কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

শান্তনু গঙ্গারিডি

 

শিবোলেথ

 


(১)

ব্রিটিশদের ভারতব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাস ও ভূগোলের দিকে নজর দিলে দেখা যায় যে ডিমাসা রাজ্য এবং আহোম রাজ্য সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা দিনে আলাদা আলাদা চুক্তি মারফত ব্রিটিশরাজের অধীনে এসেছিল। ৬ মার্চ ১৮২৪-এর স্বাক্ষরিত বদরপুর চুক্তির ফলে ডিমাসা অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনে আসে। তার প্রায় দু’বছর পর ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮২৬ তারিখের ইয়ান্ডাবু চুক্তির দৌলতে ইংরেজরা আহোম রাজাদের রাজ্য  নিজেদের অধিকারে আনতে সফল হয়। এই দুই অঞ্চলকে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, ১৮২৪এর বদরপুর চুক্তি মারফৎ ইংরেজ শাসকেরা সর্বপ্রথম উত্তর পূর্ব ভারতের বুকে পা রাখতে সক্ষম হয়।

আজকের আসামের অন্তর্ভুক্ত বর্তমান করিমগঞ্জ জেলা ছিল অবিভক্ত বঙ্গভূমির সিলেট জেলার অংশ। কাছাড় ও হাইলাকান্দি জেলা দুটি ছিল ডিমাসা রাজাদের শাসনাধীন। আবহমান কাল থেকে এই অঞ্চলের আম জনতার মুখের ভাষা ছিল বাংলা এবং ডিমাসা রাজারা বড়ইল পাহাড় সন্নিহিত অঞ্চলে বসতি স্থাপনের পর হয়তো বা তুলনামূলকভাবে উন্নত স্থানীয় লোকেদের মুখের জবান নিজেদের রাজ্যের রাজভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়। বড়াইল পাহাড়ের দক্ষিণে বাংলার চল না থাকলে ডিমাসা রাজারা এই ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতে গেলেন কেন? বাংলা শিখলেন কীভাবে? তখন রেডিও টিভি বা ইন্টারনেট পরিষেবা মানুষের কল্পনায়ও ছিল না যে লোকে বহির্রাঞ্চলের একটি ভাষা অনলাইনে শিখে নেবে। কৃষ্ণচন্দ্র বর্মণ গোবিন্দচন্দ্র বর্মণ প্রমুখ ডিমাসা রাজারা ভাষাটাকে ভালোবেসে বাংলা সাহিত্য চর্চা করতেন। ইংরেজ শাসনকালেও এ অঞ্চলের সরকারি ভাষা ছিল বাংলা।

পরবর্তী কালে প্রশাসনিক প্রয়োজন বোধে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভেঙে আসাম প্রদেশ গঠনের সময় বাঙালি অধ্যুষিত সিলেট জেলাকে আসাম প্রদেশের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিশ্রুতি ছিল নতুন প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হলেও শ্রীহট্টের ভাষা সংস্কৃতি রক্ষা করা হবে।

এছাড়া গোয়ালপাড়া এবং বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলগুলি নবগঠিত আসাম প্রভিন্সের সঙ্গে একীভূত করে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, আহোম রাজাদের কাছ থেকে অধিকৃত ভূমির যে পরিমাণ ইরেজরা দখল করেছিল তার চাইতে অনেক বৃহৎভূমি জুড়ে দিয়ে আসাম প্রদেশ গঠন করা হয়েছিল। সেই সকল "জুড়ে দেওয়া ভূমি"-র সঙ্গে সঙ্গে সেই সেই অঞ্চলের বিভিন্ন জাতি জনজাতীয় ভূমিপুত্রদেরকেও আসামের বাসিন্দা হতে হয়েছিল। এ সকল কার্যকারণে আসাম নামক রাজ্যটি শুরুর থেকেই একটি বহুভাষিক রাজ্য। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের মতোই তার ভাষা বৈচিত্র্য। নানান গন্ধ বর্ণের সমাহার নিয়ে তৈরি হয়েছে এই অপরূপা অলকা আসাম।

(২)

ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, ভাষিক, কৃষ্টি ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বিচার করলে বোঝা যায় বরাক উপত্যকা বঙ্গভাষাভূমির পূর্বপ্রাঙ্গণের স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। যেখানে বাঙালি ছাড়াও বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীর জাতিজনজাতির মিলিজুলি বসবাস। ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি আসামকে প্রদেশ হিসাবে গঠন করার সময় নতুন প্রদেশের রাজস্ব ঘাটতির সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে বঙ্গভাষী সিলেট ও কাছাড় জেলাকে কেটে এনে আসাম রাজ্যের সাথে জুড়ে দেয়। ফলস্বরূপ অবিভক্ত কাছাড় জেলা ও অবিভক্ত সিলেট জেলা দুটি নিয়ে "সুরমা উপত্যকা" নামে কমিশনার শাসিত একটি নতুন প্রশাসনিক বিভাগের জন্ম হয়। ১৯৪৭ সালের রেফারেন্ডাম মারফত এই বিভাগের সিলেট জেলার সিংহভাগ অংশ চলে যায় পূর্বপাকিস্তানে। সেই কমিশনার শাসিত "সুরমা উপত্যকা"র এপারে পড়ে থাকা বাকি অংশকে ইদানিং "বরাক উপত্যকা" নামে ডাকা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, সুরমা-বরাক অঞ্চল অর্থাৎ বিভাগ-পূর্ব সিলেট ও অখণ্ড কাছাড় স্মরণাতীত কাল থেকেই একটি অভিন্ন কৃষ্টি সাংস্কৃতিক ভৌগোলিক ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এবং ইংরেজ শাসনের সৌজন্যে একদা আসাম প্রভিন্সের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

এই পরিপ্রেক্ষিত বুঝতে পারলেই "আজকের আসাম"-এর এই দক্ষিণ অঞ্চলটির ভাষিক সাংস্কৃতিক পরিচয় উপলব্ধি করা সম্ভব। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দশকে দশকে এ রাজ্যের ক্ষমতা দখলে রাখা সমস্ত রাজনৈতিক দল এই ভৌগোলিক অঞ্চলের ভাষিক সাংস্কৃতিক পরিচয়কে অস্বীকার করে ইতিহাস বিকৃত করার চক্রান্ত করে এসেছে। ভাষা কেড়ে নেওয়ার এই আক্রমণের মোকাবিলা করতে গিয়ে এখানকার বাংলা ভাষার চিহ্নগুলি কিছুটা রূপান্তরিত হয়েছে। হয়ত কিছুটা ভিন্নখাতে বয়ে চলা সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। মোদ্দাকথা, দক্ষিণ আসামের এই ভূখণ্ড আসলে যে বাংলা ভাষাকৃষ্টির বৃহৎ ভূগোলেরই অংশ সেটা অল্প আয়েসেই বোধগম্য হয়।

প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে, ১৯১৭ সালে অসম সাহিত্যসভা এবং ১৯১৯ সালে অসম ছাত্রসম্মেলন অসমিয়াদের ভাষাগত আঞ্চলিক পরিচয়ের রক্ষাকবচ দাবি করেছিল। তারাই প্রথমবার আসামে সরকারি চাকুরিতে "অসমিয়া"-দের নিযুক্তির দাবি তুলেছিল। সেই লক্ষ্য পূরণের স্বার্থে এই দুটি সংগঠন আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত বাংলাভাষী জেলাগুলোকে বঙ্গদেশের সঙ্গে যুক্ত করার দাবিও উত্থাপন করেছিল। বাংলাভাষী জেলাগুলো বলতে অবশ্যই শ্রীহট্ট কাছাড় ছাড়াও আরো কিছু অঞ্চলকে ইঙ্গিত করা হয়েছিল।

আসাম রাজ্যের অসমিয়া বাঙালি ভাষা-বিরোধ আসলে ইংরেজ সৃষ্ট। রাজস্ব আদায়ের অজুহাতে সেদিন বাংলাভাষাভাষী অঞ্চলগুলোকে নব গঠিত আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত না করা হলে এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধিতার জন্মই হতো না। বঙ্গ ভূখণ্ড হতে নির্বাসিতা না হলে মাতৃভাষায় কথা বলার "দোষে" বাঙালিকে অভিসম্পাত কুড়োতে হতো না। একষটি, একাত্তর, বাহাত্তর, ছিয়াশি, ডি-ভোটার, ডিটেনশন ক্যাম্প, এনআরসি— সব সময় বাঙালিকেই অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

১৯৬১র ঘটনার পর কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ পদক্ষেপে তৎকালীন কাছাড় (বর্তমানে কাছাড় করিমগঞ্জ হাইলাকান্দি) জেলার জন্য বাংলাভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ভাষা বিধির ৫ নং ধারার ৫ নং উপধারায় বলা আছে যে কাছাড় জেলার জন্য জেলাস্তরে এবং জেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রশাসনিক ও অন্যান্য সরকারি কাজকর্মে বাংলা ব্যবহৃত হবে।

কিন্তু তারপরও দশকে দশকে চোরাগোপ্তা ও সরাসরি আক্রমণ শানানোর কাজ চলতে থাকে। সার্কুলার ইত্যাদি ছাড়াও হঠাৎ হঠাৎ সরকারি ব্যানার সাইনবোর্ডে অন্য ভাষা লিখে খোঁচাখোচি চলে। বরাকবাসীরা নার্ভ পরীক্ষা করা হয়। বরাকের বাঙালিকে অসহিষ্ণু তকমা দেওয়া হয়। এদের সঙ্গে ধুন দেবার লোকেরাও বরাকে ক্রমে ক্রমে বেড়ে চলেছে। সরকারি ভাষা আইন ভঙ্গকারীরাই যেন সঠিক --সত্যমেব জয়তের এই পরিণতি এই রাজ্যেই সম্ভব।

বিষয়টি নিয়ে আমাদের অভিভাবক প্রয়াত সুজিৎ চৌধুরীর বক্তব্য খুব স্পষ্ট। আজ থেকে বহু বছর আগেই তিনি সতর্ক করে বলে গেছেন:

"১৯৬১, ১৯৭২ বা ১৯৮৬ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের সেই শিক্ষাই দিচ্ছে যে রাজ্যের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসাবে ও রাজ্যের প্রশাসন যাঁরা চালান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি কোনও সহজাত আনুগত্য তাঁদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়, ন্যায়বিচারের খাতিরে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ভাষিক সংখ্যালঘুদের প্রতি তারা গণতান্ত্রিক আচরণ করবেন, এমন সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত সুদূরপরাহত। বরঞ্চ উল্টোটাই অহরহ দৃষ্টিগোচর– আন্দোলনের মাধ্যমে বরাক উপত্যকার মানুষ যে অধিকারগুলো অর্জন করেছে, অবলীলায় সেগুলোকে লঙ্ঘন করাটাকেই তাঁরা শ্রেয় বলে মনে করছেন, এমন দৃষ্টান্ত অহরহ তৈরি হচ্ছে। এই কারণেই অন্যধরনের একটি কর্তব্য সম্পর্কে বরাক উপত্যকার মানুষের অবহিত হওয়া প্রয়োজন। কথা হচ্ছে, বড় রকমের আক্রমণ যখন আসে, বড় রকমের আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে প্রতিহত করা যায়। সে ক্ষমতা যে বরাক উপত্যকাবাসীর ছিল, তা অতীতের ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত। এই ধরনের প্রতিরোধের ক্ষেত্রে হানাদাররা তাদের আক্রমণের কৌশল পাল্টে ফেলে, তারা তখন সরাসরি আঘাত না করে চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালায়। আমাদের ক্ষেত্রে এখন সেই চোরাগোপ্তা আক্রমণটা চালানো হচ্ছে। অর্থাৎ সরাসরিভাবে আইনের মাধ্যমে সংরক্ষিত আমাদের অধিকারকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে না, কিন্তু কিছু না বলে না কয়ে প্রতিদিন ভাষা আইনের সমস্ত বিধানকে লঙ্ঘন করে বরাক উপত্যকার শাসনকার্য নির্বাহ করা হচ্ছে। এর পেছনে যে প্রকল্পটি রয়েছে তা হচ্ছে এই যে যদি দেখা যায় যে ভাষা আইনের পরিপন্থী ওই সমস্ত কাজকর্মের বিরুদ্ধে তেমন কোনও প্রতিবাদ হচ্ছে না, তাহলে সময় ও সুযোগ মতো আরো ব্যাপক অসমিয়াকরণের কাজে হাত দেওয়া। মনে রাখা দরকার যে নিত্যদিনের ওই সমস্ত আক্রমণের প্রতিরোধে প্রয়োজন নিত্যদিনের আন্দোলন। অর্জিত অধিকার টিকিয়ে রাখতে হলেও দরকার সতত সজাগ সতর্কতা। বলা প্রয়োজন যে নিত্যদিনের এই প্রতিরোধ বজায় রাখার ব্যাপারে আমাদের যথাযথ সচেতনতা গড়ে ওঠেনি, তাই শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের সাংস্কৃতিক ও ভাষিক অধিকার প্রতিদিনই নিত্যনতুন বিপন্নতার মুখোমুখি হচ্ছে।"

ভাষিক আগ্রাসনের আরেকটি রূপ রয়েছে, যা মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আসামে বসবাস কারি বাঙালিরা ঠিক কী পরিচয় দেবেন সেটাও নির্ধারণ করে দেবার লোকের অভাব নেই। কেউ বলছেন অসমিয়া বাঙালি কেউ বলতে চাইছেন বঙ্গভাষী অসমিয়া! বুঝতে অসুবিধা নেই যে এই এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি করা হয় আসামবাসি বাঙালির অস্তিত্বকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেবার জন্য।‌ বাঙালির সমস্যা  তাদের বেশির ভাগই নিজের মাতৃভাষা বিসর্জন দিয়ে অসমিয়া ভাষায় লীন হতে রাজি না। অসমিয়া ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি যথাযোগ্য সম্মান ও মর্যাদা প্রর্দশন করেও বাঙালিরা নিজের জাতিগত পরিচয় ভুলতে পারে না। না, কিছুটা ভুল বললাম। স্বাধীনতার দেড় দশকের মধ্যে একদল বাঙালি নিজেদেরকে অসমিয়াভাষীতে পরিবর্তন করে ছিলেন এবং ন-অসমিয়া (নতুন অসমিয়া) নামে অভিহিত হয়েছিলেন। ষাটের দশকে উত্তাল বঙাল-খেদা আন্দোলনের সময় বঙ্গমূলের কৃষিজীবী মুসলমানদের অধিকাংশ নিজেদেরকে অসমিয়াভাষী বলে পরিচয় দিয়েছিলেন হয়তো বা ভিটেমাটি রক্ষার খাতিরে। বলা যায় তাদের কেউ কেউ সত্যি সত্যি মিশে যেতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষতক দেখা গেল এলিট অসমিয়া সমাজের কাছে তারা অনেকাংশে ব্রাত্য রয়ে গেলেন। সাম্প্রতিক অতীতে আসাম জুড়ে যে এনআরসি হয়ে গেল সেখানে বঙ্গমূলের মুসলিমদের খিলঞ্জিয়া (ভূমিপুত্র) বলে মান্যতা দেওয়া হয়নি। নামেই "নতুন অসমিয়া" কাজের বেলা স্বীকৃতি নেই।

(৩)

একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ কথার অবতারণা করার আগে বলে রাখি, অসমিয়া ও বাংলা এই দুটি ভাষার লিপি প্রায় এক হলেও উচ্চারণগত দিক থেকে বহুলাংশে সম্পূর্ণ আলাদা। ওদের চ দিয়ে ইংরেজি S  এবং ছ দিয়ে Sh বোঝানো হয়। অন্যদিকে শ স ষ গুলো শব্দের মাঝখানে অনেকটাই উর্দু খ় এর মতো উচ্চারণ করা হয়। শব্দের শুরুতে থাকলে হ উচ্চারণ করা হয়।‌ অসম অসমীয়া বানান লিখলেও ধ্বনিগত ভাবে অখ়োম অখ়োমীয়া বলা হয়। একজন অসাধারণ অসমিয়া যখন অসমিয়াতে কথা বলেন তখন অখ়োম অখ়োমীয়া উচ্চারণ করেন। তারাই আবার ইংরেজি / বাংলা / হিন্দিতে কথা বলার সময় রাজ্যের নাম আসাম বলেন। জাতির নাম অসমিয়া বলেন। এটাই দস্তুর। সে যাইহোক, ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিকের সৌজন্যে তিন দশক ধরে আম বাঙালির লব্জের আসাম নামক রাজ্যটি রাতারাতি অসম-এ পরিণত হয়ে গেছে। মনে রাখতে হবে, বাঙালির কণ্ঠে অসম উচ্চারণ যে কোনো অসমিয়ার কানে লাগে। বাংলা অসম শব্দটি অসমিয়াতে অচম বানানে লেখা হয়। প্রতিবেশী রাজ্যের ভুল নাম শিখিয়ে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি করা হয়েছে।

অতিমারির সময়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশার কথা দেখে সারা পৃথিবী চমকে উঠেছিল। বলে রাখা ভালো, আসাম রাজ্যেও এক ধরনের পরিযায়ী মজদুর রয়েছেন। এই শ্রমিকদের বিশেষত্ব হল এরা একটু ভালো পারিশ্রমিকের আশায় "নিজভাষা অঞ্চল" থেকে বেরিয়ে "অন্যভাষা অঞ্চল"-এ চলে যান কাজের সন্ধানে।

হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে একটু উন্নত মজুরি জোটে হয়ত। আর এই হতভাগাদেরকেই মাঝে মধ্যে পাকড়াও করা হয়। উগ্র জাতীয়তাবাদীদের চেলা চামুণ্ডাদের হাতে এরা বাংলাদেশি হিসেবে "চিহ্নিত" হয়ে যান। কারণ এরা অসমিয়া ভাষায় ততটা সড়গড় না। কাগজপত্র দেখিয়ে কেউ যদি বলেন: আমি হোজাই  লংকা বা বরাক অঞ্চলের বাসিন্দা তাহলে বলা হয়: তুই যে অসমিয়া তার প্রমাণ দে। বল: "জয় আই অখ়োম"। (আসামের সকল বাসিন্দা অসমিয়াভাষী আর কি!)

অসহায় লোকগুলো ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বলে: "জয় আই অসম। জয় আই অসম"। অসম বলতে পারলেও অখ়োম বলতে অনভ্যস্ত কণ্ঠ আটকে যায়। ফলস্বরূপ কান ধরে উঠবোস নাকে-খৎ এবং পুলিশে সোপর্দ। শুধু কী দিন মজুর বা কনট্রাক্ট লেবার? অনেক কলেজ ছাত্রকেও এই পরীক্ষা দিতে হয়। এটাই হল চূড়ান্ত শ্যভিনিস্ট প্রবণতা। আমার ভাষা কৃষ্টি সংস্কৃতির বাইরে আর কোনো কিছুই আমরা সহ্য করতে পারব না। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা জুড়ে এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরু তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা কিন্তু টু শব্দ করেন না।

অনেকেই শুনলে বিস্মিত হবেন মূলস্রোতের অসমিয়া শ্রোতাদের বোধগম্যতার জন্যে গানের কথা ও ভাষা বদল করতে বলা হয়েছিল প্রতিমা বড়ুয়াকে। তাঁর কথায়: "গৌহাটির আকাশবাণী থেকে বলল, গোয়ালপাড়িয়া গানগুলো তর্জমা করে গাইতে হবে। আমার রাগ হল— এ আবার কোনদেশি কথা? গোয়ালপাড়িয়া গানের অসমিয়া অনুবাদ করে গাইব? রাজি হলাম না। ... গানের বিকৃতি ঘটাব নাকি? গানের সুরের কোনো দাম নেই? ভাষার কোনো দাম নেই?"

আমরা জানি আকাশবাণী কলকাতা এবং আকাশবাণী গুয়াহাটিতেও গোয়ালপাড়ার নদীজলমাটির গানগুলো ভাষা বা উচ্চারণ কোনো কিছু না বদলেই সম্প্রচার করা হয়।

সবচেয়ে মজার কথা হল অসমিয়া ভাষার নিয়ন্ত্রণক সংস্থাটির বিচারে এখন গোয়ালপাড়ার ভাষা অসমিয়ার একটি উপভাষা স্বীকৃতি লাভ করেছে! (এদিকে গোয়ালপাড়িয়াদের অনেকেই ইদানিং রাজবংশী পরিচয় দিতে গর্ব বোধ করছেন।)

গোয়ালপাড়ার অসমিয়াকরণ সেই ষাটের দশকেই সম্পূর্ণ হয়েছিল। অবিভক্ত কাছাড়েও নিরন্তর চেষ্টা চলছে। এদের নাম বরাকিপন্থী। এরা বলেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষা আমাদের মাতৃভাষা না! বরাক উপত্যকার এই "সুসন্তানেরা" আসামের বিজেপি অগপ মেলবন্ধন জমানায় আরো বেশি সক্রিয়। বরাকি / সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আদাজল খেয়ে কাজ করে যাচ্ছেন এরা। প্রথমে সিলেটিকে স্বতন্ত্র ভাষা ঘোষণা  এবং তারপর অসমিয়ার উপভাষা বানানো --এটাই হল লং-টার্ম প্লান। আমরা যেন ভুলে না যাই যে, উনিশে মে-র পাল্টা হিসেবে এরাই ঘটিয়ে ছিল উনিশে জুন, হাইলাকান্দি শহরে। উনিশে জুনের মেঘে বরাক ধলেশ্বরী কুশিয়ারার কূলকে প্লাবিত করতে পারলেই এরা সফল। বরাক জুড়ে হিন্দুত্ববাদী শক্তির উত্থানের ফলে কাজটা সহজতর হবে বলে এদের আন্তরিক বিশ্বাস।

ইহুদিদের বাইবেলে বর্ণনা করা আছে, পরাজিত এফ্রাইল জনজাতির লোকজন মুক্তির আশায় স্থান ত্যাগ করে জর্ডান নদী পার হচ্ছিল। দুর্ভাগ্যবশত তারা বিজেতা গিলিয়ড অঞ্চলের লোকেদের হাতে ধরা পড়ে যান। এফ্রাইলদের চিহ্নিত করার সহজ সরল উপায় হিসেবে গিলিয়ড-রা এফ্রাইলদের কেবলমাত্র একটি শব্দ উচ্চারণ করতে বলে। শব্দটি: "শিবোলেথ"।

গিলিয়ডদের কণ্ঠে শব্দটির যে উচ্চারণ এফ্রাইল-রা বহু কসরত করেও নিজেদের মুখে সেই উচ্চারণ ধ্বনি আনতে ব্যর্থ হয় এবং বিজেতার হাতে ধরা পড়ে অশেষ দুঃখ নির্যাতন সইতে হয়।

বাগ্বৈশিষ্ট চিহ্নিত করে বাঙালিকে বহিরাগত বলে মার্কামারার রাজনীতি চলছে দশকের পর দশক। ওহো,  বছর চল্লিশ হল বাঙালিরা শুধু বহিরাগত না। বিজেপি আরেসেসের বরাভয় লাভের পর যে কোনো বাঙালিকেই সরাসরি বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র অপরাধ বোধ জাগে না যাদের, তাঁরাই এখন আসামের ক্ষমতার অলিন্দে।

ভুল বোঝাবুঝি ও অবিশ্বাসের বাতাবরণের মধ্যেই আসামের বাঙালিরা বেঁচে বর্তে আছেন।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন