![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৭ |
সাইকেলের খেলা
সাইকেল নিয়েই যত ক্যারদারি অভিমন্যুর। তাদের পরিবারে অর্থের অভাব নেই। বাবার বিশাল ব্যবসা কাঠের আসবাবের। বড়দা বাবার সঙ্গেই ব্যবসায় লেগে পড়েছে। মেজদা অবশ্য ব্যবসার ধারেকাছে যায় না। আন্তর্জাতিক এক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মচারী। দুই দিদির বিয়ে হয়েছে খুবই অর্থবান পরিবারে। মোটকথা অভিমন্যুদের পরিবার যে রীতিমতো ধনী পরিবার, তাতে কারও কোনো দ্বিমত নেই। স্বাভাবিক কারণেই তাদের বিশাল বাড়িতে আছে তিন-তিনটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত গাড়ি, একটা গাড়ি বাবা ও দাদা ব্যবহার করে, একটা মেজদার, আর একটা ঘরে থাকে মায়ের প্রয়োজনে। কিন্তু কী আশ্চর্য, সেই পরিবারের অত্যন্ত আদরের কনিষ্ঠ সন্তান হওয়া সত্ত্বেও অভিমন্যু কখনও গাড়িতে চড়ে না। বাড়িতে দুটো বাইক আছে, তা চালায় না। তার নিজের একটা সাইকেল আছে, সেই সাইকেলেই সর্বত্র যায়। অর্থনীতিতে এম এ পাশ করার পর এখন চাটার্ড একাউন্টেন্সি পড়ার কথা ভাবছে।
শুধু সাইকেল চালানো নয়, সাইকেলে অনেক ব্যালান্সের খেলাও দেখাতে পারে অভিমন্যু। সাইকেলের সিটে উলটো হয়ে বসে সাইকেল চালানো, একচাকা শূন্যে তুলে অন্যচাকায় সাইকেল চালানো, সাইকেল চালাতে চালাতে হঠাৎ স্থির হয়ে নিথর সাইকেলে বসে থাকা। এইভাবে সাইকেলে বিভিন্ন ক্যারদারি করতে করতেই মাঝেমাঝে পৌঁছে যায় বহ্নিদের বাড়িতে। বহ্নির নামে যতই উত্তাপ থাক না কেন, মেয়েটা খুবই নরমসরম স্বভাবের। কথা বলে নিচুস্বরে মোলায়েম গলায়। কিন্তু যখনই অভিমন্যু তার কাছে আসে, কেমন যেন হইচই শুরু হয় তার ভেতরে। কখনও বা ভয়ও হয়। বড়লোকের ছেলে তাদের মতো এক ছাপোষা মধ্যবিত্তের ঘরে আসাটা যেন ঠিক নয়, শোভন নয়। অনুযোগও জানিয়েছে, তোর এভাবে হুটহাট আমাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া কিন্তু ঠিক নয়!
-কেন ঠিক নয়?
-তুই এত বড়লোক বাড়ির ছেলে, আর আমরা
নিছকই পাতি মধ্যবিত্ত।
-তা তুই আমাকে কী করতে বলিস? তাহলে
হয় তোরা বড়লোক হয়ে যা এবং আমরা গরীব হয়ে যাই?
অভিমন্যুর কথায় হেসে ফেলে বহ্নি।
-তাতে কী লাভ, পার্থক্যটা তো থেকেই
গেল!
অভিমন্যু বলল, বড়লোক বাড়ির ছেলে
হলেও আমি কিন্তু বড়লোক নই, আমি তো কোনো উপার্জনই করি না! সাইকেল চালিয়ে ফ্যা-ফ্যা ঘুরে
বেড়াই!
বহ্নি বোঝে, সাধারণ বন্ধুত্বের বৃত্ত থেকে তারা যেভাবে একটা স্বতন্ত্র বন্ধুত্বের বৃত্তে অনুপ্রবেশ করেছে, তা অস্বীকার করা যেমন অভিমন্যুর পক্ষে সম্ভব নয়, তেমনি বহ্নির পক্ষেও অসম্ভব। অথচ তা কোনোদিনই মিলনান্তক পরিণতিতে উত্তোরিত হবে না। একটা একটা করে দিন অতিক্রান্ত হচ্ছে, আর সেই ভয়ংকর দিনটি ঘনিয়ে আসছে।
প্রসঙ্গটা তুলতে চাইছিল না অভিমন্যু,
কিন্তু বহ্নি তা টেনে আনল।
-তুই তো জানিস, দিন সাতেক পরেই
চেন্নাইয়ের হাসপাতালে আবার ভর্তি হচ্ছি!
অভিমন্যু চুপ করে থাকল। বহ্নির
মাথায় টিউমার ধরা পড়েছে আগেই। চিকিৎসা চলছে। এবার অপারেশন হবে। তবে সাফল্য কতটা, ডাক্তারবাবুরা
সংশয়ে আছেন। হয়তো বহ্নি আর ফিরে আসবে না!
বহ্নি বলল, যাবার আগে আমার একটা
আবদার আছে।
-কী, বল!
-তোর সাইকেলের খেলা দেখতে চাই অভিমন্যু!
হয়তো শেষবারের মতো!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন