও কেতকী  বা আদ্যা, কোথাও বাসুলী বা রঙ্কিনী,  কোথাও চণ্ডী বা ষষ্ঠীবুড়ি, কোথাও মনসা বা বিশালাক্ষী, আরও নানা রূপে তিনি বিরাজমান।

ধর্মরাজের পূজা প্রথম প্রচলন হয়েছিল ভল্লুকা বা বল্লুকা নদীর তীরে।  এই কারণে  ভল্লুকার অন্যান্য শাখা নদী গাঙ্গুর, বেহুলা, বাঁকা, খড়ি,  মায়া প্রভৃতি, তীরে- তীরেও ধর্মরাজ, ধর্ম ঠাকুর প্রভৃতি নামে সূর্য দেবতার ব্যাপক পুজো শুরু হয়। ধর্ম শব্দটি ‘ডোমরাজ’ বা ‘ডোমরায়’-এর সাংস্কৃতিক রূপ। এই শব্দের অর্থ ডোমেদের রাজা বা ঈশ্বর।

ডোমজাতি এখন হিন্দু সমাজের তফসিলি জাতিভুক্ত, তবে বৌদ্ধধর্মের গৌরবময় যুগে সাধারণ ভজনের জন্য তাদের প্রভূত খ্যাতি ছিল। ধর্মরাজ ব্রাহ্মণদের মধ্যে প্রচলিত নয়।  এক সময় তাঁদের এই দেবতার প্রতি কোনো উৎসাহ ছিল না। প্রধানত হাড়ি, ডোম, জেলে, তন্তুবায়, বণিক, কর্মকার প্রভৃতিদের মধ্যেই বেশি প্রচলিত।পরবর্তী সময়ে ক্রমে ব্রাহ্মণরা পূজারী হিসাবে এই দেবতার পুজো করতে শুরু করে।

ধর্মরাজের মূর্তি হিসাবে কোনো অবয়ব নেই। একটি প্রস্তরখণ্ডই ধর্মরাজ, মনসা, চণ্ডী প্রভৃতি নামে পূজিত হন। তবে কোথাও কোথাও ধর্মরাজে কূর্ম মূর্তি আছে।

ধর্মরাজের স্বরূপ নিয়ে যথেষ্ট  বিতর্ক আছে। ধর্মমঙ্গলের অন্যতম কবি সীতারাম দাসের মতে ধর্মরাজ 'জটিল ঠাকুর'। ডঃ সুকুমার সেন বলেছেন যে, জন্মসূত্রে ধর্ম হলেন বৈদিক দেবতা বরুণ। তবে তার সঙ্গে আদিত্য সোম প্রভৃতি অন্য দেবতারাও মিশে গেছেন। পণ্ডিত  হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ধর্ম ঠাকুরকে ‘প্রচ্ছন্ন বুদ্ধদেবতা’ বলে মনে করেছেন। ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেছেন, ধর্ম ঠাকুর সূর্য দেবতার প্রতীক। ধর্ম ঠাকুরের ধ্যানমন্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ধর্ম ঠাকুর হস্তপদহীন, নিরাকার ও শূন্য স্বরূপ ( শূন্যমূর্তি)।

বর্তমানকালের পূজারীরা তাঁকে কোথাও বিষ্ণু, কোথাও শিব, আবার কোথাও সূর্য  ধ্যানমন্ত্রে পুজো করে থাকেন। সুতরাং ব্রহ্মা যেমন এক থেকে বহু হয়েছেন তেমনি নিরাকার প্রভু নিরঞ্জন ধর্ম— আদিতে যাই হোন না কেন, তিনি  বহুর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছেন। তাঁর নামেরও অন্ত নেই। মানিকরাম গাঙ্গুলি তাঁর ধর্মমঙ্গল কাব্যে ২০টি পৃথক নামে ধর্মশিলা বন্দনা করেছেন। ময়ূর ভট্টের 'শ্রীধর্মপুরাণ' নামে একটি অপ্রামাণিক গ্রন্থে ৫২টি পৃথক নামে ধর্ম ঠাকুরের উল্লেখ আছে। ডঃ অমলেন্দু মিত্র বীরভূম জেলাতেই ৯১টি বিভিন্ন নামের ধর্মশিলার সন্ধান পেয়েছেন। ডঃ মিহির চৌধুরী কামিল্লা মহাশয় ১৩৬টি ধর্মদেবতার নামের তালিকা প্রস্তুত করেছেন। মেমারি থানার দলুই বাজারে গ্রাম সমীক্ষার সময় ‘দলুই রায়’ নামে ধর্মদেবতার সন্ধান পাওয়া গেছে। ‘দলুই বাজার’ গ্রামের আদিবাসীন্দারা হলেন ‘দলুই’ পদবিধারী তফশিলিগণ। সম্ভবত তাঁরা তাঁদের দেবতাকে রাজা উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। সেই রাজা থেকে ‘রায়’ পদবি এসে থাকতে পারে। শুধু এই গ্রামেই নয়, অনেক গ্রামেরই ধর্মরাজের উপাধি রায়। যেমন— যাত্রাসিদ্ধি রায়, ক্ষুদি রায়, বাঁকুড়া রায় (মনে করা হয় বাঁকুড়া রায় নাম থেকেই বাঁকুড়া জেলার নাম হয়েছে), সন্ন্যাসী রায়, বংশী রায়, কালু রায় ইত্যাদি। ধর্ম ঠাকুরের গ্রাম্য জনোৎসবকে ক্রমে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা শৈব উৎসবে পরিণত করেছেন । শিব ক্রমে গ্রামদেবতা হয়েছেন বলে ধর্মের গাজন সহজেই শিবের গাজন হয়েছে। সম্ভবত টোটেম  সংস্কৃতির ধারক ও বাহক বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মপ্রচারের জন্য এবং নিষাদ জাতির প্রতীক এই কূর্ম টোটেমের চিহ্ন মনে করা হয়।

এইসব জাতি আর্য সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ সংযোগ ও প্রত্যক্ষ প্রভাব বহির্ভূত ছিল। বৌদ্ধধর্মের প্রভাবও এর মধ্যে পড়েছে, কারণ এই অঞ্চলে অনেক ধর্ম মন্দিরে ছোট ছোট পাথরের স্তূপ, ধ্যানী বুদ্ধমূর্তির মতো ছোট ছোট ২/৩ ইঞ্চি পাথরের মূর্তি দেখা যায়। ধর্মঠাকুর কোথাও শৈব আবার কোথাও বৈষ্ণব হয়ে গেছেন। যেমন ‘ওর গ্রাম’-এর ধর্ম ঠাকুরের নাম ‘স্বরূপ নারায়ণ’।

ধর্মঠাকুরের অন্যতম আদিপীঠ বরোয়াঁ গ্রামে বুদ্ধপূর্ণিমার দিন গাজন হয়। এই গ্রামে ধর্মরাজের সর্বশেষ  সেবাইত ছিলেন মুখী পণ্ডিতনী (মোক্ষদা পণ্ডিত)। তাঁর কোনো সন্তানাদি ছিল না। তাঁর মৃত্যুর পর স্বর্গীয় অক্ষয় ভট্টাচার্য একশো বছরেরও আগে স্বপ্নাদেশ পেয়ে ধর্মরাজের পুজো শুরু করেন। গাজনের দিন এখানে প্রচুর বাজি পোড়ানো হয়। আগে কলকাতার পেশাদার দল ডেকে এনে যাত্রাগানের আসর বসানো হত। এখন সেসব বন্ধ হয়ে গেছে।

ধর্মরাজের অপর একটি বাৎসরিক অনুষ্ঠান হল 'যাত' উৎসব। কালনা থানার মানিকহার এবং মেমারি থানার বোহার গ্রামে মাঘ মাসের দ্বিতীয়া তিথিতে যাতের অনুষ্ঠান ও বড় মেলা হয়। সংস্কৃত সংযাত্রিক> সংজাত> সাংজাত শব্দ থেকে ‘যাত’ কথাটি এসেছে। 'সাংযাত্রিক' শব্দটির অর্থ একই জলপথের যাত্রী। এক সময় জলপথে গিয়ে ধর্মরাজের পূজা ও আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম করতে হত বলে ধর্মরাজের এই সময়ের পুজোকে ‘ধর্মরাজের যাত’ বলা হত। এছাড়াও স্থানভেদে নানা রীতির আচারও লক্ষ করা যায়। যেমন— মানিকহার গ্রামের আশেপাশের গ্রাম থেকে চাল তুলে মাঘী অমাবস্যায় ন-পাড়া গ্রামে আগে পুজো হয়। তারপর মেদগাছির সিংহ রায়দের বাড়ি। এরপর পশ্চিমপাড়ায় যোগাদ্যার শূন্য বেদিতে এনে পূজা করা হয়। পরের দিন কয়েক পাড়ায় পুজো হয়। তারপরের দিন পাঁঠা বলি। বোহার গ্রামে ন-জনের বাড়ি পুজো পান ধর্মরাজ। পরের দিন মন্দিরের সামনের ফাঁকা জায়গায় ধর্মরাজের কূর্মাকৃতি মূর্তি 'খেলারাম', স্তম্ভাকৃতি ধর্মরাজ, চেপ্টা পাটার মতো কালু রায় ছাড়াও নারায়ণ পূজিত হন। দেবতাদের ছোট কাঠের সিংহাসনে বসানো হয়। রাস্তার দু-ধারে মেলা বসে। আগে বড় বড় যাত্রা কোম্পানির যাত্রা হত। ড.আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে ধর্মরাজ কুষ্ঠ, ধবল প্রভৃতি রোগ নিরাময় করেন এমন লোকবিশ্বাসের কারণে লোকসমাজে ধর্মরাজের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মপণ্ডিতগণ লোকের অসুখে-বিসুখে, বিশেষত কুষ্ঠ রোগ, নানা চর্ম রোগ, স্ত্রীলোকের বন্ধ্যাত্ব রোগে নানা টোটকা ওষুধ দিয়ে থাকেন। ড. ভট্টাচার্য আরও বলেছেন, চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ এবং আষাঢ়— এই চার মাসেই তাঁর পূজা হয়। আবার খনার বচন (ধন্য রাজার পুণ্য দেশ, যদি বর্ষে মাঘের শেষ) মেনে দরিদ্র কৃষিজীবীরা মাঘে বৃষ্টির প্রত্যাশায় ধর্মরাজের শরণ নিতে শুরু করেছিল। চতুর্দশ শতকে জিন প্রভসূরির ‘রত্নবাহপুর কল্প’ থেকে জানা যায় ধর্মরাজ বৃষ্টির নিয়ন্ত্রক।

পূর্বস্থলীর বুড়োরাজের গাজন বেশ প্রসিদ্ধ। মন্তেশ্বর থানার 'ইচু' গ্রামেও বুড়োরাজের  পুজো, গাজন ও মেলা হয়। জামালপুরের গাজন পুজোও বেশ বড় আকারেই হয়। এই পুজোয় ছাগ, শুয়োর বলি হয়। সেই সঙ্গে খুব বড় মেলা বসে। এই মেলায় বহু দূরদূরান্ত থেকে লোক সমাগম হয়। জামালপুরের কিছু দূরে গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে ছোট মাটির ঘরে যে বুড়োরাজের মূর্তিকে অনাদিলিঙ্গ মনে করা হয়। সেখানে শিবলিঙ্গের ওপর সাপের ফণা। বুড়োরাজ শিব এবং ধর্মরাজ উভয়ের ধ্যানেই এই পুজো করা হয়। বুড়োশিবের বুড়ো আর ধর্মরাজের 'রাজ' নিয়ে হয়েছে 'বুড়োরাজ'।

লোককাহিনি অনুযায়ী আজ থেকে আনুমানিক দেড়শো বছর আগে গ্রামের যদু ঘোষ জঙ্গলে গোরু চরাতে গিয়ে দেখেন তার একটা গোরু দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় আপনা থেকে একটা পাথরের ওপর দুধ পড়ছে। গ্রামের চাটুজ্যেমশাইকে এই ঘটনা জানালে তিনি বলেন, পাথরটি অনাদিলিঙ্গ শিব। অনাদিলিঙ্গ শিবের উৎপত্তি বিষয়ে নানা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। বাংলায় শিবের গাজন হয় চৈত্রসংক্রান্তিতে। ধর্মের গাজন বৈশাখী পূর্ণিমায় হলেও বছরের যে-কোনো সময় এই পুজো করা যায়।

রাঢ়ের অন্যতম অনুন্নত সমাজের গণদেবতা জনপ্রিয়  ধর্মঠাকুরকে হিন্দুসমাজের শ্রেষ্ঠ দেবতা শিবঠাকুর অনেক জায়গায় আত্মসাৎ করেছেন বলে মনে করা হয়। বুড়োশিব সেই রূপান্তরের মধ্যবর্তী রূপ। এটা ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের কৃতিত্ব। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা, এর থেকে হিন্দু সনাতনধর্মের উদারতাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্বস্থলীর বুড়োরাজের পুজো হয় বৈশাখী পূর্ণিমার গাজনে। চোদ্দ-পনেরো হাজার শৈবপন্থী সন্ন্যাসীর উপস্থিতি থাকে এই পুজোয়। পুজোয় বলি হিসাবে উৎসর্গ করা হয় পাঁচ হাজারেরও বেশি ছাগ ও পাঁঠা। ধর্মরাজের নামে হাড়িরা শুয়োর, ভেড়া বলি দেয়।

সমস্ত আচার পালনের পর বলি শেষে বুড়োরাজের নৈবেদ্য দেওয়া হয়। মাঝখানে একটা দাগ কেটে শিবের অর্ধেক ও ধর্মরাজের অর্ধেক— এই রকম একটি কাল্পনিক সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এই পুজো উপলক্ষে বৈশাখী পূর্ণিমার চার পাঁচ দিন আগে থেকে জ্যৈষ্ঠমাসের পূর্ণিমা পর্যন্ত খুব বড় মেলা বসে। হিন্দু- মুসলিম জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবাই বুড়োরাজের থানে যার যার নিজের মনোবাসনা পূরণের আশায় মানত করে থাকে।

আধ্যাত্মিক লোকসংস্কৃতির এই ঐতিহ্যের মাঝে সুস্থ সমাজের পক্ষে যে বিষয়টি মাঝে মাঝেই কাঁটার মতো বিদ্ধ করে, সেটি হল গাজনপুজো বা উৎসবের আড়ালে দেবসেবার নামে পুরোহিতরা অর্থের  বিনিময়ে বিভিন্ন রোগের ওষুধ দেয়। বলি দেওয়া পাঁঠা নিয়ে কাড়াকাড়ি, লাঠালাঠি, খুন, জখমের কত ত্রাসের সৃষ্টিও হয় মাঝেমধ্যে।

আর একটি অভিনব ধারার গাজন উৎসবের কথা শোনা যায় বোড় গ্রামে। শিব, ধর্মরাজ, বুড়োরাজ ছাড়াও কৃষ্ণ-সহোদর বলরামেরও গাজন হয় এই বোড় গ্রামে। মনে করা হয় এই ‘বলরাম’ নামই অপভ্রংশ হয়ে লোকমুখে গ্রামের নাম হয়ে গেছে বোড় গ্রাম। আর বলরামের নাম হয়েছে ‘বোড় বলরাম’।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় কৃষ্ণ-বলরাম একত্রে পূজিত হন। শুধু বলরামের পুজো খুব কমই হয়। হলধর বলরাম চাষ আবাদের দেবতা। বহু সংস্কৃতির সমন্বয়ে এর বর্তমান রূপ হয়েছে কাঠের তৈরি দশ হাত উঁচু মূর্তি। ১৪টি হাত। মাথার ওপর ১৩টি সাপ। ৩টি চোখ, মুখে প্রশান্ত হাসি। ভাদ্রমাসের অনন্ত চতুর্দশী, পৌষমাসের মকর সংক্রান্তি ও মাঘমাসে মাকুড়ী সপ্তমীতে। এই পুজো হয়ে থাকে। আর বৈশাখে হয় গাজন। এগারো দিন চলে বিশাল মেলা।  এই উপলক্ষ্যে এখনও সেখানে যাত্রাপালা হয়।

নৃসিংহ কৃষ্ণ অবতার হলেন সংকর্ষণ বা বলরাম। বলরাম বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। এই অবতারে তিনি দেবকী ও বসুদেবের সপ্তম সন্তান। বলরাম তোসালি উপজাতির নাগ দেবতা হিসাবেও পরিগণিত হন। ব্রাহ্মণ্য যুগে নাগদেবতা বলরাম নামে পূজিত হন। বিশেষ মতে ইনি অনন্ত বা শেষনাগ। ভারতের আদিম অধিবাসীদের মধ্যে এক সময় নাগপুজোর প্রচলন ছিল। দক্ষিণ ভারতের কিছু কিছু আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় আজও নাগপুজো হয়ে থাকে।

নৃসিংহ দেবেরও পুজো হয় অনন্ত চতুর্দশীতে। একাদশ রুদ্রের পূজা হয় এগারো দিন ধরে।

জগন্নাথ যখন বিষ্ণু হন তখন জগন্নাথের পাশে থাকেন তোসালির নাগদেবতা বলরাম। পৌরাণিক ব্যাখ্যায় ক্ষীরসমুদ্রে শেষনাগের উপরেই বিষ্ণু অনন্ত শয্যায় শায়িত থাকেন এবং বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতারে  তিনি আসেন সহায়ক রূপে। ‘হরিবংশ’ অনুযায়ী শেষ নাগের আর-এক নাম সংকর্ষণ। আবার বিষ্ণুপুরাণ মতে বিষ্ণুর মুখ থেকে সংকর্ষণ রুদ্রের আবির্ভাব। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ মতে হলায়ুধ, অর্থাৎ বলরাম, রুদ্র বা শিবের আর-একটি রূপ। তাই সঙ্কর্ষণ ও বলরাম অভিন্ন। পুরীর জগন্নাথ  মন্দিরে এই বলরামকেই শিবরূপে বর্ণনা করা হয়েছে।

নৃসিংহ চতুর্দশীর দিন গাজনের পূজা হয়। শিব ও ধর্মঠাকুর কৃষ্ণ, বিষ্ণু এবং বলরাম এক জাতীয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, এই পুজো যেহেতু বৈদিক মতে হয়ে থাকে, তাই বলরামের গ্রামে মুসলমান, কামার, কুমোর ও রজকের বাস নিষিদ্ধ। আজকের দিনে এধরনের সংস্কার বেমানান ছাড়া আর কিছুই নয়। আর একটি পুজো হয় আনুখাল গ্রামে। সেখানে জয়দুর্গার বাৎসরিক পূজায় গাজন হয়। সহজপুর গ্রামে সম্পূর্ণ বালকদের দ্বারা বালকেশ্বর শিবের গাজনপুজো হয়। দেড়শো বালক গাজনে সন্ন্যাসী হয়। একদিনের অনুষ্ঠানে এইসব বালক সন্ন্যাসীরা খেলাসহ বিভিন্ন ধরনের আকর্ষণীয় খেলা দেখায়।

গোরুর গাড়িকে ময়ূরপঙ্খীর শোভায় সাজিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে ধর্মরাজের গাজনপুজো হয় ধামাস গ্রামে । গলসি থানার গোহগ্রামে হয় ভগবতী দেবীর গাজন। ভগবতীদেবীর মূর্তিটি এক খণ্ড কালো পাথরের ওপর খোদিত সিংহবাহিনী দেবীমূর্তি। দেবীমূর্তির নীচে আছে রাখাল, গোয়ালা এবং একটি গোরুর মূর্তি। অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিতা চতুর্ভুজা মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় চোদ্দ ইঞ্চি।

বাঁকুড়ার 'শালখাঁড়া' গ্রামের যে দেবীর পুজোর মাধ্যমে গাজন উৎসব পালন করা হয়, সেই মূর্তিটিও গলসির দেবীমূর্তির রূপে হলেও সেটি মাটির তৈরি। বহুপ্রাচীন উৎসব এটি। ভগবতীর গাজন বিশিষ্টতায় পরিপূর্ণ। দেবীর দুটি মন্দির। বারোমাস পুজো হয় স্থায়ী মন্দিরে। অস্থায়ী মন্দির দামোদরের ধারে। সপ্তমীর দিন ভোরে হয় 'নেড়া' পোড়ানোর অনুষ্ঠান। তারপর ভক্তারা সরকাঠির মশাল জ্বেলে, ঢাকঢোল-বাঁশির তালে সাত বার মন্দির প্রদক্ষিণ করে জ্বলন্ত মশাল নদীতে নিক্ষেপ করে। জনশ্রুতি, নদীর ওই জায়গা থেকেই নাকি এক সময় দেবীমূর্তি উদ্ধার করা হয়েছিল। তারপর ব্রাহ্মণ ভক্তারা অন্যান্য জাতির ভক্তাদের কাঁধে করে মন্দিরে ফেরে। নেড়া পোড়ানোর পর বাদ্যবাজনা সহকারে গানের আসর বসে। বিকেলে ভক্তারা বাণেশ্বর শিবকে কুলেপাড়ার ঘাটে স্নান করিয়ে চক্রবর্তী বাড়ির শিবমন্দিরে রেখে আসে। অষ্টমীতে বাণেশ্বরকে মাথায় নিয়ে ভক্তারা বাড়ি বাড়ি ঘোরে ‘গম্ভীরেশ্বর মহাদেব, ভগবতীশ্বর মহাদেব’ নামে জয়ধ্বনি দিয়ে। সন্ধ্যায় ভক্তারা নদীতে স্নান করে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের গলায় আকন্দের মালা পরিয়ে দেয়। তারপর দণ্ডী কেটে মন্দিরে গিয়ে মা ভগবতীকে প্রণাম জানায়। পুজো শেষে তারা ফলাহার করে। রাতে বাণ ফোঁড়া অনুষ্ঠানের পর ভগবতীদেবীকে পালকি করে ভগবতীর অস্থায়ী মন্দিরে (বাপের বাড়িতে) নিয়ে যাওয়া হয়। পরপর ক-দিন নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে এই পর্যায় শেষ হলে হয় পাঁঠাবলি এবং যাত্রাপালা।

নবমী পুজো হয় দেবীর বাপের বাড়িতে। তারপর বারোমাস পুজোর জন্য স্থায়ী মন্দিরে (শ্বশুর বাড়িতে) দেবীকে রেখে দেওয়া হয়। মন্দিরে তোলার আগে ১০৮ ঘড়া জলে দেবীকে স্নান করিয়ে মন্দিরে তোলা হয়। আর-একটি বিরল ও ব্যতিক্রমী গাজন হল কুরকুবা গ্রামের কমলামাতার গাজন। কমলামাতার পাষাণ মূর্তি আছে নাটমন্দিরে। এই পুজো উপলক্ষেও তিন-চার দিন ধরে বড় মেলা চলে।

এছাড়াও কাঁকসা গ্রামে মনসাদেবীর গাজন হয়। ব্রাহ্মণ গ্রামের কাছে সাতকাহানিয়া প্রভৃতি গ্রামে মনসার বাৎসরিক পূজায় অনেক পুরুষ এবং মহিলা সন্ন্যাসী হন। বাণ ফোঁড়া, দণ্ডীকাটা, ধূপধুনো পোড়ানো  প্রভৃতির মধ্য দিয়ে এখানকার গাজন উৎসব পালিত হয়।

রাঢ়বাংলার বাঁকুড়া, বর্ধমান জেলা গাজনের বৈচিত্র্য ও বিরল আচার-অনুষ্ঠানে এগিয়ে থাকলেও পুরুলিয়া ও বীরভূম জেলাও কম যায় না। তবে বিশিষ্টতার দিক থেকে সেগুলি খুব একটা উল্লেখযোগ্য নয়। এই দুটি জেলাতেই মূলত মহাদেবকে উদ্দেশ করেই চৈত্র সংক্রান্তির দিন বিভিন্ন জায়গায় গাজন উৎসব পালিত হয়। কোথাও কোথাও মেলাও বসে। বীরভূমের সিউড়ি, ইলাম বাজার, নলহাটি, তারাপীঠে প্রথা অনুযায়ী গাজনপুজো ও উৎসব হয়ে থাকে।

 

পুরুলিয়া

--------

পুরুলিয়া জেলায় মূলত চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখ মাসের শুরুতে চড়ক পূজার মধ্যে দিয়ে সাড়ম্বরে উৎসব পালিত হয়। একে ভক্তা পরবও বলা হয়ে থাকে। এই উৎসব পুরুলিয়ার গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা প্রধানত মুরগুমা, রঘুডিহি, বাঘমুণ্ডি, ঝালদা, বলরামপুর এবং অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশের বিভিন্ন গ্রামে শিবের গাজন বা ধর্মের গাজন হিসেবে আয়োজিত  হয়।

পুরুলিয়ার রঘুডিহি গ্রামে গাজন উৎসব খুব জনপ্রিয়, যেখানে ভক্তরা বা 'ভক্তা'রা বিভিন্ন কায়িক কষ্টসাধ্য আরাধনা ও নাচের মাধ্যমে তাদের আরাধ্য শিব ও ধর্মরাজ তুষ্ট করার চেষ্টা করে থাকে।

অযোধ্যা পাহাড়ের কোলেই রয়েছে মুরগুমা গ্রাম। আশেপাশে আরও বেশ ক-টি গ্রামে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী পূর্ণিমার আশেপাশে এই গাজনকে কেন্দ্র করে এক উৎসবমুখর পরিবেশ গড়ে ওঠে। একই রকম ভাবে বাঘমুণ্ডি ও ঝালদা অঞ্চলগুলিতেও গাজন বা 'ভক্তা পরব' উপলক্ষ্যে চড়ক গাছ এবং শিবের গাজন কেন্দ্রিক মেলা বসে। চড়ক গাছ বলতে বোঝায়— একটি ফাঁকা জায়গার মাঝখানে বাঁশের লম্বা এবং উঁচু খুঁটি। একদম মাথায় আড়াআড়ি ভাবে আরও একটি বাঁশ বাঁধা থাকে। যেটি চক্রাকারে ঘুরতে পারে। এই বাঁশের দণ্ডটির একেবারে শেষ প্রান্তে বিশেষ কোনো গাজন সন্ন্যাসীর পিঠে বাণ বা বড়শি ফুঁড়ে ঘোরানো হয়। পুরুলিয়া জেলার শহর এলাকাতেও অধিকাংশ শিব মন্দিরে ছোট করে হলেও এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যাকে স্থানীয়ভাবে 'চৈত পরব' বা 'ছৌ পরব'-ও বলা হয়। আর বড় পুজোগুলির ক্ষেত্রে আড়ম্বর অনেক বেশি থাকে। এই জেলার গাজনে সবথেকে লোমহর্ষক ও ভক্তিপূর্ণ আচার হল নীল-পার্বতীর বিবাহ নিয়ে রূপক নাটক।

 

বীরভূম

-----

বীরভূম জেলার গাজনপুজো বা উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখ মাসে পালিত হয়। এটি রাঢ় বাংলার একটি প্রাচীন লোক উৎসব।  এই জেলাতেও শিব, নীল এবং ধর্মঠাকুরের আরাধনাকে কেন্দ্র করে

এই উৎসব আয়োজিত হয়। বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহব্যাপী এই উৎসবে যথারীতি সন্ন্যাসীরা কাঁটাঝাঁপ, আগুনের ওপর হাঁটা ও চড়ক পুজোর মতো কঠিন রীতিনীতি পালন করেন। জেলার গ্রাম্য সংস্কৃতি, ভক্তি ও ঐতিহ্য এই উৎসবের মূল আকর্ষণ।

শিবের গাজন হয় মূলত চৈত্র সংক্রান্তি থেকে চড়ক পর্যন্ত এবং বৈশাখী পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমায় হয় ধর্মরাজের গাজন।

এই জেলায় গাজন সন্ন্যাসীরা মূলত সন্তান কামনার ব্রত পালন করে। সারাদিন উপবাস থেকে রাতের বেলা হবিষ্যান্ন বা ফলাহার করে থাকে ভক্তা সন্ন্যাসীরা। এছাড়াও চড়ক গাছ, বোলান গান, এবং কাঁটার ওপর ঝাঁপ দেওয়ার মতো শরীর হিম করা রীতিনীতি দেখা যায়।

ধর্মরাজ পুজো: সাঁইথিয়ার কাছে মল্লিকপুর, তাঁতিপাড়া, পুরন্দরপুর, আহমেদপুরের কাছে বেলের মতো বিভিন্ন স্থানে ধর্মঠাকুরের গাজন ও চড়কপুজো হয়।

রাঢ় বাংলার গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক হিসাবে এই জেলার স্বতন্ত্র একটি রেওয়াজ হল বোলান গান। গাজন বা ধর্মপূজার সময় বীরভূম-মুর্শিদাবাদ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে 'বোলান' বা শিবের গান বিশেষ জনপ্রিয়।

(ক্রমশ)


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন