ধারাবাহিক
উপন্যাস
স্বর্গ এসেছে নেমে
(১৭)
ঘরে ফেরার পথে যে ভাবনাটি বৈশ্বানরের মনটিকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল তা হল রুদ্রাক্ষর আচরণ ও উপহার প্রদান। সংসদ সভাপতি হলেও সে বৈশ্বানরের প্রতিপক্ষ। কানে কানে বলা, ‘উপহারটি ঘরে গিয়ে খুলো’, পুরো ব্যাপারটাকে একট রহস্যের আবরণে মুড়ে দিয়েছে যেন’ কৌতূহলের আগুনে টগবগ করে ফুটছে বৈশ্বানর। ঘরে এসেই তার প্রথম কাজ হল উপহারের প্যাকেটটি খোলা। উপরের রঙিন কাগজটি কেটে বাক্সটি খুলতেই বৈশ্বানরের চক্ষু স্থির। একটি বাক্স তো নয়, পর পর তিনটি বাক্স, আর তিন নম্বর বাক্সের মধ্যেই আছে রুদ্রাক্ষ’র উপহার। ত্রস্ত হাতে খুলে ফেলল বৈশ্বানর তিন নম্বর বাক্সটি। আর একবার বিস্ময়ের ধাক্কায় নিস্পন্দ হয়ে গেল সে। এ কেমন উপহার! তবে ওর ভাল ছেলের আচরণ পুরোটাই তবে নাটক! বৈশ্বানর পুলিশ অফিসারের উর্দি পোরবে দু আড়াই বছর পর। তখন তো এইরকম একটি যন্ত্র ঝুলবে তার কোমড়বন্ধ থেকে, কিন্তু রুদ্রাক্ষ কেন এই অস্ত্রটি আজ উপহার দিল তাকে! রুদ্রাক্ষ কি বোঝাতে চাইলো, বন্ধুত্বের নয়, হিংসার উপরই প্রতিষ্ঠিত তাদের দু’জনের সম্পর্ক! এমনও হতে পারে এটা ভীতি প্রদর্শনের একটি কৌশল! এই আগ্নেয় অস্ত্রটি আকারে ছোট হলেও মারণ ক্ষমতায় তো পিছিয়ে নেই। এমন একটা অস্ত্র বিনা লাইসেন্সে যার কাছে থাকবে তারই তো বিপদ। ধূর্ত রুদ্রাক্ষ দাতা হিসাবে নিজের নামটি উল্লেখ করেনি কোথাও। প্রয়োজনে তাকে প্রশ্ন করা হলে সে অনায়াস উদাসীনতায় বলে দিতে পারবে, ‘রিভলবার? উপহার! বৈশ্বানরকে! কই, কিছুই জানি না তো! দেখান, দেখান আমাকে, কোথায় লেখা আছে আমার নাম!’ সে যা-ই হোক কাল ভোর হতেই অনঙ্গ বাবুকে জানাতে হবে ব্যাপারটা। তিনি সম্ভবত রিভলবার সমেত তাকে নিয়ে যাবেন থানায়, বড়বাবুকে খুলে বলবেন সব কথা, তারপর বড়বাবু যেমন বলবেন সে অনুযায়ীই কাজ হবে।
ভোর হল। তর সইল না বৈশ্বানরের। দারোয়ানকে দিয়ে খবর পাঠালো, সে
এক্ষুণি দেখা করতে চায় সান্যাল কাকুর সঙ্গে। অনঙ্গবাবু বুঝলেন, বিশেষ কোন কথা না থাকলে
বৈশ্বানর কখনও এত ভোরে তার সঙ্গে দেখা করতে চাইতো না। তিনি নিজেই গিয়ে হাজির হলেন বৈশ্বানরের
ঘরে। বৈশ্বানর রিভলবারটি দেখালো অনঙ্গবাবুকে এবং তার ধারণার কথাও জানালো সবিস্তারে।
অনঙ্গবাবু জানতে চাইলেন, অস্ত্রটিতে বৈশ্বানর হাত লাগিয়েছে কিনা। জেনে নিশ্চিন্ত হলেন
যে তেমন কিছু ঘটেনি। অস্ত্রটি নিয়ে যখন থানায় গিয়ে হাজির হলেন দুজন তখন বড়বাবু তৈরী
হচ্ছেন বাইরে যাবেন বলে। এত ভোরে তাদের দেখে বিস্মিত হলেন তিনি। বসতে বলে জানতে চাইলেন
ব্যাপারটা কি। বৈশ্বানর খুলে বলল সব কথা, এমন কি রুদ্রাক্ষ ও তার মধ্যে যে ঘটনায় শত্রুতার
সূত্রপাত সে কথাও জানাতে ভুলল না। সব কথা শোনার পর কিছুক্ষণ কিছু ভাবলেন বড়বাবু। তার
কপালে চিন্তার রেখা স্পষ্ট। কিছু সময় পর নীরবতা ভেঙে বললেন তিনি, ‘বড় দুশ্চিন্তার বিষয়,
স্কুল কলেজের ছাত্রদের মধ্যে এই ভয়ংকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে আজকাল, ঠিক আছে ব্যাপারটা
নিয়ে আমাকে আলোচনা করতে হবে প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে, এখন দেখাও দেখি তোমার উপহারটি’।
অতি সন্তর্পণে বাক্সটি খুলল বৈশ্বানর যাতে অস্ত্রটির গায়ে হাতের ছোঁয়া না লাগে। এবার
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন বড়বাবু রিভলবারটির দিকে, তুলে নিলেন ক্ষীপ্র হাতে, ভ্রূ কুঁচকে
উঠলো তার মুহূর্তের জন্য তারপর অনঙ্গবাবু আর বৈশ্বানরকে চমকে দিয়ে হো হো করে হেসে উঠলেন
তিনি। হাসি থামলে বললেন, ‘তাই বলি, এতখানি সাহস কোথায় পাবে যে একটা আসল রিভলবার কিনে
গিফট করবে!’ প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠল অনঙ্গবাবু আর বৈশ্বানর, ‘এটা আসল অস্ত্র নয় তবে?’
‘না’, মাথা নেড়ে বললেন বড়বাবু। ‘এই দেখুন, যে কোম্পানির নাম দিয়ে এই নকল অস্ত্রটি বানানো
হয়েছে তার স্পেলিংটা দেখুন, ভুল লেখা হয়েছে, জেনুইন কোম্পানির প্রোডাক্টে কখনো ভুল
বানান থাকবে না, তাছাড়া প্যাকিং-এর উপর কোম্পানির লোগো, ব্র্যান্ডের নাম, এমন আরো অনেক
কিছু আছে যা পরিবর্তন করে লেখা হয় যাতে আইনি ঝামেলা এড়ানো যায়’। অনঙ্গবাবু বললেন,
‘তবে যাত্রা থিয়েটারে আমরা যে সব বন্দুক রিভলবার দেখতে পাই, এটা সে জাতের?’ ‘একজাক্টলি’,
বলে বড়বাবু আশ্বাস দিলেন অনঙ্গবাবুকে, যে এরপর থেকে তিনি কলেজগুলোতে স্পেশাল ইনভেষ্টিগেশন চালাবেন যাতে এই
ধরনের প্রবণতার বৃদ্ধি না ঘটতে পারে।
রোমাঞ্চকর একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে এল দুজন। অনঙ্গবাবু বলে এলেন
বৈশ্বানরকে, সে যেন এ ঘটনায় মুষড়ে না পড়ে। হেসে বলল বৈশ্বানর, যে জীবন সে বেছে নিয়েছে
স্বেচ্ছায় তাতে এমন কত ঘটনাই তো সামাল দিতে হবে তাকে। প্রথম ধাক্কাটা তাকে বেসামাল
করে দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু এখন থেকে সে সম্পূর্ণরূপে সচেতন থাকবে যে কোন পরিস্থিতির মুকাবিলা
করার জন্য।
(১৮)
অনঙ্গবাবুর ভোর ভোর ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া কুন্তলা ভাল চোখে দেখেনি, বিশেষ করে ওই বেজাতের ছেলেটার সঙ্গে। মনস্বিনী উৎকন্ঠিত এ কথা ভেবে যে কিছু অঘটন না ঘটে থাকলে বাবা কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ বৈশ্বানরের সঙ্গে বেরিয়ে যাবেন কেন। অনঙ্গবাবু ঘরে ফিরতেই মুখোমুখি হতে হল মনস্বিনী ও কুন্তলার। কুন্তলার প্রশ্ন, ওই ছেলেটা কি ছিনে জোঁকের মত লেপ্টে থাকবে সারা জীবন? সময় কালের ঠিক ঠিকানা নেই, যখন তখন তলব করলেই হল! এদিকে মনস্বিনীর মন বলছিল অন্য কথা। ওই উপহার ঘটিত কিছু ব্যাপার হবে কি? জানতে চাইলো সে বাবার কাছে। অনঙ্গ বাবু ইশারায় বললেন, তেমন কিছু নয়, পরে তিনি তাকে জানাবেন সব কথা।
রণজয় স্যার ইংরেজির অধ্যাপক। কেবলমাত্র এটুকু বললেই তাঁর সম্বন্ধে
সব বলা হয়ে যায় না। তিনি যেমন একজন ভাল অধ্যাপক, তেমনি অত্যন্ত ভাল মানুষও একজন। ছাত্র
দরদী হওয়ার কারণে কলেজে বেশীর ভাগ ছাত্রের প্রিয় শিক্ষক তিনি। রুদ্রাক্ষ তাঁর মনে ভীতি
সঞ্চার করবার জন্য যে কথাগুলো তাকে বলেছে তিনি তেমন কোন গুরুত্ব দেননি তাতে কিন্তু
তিনি চিন্তিত মনস্বিনীর কথা ভেবে। রুদ্রাক্ষ এমন ধাতুতে গড়া যার কাছে সদ্ভাবনার কোন
জায়গা নেই। রুদ্রাক্ষর মত ছেলেরা অবশ্য জন্মের সাথে সাথে অসৎ হয়ে ওঠে না। সুস্থ সুন্দর
পারিবারিক পরিবেশের অভাব, নীতি আদর্শহীন পরিপার্শ্ব এদের চরিত্রগঠনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলি এমন সব যুবজনের জন্য হাত বাড়িয়ে থাকে। সামান্য ক্ষমতা
আর অভাবপীড়িত জীবনে অর্থলোভ এদের ঠেলে দেয় অন্ধকারের রাজ্যে কিন্তু সুতো বাঁধা থাকে
দলনেতাদের হাতেই। ভাবনার বিষয়, বৈশ্বানর ট্রেনিং–এ চলে গেলে ওরা উঠেপড়ে লাগবে মনস্বিনীর
ক্ষতি সাধন করতে। বিপ্রতীপে আর একটি ভাবনা আশা জাগায়; মনস্বিনী ব্যক্তিত্বময়ী, তার
সমর্থকের সংখ্যাও হেলাফেলা করার মত নয়, তারপর রয়েছে তার বাবা অনঙ্গ সান্যালের মত মানুষের
প্রবল প্রতিপত্তি।
বৈশ্বানরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সকলেরই কৌতূহল ছিল উপহারটি নিয়ে।
একটু বেলা বাড়তেই ফোন আসা শুরু হল একের পর এক। রণজয় স্যার ফোন করলেন কিন্তু তা বৈশ্বানরকে
নয়, অনঙ্গবাবুকে। তিনি অনুভব করলেন, বৈশ্বানরের অভিভাবক হিসাবে অনঙ্গবাবুর সঙ্গেই কথা
বলা উচিত। রণজয় অনঙ্গবাবুকে জানিয়ে দিলেন গতকাল রুদ্রাক্ষ তাকে কি ধরনের কথা বলে থ্রেট
করেছে। অনঙ্গবাবু জানালেন, সমস্ত বিষয়ে আলোচনা করবার জন্য তিনি মনস্বিনী ও বৈশ্বানরকে
নিয়ে যাবেন প্রিন্সিপ্যালের বাড়িতে, তিনিও যেন উপস্থিত থাকেন সেখানে। সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের
পরদিন রবিবার হওয়ায় প্রিন্সিপ্যাল এবং রণজয় স্যার, কারও পক্ষেই তেমন অসুবিধা ছিল না।
সকলে উপস্থিত হলে অনঙ্গবাবুই শুরু করলেন প্রসঙ্গটি। রণজয় স্যার তাকে থ্রেট করার কথাটি
বললেন। মনস্বিনী রনজয় স্যারকে আশ্বাস দিয়ে বলল, ‘একদম ঘাবড়াবেন না স্যার, সংসদ ইলেকশন
খুব কাছেই, কাল স্টুডেন্টসদের যে অ্যটিটিউড দেখলাম তাতে মনে হয় না রুদ্রাক্ষর দল আবার
ভিক্ট্রি পাবে, তাছাড়া ওর তো এটাই লাস্ট ইয়ার
কলেজে’। বৈশ্বানর বলল, ‘তাতে কি এসে যাবে, বাইরে থেকে কলকাঠি নাড়বে’! প্রিন্সিপ্যাল
স্যার আশ্বাস দিলেন, ‘থানার বড়বাবুকে আমি ব্রিফ করে দিয়েছি রুদ্রাক্ষর সম্বন্ধে। উনি আমাকে ভরসা দিয়েছেন, উটকো
ঝামেলা যাতে না হতে পারে সেটা উনি দেখবেন’। রণজয় স্যার স্থানীয় নেতাদের প্রভাবের কথা
উল্লেখ করলেন। অনঙ্গবাবু জানালেন, ‘বর্তমান এস.আই ইয়ং ব্লাড, বেশীদিন হয়নি এসেছেন এই
থানায়, এখনও পর্যন্ত বিরূপ মন্তব্য কিছু শোনা যায়নি ওঁর বিরুদ্ধে। তাছাড়া একটু সজাগ নজরে দেখলে ভাল মানুষকে চিনতে
ভুল হয় না, কাল তিনি আমাদের সঙ্গে যেমন সহযোগিতা
করলেন তাতে সন্দেহ নেই এখনও পর্যন্ত তিনি একজন ভাল মানুষ’। একথায় সকলেই হো হো করে হেসে
উঠলো। হাসি থামলে অনঙ্গবাবু বললেন, ‘আমার এ কথা বলার কারণ, মানুষের মন তো, প্রলোভনের
আগুন যখন চারদিক থেকে ঘিরে ধরে তখন আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর উপায় থাকে না। নিঃসন্দেহে
এটা একট চ্যালেঞ্জিং জব, বিশ্বাসঘাতকের দেশে নিজেকে নিষ্কলুষ রাখাটা আমার মনে হয় একরকম
অগ্নিপরীক্ষা’। মৃদু হাসি ফুটে উঠল বৈশ্বানরের ঠোঁটের কোণে। ‘আশীর্বাদ চাই আপনাদের
সকলের, যেন অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পারি সেই অগ্নিকুন্ড থেকে’, বিনয়ের সঙ্গে কথাগুলো
বললো বৈশ্বানর। মনস্বিনীর চোখে ফুটে উঠলো অবিমিশ্র বিশ্বাসের ভাষা। প্রিন্সিপ্যাল স্যার,
অধ্যাপক রণজয় এবং অনঙ্গবাবু তিনজনই প্রায় একই ভাষায় বললেন, ‘তুমি নিজেই তো আগুন বৈশ্বানর, আগুনে ভয় কি তোমার! আমাদের
আশীর্বাদের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে না তোমাকে, সে সর্বদা আছে, থাকবেও তোমার মাথার
উপর’।
আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হল কোনমতেই রুদ্রাক্ষর দলকে জিততে দেওয়া
যাবে না এবং সেই দায়িত্ব স্বেচ্ছায় গ্রহণ করল মনস্বিনী। প্রিন্সিপ্যাল বা রণজয়স্যার
এব্যাপারে প্রত্যক্ষ সমর্থন জানাতে পারবেন না কিন্ত দুজনই জানালেন, তাঁদের নৈতিক সমর্থন
থাকবে মনস্বিনীর প্রতি।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন