বর্ণমালার সাতকাহন (পর্ব ৩৭)
সূর্য যতই হেলে পড়ে ছায়া তত লম্বা
হয়, এ কোনও সেন্টিমেন্টাল ঘটনা নয়, মাত্রই জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিষয়। তবু এই দীর্ঘতর
ছায়া অনেক কথা বলে। মাটি সরিয়ে সরিয়ে নতুন আলু তুলে আনার মতো আবেগ সরিয়ে তুলে আনি
স্মৃতি। ক্যামেরায় ছবি তোলা হতো সেই ছবি রাখা হতো এলবামে। কত রকমের আকার ও প্যাটার্ন।
ছবিগুলো দ্রবীভূত হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে, কত বছর পরে তবু সবটাই নয় আছে কিছু কিছু। এত
ঘনঘটার জীবন ইতিমধ্যেই কাটিয়ে ফেলার পরে দেখেছি ছোটোবেলার যে রুচি যে সহবত শিক্ষা
আমাদের দেয়া হয়েছিল তা বড়ো বুড়ো অনেকেরই সেই বোধটুকু নেই। কোনও তেমন রবীন্দ্রনাথের
পরিবার নয় পাতি ঘটি বাড়ি পড়াশোনার শরীর চর্চার রেওয়াজটুকু ছিল মা বাবা দুই পক্ষের
একান্নবর্তী পরিবারের। সেখানে বারবার শেখানো হতো সোবার হতে ম্যানার্স জানতে। তিনবার
রাজনৈতিক পালাবদলের পরে সূর্য পশ্চিম দিকে হবো হবো ভাব এখন মন তিক্ত হয়ে থাকে। গুটিয়ে
যায় চরম অশালীন আচরণ দেখে। বড়োরা জ্ঞানীরা যদি এই ভব্যতা করে, কী শিখবে ছোটোরা। অস্পষ্ট
সেই সব ছেলেবেলা,যখন বাড়ির কাজের মানুষ আমাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া আসা করা মাসিকে
জন্মদিনে পা ছুঁয়ে প্রণাম করা হতো। সবই খুব সোনায় সোহাগা ছিল না। লাশ তখনও পড়ত।
বোমাবাজি তখনও হতো। পুজো তখনও হতো। সৌজন্য সম্ভ্রম বিষয়টা পরিচয় পত্রর মতো সকলে সতর্ক
হয়ে বহন করতেন।
"The real dignity of a
man lies, not in what he has, but in what he is." কিন্তু মূল্যবোধের মতোই পচনশীল
এই রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য আজ।
জীবন বহিয়া যায় নদীর স্রোতের ন্যায়... মেয়েটি কী ভালো নম্বর লইয়া মাধ্যমিক পাশ করিল! বাড়ির লোক এবং মাস্টারমশাই সকলের ভূমিকায় এই ধারণা তাহার বদ্ধমূল হইল যে গণিত তাহার জন্য নয়। সে বাণিজ্য শাখা লইয়া পড়িবে স্থির করিল। নিয়তি দেবী আবার অলক্ষ্যে হাসিলেন। পরবর্তীকালে উচ্চতর পাঠে তাহাকে ফিরিতে হইবে সংখ্যাতত্বের নিকট আজীবন। সেই সময় বাঙালির দুহিতারা প্রচুর সংখ্যায় বাণিজ্য শাখায় পড়ত না। মেয়েরা আর্টস পড়বে এবং ছেলেরা বিজ্ঞান খুব মেধাবিনী এক আধজন প্রশ্রয় টিকা নিয়ে বিজ্ঞানও পড়ত। ছেলেরা পাশ করে চাকরি করবে এবং মেয়েরা পাশ করে বিয়ে করবে মা হবে এমন একটা সরল বৃত্ত ছিল। যদিও মহানগর চলচ্চিত্রটি ততদিনে মুক্তিপ্রাপ্ত ও জনপ্রিয়, সমাজ পেছিয়ে ছিল ঘটি গেরস্থ ঘরে। মেয়েটি ডেবিট ক্রেডিট আপন করিয়া নিল, অর্থনীতিকে ভালোবাসিল। ভালোবাসা! সখী ভালোবাসা কারে কয়?
বেশি তখনও কোচিং সেন্টারের রমরমা
নেই বিশেষত বাণিজ্য শাখা। শহরের একটি লিফলেট থেকে জানা গেল সেখানে একজন চার্টাড একাউট্যান্ট
পড়ান। ছোটো ও স্বপ্নের পুত্রসন্তান লইয়া সকলেই ব্যস্ত। সব নজর সেই দিকে। অতএব না সঠিক অনুসন্ধান না সঙ্গে থাকা কিশোরী মেয়েটি
যার তখনও বালিকাসম মনের গঠন। একাকী মফস্বল থেকে ট্রেন করে এসে পড়িল শহরের কুজ্ঝটিকায়।
একটি সুদর্শন ব্যক্তি চার্টার্ড
একান্টান্ট সাজিয়া সেই গৃহে গুটিকয়েক তরুণকে জ্ঞান দান করিতেন। তাঁহার সুন্দর চেহারা
এবং সাবলীল কথনে প্রায় সকলেই মুগ্ধ হইত এই পাড়াগাঁয়ের মেয়েটি সহজ শিকার হইবে এ
আর নূতন কী।
ভূগোলে পড়া যায় একটি নিম্নচাপ
অঞ্চলে যখন শূন্যতা সৃষ্টি হয় অন্য উচ্চতাপ স্থান হইতে বাতাস আসিয়া সেই স্থল দখল
করিয়া লয়। মেয়েটির মন শূন্য ছিল। ঘরে একাকী নিঃসঙ্গ মাতৃনির্ভর মেয়েটি তাহার মা
কে পায় না পুত্রের প্রতি মনসংযোগ অধিক নাকি সে ছোট বলিয়া অথবা ছেলে বলিয়া স্নেহাধিক্যে
সে ভাবিল তাহার মা আর তাহাকে ভালোবাসে না কারণ কপালে জুটিত অধিকাংশ সময় শাসন। ইহারই
মধ্যে তাহার চেনা শোনা বন্ধুরা সকলেই প্রেমে পড়িল সকলেই বয়ফ্রেণ্ড নিয়ে ব্যস্ত।
তাহার ছেলে বয়সের এই অভিমান একদিন জীবনঘাতক হইল।
একা এই দীর্ঘ পথ ছেড়ে দেওয়া সঠিক
হয়ত ছিলো না অথবা সবটাই ভাগ্যের পরিহাস, সুদর্শন ও ধূর্ত মানুষটি আসলেই ছিলেন না চার্টার্ড
একান্টান্ট আসলেই আর্থিক প্রতারণা তাঁর নেশা এবং পেশা, সেই ফুল্ল কুসুমিত গ্রাম্য বালিকার
সরলতা এবং নিঃসঙ্গতার সুযোগ তিনি উত্তমরূপে ব্যবহার করিয়াছিলেন। এঁদের পরিবার কোনও
কন্যা পণ নেন না। কিন্তু মানুষটির সুন্দরের আড়ালে এক জটিল মনোরোগী বাস করিত। সামান্য
আবেগের জন্য অসামান্য মূল্য দিতে দিতে কিশোরী একবার মহিলা হইয়া গেলো। বারো বছর অন্তরীণ
দারিদ্র, স্বামীর অপদার্থতা অত্যাচার এবং অশান্তি তৎসহ সামাজিক চাপে ধীরে ধীরে জীবন
তাহার প্রায় নির্বাপিত হইয়া আসিল তবু তাহার পিত্রালয় হইতে কেহ বলিল না ফিরিয়া এসো
এই বাড়িটিও তোমার এখানেও সম্মান আছে। কেহ বলিল না বিবাহবিচ্ছেদ করিয়া নূতন জীবন সূচনা
করা যায় পুনরায়। আইন কানুন প্রতিষ্ঠিত হয় কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত সমাজে তা গ্রহণযোগ্যতা
পেতে কেটে যায় একাধিক প্রজন্ম।
ভাসমান বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একটি
জীবন ভেতরে ভেতরে কাটাছেঁড়া চলতেই থাকল। ভুল ভ্রান্তি হলো পিছল পথে আবার রোদ হলো।
একটি জীবনে হয়ত আমাদের প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি দিনবদল দেখেছে। কালো সাদা টেলিভিশন থেকে
স্মার্ট টিভি, কালো টেলিফোন সেট থেকে আই প্যাড, একান্নবর্তি থেকে লিভ ইন, নকশাল আন্দোলন
থেকে হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিসম ...জীবন হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলে। কিন্তু তবুও প্রেম
আসে। যত সুখ তার চেয়ে বেশি অসুখ। কর্পোরেট জীবন থেকে দু পা হেঁটে নদীর পাড়। সবুজ
ঘাস এবং ভালোবাসা আজও এসেছে পরিণত প্রেম হয়ে। কখনও সখনও সেই মধুর প্রাথমিক দাম্পত্য
মনে ছায়া ফেলে। বয়স্ক বৃদ্ধ দাদু দিদাদের জন্য রাত বিরেতে হাসপাতাল ঘর, শ্মশান যাত্রা,
মধুচন্দ্রিমার মুহূর্ত, সেই সব ভ্রমণ সন্তানাদি নিয়ে সুখে থাকার ভেক অথবা গোপন মুহূর্ত
কখনও স্বপ্নের মতো ঝিলিক দিয়ে ওঠে। তাহার স্মৃতি পড়ে তাহার সাথে দিনগুলি শরীরের ভেতর
কর্কট রোগাক্রান্ত যাতনার মতো বোধ হয়। তবু এই ভালো। ভালো থাকুক যে যার মতো।
তাকিয়ে দেখি বেলা হলো। "প্রেম
জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কী? তাকে দেয় দাহ।
যে আগুন আলো দেয় না অথচ দহন করে, সেই দিপ্তিহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ.."
হইতে লাগিলো সেই একদা বালিকার মতো নারীটি। তাহার অতৃপ্ত প্রেমতৃষ্ণা একদিন জীবন শেষে
বিকেলে ভোরের ফুল হইয়া দেখা দিবে জীবনের রঙ্গমঞ্চে। তবু সেখানেও কি ছলনা নেই! সে কথা
পরে।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন