![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৭ |
স্বপ্নদ্রষ্টা
“বিষদুষ্ট”! এই বার্তা-, এই রক্তবাহিত অক্ষরমজুরের দল অধীক্ষকের বাম অলিন্দে যায়, এবং তিনি, স্বপ্ন-বিভাগের মুখ্য অধীক্ষক, যা একজন ব্যক্তির ঘুমন্ত সৃজনশীলতা-, সংবেদন-উদগত-, সেন্সরমুক্ত করে ‘ঘুমে-দ্রুত-চক্ষু-সঞ্চালন’কে আরও দ্রুত করার দিকে এগিয়ে দেন।” ওকে‘র নিচে নামছাপ-সহ সইটুকু মাত্র। তাই নটরাজন-, কালো-জাদুবিদ -প্রতিদিন ঘুমোতে যাবার আগে, তাঁর ঝোলা থেকে পোষ-মানা চন্দ্রবোড়া সাপের একটি বিষ-থলি নিজের পছন্দমত স্বপ্ন দিয়ে প্রতিস্থাপিত করত, এবং স্বাভাবিকের চেয়ে লম্বা ঘুমকেন্দ্রিক জিভটাকে পোষা ছোবলের সামনে উলঙ্গ করে দিত। ঘুম হয় গাঢ়-নীল, তাঁর চোখে জড়িয়ে আসত। সে-সব ঘুম, যে-সব ঘুম সবার চোখে থাকে না, সে-সব চোখ, যে-সব চোখ সবার ঘুমে থাকে না - সেই সব ঘুম, সেই সব চোখের সামনে, নটরাজন জানলা খুলে দিত। খোলা জানলা দিয়ে দৃশ্যমান রাতের আকাশ - নিকষ অন্ধকার - যেন এক অসীম প্রেক্ষাগৃহ, রাত বড় গভীর, স্বপ্নের কুশীলবেরা একে একে নিজের ভুমিকা নিয়ে হাজির হত। প্রায় প্রত্যেক স্বপ্নে নতুন নতুন তীব্র ও সৃজনশীল কামনার জন্ম হত, ভবিষ্যতের গর্ভে ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনার মত অনিঃশেষ এক প্রজাতি-, এই অনুভূতিমালা নটরাজনকে ঘিরে যে অস্পষ্ট কুয়াশার বলয় তৈরি করেছিল, যার বর্ণলাল শ্লেষ্মার ঘ্রাণ উপভোগ করতে- সভ্যতার পরতে পরতে তাঁর ছিল ঢাকাই মসলিন স্বচ্ছতা- বস্তুত প্রেক্ষাগৃহ- ক্ষুধাতুর দর্শকের উদ্দেশ্য হত।
০০০০শব্দ শোনা যায়।, পায়ের শব্দ, কলিং বেলের শব্দ, প্রতিরোধের দরজা ভাঙার শব্দ, ধস্তাধস্তি, আর্তনাদ আর শীৎকারের শব্দ; বিশেষে নিঃশব্দেরও শব্দ শোনা যায়। অবশেষে, নেকড়ের খাদ্যের তালিকাভুক্তির কাছে এই পদ যার- যখন গাছপাকা জামরুলের মাংস, তার খিল আলগা হয়ে যায়, আত্মসমর্পণ করা ছাড়া শব্দের আর কোনো উপায় থাকে না।
অট্টহাসির শব্দ সীমাহীন -- শোনা যায়! মজ্জায় ভরা মাংসপুষ্ট হাড় চূর্ণ করার দিকে দাঁতের অনন্তযাত্রার শব্দ- শোনা যায়। অনন্ত পূর্ণচ্ছেদ সম্ভাবনার দিকে সম্ভাবনা তৈরি করার শব্দ- শোনা যায়!
ছোট তথ্যচিত্রটি কমবেশি ত্রিশ মিনিটের, তারপর একটি পূর্ণচ্ছেদের অনন্ত শব্দ শোনা যেত। আর প্রেক্ষাগৃহের অনন্ত দর্শক, ‘পূর্ণচ্ছেদের অনন্ত শব্দ’ … মানে ‘পূর্ণচ্ছেদের অনন্ত শব্দ’… ইত্যাদি, শুনতে শুনতে সেই অনন্ত যাত্রায় মিলিয়ে যেত।
আবহ মূর্ছনা আর দর্শকদের শব্দহীন করতালির আঁতাতে প্রেক্ষাগৃহ যখন উত্তাল, নটরাজন যার-সীমা-নেই খুশি হয়। “দ্য হাংরি হাউলিং উলফ”-এর চমৎকার অ্যান্টি-হিরো ইমেজ, নটরাজনের অনির্ধারিত মানসিক ভারসাম্যহীনতা, রোগ নিরাময়ের জন্য এক বিশেষ কালোজাদু পদ্ধতি, সর্বকালের সর্বোচ্চ টিআরপি রেকর্ড অর্জন করে, এবং এই ‘খুশি’তে, নটরাজন-, একজন বিষদুষ্ট স্বপ্নদ্রষ্টা, অতিরিক্ত পান-ভোজনের শেষে এক লম্বা শব্দ-ঘুমে চলে যায়। কেবল তাঁর ঘরের শ্বেত-রোগগ্রস্ত দেয়ালে ঝোলানো একটি প্রাচীন মূল্যবোধের ডেডলক ঘড়ির আত্মা, পুনরুত্থান পর্যন্ত যে গভীর-নীরবতা-ধ্যানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল—, নিয়ম ভেঙে একটা মৃত দীর্ঘশ্বাস ফেলল, কোনো শব্দ শোনা গেল না। ভোর চারটের আগেই ---,
নটরাজনের দরজার সামনে একটা ভ্যান এসে দাঁড়াল। এত তাড়াতাড়ি! একী স্বপ্ন নয়? স্বপ্ন।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন