কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

গোলাম কিবরিয়া পিনু

 

কবিতা : বাস্তবতা, স্বভাব কবি ও আধুনিক কবি

 


আমরা মনে করি না-- কবিরা নক্ষত্রালোকের বাসিন্দা, তারা দূর নক্ষত্রালোক থেকে আসা কোনো প্রাণী! তারা তো এই সমাজের মানুষ, এই সমাজের মানুষের বোধ, স্বপ্ন-আশা, আকাঙ্ক্ষা, জীবনের দ্বন্দ্ব, মানুষের সভ্য হয়ে ওঠার ক্রমাগত সংগ্রামকেই অন্বেষণ করেন।

শিল্পসৃষ্টি রহস্যময়, তা দূরালোকের কোনো বিষয় নয়, হয়তো কখনো কখনো প্রহেলিকাময়, সবসময়ে তার জট হয়তো খোলা যায় ন, তবু তা মানুষেরই সৃষ্টি। কবিতার তো বিভিন্ন ধরনের ভুমিকা থেকে যায়-- কল্পনা শক্তি বাড়ায়, বোধ জাগ্রত করে, আনন্দ দেয়, মনের বিভিন্ন দিগন্ত প্রসারিত করে, স্বপ্প জাগায়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে টেনে আনে, মননশীলতা ও জীবনী শক্তি বাড়ায়, ইত্যাদি।

কবিতা নিছক আনন্দের বিষয় নয়, চৈতন্যের বহু স্তর উন্মোচিত করে। জীবনের স্ব-স্ব অনুভূতির মধ্যে দিয়ে জীবনের তাৎপর্য উন্মুক্ত করতে পারে কবিতা। কবিতা মানুষকে ভাবায়, ভাবতে শেখায়, জাগিয়ে তোলে, কৌতুহল সৃষ্টি করে। কবিতা সমকালের হয়েও- আগামীকালের ও চিরকালের হয়ে উঠতে পারে। ভালো কবিতার শিল্প-সৌন্দর্য স্বতঃস্ফুর্ত ও আনন্দময় অনুভূতির জন্ম দেয়। কবিরা অগ্রজ্ঞান নিয়ে অগ্রগামী থাকেন। নিছক আত্মসর্বস্বসুখকে গুরুত্ব না দিয়ে জীবনবোধের প্রেষণায় কবিরা কবিতা লেখেন। যা কিছু অনৈতিক, অন্যায়, নৈরাজ্যপূর্ণ ও নেতিবাচক-- তার বিরুদ্ধে এক ধরনের নিজের বিবেচনাবোধ তুলে ধরার জন্য মানুষের কণ্ঠলগ্ন হয়ে কবিরা কবিতা লেখেন। মানুষের চেতনা ও ভাবজগৎ ছুঁয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে তারা কবিতা রচনা করেন। এজন্য নিজেকেও তারা  রূপান্তর করেন-- কবিতাকেও  রূপান্তরিত করেন।

আজকে প্রযুক্তির নজিরবিহীন উন্নতি হয়েছে, সে-কারণে অর্থনৈতিক, সামাজিক, চিকিৎসা, শিক্ষা ও  অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, সেই অনুপাতে মানুষ সভ্য হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে-- কাঙ্ক্ষিতভাবে তার নৈতিকমান উন্নত করেনি। মানুষ সেইভাবে মানবিকও হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতা দূরবর্তী হয়েছে। নারকীয় ও দুর্বৃত্তায়ন প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। সেইসাথে যুদ্ধের বিভিন্ন রকম প্রস্তুতিতে প্রযুক্তি ব্যবহার করে আরও বেপরোয়া হয়ে মানুষের সর্বজনীন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে না এসে  পারমাণবিক যুদ্ধের প্রতিযেগিতায় মেতে উঠেছে।

আমরা জানি, শত বছর আগেও মানুষ এক ভূখণ্ড থেকে আর এক ভূখণ্ডে যোগাযোগহীনতায়, বিচ্ছিন্নতায়, কী দূরবর্তী ছিল! যুগযুগ ধরে, শত শত বছর ধরে, এই বিচ্ছিনতার কারণে অঞ্চলে অঞ্চলে মানুষ বিভক্ত হয়ে ছিল-- কত রকমের ভাষা, ধর্ম, আচরণ ও শাসনপদ্ধতিতে অভ্যস্ত থেকেছে, এযুগে তা আমরা জেনে হতবাক হই।

বিংশ শতাব্দীতে-- পরিবর্তন হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থায়-- রাস্তাঘাট তৈরি হলো, রেল তৈরি হলো, বিদ্যুৎ এলো। আজ বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিক ভাবে মানুষের মধ্যে যাতায়াত বেড়েছে, মেলামেশা বেড়েছে। অভিজ্ঞতার বিনিময় শুধু হচ্ছে না, একই ভূখণ্ডে কত ভাষার মানুষ, কত দেশের মানুষ থিতু হয়ে শুধু জীবননির্বাহ করছে না, যুথবদ্ধ হয়ে বসবাস করছে ঐকসূত্র নিয়ে। পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা জ্ঞানের মূলভিত্তি, তারপরও-- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সুযোগ নিয়ে আজকের সভ্যতা এক বিশেষ জায়গায় দাঁড়িয়েছে।

সমুদ্র ও পর্বতের খবর মানুষের আয়ত্বে, নভোম-লের জ্ঞানও আয়ত্বে। জন্ম-জীবন-মৃত্যুর বিভিন্ন তত্ত্ব আমরা জানছি। কোষ ও জিন তত্ত্ব জানছি। অনুজীব ও অনুজীবের জগৎ সম্পর্কে নতুন অনেককিছু জানছি। ডারউইন, ফ্রয়েড ও কাল মার্কস, বিবতর্নবাদ, বস্তুবাদ, মনস্তত্ত্ব আজ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে। আইনস্টাইনের কোয়ান্টাম থিওরি ও থিওরি অফ রিলেটিভিটি, হকিং-এর বিগব্যাং থিওরিও জানছি। উদ্ভিদবিদ্যা ও চিকিৎসাবিদ্যার বিকাশ হয়েছে বেশ। এসময়ে-- বিজ্ঞানের বিশাল সমৃদ্ধি, প্রযুক্তি বিদ্যারও অকল্পনীয় সাফল্য এসেছে। আমরা জানি,  এখনকার সময়-- দুটি বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়।

মানুষ আধুনিক জীবনযাপন করছে-- ধর্মের বাইরে থেকে-- বিদ্যুৎ নিচ্ছে, শিক্ষা নিচ্ছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিচ্ছে কিন্তু এসবই ধর্মের ঊর্ধ্বে। কিন্তু মানুষকে ধর্মে ধর্মে খণ্ডিত করছি। অহংবোধ, ক্ষমতার দর্প, সংকীর্ণ চিন্তাধারা, ধর্মান্ধতা, জঙ্গীবাদ, কুপমন্ডুকতা-কুসংস্কার ও পরমত অসহিষ্ণুতা--আমাদের সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে বাধাগ্রস্ত করছে। যুক্তিবাদী ও মানবিক হওয়া জরুরি। যা ভালো তা সবার জন্য ভালো হওয়া উচিত।

মানুষ নতুনকে গ্রহণ করছে--পুরনোকে বর্জন করে এগুচ্ছে। নতুন সমস্যা সমাধানে নতুন নতুন সমাধানের পথ খুঁজছে। জন্ম, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, আবাস, যোগ্যতা প্রভৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও মানুষ এক অভিন্ন হয়ে উৎকৃষ্ট মানবিক গুণের অধিকারী হয়ে সভ্যতা এগিয়ে নিয়ে যেতে আজ বদ্ধপরিকর। একসাথে বাঁচা, সুষমভাবে বাঁচা, মানবিক ও যুক্তযুক্তভাবে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-স্থানের ঊর্ধ্বে থেকে বাঁচা; আজকের মানুষের আরও সভ্য হয়ে ওঠার জন্য পরিপূরক ও জরুরি বিষয়।

আজ তো স্বভাব কবির যুগ নয়, যারা স্বভাব কবি, তাঁরা সবসময়ে অস্থির, তাঁদের নেই গভীর পঠনপাঠন, নেই আধুনিক জীবন-দৃষ্টিভঙ্গি, নেই সমাজ নিয়ে বিস্তৃত অভিজ্ঞতা, নেই বৈজ্ঞানিক স্বচ্ছ ধারণা ও সভ্যতার প্রতি মনোযোগ। তাঁরা  ভাবেন কবির ক্ষমতা অলৌকিক! এখনকার যুগ--স্বভাব কবির যুগ নয় বলে আমরা মনে করি।

‘ছিলো এক সময়, যখন কবিতা হয়ে উঠেছিলো গোলকধাঁধার রহস্যলহরী, অধ্যাত্মিকতার ধরি মাছ--না-ছুঁই পানি গোছের অস্পষ্ট জবুথবু উচ্চারণ, মানুষের সমাজ থেকে একশো হাত দূরে স’রে গিয়ে গিয়ে এক দুর্ভেদ্য প্রহেলিকা, তখন থেকে কবিতার পাঠক গিয়েছিলো ক’মে।’--বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, দেশ, ১৭ জুন ২০১৮

‘কবিতা, কল্পনালতায় আমি বিশ্বাস করি না। যার সঙ্গে আমার সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি, অর্থাৎ চোখ-কান-স্পর্শ কি ঘ্রাণেনিদ্রয়ের যোগাযোগ তৈরি হয়নি তাকে নিয়ে আমি লিখতে পারি না। আমি এমন কোনো মানুষের মুখ আঁকবার চেষ্টা করিনি যা আমার মাথা থেকে বেরিয়েছি। আমি শুধু আমার সামনে যে লোকটাকে দেখছি, তার মুখটাকেই ধরবার চেষ্টা করছি। সে ছাড়া আর কেউ আমাকে নাড়া দিতে পারে না।’--নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কালি ও কলম, পৃষ্ঠা ৮৭, চৈত্র ১৪২৫

‘একজন বড় কবি এবং ছোট কবির মধ্যে ঈৎধভসধহংযরঢ় ব ঝশরষ এ তফাৎ হয় না। তফাতটা হচ্ছে অভিজ্ঞতার বিভিন্ন শেকড় বা রেঞ্জকে কতখানি স্পর্শ করেছে।’ ‘কোনো কোনো কবির প্রয়োজন হয় একটা ভালো কবিতা লেখার আগে দশটা মাঝারি কবিতা লেখা’-- শহীদ কাদরী, তাঁর সাক্ষাৎকার, ভোরের কাগজ, ১৩.৮.২০০৪

মোটা দাগে আমরা বলতে পারি কবিতায় আবেগ, অনুভূতি, কল্পনা, বিশেষ পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা, ছন্দ ও বিবিধ অলংকার থাকে। কবিতার চারিত্র্য বিভিন্নমুখী হয়ে থাকে, অর্ন্তমুখীও হতে পারে, বহির্মুখীও হতে পারে। কবিতা গদ্যের মত স্পষ্ট  হতে পারে, নাও হতে পারে। কবিতায় একটিমাত্র অর্থ খোজা সমীচীন নয়, একই কবিতার বহু অর্থ, বহু রকমের দ্যোতনা থাকতে পারে। কবিতায় ইঙ্গিত থাকবে-- চিন্তা, কল্পনার বহুবিধ দিগন্তও থাকবে। একটি কবিতার অনুভব ও ব্যাখ্যা--বিভিন্ন রকমের পাঠকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন হয়-- রুচি, শিক্ষা ও অন্যান্য সামাজিক অবস্থানের কারণে।

শিল্প বা কবিতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেই পুরনো তিনটি জিজ্ঞাসা এখনো গুরুত্বপূর্ণ, এক ধরনের দিশা খুঁজতে সাহায্য করে।

১. কী ভাবলাম?

২. কেমন করে বললাম?

৩. আর কেন বললাম?

আমরা জানি, শিল্পসৃষ্টিকে অনুভব করেন-- ভোক্তা, শিল্পের সাথে ভোক্তার যোগসূত্র তৈরি হয়, সেই শিল্পবোধে তিনি কবিতাকে গ্রহণ করেন।

শিল্প বা রচনার ভিত্তিমূলে থাকে-- আঙ্গিক ও ভাষাশৈলী, থাকে ভাববস্তুর গভীরতা ও শিল্পের অন্যান্য সৌকর্য। থাকে লেখক ও শিল্পীর নিজস্ব সৃজনশীলতা।

বার্নাড শা’র কাছে প্রশ্ন ছিল, সাহিত্যে কন্টেনের গুরুত্ব বেশি, না ফর্মের? তিনি বলেছেন-- ‘সাইকেলের আগের চাকার গুরুত্ব বেশি না, পিছনের চাকার?’

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন