সব মানুষই সেকুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) যদি না অস্বীকার করে
সেকুলার শব্দের অর্থ ঠিক ধর্মনিরপেক্ষ
নয়। তবে ভারতীয় সংবিধান শব্দটি ধর্মনিরপেক্ষ অর্থেই ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ সব ধর্মের
ব্যাপারে রাষ্ট্র নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে। রাষ্ট্র সব ধর্মকে সমান গুরুত্ব দেয়
এবং সমস্ত ধর্মীয় গোষ্ঠীর মানুষের নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার মর্যাদা মেনে নেয়। প্রয়োজনে
রাষ্ট্র তাঁদের পাশে থাকবে এবং জনগণের বিকাশে সাহায্য করবে। লক্ষণীয়, ধর্মের উপরে
মানুষকে সত্য বলা হয়নি। সংবিধান প্রণেতারা
ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্য বুঝতেন এবং জানতেন যে ধর্ম তা সে প্রাতিষ্ঠানিক ও লোকিক
হোক, তা গণজীবনের অংশ। ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রাষ্ট্র ধর্ম থেকে দূরত্ব রক্ষা করে
তত্ত্বগতভাবে। বাস্তব কিন্তু অন্যকথা বলে। আধুনিক রাষ্ট্রভাবনা ইউরোকেন্দ্রিক। অসাধারণ
চিন্তক ফরহাদ মজহার বলেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্ব পুরোপুরি খৃষ্টীয়। এই রাষ্ট্রতত্ত্ব
গোটা পৃথিবীকে গ্রাস করেছে। হিব্রু বৌদ্ধ হিন্দু
ইসলাম সর্বত্র এই আধুনিক খ্রিষ্টীয় রাষ্ট্রতত্ত্ব চলছে অনুকরণের কারণে, ঔপনিবেশিকতার
কারণে।
আসলে সেকুলারিজম হল ইহসর্বস্বতা, জাগতিক লৌকিক ব্যাপার। মন্দির মসজিদ গীর্জা এসবও ইহজাগতিক। ঈশ্বর প্রসঙ্গ থাকলেই তা পারলৌকিক হয়ে যায় না। ঈশ্বর ও রাষ্ট্র মানুষের দুই অপূর্ব অত্যাশ্চর্যান্বিত সৃষ্টি। এবং মানুষসহ যা কিছু জাগতিক ইহলৌকিক তা প্রকৃতিজাত। আমাদের , সমস্ত মানুষের সমাজজীবনে রয়েছে ইহসর্বস্বতা। জগৎ হল এক গতিশীল ব্যাপার। জন্ম(জ) গমন(গ) ও উল্লম্ফন (ৎ) থাকে যাতে তাই জগৎ। যা জন্মায় বিকশিত হয়, পরিণত হয় এবং মরণ পরবর্তী অধ্যায়ে লাফ দেয় তা জগৎ।
জ-গ-ৎ করে বলে এই বিশ্বসংসারের বা তার প্রতিটি সত্তাকে জগৎ শব্দে
চিহ্নিত করা হয়। যা কিছু গমনশীল চরাচরলক্ষণ ভুবন তাই জগৎসংসার। জগৎ কীভাবে সৃষ্টি
হয়েছে তা বাইবেল কোরানে (=< করণীয়?) ও বিভিন্ন পুরাণ লোকপুরাণে তা বর্ণিত হয়েছে।
অবশ্যই ক্রিয়াভিত্তিক ভাষায়।
এমনি সেকুলারিজম বলতে বোঝায়, রাষ্ট্রনীতি শিক্ষা প্রভৃতি ধর্মীয় শাসন হতে মুক্ত থাকা উচিত এমন মতবাদ। আগেই বলেছি বাস্তবে এমন হয় না। খৃষ্টান মিশনারীরা আধুনিক খৃষ্টীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে লেগে থাকে। হিব্রু বৌদ্ধ ও ইসলামী দুনিয়ার দেশগুলি এবং ভারতের জাতীয়তাবাদী ও হিন্দুত্ববাদীরা তা ভালোই লক্ষ করেছে। আর তাই ঐসব ধর্মে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা না থাকলেও তা গ্রহণ করেছে। ওপার বাঙলায় যে ইসলামী জাতীয়তাবাদের শ্লোগান ওঠে এবং এখানে ভারতে হিন্দুত্ববাদী উগ্র জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিরন্তর প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায় তার কারণ এই। তবে ভারতীয় সংবিধানে এর সমর্থন নেই। সংবিধান প্রণেতারা পাশ্চাত্য রাষ্ট্রতত্ত্ব গ্রহণ করলেও সংবিধানের রচনায় অনেক মৌলিকত্বের পরিচয় দিয়েছেন বলা যায়। কারণ ভারত হল বহু জাতি বহু ভাষা ও বহু ধর্মের দেশ। দেশভাগ হওয়ার পর ভারত রাষ্ট্র মিশ্র অর্থনীতির পথে পা বাড়িয়েছিল। অর্থাৎ ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রভাবনার সমন্বয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের পথে যাত্রা করেছিল। যেকারণে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গণতন্ত্র ও একধরনের স্বাধীনতা এদেশের মানুষ সর্বাংশে না হলেও উপভোগ করে গেছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু এখন আর তা নয়। এখন বিশ্বায়নের উন্নয়ন তার ঘাড়ে এসে পড়েছে এবং ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিশ্বায়ন নামক কর্পোরেট ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণবাদী রাজনীতির দ্বারা সর্বাংশে পরিচালিত হচ্ছে। খুব আশ্চর্যজনক ব্যাপার যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নেই অথচ ভোটরাজনীতির খোলনলচে পুরোপুরি ব্যবহার করা হচ্ছে নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন গণশোষণ গণপ্রতারণা ও গণনিপীড়ণ চালানোর চালানোর জন্য। ইতরবিশেষ থাকলেও ভারতীয় উপমহাদেশের ছবিটা একইরকম। ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ও তার রাজনৈতিক শাখা ভারতীয় জনতা পার্টি হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস, নৃতত্ত্ব, পুরাণ, ঐতিহ্যের রাজনীতিকরণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমের অনুশীলন শুরু করে দিয়েছে। এরমধ্যে দ্বিমুখী বিপদ লুকিয়ে আছে।
১) সত্যি সত্যিই ফ্যাসিবাদ কায়েম
হয়ে যেতে পারে।
২) যে বিষয়গুলির আর এস এস ও বিজেপি
রাজনীতিকরণ করে চলেছে সেগুলি একটাও তাদের নয়,
সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্য
সংস্কৃতি সংস্কার ও সুসংস্কৃত উত্তরাধিকার। বিজেপি বাদ দিয়ে অন্য দলগুলি যদি তা গ্রহণ
করে অলরেডি অনেকেই শুরু করে দিয়েছে তাহলে বিজেপি হঠাৎ করে রহস্যজনকভাবে নিশ্চিহ্ন
হয়ে যেতে পারে। কারণ হিন্দুত্ববাদীরা পড়াশোনা পছন্দ করে না , মেয়েদের পছন্দ করে
না , দলিত আদিবাসী উপজাতিদের পছন্দ করে না এবং প্রাচ্যের ইসলামকেও পছন্দ করে না। এসব
বলছি কারণ বৃহত্তর জনসাধারণেরও অপছন্দের অধিকার আছে।
৩) এর বাইরে তৃতীয় একটি বিপদ ঘটতে পারে। এবং সেটা হলেই ভালো। সবাইকে চমকে দিয়ে গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ থেকে এর জন্ম হতে পারে। এর বাইরেও কোনো সম্ভাবনা থাকতে পারে।
আমাদের বক্তব্য যে সব মানুষ সেকুলার বা ইহজাগতিক লৌকিক। সেকুলার শব্দের মূলে গেলে জেনারেশন অর্থ পাওয়া। পুরুষ ও পর্যায় না বুঝলে জেনারেশন বোঝা যায় না। পুরুষ-পরম্পরায় বিশেষ এক স্তর। কর্মচঞ্চল পৃথিবীতে কর্ম ও ক্রিয়ার সবকিছুর মূল। মহাশয় কাজ করে খেতে হয়। কর্মই ধর্ম। ধর্মকর্ম করে বেঁচে থাকতে হয় এই পৃথিবীতে। কর্মের জগৎ ইহজগৎ। বৃত্তিজীবী মানুষদের কথা ভাবুন। বর্ণ আজে ক্লাস আছে কাস্ট আছে কিন্তু বৃত্তিহীন কিছু আছে কি সিস্টেমে? সিস্টেম তো আজকের নয়। এবং উৎপাদন কর্মযজ্ঞই ভুবনের নাভি বা কেন্দ্র। যখন চয়ন ছিল শিকার ছিল তখনও যেমন এখনও তাই। উৎপাদন কর্মযজ্ঞই সব সমস্তকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। সেকুলার না হয়ে যাবেন কোথায়। সার্কেল শব্দের সঙ্গে সেকুলার শব্দের তুলনা করা হয়। বৃত্ত তো সার্কেল এবং তার কেন্দ্র উপেন্দ্র পরিধি থাকে। একটি আবর্তন। পুনরাবর্তনজনিত কর্মের আবহমান জগৎ। কর্পোরেট লুণ্ঠন দস্যুরা সব গোলমাল করে দিচ্ছে। ভয় নেই আবার থিতিয়ে যাবে।
বৃত্ত না থাকলে বৃত্তান্ত জানা
যায় না, সামাজিক কর্মের সঙ্গে দায়বদ্ধ করে লোকে যে মানসলোকের চক্রপথে আবর্তিত হচ্ছে,
বোঝা যায় না। যেমন অনুধাবন করা যায় না যে জীবিকা পেশা চাকরির মূলে মনের শক্তি বা
ধর্ম যাকে ফ্যাকাল্টি বলে। জীবিকাহানি কিন্তু বৃত্তিভঙ্গ।
সেকুলার শব্দের সঙ্গে রেগুলার শব্দেরও
তুলনা করা হয়। নিয়মিত প্রথানুযায়ী অভ্যাস অনুযায়ী কাজ , সময়ের ব্যবধানে নিয়মিত
সংঘটিত। সেকুলার স্টেটকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষ লোকায়ত রাষ্ট্র বানাতে পারি আমাদের দেশকাল
মেনে। তারজন্য পুনর্বিবেচনার পুনরাবিষ্কারের ও পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন আছে আমাদের যা
কিছু। তাই বলছিলাম, মানুষ মাত্রেই সেকুলার যদি সে করেকম্মে খেতে চায় এবং নতুন এক সুন্দর
পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন