| সমকালীন ছোটগল্প |
ইন্টারভিউ
এমনটা হয় না বিশেষ, হীরেণ সান্যালের মতো চিত্রপরিচালক এককথায় রাজী হয়ে গিয়েছিলেন তাকে সময় দিতে। তার বোধহয় একটা কারণ আছে, লোকে যা অনুমান করে, বিশেষত ফিল্ম জগতের লোক, তা হল এই যে সঞ্চিতা তার এখনকার পরিচয়ে চিত্রসাংবাদিক বটে, কিন্তু এই সামান্য কিছুকাল আগেও কেউ কেউ তাকে চিত্রপরিচালক হিসাবে জানত। যথেষ্ট সিনেমা বোদ্ধা হলেও এবং বেশ কিছু উঁচু মানের সিনেমাটিক ট্রিটমেন্ট তার ছবিতে থাকলেও ফিল্ম লাইনে খুব সফল হতে পারেনি সে। একে মহিলা, তদুপরি অল্প বয়েসের স্বাভিমান, তাই না পেরেছে তোয়াজ করে কোনো প্রডিউসারকে রাজী করাতে, না পেরেছে সরকারি আনুকূল্য যোগাড় করতে। সিনেমা করা আর হয়নি। তবু হয়তো জিদ ধরেই পড়ে থাকতো এবং চিত্রসাংবাদিকের চাকরির অফার ফিরিয়েই দিত, যদি মা, বিধবা মা, অকাল বৈধব্যের পর যিনি রক্ত জল করে সঞ্চিতাকে মানুষ করে তুলেছেন, তিনি বারণ না করতেন। মা বলেছিলেন, সুযোগ কোনোদিন পেলে আবার নাহয় করবি, কিন্তু এখন বসে থাকিস না। মা নিজে লেখেন, নাম করতে পারেননি হয়তো, কিন্তু তার গল্পে সব সময় এমন কতগুলো উন্মোচনের ব্যাপার থাকে যা সিনেমার পক্ষে খুব উপযোগী। তাই সিনেমা যতদিন করেছে সঞ্চিতা, কাহিনী নিয়ে তাকে ভাবতে হয়নি। শেষ যে ছবিটা করতে গিয়ে বাধা পড়ল, সেটাও মায়ের লেখা, সঞ্চিতার মতে তার মায়ের শ্রেষ্ঠ লেখা। সিনেমা করার সুযোগ আবার যদি কোনো দিন পায়, তবে ঐ গল্পটা নিয়েই করবে। হীরেণ সান্যাল তার চিত্রপরিচালক পরিচয়টাও জানতেন বলেই হয়ত তার চিত্রসাংবাদিক পরিচয়টাকে একটু বাড়তি সম্মান দিলেন। বললেন, আজই চলে আসুন না। সঞ্চিতা বলল, আমি অভিভূত স্যার, এতটা আশা করিনি, নইলে ছবিটা আরেকবার দেখে নিয়ে আপনাকে বলতাম। কাল সকালে হলে কি খুব অসুবিধা হবে স্যার, তাহলে আরেকবার দেখে নিতে পারতাম আজ। হীরেণ সান্যাল নাকি বলেছিলেন, সেটা আবার কোনো সমস্যা হল নাকি? আমার এখানে দেখবেন। দরকার যখন যেমন পড়বে কম্পিউটারে দেখে নিতে পারবেন। আজ এলে সুবিধা হয় এই যে কথা বলার সময় পাওয়া যাবে। বিকেলটা ফাঁকা রেখেছিলাম আজ, আর কাউকে সময় দিইনি।
দ্বিতীয় কোনো কথা না বলে সেদিনই
গিয়ে হাজির হয়েছিল সঞ্চিতা। সহাস্য অভ্যর্থনায় হীরেণ সান্যাল নিজে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছিলেন।
কম্পিউটার নয়, বিরাট বড় টিভির পর্দায় ছবিটা চালিযে দিয়ে নিজে এসে বসলেন সোফায়। জিজ্ঞেস
করলেন ছবিটা শেষ হলে কথা শুরু করবেন? নাকি কথা বলতে যখন যেখানে দরকার পড়বে সেই জায়গায়
চালিয়ে দিয়ে দেখে নেবেন? দেখেছেন যখন একবার তখন নিশ্চয়ই মোটামুটি মনে আছে সবই? সঞ্চিতা
বলল, হ্যাঁ, তা মনে আছে। যখন দরকার পড়বে তখনই
না হয় চালানো যাবে। হীরেণ সান্যাল বলল, বেশ, তাই হোক। তারপর মিনিট খানেক চুপ করে থেকে
হঠাৎ খুব হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেনট, কয়েকটা কথা আছে। আপনার আপত্তি না থাকলে আমিই
বরং শুরু করি।
--- হ্যাঁ, হ্যাঁ, কোনো অসুবিধা
নেই। অনায়াসে শুরু করতে পারেন।
--- একটা কথা আমার কানে এসেছে যে
আমার এই 'নানা রঙের দিনগুলি' ছবির স্ক্রিপ্ট নাকি চুরি করা। অন্য কারো স্ক্রিপ্ট নাকি
আমি আত্মসাৎ করেছি, কোনো কোনো জায়গায় সামান্য এদিক ওদিক করে দিয়ে। আপনার কানে এসেছে
নাকি এইরকম কোনো কিছু?
--- আপনি পেলেন কার কাছ থেকে? ভারী
ইন্টারেস্টিং তো! আপনি জিজ্ঞেস না করলে আমি নিজেই এ নিয়ে আলোচনা করতাম।
--- রিয়েলি? দেন ইট ইজ রিয়েলি ইন্টারেস্টিং।
আমি কিন্তু আরো একটা কথা শুনেছি।
--- কী বলুন তো?
--- আমি যার কাছ থেকে শুনেছি
... সে নাকি শুনেছে আপনি বলেছেন। আপনার স্ক্রিপ্ট থেকেই নাকি নেওয়া।
--- স্ট্রেঞ্জ! কে বলল আপনাকে?
এতটা স্পেসিফিক কিছুতো বলিনি কোনোদিন?
--- ওহ, তার মানে বলেছিলেন, কিন্তু
এটা বলেননি, তাই তো?
--- আমার লাস্ট এফর্ট, যেটা ম্যাটেরিয়ালাইজ
করল না, প্রডিউসার রাজি হয়ে গিয়েও ব্যাক ট্র্যাক করল বলে, সেটা নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে
গিয়েছিলাম। কাস্টিং প্রায় সবই ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছিল, এমনি স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনানো ছাড়াও
ফর্মালি সবাইকে নিয়েও বসেছিলাম। তারপর তো, আর কী বলব, প্রভিডেন্স হেল্ড আদারওয়াইজ,
করতে পারলাম না। প্রডিউসার বলে দিল এইরকম ছবিতে টাকা ঢালতে পারবে না। আমি অবাক হয়ে
দেখলাম অদ্ভুত মিল রয়েছে সেই স্ক্রিপ্টের সাথে আপনার এই ছবিটার, 'নানা রঙের দিনগুলি'।
ভেবেছিলাম কেউ কি কোনোদিন গল্প করতে করতে ছবির গল্পটা এমনিই বলে ফেলেছিল বা একটা স্ক্রিপ্ট তৈরী করে এনে দেখিয়েছিল আপনাকে। দেখে হয়তো আপনার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল গল্পটা। হয়তো আদৌ
আপনি জানতেন না ঐ গল্পটা নিয়ে কারো ছবি করার পরিকল্পনার কথা, কিংবা হয়তো ভেবেছেন সে
ছবিটা তো হল না, সুতরাং গল্পটা নিয়ে ছবি করায় কোনো বাধা থাকতে পারে না।
সঞ্চিতা থামল, হয়তো প্রতিক্রিয়া
লক্ষ্য করার জন্যই। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে, অথচ মন দিয়ে শুনছিলেন হীরেণ সান্যাল। বোধহয়
ভাবতে পারেননি হঠাৎ এই জায়গায় এসে থেমে যাবে সে। যখন দেখলেন বিরতি দীর্ঘায়িত হচ্ছে,
তখন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। জিজ্ঞেস করলেন, তারপর? সঞ্চিতা বলল, আমি কেবল খোঁজ করছিলাম
আমার ঐ গল্পটা কে কে জেনেছে এবং তার মধ্যে কার কার পক্ষে সম্ভব আপনার কাছে পৌঁছানো।
ব্যস, এই পর্যন্তই। কখনই এমন ধৃষ্টতা আমার হবেনা যে বলব আমার স্ক্রিপ্ট আত্মসাৎ করে
আপনি ছবি করেছেন।
--- হ্যাঁ, আমারও সেরকমই মনে হয়েছিল।
কথাটা বিশ্বাস করতে পারিনি বলেই আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম।
--- একটা অনুরোধ করব স্যার আপনাকে?
--- বলুন।
--- আমাকে আর 'আপনি' করে বলবেন
না। কানে বড় লাগে। সম্মানে অনেক বড় তো বটেই, বয়েসে ও আপনি অনেক বড় আমার থেকে। আগেও
বলেছি আপনাকে কয়েকবার, যখন দেখা করতে এসেছি। আপনি তা ভুলে গেছেন। বলবেন না প্লিজ।
--- বেশ, তাই হবে। তুমি ঠিকই বলেছ,
বয়েসে তোমার থেকে আমি অনেক বড়। একেবারে শেষে এসে পৌঁছেছি প্রায়। ফিল্ম লাইনে অনেকদিন
হল, আর পারব কিনা জানি না। এবার ক্যারিয়ার শেষ করতে হবে, একথা অনেকদিন ধরে ভাবছি।
'নানা রঙের দিনগুলি' যখন করি তখন ভেবেছি এটাই হয়তো আমার শেষ ছবি। বলতে পার জীবনের শেষ
ছবি করছি ভেবেই এই ছবিটা করেছি। শেষ ছবির সাথে মানুষের একটা আলাদা সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে
থাকে, তা হয়তো বুঝতে পারবে। এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কোনোদিন প্লাগিয়ারিজমের
(plagiarism) অভিযোগ কোনোদিন আসেনি। যদি নজর করে থাকো তাহলে নিশ্চয় দেখেছ যে আমার ছবির
স্ক্রিপ্ট সবসময় আমার নিজের, নিজের করা স্ক্রিপ্ট ছাড়া আমি কাজ করতে পারি না। বিখ্যাত
সাহিত্যিকদের গল্প নিয়ে যখন কাজ করেছি তখনো স্ক্রিপ্ট আমার নিজের। এ ছাড়া আর যা গল্প
নিয়ে কাজ করেছি তা সব আমার নিজের। এই সিনেমাতেও তাই হয়েছে, গল্প এবং স্ক্রিপ্ট আমার
নিজের। কিন্তু স্ট্রেঞ্জ যে তুমি বলছ তোমার স্ক্রিপ্টের সাথে এর হুবহু মিল ।
--- হ্যাঁ, স্যার। সত্যিই বড় আশ্চর্যজনক
মিল। আমার গল্পেও নায়ক একজন পরিশ্রমী এবং আশাবাদী একজন নবীন চিত্রপরিচালক এবং নায়িকা
একজন অনমনীয় এবং নির্ভীক লেখিকা, আপনার সিনেমাতেও তাই। দুজনের পারস্পরিক সম্পর্কের
বর্ণনা দুটো গল্পেই প্রায় একই রকম যে দুজন দুজনকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসলেও দুজনের মধ্যে
ব্যক্তিত্বের সংঘাত অত্যন্ত তীব্র। নিজের নিজের কাজের জায়গায় তারা স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব,
নায়ক যেমন কোনোদিন তারা ভালবাসার মানুষটির গল্প নিয়ে সিনেমা করেনি, নায়িকাও ঠিক কোনোদিন
তার ভালবাসার মানুষটির সিনেমার প্রয়োজনে অর্ডারি গল্প লেখেন। দুটো গল্পেই আছে যে তীব্র
এই ব্যক্তিত্বের সংঘাত কিন্তু তাদের প্রেমে বা পারস্পরিক সম্পর্কে কোনো চিড় ধরাতে পারেনি,
বরং তা তাদের পরষ্পরের প্রতি পরষ্পরের শ্রদ্ধা আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও সে গল্প মিলনান্তক হতে পারল না, কারণ
চিন্তার উৎকর্ষতা যা ব্যক্তিগতভাবে লব্ধ তা কেবল ব্যক্তির সীমার মধ্যেই আটকে থাকল,
প্রয়োজনের মুহূর্তে সাহসী হতে পারল না বাইরে বেরিয়ে এসে সামাজিক সংস্কার বা পারিবারিক
প্রতিষ্ঠার নিম্নবর্তী ভাবনার সাথে প্রকাশ্য সংঘাতে আসার বা তাকে প্রতিহত করার। তাদের
প্রেম কেবল ততক্ষণই সত্য, যতক্ষণ তারা দুজন পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি স্বতন্ত্র সত্তা,
কিন্তু তা দুজনকে এক করতে পারে না । তাদের
প্রেম কেবল বুদ্ধিবৃত্তির গোপন প্রকোষ্ঠে বাঁচে বাড়ে, কঠিন বাস্তবের আবহাওয়ায় নিরাপত্তা
বিঘ্নিত হয় তাদের। তাই তারা যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছাতে পারল না শেষ পর্যন্ত।
সঞ্চিতা হয়তো আরো বলত, কিন্তু থামতে
হল তাকে। হীরেণ সান্যালের আঁতকে ওঠার শব্দ শোনা গেল, "বলো কী? এত স্পষ্ট এইরকম
কিছু তো ছিল না আমার সিনেমায়?" সঞ্চিতা বলল, “না, আপনারটায় ছিল না, আমার স্ক্রিপ্টে
ছিল। ঐ একটি জায়গাতেই কেবল তফাৎ দুটো গল্পে”।
--- “কিন্তু ঐ তফাৎটা খুব সামান্য
তফাৎ নয়, ঐটুকুতেই ছবির থ্রাস্ট বদলে যায়, নতুন আরেকটা ছবির বিষয় হয়ে উঠতে পারে!”
বলতে বলতে নিজের কথার মধ্যেই বোধহয়
কোথাও হারিয়ে গিয়েছিলেন হীরেণ সান্যাল, কিংবা হয়ত নিজের ভিতরে চলতে থাকা কথোপকথনের
শান্তি যাতে বিঘ্নিত না হয় তাই হয়ত চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “অসুবিধা
একটাই, নতুন একটা ছবির সম্ভাবনায় পূর্ণ হলেও, ভেবে দেখলাম কেবল ঐটুকু পার্থক্য সম্বল
করে নতুন আরেকটা ছবি তৈরী করা যায় না। অন্তত এই দেশে যায় না। হেয়ার ইট উড হিট দি ওয়াল
ওনলি। হাউএভার হার্ড দি হিট মে বি, দি ইমপ্যাক্ট
ইজ জিরো। কিন্তু এখন আমি তোমাকে কীভাবে হেল্প করতে পারি বুঝতে পারছি না। তেমার
এই বিশেষ ইন্টারপ্রিটেশনটা ফিমেল ওয়ে অফ ইন্টারপ্রিটেশন, বোধহয় তুমি করেছ বলেই এইরকম
হয়েছে। এটা বাদ দিলে বাকি সবদিক দিয়ে দুটো গল্প একই, সুতরাং দ্বিতীয় আরেকটা ছবি করা
যায় না। তোমার কি কোনো অ্যাম্বিশন ছিল এই স্ক্রিপ্ট নিয়ে? তুমি তো সরে এসেছ ফিল্ম থেকে?”
--- তবু এখনও ভাবি ছবি করার কথা।
জানি না কোনোদিন হয়ে উঠবে কিনা। ভেবেছিলাম আবার কোনোদিন ছবির কাজে ফিরতে পারলে ঐ স্ক্রিপ্ট
নিয়েই করব, কিন্তু তা তো আর হওয়ার নয়। এই গল্পটার উপর বিশেষ একটা দূর্বলতা ছিল আমার।
--- সরি। তুমি হয়তো বিশ্বাস করবে
যে এই স্ক্রিপ্ট আমার লুট করা নয়। তোমার মতো আমারো দূর্বলতা ছিল এই গল্পের উপর। জানি
না তোমার দূর্বলতার পিছনে কোনো স্পেশ্যাল রিজন ছিল কিনা, তবে আমার বেলায় তা ছিল। ফর
মি, এটা গল্প নয়, ঘটনা। আগেই বলেছি যে জীবনের শেষ ছবি করছি জেনে এই ছবিতে হাত দিয়েছিলাম।
সারাজীবন কেবল অন্যের কথা বলে গিয়েছি, কেবল অন্যের জীবনই গুরুত্ব পেয়েছে, আমার নিজের
জীবনের কথা কখনো বলা হয়নি। অস্ত যাওয়ার বেলায় আকাশ রঙীন হয়ে ওঠে, সেই আলোয় সবকিছু রঙীন
দেখায়। আমার নিজের জীবনটাও সেইরকম দেখাল।
তাই এই ছবি করা।
বিষ্ময়াভিভূত সঞ্চিতা আবার উচ্চারণ
করল, স্ট্রেঞ্জ! হীরেণ সান্যাল বলল, ইনডিড। তাই তুমি যেমন খোঁজ করছিলে কে তোমার স্ক্রিপ্ট
রিডিং শুনে গল্পটা জানতে পেরে আমাকে জানিয়েছে, তেমনি আমার এখন খোঁজ করতে ইচ্ছে করছে
যে কেউ এমন আছে কিনা যে আমার জীবনের ঘটনা সব জেনে গল্পটা তোমাকে দিয়েছে স্ক্রিপ্ট করার
জন্য। তোমার এ স্ক্রিপ্টের গল্প কি তোমার নিজের লেখা?
--- না, স্ক্রিপ্ট আমার করা, কিন্তু
গল্প অন্যের।
--- কার লেখা?
--- আমার মায়ের।
--- ওহ্, তোমার মা লেখালেখি করেন?
এটা কি তার কোনো পাবলিশড গল্প?
--- না, এটা আমার জন্যেই লেখা,
আমি ছবি করব বলে। তাই কোথাও ছাপতে দেননি। মা এখন আর তেমন লেখালিখি করেন না, কিন্তু
আগে নিয়মিত লিখতেন। বাবা গত হওয়ার পর মা'র লেখালিখি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। আমি আর
আমার ভাই দুজনেই তখন খুব ছোট, বাবা যখন গত হলেন। নিজের হাড় কালি করে মা আমাদের এতটা
বড় করেছেন। নইলে হয়ত ভেসেই যেতাম।
--- বুঝলাম। তোমার মা কি কখনো বলেছেন
যে কারো মুখে কোনো গল্প শুনে তারপর তা অনুসরণ করে এই গল্পটা লিখেছেন কিনা?
--- না, তেমন কিছু মা'র মুখে শুনিনি।
--- আগে লিখতেন বললে। তখন যদি শুনে
থাকেন তাহলে নাও মনে থাকতে পারে কার কাছ থেকে শুনেছেন। কোনো পাবলিশড রচনা আছে তাঁর?
দেখতাম পড়েছি কিনা, আমাদের যে পড়তে হয় অনেক, তুমি নিশ্চয় জানবে।
--- হ্যাঁ, তা তো পড়তেই হয়। খুব
বেশী পাবলিশড লেখার কথা আমার জানা নেই। বেশীরভাগ লেখাই লিটল ম্যাগাজিনে, সেগুলো সংরক্ষণ
করা হয়নি। উপন্যাস আছে দুটো, 'রাগ ইমন', আর 'কাগজের নৌকা'।
--- কী বললে? কাগজের নৌকা?
সঞ্চিতা কারণ বুঝতে পারল না কেন
অমন অবাক চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন হীরেণ সান্যাল। বেশ কিছুক্ষণ পর আবার জিজ্ঞাসার
সুরে বললেন, 'কাগজের নৌকা’? ঐ নামে একটা উপন্যাস আমি পড়েছি বলে মনে হচ্ছে। যতদূর মনে
পড়ছে সেটাও কোনো মহিলার লেখা। তোমার মায়ের নাম কী? সঞ্চিতা বলল, একই নামের বই আরো
কারো থাকতে পারে, আমার মায়ের নাম সুমিতা রাহা। অমনি লাফিয়ে উঠলেন হীরেণ সান্যাল। কী
বললে? সুমিতা রাহা? ঐটা কি তার বিয়ের আগের পদবী? নাকি বিয়ের পরের পদবী?
--- না, বিয়ের আগের। ঐ নামেই প্রকাশিত
হয়েছিল ঐ বইটা।
--- তাহলে ও বই আমার পড়া। হয়তো
খুঁজলে এখনো পাওয়া যাবে আমার এখানে। যাইহোক, আর প্রশ্ন করব না গল্পটা উনি কারো কাছ
থেকে শুনে লিখেছেন কিনা। আর সে প্রশ্ন আসে না। এই গল্পটা তোমার হাত ফসকে চলে গেল বলে
আর আক্ষেপ কোরো না। আরো অনেক কিছু পড়ে রইল, তোমার মা চাইলে এর চেয়ে আরো অনেক বেশী
টান টান গল্প লিখে দিতে পারবেন। সিনেমা করলে তা এই 'নানা রঙের দিনগুলি'র থেকে মোটেও
খারাপ হবে না।
--- মানে?
--- মানে জেনে কী হবে? মানে না জেনেই নাহয় আমার কথা একটু বিশ্বাস করলে!
তুমি যখন সে ছবিতে হাত দেবে তখন যদি বেঁচে থাকি তখন নিজে নিশ্চয় আমি আর কোনো ছবি করব
না, কিন্তু শরীরের যে অবস্থাই থাকুক না কেন, তোমাকে সাহায্য করার জন্য আবার আমি মাঠে
নামব।
সাক্ষাৎকারে আরো অনেক কথা হয়েছিল।
নিজের ভাবনা চিন্তা, ভুল ত্রুটি, সব কিছু তিনি অর্গল খুলে মুক্ত করে দিয়েছেন সঞ্চিতার
কাছে। চলে আসবার সময় খুব মায়াবী সুরে বলেছিলেন, "চলে যাচ্ছ? আবার এসো কিন্তু!”
বেরিয়ে পড়ার পর পিছন থেকে আবার ডাকলেন। সঞ্চিতা এগিয়ে গেলে বললেন, "ভুল করে পিছু
ডেকে ফেললাম, দুদণ্ড দাঁড়িয়ে যাও”। সঞ্চিতা বলল, "কিছু বলবেন বলেই তো ডেকেছিলেন!”
--- না, তেমন কিছু নয়। ভালো আছে
তো তোমার মা?
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন