কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

সুজিতকুমার দাস

 

আলোর সন্ধানে


 

(প্রথম দৃশ্য)

পর্দা উঠলে দেখা যায় সবুজ শাড়ি পরিহিতা প্রকৃতি মা  মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রকৃতি মায়ের বামপাশে মৃত্তিকা (পরনে ধূসর পোশাক), জীবন (পরনে সাদা পোশাক) প্রকৃতি মায়ের ডানপাশে বাতাসী (পরনে হালকা রঙের পোশাক সঙ্গে পাতলা সাদা ওড়না এমনভাবে নেওয়া যাতে সামান্য বাতাসেও ওড়না ওড়ে), আকাশ (পরনে আকাশী পোশাক) এরা সবাই এক পা হাঁটু গেড়ে এবং অন্য পা ভাঁজ করে বসার ভঙ্গিমায় দুহাত ক্রশ করে মাথা তার মধ্যে নীচু করে গুঁজে রেখেছেস্পট লাইট প্রকৃতির উপর

প্রকৃতি : আমি প্রকৃতি আদ্যাশক্তির  নির্দেশে আমি ধরিত্রীর বুকে প্রাণের স্পন্দন সৃষ্টি করেছি পৃথিবীর সমস্ত জীবকুল আমার কাছে ঋণী মৃত্তিকা, জীবন, বাতাসী, আকাশ আমারই অংশ কখনো আমি ওদের সম্মিলিত রূপ, কখনো ওরা প্রত্যেকে স্বতন্ত্র সত্তা জীবজগতের প্রাণশক্তি উপ্ত আমার অংশে অংশে

(প্রকৃতি থামে স্পট লাইট মৃত্তিকার উপর পড়ে মৃত্তিকা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়)

মৃত্তিকা : আমি মৃত্তিকা জীবের প্রাণশক্তি নিহিত আমার গর্ভে আমি সভ্যতার ভিত্তিভূমি যুগ যুগ ধরে আমার রসদে লালিত জীবকুল

(প্রকৃতির দিকে মৃত্তিকা ডান হাত বাড়িয়ে দিলে প্রকৃতি বাম হাত বাড়িয়ে মৃত্তিকার হাত শক্ত করে ধরে নেয় স্পট লাইট বাতাসীর উপর পড়ে বাতাসী উঠে দাঁড়ায়)

বাতাসী : আমি বাতাসী কেউ আমায় দেখতে পায় না, কিন্তু আমি যে আছি তা বোঝে সকলেএ জগতের সর্বত্র আমি বিরাজমান আমি জীবকুলের প্রাণবায়ু আমার এতটুকু অভাববোধে জীবজগৎ অস্থির হয়ে ওঠে আমি আদ্যাশক্তির এক মহাশক্তি

(বাতাসী তার বাম হাত প্রকৃতির দিকে বাড়িয়ে দিলে প্রকৃতি ডান হাত দিয়ে শক্ত করে তা ধরে নেয় স্পট লাইট জীবনের উপর পড়ে জীবন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়)

জীবন : আমি জীবন এ জগতের তিনভাগে আমি বিরাজ করি জীবের প্রাণশক্তি নিহিত আমার ফোঁটায় ফোঁটায় আমি আদ্যাশক্তির অংশ এক মহাশক্তি

(জীবন তার ডান হাত বাড়িয়ে দিলে মৃত্তিকা বাম হাত দিয়ে তা শক্ত করে ধরে নেয় স্পট লাইট আকাশের উপর পড়ে আকাশ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়)

আকাশ : আমি আকাশ সূর্যের সোনালি রঙে স্নাত প্রাণশক্তির এক মহা উৎস আমি আমার কোলে পালিত মেঘরাশি ধরিত্রীকে নব প্রাণরসে সিঞ্চিত করে আমি অধরা, অসীম, চিররহস্যময়

(আকাশ বাম হাত বাড়িয়ে দিলে বাতাসী ডান হাত বাড়িয়ে শক্ত করে ধরে নেয় সবাই মিলে বৃত্ত রচনা করে গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে সমস্বরে)

আমরা সৃষ্টি আমরা স্থিতি আমরা লয়

আমরা সৃষ্টি আমরা স্থিতিআমরা লয়

(প্রস্থান)

 

(দ্বিতীয় দৃশ্য)

(ঘরোয়া পরিবেশ দুষ্টাত্মা উচ্ছ্বসিতভাবে প্রবেশ করে)

দুষ্টাত্মা : দুর্মতি! দুর্মতি! দুর্মতি কোথায় গেলে?

(বাঁ দিক দিয়ে দুর্মতির প্রবেশ)

দুর্মতি : কী হলো কী? সকাল সকাল এত চেঁচাচ্ছ কেন?

দুষ্টাত্মা : একটা খুশির খবর আছে

দুর্মতি : ও মা! তাই নাকি! কী খবর গো?

দুষ্টাত্মা : সারা জগতের উপর আমি প্রায় কব্জা করে ফেলেছি পৃথিবীর যে দিকে তাকাবে দেখবে শুধু আমার কীর্তির ধ্বজা উড়ছে লোভ, লালসা, ঈর্ষা, মোহ আমাদের অনুচরেরা সারা পৃথিবীতে দারুন কাজ করেছে পৃথিবীর বনভূমির এক তৃতীয়াংশ নিঃশেষিত হয়ে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার কলকারখানা জঙ্গলের শতাব্দী প্রাচীন গাছের কাঠ আর জন্তু জানোয়ারের ছাল, চামড়া, শিং, দাঁত, হাড় থেকে কতো যে মুনাফা হয়েছে তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না তুমি জেনে আরো খুশি হবেবাঘের চামড়া, হরিণের শিং, হাতির দাঁত আর গন্ডারের শৃঙ্গ দিয়ে তোমার জন্য একটা সিংহাসন বানানোর ব্যবস্থা করেছি

দুর্মতি : ও মা! তাই নাকি!

দুষ্টাত্মা : শুধু কী তাই? যেখানে যত জলা জায়গা, সেগুলো বুজিয়ে এত উঁচু উঁচু আবাসন নির্মাণ হয়েছে যে মাথা উঁচু করে দেখতে গিয়ে তোমার ঘাড়ে খটকা লেগে যেতে পারে

দুর্মতি : কিন্তু, এত জলা জায়গা বুজিয়ে দিলে জলের অভাব হবে না?

দুষ্টাত্মা : হ্যা হ্যা হ্যা! হাসালে দুর্মতি! তুমি হাসালে আমাদের বড়ো বড়ো পাম্পগুলো মাটির গভীর থেকে গ্যালন গ্যালন জল তুলে নিতে পারে জল তো এখন ঘরে ঘরে

দুর্মতি : সত্যি! তোমার বুদ্ধির তুলনা হয় না

দুষ্টাত্মা  : এখন বজ্রের শক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় শীতগ্রীষ্ম বর্ষা কোন কিছুই এখন আমাদের আর কাবু করতে পারে না সবরকম পরিস্থিতিতে এখন আমাদের শুধু আরাম আর আরাম শিল্প ক্ষেত্রেও আমরা বিপ্লব ঘটিয়েছি আনবিক শক্তি এখন আমাদের হাতের মুঠোয় প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহারে জীবন যাকে বলে একেবারে হালকা বুঝলে তো, এখন শুধু আমাদের সুখ আর ভোগ, ভোগ আর সুখ চলো! তোমাকে তোমার সিংহাসনটা দেখিয়ে আনি

দুর্মতী  : সেই ভালো চলো

(দুর্মতি ও দুষ্টাত্মার প্রস্থান)

 

(তৃতীয় দৃশ্য)

মঞ্চের মাঝখানে প্রকৃতি মা দাঁড়িয়ে পরনের শাড়ির সবুজ রং এখন অনেকটা ফিকেনেপথ্যে আর্ত চীৎকার

আর পারছি না বড্ড কষ্ট! আ্ঁআঁ বাঁচাও! বাঁচাও!

প্রকৃতি : এ কী! এ আর্ত স্বর কোথা থেকে আসছে?  মনে হচ্ছে কেউ যেন ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে পড়েছে

(ধুঁকতে ধুঁকতে জীবনের প্রবেশ সারা গায়ে নোংরা আর প্লাস্টিক জড়ানো)

জীবন : আর পারছি না দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা এ অবস্থায় কী চলা যায়?

প্রকৃতি : এ কী অবস্থা হয়েছে তোর? কী করে এমন অবস্থা হলো? প্লাস্টিক আবর্জনায় ভর্তি গা সারা দেহে পোকা কিলবিল করছে কে করলো এমন অবস্থা?

জীবন : সবই উন্নয়নের ফল যেখানে সেখানে ফেলা প্লাস্টিক, আবর্জনা, কারখানার রাসায়নিক জঞ্জাল সব এসে আমার শরীরে মিশে শরীরটাকে একেবারে ঝাঁঝড়া করে দিয়েছে আমি আর এ শরীর বয়ে নিয়ে যেতে পারছি না (কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ে)

(হাঁপাতে হাঁপাতে বাতাসী প্রবেশ করে)

প্রকৃতি : এ কী বাতাসী! তুই অমন হাঁপাচ্ছিস কেন?

বাতাসী : বিষ! বিষ! বিষে ভরে গেছে আমার দেহ কালো কালো ধোঁয়া, ঝাঁঝালো গ্যাস, ধুলো আমার শরীরকে ভারী আর বিষাক্ত করে দিয়েছে আমি আর বইতে পারছি না আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে (কাশতে কাশতে বসে পড়ে)

(ধীর ক্লান্ত পদক্ষেপে মৃত্তিকার প্রবেশ)

প্রকৃতি : মৃত্তিকা! তোর আবার কী হলো? তুই অমন টেনে টেনে টলে টলে চলছিস কেন?

মৃত্তিকা : জানি না আমার কী হয়েছে কিন্তু শরীরটা আমার ভালো নেই ডাক্তার পরীক্ষা করে বললো শরীরের জায়গায় জায়গায় প্লাস্টিক ক্লট হয়ে আছে তেষ্টা পায়, কিন্তু মুখের জল পেটে গিয়ে পৌঁছায় না শরীর জুড়ে শুধু রাসায়নিক বিষ দেখছ না আমার লাবণ্য কেমন হারিয়ে গেছে

(হাঁপাতে হাঁপাতে মৃত্তিকা বসে পড়ে)

(উত্তেজিত হয়ে আকাশের প্রবেশ)

আকাশ : অত্যাচার! নির্মম অত্যাচার! এত অত্যাচার আমি আর সহ্য করতে পারছি না মনে হচ্ছে আমি এক গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার গ্রীনহাউস গ্যাস দিয়ে আমার ওজোনের বর্ম ভেঙে দেওয়া হয়েছে কালো কালো ধোঁয়া আর বিষাক্ত রাসায়নিকের ঝাঁঝালো গন্ধে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে মুহুর্মুহু আমার দিকে ধেয়ে আসছে শয়ে শয়ে ক্ষেপনাস্ত্র প্রচন্ড উত্তাপের জেরে আমার বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে

প্রকৃতি : একা তোরই যে এমন অবস্থা হয়েছে তা নয় চেয়ে দেখ মৃত্তিকা, বাতাসী আর জীবনের কী অবস্থা হয়েছে

আকাশ : এ কী! এ কী বীভৎস অবস্থা হয়েছে ওদের! উত্তেজনার বশে আমি এতক্ষণ ওদের খেয়ালই করিনি কিন্তু আমরা কি এভাবে চুপ করে বসে থাকবো? এর প্রতিকারের কী কোন উপায় নেই?

প্রকৃতি : আছে এসো আমরা সবাই মিলে আদ্যাশক্তির কাছে আমাদের প্রার্থনা জানাই যা ব্যবস্থা করার উনিই করবেন

(প্রকৃতি, আকাশ, জীবন, বাতাসী, মৃত্তিকা সবাই মিলে হাতজোড় করে)

হে আদ্যাশক্তি! জগৎ ও জীবনের স্রষ্টা ও রক্ষাকর্তা! আমরা তোমার শরণাগত ত্রাহিমাম!

ত্রাহিমাম! রক্ষা করো রক্ষা করো

(দিব্য জ্যোতির্ময় এক মূর্তির আবির্ভাব)

আদ্যাশক্তি : আমি আদ্যাশক্তি! তোমাদের আকুতি শুনে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না দুষ্টাত্মা আর দুর্মতির স্পর্ধা আমাকে স্তম্ভিত করেছে কিন্তু, ওদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমি তো বিবেককে পাঠিয়েছিলাম সে কোথায় গেল?

মৃত্তিকা : দুষ্টাত্মা আর দুর্মতি মায়া আর মোহ-র শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ওকে এক নির্জন দ্বীপে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে

আদ্যাশক্তি : বুঝেছি ঐ জন্যই সারা পৃথিবীতে দুষ্টাত্মা ও দুর্মতির এত দৌরাত্ম্য ওদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে গেলে সবার আগে বিবেককে খুঁজে ওর ঘুম ভাঙাতে হবে ওদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা একমাত্র বিবেকের আছে তোমরা একযোগে বিবেকের ধ্যান শুরু করো তোমাদের সম্মিলিত শক্তিতে ওর ঘুম ভাঙ্গবে আর ও জেগে উঠলেই দুষ্টাত্মা আর দুর্মতির দর্প চূর্ণ হবে

(আদ্যাশক্তির প্রস্থান)

(সবাই মিলে বিবেকের ধ্যান শুরু করে)

(সম্পূর্ণ সাদা পোশাকে বিবেক প্রবেশ করে সঙ্গে একটি ছোট মেয়ে মেয়েটির হাতে ধরা একটা চারাগাছ)

বিবেক : আমি বিবেক! দুষ্টাত্মা আর দুর্মতি ক্রীট দ্বীপের গহন অরণ্যে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল তোমাদের অন্তরাত্মার আকুল আহ্বানে আমার ঘুম ভেঙেছে দুষ্টাত্মা আর দুর্মতির চোখ এড়িয়ে আমি বহু কষ্টে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছি

প্রকৃতি : তোমার সঙ্গে ও কে?

বিবেক : ও সুমতি!

প্রকৃতি : সুমতি! ওকে কোথায় পেলে?

বিবেক : দুষ্টাত্মা আর দুর্মতি ওকে এক অন্ধকার কূপে বন্দিনী করে রেখেছিল আমি ওকে উদ্ধার করে এনেছি

প্রকৃতি : ওর হাতে ওটা কী?

বিবেক : বোধিবৃক্ষের চারা

প্রকৃতি : বোধিবৃক্ষের  চারা!

বিবেক : হ্যাঁ দুষ্টাত্মা আর দুর্মতি মিলে লোভ, লালসা, ঈর্ষা আর মোহকে হাতিয়ার করে মৃত্তিকা, জীবন, বাতাসী আর আকাশের যে ক্ষতি করেছে এই বোধিবৃক্ষই সে ক্ষতির হাত থেকে ওদের বাঁচাবে এর সুশীতল ছায়ায় ওদের শরীরের জ্বালা জুড়াবে এই বৃক্ষের সুশোভিত কুসুমের সৌরভ ভালোবাসার রূপ নিয়ে ওদের ক্ষতে প্রলেপ দেবে এই বৃক্ষের সুমিষ্ট ফল কর্ম ফলের রূপ নিয়ে নব অনুপ্রেরণার রসদ ছড়িয়ে দেবে দিকে দিকেঐ দেখ! সূর্যের সোনালী কিরণ এসে পড়েছে এই বোধিবৃক্ষের উপর চলো আমরা সবাই আলোর পথের যাত্রী হই

(ও আলোর পথযাত্রী এ যে রাত্রি এখানে থেম না)

গান চলতে থাকে ধীরে ধীরে প্রথমে এসে দাঁড়ায় সুমতি, তার পিছনে বিবেক, তার পিছনে প্রকৃতি এবং প্রকৃতির দু পাশে জীবন, বাতাসী, আকাশ ও মৃত্তিকা

(ধীরে ধীরে পর্দা নেমে আসে।)

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন