কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

দীপক সেনগুপ্ত

 

সমকালীন ছোটগল্প


সতী সাবিত্রীর পেনড্রাইভ

আমার ফ্ল্যাটটা এই আবাসনের তিন নম্বর টাওয়ারের ১৭ তলায়। এর ওপরেই ছাদ। তবে আমার ফ্ল্যাটের ঠিক ওপরে ছাদে একটা সুইমিং পুল আছে। তাই সর্বোচ্চ তলায় হলেও আমার ফ্ল্যাটটা গ্রীষ্মের দিনে গরম হয় না। আমরা মিয়া বিবি এই ফ্ল্যাটে সুখেই থাকি। উঁচু বলে পলিউশন কম। লিফট আছে। এখনও পর্যন্ত সেটা একদিনও বিকল হয়নি। আমাদের আবাসনের 'সার্ভিসেস ও ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনে’র ভরসা দেওয়া আছে। কোনোদিন সেটা বিকল হলে সেপারেট জেনেরেটর দিয়ে লিফ্ট চালু করে দেওয়া হবে। তাছাড়া এটা খুব বড়ো নামি কোম্পানির লিফ্ট। তাদের সুদক্ষ ট্রাবলস্যুটার বাহিনী ঝটপট রিপেয়ার করে দেয়। এজন্য তাদের সাথে AMC করা আছে। অবশ্যই তার আর্থিক বোঝাটা আবাসনের সবাইকে ভাগ করে নিতে হয়েছে। এখন আধুনিক সুখ সুবিধের যুগ। তবে সেজন্য ফেল কড়ি মাখো তেল। যেমন তেল তেমন কড়ি। তাই আমাদের এ বড়ো সুখের সংসার। এই সুখের সংসারে একদিন হঠাৎ অসুখ এসে আক্রমণ করলো। সেটাই আজকের কাহিনী।

সেদিন আমি আর গিন্নী একটু আগে ঝগড়া করেছি। ঝগড়ার বিষয় টিভিতে কী চলবে? খেলা না সিরিয়াল? সে ঝগড়ার ফলশ্রুতিতে এখন টিভি বন্ধ। উনি বিছানায় আমি সোফাতে। এমন সময় ডোরবেল বাজলো।

একটা মিষ্টি মধুর সুরের ডোরবেল হোক আমরা দুজনেই চেয়েছি। সুরের ব্যাপারে সহমত হবার চেষ্টা চলছে। আপাতত তাই বিল্ডারের দেওয়া সেই পুরনো ঢং ঢং টাই চলছে। ডেলিভারি বয়রা ঢং করে বাজায়। আজ কিন্তু ঢং হয়েই থামলো না। হলো ঢং ঢং ঢং ঢং। অধৈর্য চিৎকার। আমি সোফা থেকে লাফিয়ে ওঠে দরজার সামনে চলে গেলাম। ম্যাজিক আই দিয়ে দেখলাম পুলিশের উর্দির অংশ। দরজায় আমার উপস্থিতি টের পেয়ে বাইরে থেকে গর্জন এলো-

- ওপেন দ্যা ডোর!

ভয়ে ভয়ে দরজা খুললাম। টের পেলাম আমার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আমার গিন্নী।

- জুতা খোলকে ঘুসিয়ে।

আমার গিন্নীর নাম সরোজিনী। তিনি পুলিশের ভয়ে ভীতা নন।

একজন পুলিশ নির্দেশটি মেনে জুতো খুলে ঘরে ঢুকলো। বাকি কয়েকজন বাইরেই থেকে গেল।

- আপলোগো কা বগলবালা ফ্ল্যাট মে কৌন রহতি হ্যায়?

- নহি মালুম।

আমার কথা ফুরানোর আগেই সরোজিনী উবাচ - উনকো নহি হামকো মালুম হ্যায়। বঁহা সাবিত্রী রহতি হ্যায়।

- ফুলনেম?

- নিচে নেমপ্লেট মে লিখ্খা হ্যায় তো!

এটা বল্লাম আমি। সরজিনীর সঙ্গদোষে, না না সঙ্গদোষে নয় সঙ্গগুণে আমারও সাহস বেড়েছে।

- ইজ শি এ টেরোরিস্ট?

এই প্রশ্নে আবার আমার সেই সাহস পৌঁছে গেল তলানিতে।

- টেররিস্ট কেন হবে? আমার তো ভালো মেয়ে বলেই মনে হয়েছে। এখানে যে সব মেয়েরা থাকে তাদের থেকে অনেক সভ্য ভব্য।

সরোজিনী হিন্দি ছেড়ে বাংলায় এসে গেছে।

- ও আপলোগ বেঙ্গলি হ্যায়! কলকাতাকে লোগ?

- না না কলকাতা নয় ঝাড়গ্রাম। মেদিনীপুর ডিসট্রিক।

বলে লাভ নেই। এদের কাছে গোটা বাংলাই কলকাতা। অনেক সময় বাংলাদেশ।

- চলিয়ে।

- কাঁহা?

- বগলকে ফ্ল্যাট মে। লড়কি দেখনে।

বলে কি! সেই কতো বছর আগে লড়কি দেখতে মানে মেয়ে দেখতে গেছিলাম। সে তো বিয়ের জন্য। তাতেই তো সরোজিনী এলো জীবনে। এখন আবার কেমন লড়কি দেখা? তবু যেতে হলো। আমার পরনে লুঙ্গি ফতুয়া। গিন্নীর ম্যাক্সি। ওই পোষাকেই চললাম লড়কি দেখতে। চলা মানে দু পা মাত্র। যেটা সবসময় বন্ধ থাকতো সেই দরজাটাই এখন হাট করে খোলা। সেখানে অনেক পুলিশ দাঁড়িয়ে এবং কয়েকজন সোফায় বসে। এবং একটি চেয়ারে বসে সাবিত্রী। তার হাতে হাতকড়া।

- হ্যাঁ। এই তো সাবিত্রী হ্যায়।

- ঠিক সে দেখিয়ে?

- ঠিক সেই দেখা হ্যায়।

সাবিত্রীকে দেখে মনে হলো না যে সে খুব বিচলিত। শান্ত হয়ে বসে আছে। আমাদের সঙ্গে চোখাচোখি হতে  চোখদুটো ঝলমল করে উঠলো। মানে আমার তেমনটাই মনে হলো। ওর পরনে একটা খাটো হাফ প্যান্ট। আর গায়ে ঢলঢলে টি শার্ট। যাদের ক্যাজুয়াল টপ বলে।

সরোজিনীর কাছে শুনেছি একবার অনলাইনে একসাথে হাফ ডজন এরকম ধরনের পোশাক কিনে সাবিত্রী সরোজিনীকে গছাতে এসেছিল।

- নো প্রব্লেম আন্টি। ইউ ক্যান ওয়ার দিস। ভেরি কম্ফরটেবল। এন্ড নো নিড টু পে। ইটস গিফট্ ফ্রম মাই সাইড। টেক ইট।

সরোজিনী নিতে রাজি হয়নি, কিন্তু মনে মনে এই অফারটাতে খুব খুশি হয়েছিল। মানুষের খুশি হবার কোনো নির্ধারিত নিয়ম কানুন নেই। অনেক সময় মানুষ পেয়েও খুশি হয় না। কখনো খুশি হয় কিছু না পেয়েই।

আমরা যখন দোরের বাইরে তখন একজন অল্প বয়েসের পুলিশ হেসে এগিয়ে এলো-

- আপনারা বাঙ্গালি? আমিও।

- ও প্লেন ড্রেসের পুলিশ।

- আরে না না আমি আই টি স্পেশালিস্ট। পুলিশ আমাকে প্রয়োজনে হায়ার করে।

- ও!

- আচ্ছা এ ঘরের দেওয়ালে একটা বাংলা ক্যালেন্ডার আছে। সাবিত্রী কি বাংলা জানতো?

- আরে না না। ওটা আমার। মানে আমার জন্য জোগাড় করেছিল মেয়েটা।

- তাহলে আপনি ওটা নিতেই পারেন। আমি ডি এস পি সাহেবের কাছ থেকে পার্মিশন করিয়ে দিচ্ছি।

- না না। তার কোনো দরকার নেই।

- তা কেন! আপনার জিনিস আপনি নেবেন এতে দোষের কি আছে?

ছেলেটি ডি এস পি সাহেবের থেকে পার্মিশন করিয়ে ক্যালেন্ডারটা সরোজিনীর হাতে গুঁজে দিল। আমরা মনে ভয় আর হাতে ক্যালেন্ডার নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। ভালো করে দরজা এঁটে দিয়ে সরোজিনী হঠাৎ গলা নামিয়ে বললো-

- ওগো দেখো তো, ওই খোকা পুলিশ মানে ছোঁড়াটা ক্যালেন্ডারের সাথে সাথে এটা কি গুঁজে দিয়েছে আমার হাতে?

দেখলাম সেটা একটা ছোটো সাইজের পেনড্রাইভ।

- এ তো পেনড্রাইভ। কম্পিউটারের জিনিস।

- এটা নিয়ে আমরা কী করবো? খোকা পুলিশ এটা আমাকে দিল কেন?

- সে তোমার খোকা পুলিশই জানে।

- তুমিও তো কম্পিউটার চালাতে জানো। একটা ল্যাপটপ তো তোমারও আছে। আলমারিতে পড়ে পড়ে ধূলো খাচ্ছে। সেটাতে এই পেনটা চলবে না?

গিন্নী ড্রাইভ বাদ দিয়ে দিলেন।

- চলতে পারে। কিন্তু সেটা চেক করতে হলে আগে আমার ল্যাপটপটাকে জ্যান্ত করতে হবে।

- জ্যান্ত?

- ঐ চার্জ দিতে হবে আর কী!

- তাই দাও। ও পেনে কী আছে আমি দেখবো।

- দেখবো তো আমিও।

কৌতুহল আমারও কম নয়।

চার্জ টার্জ দিয়ে ল্যাপটপটাকে সচল করতে রাত হয়ে গেল। আজ খেলা, সিরিয়াল দুইই স্থগিত থাকলো। আমরা ল্যাপটপে পেনড্রাইভ গুঁজে তাই দেখতে থাকলাম। একটু পরেই ল্যাপটপের স্ক্রিনে যা সব দৃশ্য ফুটে উঠলো, দেখে চমকে গেলাম। অশ্লীল দৃশ্য সব। সরোজিনী ছি ছি করে উঠলো।

- আরে রামো রামো। আমি আবার মেয়েটাকে সতী সাবিত্রী ভাবতাম।

- দেখলে তো। ফুলহাতা কামিজ আর গোড়ালি পর্যন্ত ঝুল সালোয়ার পরলেই সে ধোয়া তুলসী পাতা নয়।

- হুঁ। কিন্তু মেয়েটার ছবি তো ওখানে নেই।

- তাতে কি। পেন ড্রাইভটা তো ওর। কিম্বা পরের কোনো ভিডিও তে হয়তো মেয়েটাও আছে। মেয়েটা মানে তোমার সতী সাবিত্রী!

- সাবিত্রী নির্ঘাত ওর ছদ্মনাম।

- হতে পারে। তবে মেয়েটা মনে হয় টেররিস্ট নয়। কলগার্ল হবে।

- পুলিশ তো টেররিস্টই বললো।

- তোমার খোকা পুলিশ তো তা বলেনি, সে মনে হয় টের পেয়েছিল এই পেনড্রাইভে কী আছে। তাই...

- তাই আমাদের দিয়েছিল?

- আমাদের রাখতে দিয়েছে। সুযোগ বুঝে এসে নিয়ে যাবে।

- আসুক নিতে। দেখাচ্ছি মজা।

সরোজিনী আবার সরোজিনী মেজাজে ফিরে গেছেন।

- ফেরত দেবে না ঠিক করেছো? আমরা বুড়ো বুড়ি তে ওসব দেখবো। মাঝে মাঝে মজা করে।

- মরন।

আমার অনুমান সত্যি করে খোকা পুলিশ পরদিনই হাজির হয়ে গেল। আজ আরো বেশি প্লেইন ড্রেসে।

চট করে ঘরে ঢুকে সে হাত পাতলো।

- আমার জিনিসটি।

- তোমার ঐ নোংরা ছবির পেন। দেবো না আমরা উল্টে পুলিশের ওপর তলায় কমপ্লেন করবো।

মুচকি হেসে খোকা পুলিশ বললো-

- তাতে কি কিছু লাভ হবে? ওরা তো হন্যে হয়ে ওটাই খুঁজছে। পেলেই নষ্ট করে দেবে।

- কেন?

- মেয়েটা টেররিস্ট নয়। ইনভেস্টিগেটিং জার্নালিস্ট। খোঁজি পত্রকার। গোয়েন্দা সাংবাদিক বলতে পারেন। স্টিং অপারেশন করে সমাজের ওপরতলার ক্ষমতাশালীদের কুকীর্তি খুঁজে বের করা ওর কাজ। এই নোংরা ভিডিওগুলোতে সমাজের তা বড়ো তা বড়ো হস্তীদের কুকীর্তি রেকর্ডেড আছে। যা প্রকাশ্যে এলে ধুন্ধুমার কান্ড ঘটে যাবে। তাই তড়িঘড়ি এতো তৎপরতায় মেয়েটাকে টেররিস্ট তকমা লাগিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে।

- ও ঐ এপস্টেইন ফাইলের মতো।

- ঠিক বলেছেন আঙ্কেল। আপনি তো বেশ খবর রাখেন!

- তা রাখেন। ওর তো ঐ খবর আর খেলা।

তারপর আমাকে ছেড়ে সরোজিনী খোকা পুলিশকে নিয়ে পড়লো।

- তুমি নিজে বাপু কে? আমরা তো ভাবলাম তুমিও ওদের দলে।

খোকা পুলিশ মুচকি হাসি দিয়েই জবাবটা দিয়ে দিল।

- আমি ওদের হাত থেকে বাঁচতেই ওটা আপনার হাতে গুঁজে দিয়েছিলাম।

- হ্যাঁ খোকা পু ...

ঢোক গিলে শব্দটা আটকে দিয়ে সরোজিনী বললে-

- বেলের শরবত খাবে বাবা। এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি।

- না না। আন্টি। আসবো আরেক দিন। আজ যাই।

খোকা পুলিশ চলে গেল পেনড্রাইভটা পকেটে গুঁজে।

- শোনো সরো। তুমি কি ভাবলে তোমার ঐ খোকা পুলিশ যা বলে গেল সব সত্যি?

- আমি না তুমি সরো। সে সব সত্যিই তো!

- কী করে জানলে?

- সিরিয়িল দেখা ব্রেইন আমার। ঠিক বুঝতে পারি। তুমি শুধু খেলা দেখো। খেলাই দেখে যাও।

- তুমি তো ভালো করে খেলা দেখতেই দিলে না!

- মরণ। শোনো, কাল আমি সকাল সকাল মন্দিরে যাবো। তুমিও যাবে। সকালে উঠে স্নান করে নিও।

- কেন? নোংরা ভিডিও দেখার পাপ থেকে মুক্তি পেতে?

- না এই সতী সাবিত্রী ভালো মেয়েটি যাতে মুক্তি পায় সেজন্য। আর নোংরা লোকেরা কঠিন সাজা পায় সে জন্যেও। আমরা যাবো ঠাকুরকে সেই প্রার্থনা জানাতে।

- ওকে বস।

মুখে বললাম বটে, তবে জানি না সরোজিনীর ঠাকুরের সে ক্ষমতা আছে কি না! কেননা ন্যায়ের ঈশ্বর এখন যথেষ্টই দুর্বল এবং ক্ষমতার কুক্ষিগত।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন