কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

প্রীতম সেনগুপ্ত

 

সমকালীন ছোটগল্প


এক বিশ্বাসঘাতক ও দুই বর্ষার রাত

স্টুডেন্ট পড়িয়ে বাড়ি ফিরছিল অনীশ রাত সাড়ে আটটা মতো বাজে। টালিগঞ্জ ফাঁড়ির মোড়ে দাঁড়িয়ে, বৈষ্ণবঘাটার মিনি ধরে বাড়ি ফিরবে। এদিকে আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে বৃষ্টি এল বলে ফাঁড়ি অঞ্চলের একটি বাড়িতে চারজন পড়ে ওঁর কাছে --- মাধ্যমিক সায়েন্স গ্রুপ, নাইন-টেনের ছাত্রঅনীশ লম্বা ছিপছিপে, সুদর্শন ফাঁড়ির মোড়ে একটা স্টেশনারি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ইতিমধ্যে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে হঠাৎই এক কৃষ্ণাঙ্গী স্বাস্থ্যবতী মেয়ে ওঁর পাশে এসে  দাঁড়িয়ে পড়ল স্টেশনারি দোকানের শেডের তলায়বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে শুধু দাঁড়ালোই না, অনীশকে  সরাসরি তুমি করে সম্বোধন করে বলেই ফেলল, কী এমন বৃষ্টি পড়ছে যে দাঁড়িয়ে আছ? এই প্রগলভা নারীর কথায় বেশ অবাক হল অনীশ, অস্বস্তিও অনুভব করল সে আরও বলল, হাতে তো ছাতা আছে দেখছি, চল আমাকে একটু এগিয়ে দেবে? ফাঁড়ির সামনে যেখানে ওরা দাঁড়িয়ে আছে সেই জায়গাটার নাম ঘড়িঘর খুব পুরনো এলাকাএকটা গলির মধ্যে ঢুকে গেছে রাস্তাটা। এসব এলাকা অনীশের সবই চেনামেয়েটি অনীশেরই বয়সি হবে পঁচিশ-ছাব্বিশচেহারায় ভরপুর যৌবন, তবে অশিক্ষিত শ্রমিক বা কাজের  লোক শ্রেণির বলেই মনে হয়। সেইজন্যই হয়তো এত অসংকোচে কথা বলতে পারছে, শুরু থেকে ’তুমি’ সম্বোধন করছে। তথাকথিত শিক্ষা, ভ্রান্ত শ্রেণিভাবনা আমাদের মধ্যে অনেক সংকোচ এনে দেয়, যা স্বতঃস্ফূর্ততারোধীও বলা যেতে পারেইতিমধ্যে অনীশ ছাতা খুলে ফেলেছে প্রবল বর্ষণ শুরু হয়েছে দোকানের শেডে আর বামানছে নাওই মেয়েটি ও অনীশ দুজনেই ভিজছেছাতা খুলেও বিশেষ লাভ হল না তবু ছাতা খুলল এবং ভিজতে থাকল অনীশের বাসেরও পাত্তা নেই মেয়েটি অনীশের ছাতার তলায় নিঃসংকোচে চলে এসেছেকোনও জড়তা নেই শাড়ি, ব্লাউজ ভিজে গেছে উঁকি দিচ্ছে ভরাট  যৌবন অনীশের নজরে পড়ামাত্রই সে আর উপেক্ষা করতে পারে না তাঁর মনে হয় রাঢ়বঙ্গে পুরুলিয়ার মুরগুমার কোনও ছোট্ট টিলার ধারে শাল পলাশের জঙ্গলে এক উচ্ছল যুবতীর সঙ্গে প্রবল বর্ষণে বৃষ্টিস্নাত হচ্ছেমেয়েটি অনীশের হাত ধরে টেনে বলে -- চল এগোই, এমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজে লাভ কী? অনীশ কিছু বলে না, সে যেন তাঁর মধ্যে নেই! যন্ত্রের মতো হাঁটতে থাকে মেয়েটির সঙ্গে। মেয়েটি যেন ওকে সম্মোহিত করেছে! সে হেঁটে চলে মেয়েটি যেদিকে যায় সেদিকেবৃষ্টি ভেজা এক নারী শরীর তার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে, উন্নত স্তন অনীশের কনুইয়ে বারবার এসে ঠেকছে, শরীরে রক্ত কণিকাগুলি যেন দামাল হয়ে উঠেছে  হাঁটতে হাঁটতে ওরা লেক গার্ডেন্স স্টেশনের কাছাকাছি চলে এল, যে পাশটা তেলের গোডাউন ছিল তার পাশের নির্জন রাস্তা দিয়ে হাঁটছেমেয়েটি কোথায় নিয়ে যেতে চায় তাকে! সারা রাস্তা কেউ কোনকথা বলছে না, হেঁটে চলেছেঅনীশ হঠাৎই মেয়েটির কোমর জড়িয়ে ধরে বল ল, চল স্টেশনে গিয়ে বসি।’ মেয়েটি মাথা নাড়ে স্টেশনে গিয়ে বসল তারা স্টেশন শুনশানবৃষ্টি প্রায় বন্ধ   হয়ে গেছে একেবারে ভিজে চুপসে গেছে দুজনে অনীশের মনে হয় তাঁর পাশে বসে আছে এক মহঞ্জোদারো সুন্দরী সে মেয়েটির হাত নিজের হাতে নিয়ে দেখে সেই রকমই মোটা ধাতব বালা তার হাতে! এরপর চায় মুখের দিকেঅনীশের চোখে কি কোনও আকুতি ছিল? নিজের পুরুষ্টু দুই ঠোঁট মেয়েটি জিভ দিয়ে চাটতে থাকেনির্জন স্টেশনে ওই দুই ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় অনীশ দুজনের জিহ্বাও তৈরি করে অপরূপ ঘনিষ্ঠতা এমন সময় আবার শুরু হয় প্রবল বর্ষণ। ওরা স্টেশনে খোলা জায়গায় একটা কালভার্টে বসেছিল প্রবল বর্ষণে চারিপাশ ঝাপসাক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বজ্রের ভয়ঙ্কর নির্ঘোষসেসব গৌণ হয়ে গেল ক্রমশ পোশাকমুক্ত হল দুজনে এমতাবস্থায় সহবাসে লিপ্ত হল বৃষ্টিস্নাত সহবাস ক্লান্ত হয়ে  মেয়েটি যখন এলিয়ে পড়ল অনীশের বুকে, অনীশ জিজ্ঞাসা কর, তোমার নাম কী? উত্তর এল -- জাহ্নবীআরও বলল, কাল কখন কোথায় আসবে বলে দাও, আমি আসব‌। অনীশ বিন্দুমাত্র না ভেবে বলল --- মেনকা সিনেমা হলের সামনে

রাতে বাড়িতে ফিরে এসে দ্রুত বাথরুমে ঢুকতেই হল এমনিতেই ভিজে এক সা হয়ে গিয়েছেস্নান সেরে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ল যখন তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে পরদিন সকাল থেকে মনটা উশখুশ করছেঅনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে মানসিকভাবে কিন্তু আকস্মিক ঘটে যাওয়া ঘটনাটার কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় করতে পারছে না অনীশ জানে সে যথেষ্ট সংযত মানুষ, চট করে আবেগের বশবর্তী হয়ে কিছু করে ফেলাটা তাঁর স্বভাব নয়। তবু এই কাণ্ডটাই ঘটেছে কাল রাতে! যে মেয়েটির সঙ্গে ঘটেছে সে বেশ নিম্ন শ্রেণির বলেই মনে হয়। তবু ভিতর ভিতর একটা উত্তেজনা বিকেলবেলা মেনকা সিনেমা হলে সামনে অপেক্ষা করবে বলে দিয়েছে মেয়েটিকে এই বিষয়টি আর বেশি না এগোনোই ভালো এমন ভাবনা তাঁকে প্লাবিত করে দিচ্ছে মেয়েটি তার বাড়িঘর চেনে না, সুতরাং বাড়ি অবধি চলে আসবে এমন ভয়ও নেই সুতরাং এখানেই ফুলস্টপ তবু তাঁকে যেন উপেক্ষা করতে পারছে না

বিকেল পাঁচটার সময় মেনকা সিনেমা হলের সামনে গিয়ে হাজির হল অনীশ মেয়েটি তখনও আসেনি এমন আকস্মিক পরিচয়, কোথায়  থাকে কী বৃত্তান্ত কিছুই জানা হয়নি আসলে দুজনের কেউই ব্যাপারটা নিয়ে বিশেষ আগ্রহী ছিল নাআধঘন্টা হয়ে গেল অপেক্ষা করছে বেশ বিরক্ত হয়ে উঠছে ধৈর্য বাঁধ মানছে না চলে যাবে কিনা ভাবছে, এমন সময় দেখল সেই মেয়েটি উচ্ছল  যৌবনকে সঙ্গে নিয়ে লেকের ভিতরের রাস্তা দিয়ে যেন ভেসে আসছে তাঁর দিকে নাওমি ক্যাম্পবেলের বাঙালি সংস্করণ? পুরোটা না হলেও অনেকটাই তাই উচ্চতা অবশ্য মাঝারি তবু অনেকটা যেন যেন নাওমির সঙ্গে মিল আছে। যদিও নিম্নশ্রেণি থেকে উঠে আসা এক যুবতী এটা নিশ্চিত নিম্ন শ্রেণি বলতে শিক্ষা বা অর্থ কোনও কিছুই সম্বল নেই এই মেয়ের দ্রুত তাঁর কাছে এসে বলল -- কখন এসেছ? দেরি হয়ে গেল।’ অনীশ মিথ্যে বলল --- না না এই তো সবে এসেছি।’ ওরা কালীঘাট মেট্রো স্টেশনে এসে পৌঁছল হেঁটে সাদার্ন এভিনিউ ধরে হেঁটে মেয়েটি বলল -- কেমন লাগছে আমাকে? একদম সাজা হয়নি। এত তাড়াতাড়ি ভালো করে সাজতে পারিনি।’ ঠোঁটে বেশ গাঢ় লিপস্টিক, পরনে সাদার উপর প্রিন্ট করা সস্তা সিন্থেটিক শাড়িভালোই লাগছে অনীশ ভাবল এই মেয়ের সহজাত উচ্ছল যৌবনই ওর টিআরপি সাজলেও চলে, না সাজলেও চলে কত দামি পোশাক পরল, কিংবা কত সাধারণ স্তা পোশাক পরল তাতে কিছু এসে যায় না। সে বলল, ভালোই তো বেশ লাগছে।’ ওরা পার্ক স্ট্রিটে নামল, সেখান থেকে ধরল ময়দান ময়দানে তখন আলো-আঁধারি একটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা জায়গায় বসে পড়ল দুজনে একথা সেকথার পর দুজনেই ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে আলিঙ্গনাবদ্ধ হল মেয়েটি আরামের আবেশে মুখ দিয়ে শব্দ করছে অনীশের চওড়া কাঁধে খামচে ধরে আছে অনীশ নিষ্পেষণ করতে থাকল ওর কোমল শরীরইতিমধ্যে একটি পুলিশের লোক এসে তাড়া দিল -- এ্যাই কেয়া হো রহা হ্যায়? ভাগো হিঁয়াসে।’ ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো লোকটার দিকে এগিয়ে গেল জাহ্নবী তুম ভাগো হিঁয়াসে।’ রীতিমতো ঘাবড়ে গেল লাঠিধারী ভুঁড়িওয়ালা মধ্য বয়সি পুলিশকর্মীটিজাহ্নবীর রুদ্রাণী রূপে পিছু হটল। বেশ মজা পাচ্ছিল অনীশ পুলিশ চলে যাওয়ার পর জাহ্নবীর হাত ধরে উঠে পড়ল বলল --- চল এখানে বসে কাজ নেই। জাহ্নবী যতই বলে -- আমি আছি কোনও ভয় নেই, অনীশ পাত্তা দেয় না। জাহ্নবীকে সঙ্গে নিয়ে এসে হাজির হল নন্দন রবীন্দ্র সদনের সামনে জাহ্নবী বলল, চল, এখান থেকে পালিয়ে যাইদুজনে মিলে ঘর সংসার পাতব।’ ইতিমধ্যে আকাশে কালো মেঘ ছেয়ে গেছে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে বৃষ্টি এল বলে জাহ্নবীকে সঙ্গে নিয়ে শিশির মঞ্চের দেওয়ালে এক ধারে একটা দরজার শেডের তলে আশ্রয় নিল শুরু হল প্রবল বর্ষণ ওদের অসমাপ্ত মিলনের পরবর্তী পর্বটি শুরু হতে বেশি সময় নিল নাআজও বৃষ্টিস্নাত দুই নরনারী পোশাকমুক্ত হয়ে সহবাসে লিপ্ত হল

মেট্রোতে করে ফিরছিল ওরা রবীন্দ্র সরোবরে নামল দুজনেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে বেরোনোর সময় অনীশের হাত ধরে জাহ্নবী বলে, তোমার বাড়ি কোথায় বল, আমি তোমার বাড়ি যাব। বুকটা ধকরে উঠল অনীশের। এই শ্রেণির মেয়ে যদি তাঁর বাড়িতে যাতায়াত শুরু করে এবং সমস্ত ঘটনা বলে দেয় তাহলে  সর্বনাশ হবেসে কিছুটা থমকে বলে, তুমি বড় সরল। এত সরল হয়ো নাচলি দেখা হবে আবার।’ বলেই টুক করে উঠে পড়ল বাসেমেয়েটি একেবারে প্রত্যাশা করেনি অনীশের এই ব্যবহার সে ফ্যালফ্যাল করে  তাকিয়ে থাকল অনীশ আর পিছনে ফিরে তাকায়নি, ওদের দুজনের কোনওদিন দেখাও হয়নি!




0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন