কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / তৃতীয় সংখ্যা / ১৪২

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

অরিজিৎ হাজরা

 

অসত্যের ইতিহাসে চাপা পড়ে যাওয়া সত্যের সুভাষ


 

ভারতের স্বাধীনতা লাভের একটি ইতিহাস রয়েছে। যেখানে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে বহু অসত্য তথ্যকে। একাধিক ভুল তথ্যকে জোর করে ভারতের ইতিহাসের পাতায় স্থান দেওয়া হয়েছে একশ্রেণীর ক্ষমতালোভিদের অঙ্গুলী হেলনে। ভারতের প্রজন্মের পর প্রজন্ম এটা জেনে আসছে যে, ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য মহাত্মা গান্ধী ও জওহারলাল নেহরুর অবদান সবচেয়ে বেশি। অথচ স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজী   সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভূমিকাকে গুরুত্বহীন করা হয়েছে ভারতের প্রচলিত ইতিহাসে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেণ্ট এটলির কথা থেকে পরিষ্কার ভাবে জানতে পারি, ১৯৪৬ সালের ১৫ই  মার্চ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভারতের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, "today the national Idea has  spread in all the branches and inspired by a new spirit of patriotism not least per heps among some of this INS soldiers who have done such wonderful service in all war."। এছাড়া স্বাধীনতার পর যখন ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ভারতে আসেন তখন ভারতের স্বাধীনতায় গান্ধীজী ও নেহরুর অবদান প্রসঙ্গে বলেছিলেন, 'very minimum'। এরপরও ইতিহাস রচনাকারীরা কংগ্রেসের চাপে ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনা করেছে তাদের মনোমতো। আসলে নেহরুর পরিকল্পনায় ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে চিরতরে ভারতবর্ষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা। এবং সেই সঙ্গে সকলের কাছে নিজেকে একজন সৎ ও জাতীয় নেতা রূপে প্রতিষ্ঠিত করা। এছাড়া স্বাধীন ভারতের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতার মালিক হওয়ার বাসনা ছিল নেহরুর একমাত্র উদ্দেশ্য। তাই নেহরুর ক্ষমতা পাওয়ার একমাত্র পথের কাঁটা সুভাষচন্দ্রকে ভারতের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার জন্য ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনার সাজানো কথা সফলভাবে ভারতবাসীর কাছে প্রচার করেছিলেন। যা আজও বেশিরভাগ জনগণই মনে প্রাণে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে বহু তথ্য প্রমাণের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে সকলের কাছেই যে, ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় কথা ছিল নেহেরু ও গান্ধীজীর এবং কংগ্রেসের একটি গভীর ষড়যন্ত্র। আমেরিকার গুপ্তচর বিভাগ C.I.Aএর একটি গোপন রিপোর্টে পরিষ্কার বলা হয়েছে--' The government and people of USA do not believe that so called death of Subhash Chandra Bose is that reported plan crash is true. more over some people including a field nurse have seen after the incident there is very possibility that Subhash is alive।' এছাড়া pmo file no 915/11/0/6/96 এর page no  ২৭৮ এর ৫ পয়েন্টে আরো বিস্ময়কর তথ্য বর্ণিত হয়েছে-' British intelligence submitted a secret report to wave government on 8 April 1946 which noted that probably Bose reached Russian territory and that Gandhiji and Nehru also received some secret communication from him।' উল্লেখিত দুটি তথ্যই কি যথেষ্ট নয় যে নেতাজীকে নিয়ে ভুল ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন নেহরু ও গান্ধীজী।

সর্বশেষ নেতাজিকে নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিশন বিচারপতি মনোজকুমার মুখার্জির নেতৃত্বাধীন কমিশন অফ দা রেকর্ড স্বীকার করেছেন যে ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের মৃত্যু হয়নি। ২০০৫  সালে কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়া রিপোর্টের উপসংহারে তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছেন- ১. বর্তমানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র জীবিত নেই, প্রয়াত হয়েছেন। ২. বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যু হয়নি। ৩. জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রাখা চিতাভস্ম নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নয়। এছাড়া মুখার্জি কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তৎকালীন ভারতের প্রতিরক্ষা ও বিদেশ মন্ত্রী প্রণব মুখার্জী, প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী নটবর সিং, লক্ষ্মীসায়গল প্রভৃতিরা নেতাজীর বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন মুখার্জী কমিশনের সামনে।  এমনকি বসু পরিবারের সদস্যরা (যাঁরা নেতাজীর মৃত্যু হয়েছে বলে স্বীকার করে প্রচার করতেন) কেউ  সশরীরে হাজির না হয়ে শুধুমাত্র একটি চিঠির মাধ্যমে কমিশনকে জানিয়ে দেন যে, তাঁদের কাছে ১৯৪৫ সালের বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজীর মৃত্যুর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। অর্থাৎ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে মিথ্যার গল্প বারবার রচনা করে গিয়েছে একশ্রেণীর কংগ্রেস-নেতারা। সুভাষের প্রতি যে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল তৎকালীন নেহরু বাহিনীর মাধ্যমে আজও তার অন্যথা বা সমাপ্ত হয়নি। একাধিকবার লোক দেখানো নেতাজীর মৃত্যু রহস্য কমিশন গঠন করা হয়েছে আর নেতাজির বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর কথা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ১৯৭৮ সালের ২৮এ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই সংসদে দাঁড়িয়ে  নেতাজীর মৃত্যু রহস্য সম্পর্কিত খোসলা কমিশন ও সাহানাজ কমিশনের রিপোর্ট খারিজ করে দেন এবং  বলেন দুটি রিপোর্টই মিথ্যা। এছাড়া ১৯৮৩ সালের ৬ জুলাই প্রকাশ্য এক সমাবেশে বলেন, নেতাজী জীবিত  রয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি এক সন্ন্যাসী। দেশের প্রধানমন্ত্রীর এত বড় স্বীকারোক্তির পর আর কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয় কোনো ভারতীয়র মনে।

ভারতের স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে আসার পরও কি কংগ্রেসের তৈরি ইতিহাসকে মান্যতা দিয়ে ভুল ইতিহাসকে শিখব আমরা? প্রতিমুহূর্তে নেতাজীকে নিয়ে যে ভুল ইতিহাস সৃষ্টি করা হয়েছে তার পরিসমাপ্তি হওয়া একান্ত প্রয়োজন। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের একান্ত উচিত নেতাজীকে নিয়ে যে নেতিবাচক ইতিহাস  সৃষ্টি করে গেছে কংগ্রেস, তার বিরুদ্ধে সঠিক সত্য ইতিহাস প্রকাশ করা প্রতিটি ভারতবাসীর সামনে। নেতাজীকে নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার বিষয় থাকুক সংসদের উভয়কক্ষে। প্রতিবছর একটি করে স্বাধীনতা দিবস  উদযাপিত হয় আর ঠিক পরক্ষণেই নেতাজী আবার ঢাকা পড়ে যান অসত্য ইতিহাসের জঞ্জালে। যে মানুষটির  জন্য ভারতবর্ষের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে আজ সেই বিশ্ববরেণ্যকে অবহেলা করে চলেছি  আমরা। এটা অত্যন্ত দুঃখ ও ক্ষোভের ব্যাপার। আর তাই অবিল্পম্বে প্রকাশ পাক অসত্যের ইতিহাসে চাপা পড়ে যাওয়া সত্যের সুভাষ।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন