| সমকালীন ছোটগল্প |
বিধুরাম আর স্যাম আল্টম্যান
একই কলেজে পড়ত তাই তিনজনের এত বন্ধুত্ব। তিরিশ পেরনোর আগেই তারা চাকরির দুনিয়ায় বেশ ওপরের দিকে উঠে গেছে। বিয়ে-থা হয়নি, তাই মুক্ত বিহঙ্গ। সেদিন শনিবার সন্ধেবেলায় আলোকেশের বাড়িতে ওরা একটু হুইস্কি নিয়ে বসেছিল। জোর আড্ডা চলছিল – তবে সাড়ে আটটা বাজতে তিনজনেরই ক্ষিদে পেয়ে গেল। আলোকেশ কোন একটা বড় রেস্তোঁরা থেকে ফোনে খাবার অর্ডার করে দিল। বাড়িতে দিয়ে যাবে।
সময় মতো দিয়েও গেল। চাউমিন আর অনেকগুলো মানানসই খাবার। “কত লাগলো রে?” প্রীতম জিগেস করলো। “বেশি না, একুশ শো মতো হয়েছে…”
“কলকাতা জায়গাটা যে কী সস্তা! ব্যাঙ্গালোরে এই একই খাবারে হাজার তিনেক তো লাগবেই…”
নীলেশ কিছু বলেনি এতক্ষণ, এবার কী একটা কলেজ-মার্কা বুদ্ধি মাথায় ভর করায় বলল, “এই একটা মজা করবি?”
বাকি দুজন একই সঙ্গে বলল, “কী?”
“দ্যাখ, কী করি!”
নীলেশ খাবারের প্যাকেটগুলো খুলে টেবিলের ওপর
রাখল তারপর ফোন বার করে দু-তিনটে ছবি তুলল।
“ফেসবুকে দিবি নাকি? দিস না রে, এসব অনেক
পুরনো হয়ে গেছে। নতুন কিছু কর।”
“নতুনই করছি, আনকোরা নতুন।”
নীলেশ চ্যাট-জিপিটি মানে এআই লাগিয়ে ফোনে তোলা ছবিটাকে একেবারে অন্যরকম করে দিল। বাক্স তেবড়ে খাবারগুলো একেবারে ঘেঁটে গেছে, যেন খাবারের ব্যাগটা আনার সময় রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। ভেতরে প্লাস্টিকের কৌটোতে সস দেওয়া ছিল – কৌটোগুলো ফেটে লাল কালো সস ছড়িয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা। ছবিটা এত বাস্তব-সম্মত যে মনে হচ্ছে সত্যিকারের ছবি! টেবিলে খাবারের বাক্স এবং খাবার যেমন থাকার তেমন কিন্তু ছবিতে ব্যাপারটা একেবারে অন্যরকম। ছবিতে যা দেখাচ্ছে সে খাবার খাওয়া যায় না। ঘেঁটে একসা।
“এইবার দোকানের নম্বরটা দে তো…” নীলেশ বলল।
এআই দিয়ে পাল্টে দেওয়া ছবিটা নীলেশ দোকানের নম্বরে পাঠিয়ে দিল। নীচে লিখল – ‘অফুল সারভিস। খাবারের কী অবস্থা হয়েছে দেখ!’
দু-মিনিটেই দোকান থেকে ফোন এলো, “আমরা অত্যন্ত দুঃখিত, আপনাদের দেওয়া টাকাপয়সা আমরা ফেরৎ দিচ্ছি, কাল-পরশু আ্যাকাউণ্টে পেয়ে যাবেন। খাবার আর একবার পাঠাব কি?”
কড়া গলায় নীলেশ বলল, “না, তার দরকার নেই।”
নীলেশ ফোন কাটতেই তিনজন হেসে গড়িয়ে পড়ল। দারুণ দিলি তো! একুশশো নয়, তিন হাজারও নয়, এতো বিনি পয়সার ভোজ! প্রীতম বলল. “রেস্তোঁরাগুলো যা লাভ করে… ওদের মাঝে মাঝে একটু-আধটু এরকম হওয়া ভালো…”
আলোকেশ বলল, “ওপেন এআই নামে একখানা কোম্পানী করেছে বটে স্যাম আল্টম্যান! চ্যাট-জিপিটি তো ওদেরই। লোকটাকে রোজ প্রণাম করা উচিত। জিনিয়াস! দুনিয়ার সব লেখা, সব ছবি, সব তথ্য পকেটে ভরে নিয়েছে। ভাবা যায়! তারপর এমন লজিক লাগিয়েছে যে তুই যা বলবি তাই করে দেবে চ্যাট-জিপিটি! যে প্রশ্নের উত্তর চাই, যে রকম ছবি চাই, সব মুহূর্তে তৈরি! ফটোটা থেকে ফরমাশ মতো পাল্টে আরেকটা ছবি কেমন বানিয়ে দিল বল! স্যামকাকা, জিন্দাবাদ।”
মোজ করে খাওয়া-দাওয়া চলল। তারপর যে যার বাড়ি।
****
বাসববাবু কদিন বাড়িতে একলা আছেন – গিন্নী বাপের বাড়িতে আর ছেলেমেয়েরা যে যার জায়গায়, একজন বিদেশে একজন পুণেতে। বারান্দায় বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে সকালের কাগজ পড়ছিলেন। এদিকটা অভিজাত এলাকা, পয়সাওয়ালা লোকের বাস। অবশ্য এদিক ওদিকে ফাঁকে-ফোকরে বস্তি আছে কয়েকটা। ভালোই হয়েছে – এ না থাকলে কাজের লোক পাওয়া যেত না!
একটি সতেরো-আঠারোর ছেলে গেটে এসে দাঁড়াল। বাসববাবু জিজ্ঞেস করতে বলল, “রান্নাঘর, বাথরুম, সাফ করি। নতুনের মতো হয়ে যাবে। করে দেব? মাত্র তিনশো দেবেন স্যার।”
বাসববাবু অভিজ্ঞ সংসারী মানুষ। দেখেই বুঝলেন ছেলেটি অসহায় অবস্থায় পড়েছে। কমই চাইছে তবে আর একটু চাপ দিলে আরও কমে করবে। কমতে কমতে দেড়শোতে রফা হলো। দর কমানোর যুদ্ধে অসম প্রতিদ্বন্দীকে গোহারান হারিয়ে মনে মনে নিজে নিজেই নিজেকে বাহবা দিলেন।
ছেলেটা কাজে লেগে গেল। তার কাজ দেখতে দেখতে বাসববাবু জিগেস করলেন, “আগে কোনো কাজ করতিস নাকি?”
“হ্যাঁ, স্যার। দোকান থেকে বাড়িবাড়ি খাবার
পৌঁছে দেবার কাজ করতাম”।
“তা এখন এই কাজ ধরেছিস?”
“কাজটা চলে গেল কিনা।”
“কেন? কাজ চলে গেল কেন?”
“একবার খাবারের ব্যাগ এক বাড়িতে পৌঁছে দিলাম। মাকালীর দিব্যি, ব্যাগ আমার হাত থেকে পড়ে যায়নি, কিচ্ছু হয়নি। দোকানে ফিরতেই ম্যনেজার বলল যে সব খাবার নষ্ট করেছিস, এই দ্যাখ কাস্টমার ফটো পাঠিয়ে দিয়েছে।”
“অনেক বললাম, আমি কিচ্ছু জানি না! সত্যি, কিচ্ছু জানি না। কী করে এরকম ফটো এলো, আমি একটুও বুঝতে পারছি না। খাবারের ব্যাগটাতো যেমন নিয়ে গিয়েছিলাম তেমনই দিয়েছিলাম। ম্যানেজার কোন কথাই শুনল না। সেদিনই বার করে দিল। দোকানে আর রাখল না আমাকে।”
আড়াই ঘন্টা খেটে রান্নাঘর, বাথরুম পরিষ্কার করে মাত্র দেড়শটা টাকা রোজগার করে চাকরি হারানো বিধুরাম দুপু্র রোদ্দুরে ঘরে ফিরছে। বিধুরাম ক্লাস ফাইভ অবধি পড়েছিল, তারপর পয়সার অভাবে ইস্কুল ছেড়ে দিয়েছিল। পেটে বিদ্যে নেই, বুদ্ধিও তেমন নেই। সাদাসিধে ছোকরা। সে কি কখনো কোটি কোটি ডলারের মালিক তীক্ষ্ণ বুদ্ধিধর স্যাম আল্টম্যানের তৈরি কুহকের মোকাবিলা করতে পারে…!
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন