ধারাবাহিক উপন্যাস
ছেঁড়া শেকড়ের অন্তরাখ্যান
(১৮)
Tell me not, in mournful numbers, Life is but an empty dream!
ধীরেন্দ্রনাথ বলতেন শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী, নরেশচন্দ্র মিত্র প্রমুখ অভিনীত থিয়েটার দেখার কথা। স্ত্রীকে নিয়ে গেছেন দু-একবার যদিও তারাসুন্দরীর আগ্রহ ছিল না, তেমন বুঝতেও পারেন নি। ধীরেন্দ্রনাথের মতে এঁদের সমতুল্য যোগ্যতাসম্পন্ন পরিচালক বা অভিনেতা আর নেই। নিজের যৌবনে শিশির ভাদুড়ির পরিচালনায় পৌরাণিক, ঐতিহাসিক বা সামাজিক থিয়েটার দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর মনে উজ্জ্বল। প্রতিষ্ঠালব্ধ সাহিত্যিকদের উপন্যাসের সার্থক নাটক হত সেই সময়ে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের লেখা চন্দ্রগুপ্ত নাটকের সংলাপ তিনি আজও গড়গড় করে বলে দিতে পারেন, "সত্য সেলুকাস! কি বিচিত্র এই দেশ! দিনে প্রচণ্ড সূর্যের গাঢ় নীল আকাশ পুড়িয়ে দিয়ে যায়; আর রাত্রিকালে শুভ্র চন্দ্রমা এসে তাকে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় স্নান করিয়ে দেয়। তামসী রাত্রে অগণ্য উজ্জ্বল জ্যোতিঃপুঞ্জে যখন এ আকাশ ঝলমল করে, আমি বিস্মিত আতঙ্কে চেয়ে থাকি। প্রাবৃটে ঘনকৃষ্ণ মেঘরাশি গুরু-গম্ভীর-গর্জনে প্রকাণ্ড দৈত্যসৈন্যের মত এর আকাশ ছেয়ে আসে; আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখি।”
ধীরেন্দ্রনাথ রোমাঞ্চিত হন, শিশির ভাদুড়ি অতুলনীয় ছিলেন চানক্যের ভূমিকায়, "মনে রেখো নন্দ! যেদিন এই অপমানিত ব্রাহ্মণের মুক্ত শিখা আবার আবদ্ধ হবে, সেদিন জানবে—নন্দবংশ ধ্বংস হয়েছে!"
নাট্যাচার্য গত হয়েছেন বেশীদিন হয়নি। অহীন্দ্র চৌধুরী স্টেজ-শো বন্ধ করেছেন ‘শাহ্জাহান’ নাটকে শেষ অভিনয়ের পর। সম্প্রতি সামান্য কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করছেন। বিজন ভট্টাচার্যের নাটকও তিনি দেখেছেন তবে ধীরেন্দ্রনাথ পছন্দ করতে পারেন নি। সর্বক্ষণ মনের মধ্যে দেশভাগজনিত যে চাপা যন্ত্রণার অনুভব, স্টেজের ওপর সেই দুঃখকষ্ট আর দেখতে চান না। তাঁর স্কুলের দিলীপ বলে ছেলেটি একটি নাটক দেখতে যেতে তাঁকে অনুরোধ করেছিল। বলেছিল এক ছোকরা ডিরেক্টর নাকি নতুন থিয়েটার নামিয়েছে। সে ইংরাজিতেও নাটক করে, খুব পারদর্শী! ধীরেন্দ্রনাথের গোপন আত্মশ্লাঘা ক্ষুন্ন হয়েছে। ভূগোলের মাস্টারমশাই হলেও সাহেবী আমলে ইংরাজি তিনি কিছু কম শেখেন নি। মনে পড়ে ছাত্রবেলায় মুখস্থ করা কবিতার স্তবক,
Tell me not, in mournful numbers,
Life is but an empty dream!
For the soul is dead that slumbers,
And things are not what they seem.
ভেতরে চাপা গরিমা কাজ করে, এপাড়ায় তাঁর সমকক্ষ শিক্ষিত আর নেই। মাইলদুই দূরে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে স্কুল তৈরির সূত্রে, ওদেশে থাকতে তাঁরা ধনবান ছিলেন। তাঁর বড়ো ছেলে ডাক্তার, বয়সে অবশ্য ধীরেন্দ্রনাথের তুলনায় বেশ ছোটো। বাসাতে অনেক সদস্য, বাকিরাও শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত। দেশের বাড়ি থেকে অর্থাগম মন্দ ছিলনা, তাই এখানে এসে দালান তুলেছেন। ধীরেন্দ্রনাথের পুত্রকন্যারা কম-বেশী মেধাবী, অথচ এখনো তেমনভাবে প্রতিষ্ঠা পায়নি—কষ্ট ভুলতে পারেন না।
দিলীপের থিয়েটারের প্রস্তাবে তিনি রাজি হন নি, যাওয়ার ইচ্ছা হয়নি। বাসন্তী ও তার ভাই দিলীপের সঙ্গে গিয়ে দেখে এসেছে। বাসন্তী এসে উচ্ছ্বসিত গলায় বলেছিল, “আপনি গ্যালে অনেক ভাল লাগত কাকাবাবু। আমি আর চোখ সরাইতে পারি না! অ্যামন নাটক আগে কখনো কেউ দ্যাখে নাই।”
ধীরেন্দ্রনাথ তার কথার বিশেষ গুরুত্ব দেন নি। অল্পবয়সের মেয়ে, কী-ই বা বোঝে? বাসন্তী আগে নাটক দেখেনি। অতদূরে উত্তরের হলে প্রায় অচেনা জায়গায় একা যাওয়ার প্রশ্ন ওঠেনি। শুনেছে কালীঘাটের দিকে দু-একটা নতুন থিয়েটার হল হয়েছে। বাসন্তীর সিনেমার নেশা আছে, সিনেমা হলে নতুন বই এলে সে যাওয়ার সুযোগ খোঁজে। তবে একা যাওয়া যায় না। মিশুকে মেয়ে বলে পাড়ার কারো না কারো সঙ্গ জুটেও যায়। পাড়ার দু-তিন কিলোমিটারের মধ্যে বেশ বড়ো-বড়ো কয়েকটা স্টুডিয়ো আছে, সেখানে সিনেমা তোলা হয়। ট্রামডিপোর দিকে সোজা যেতে গেলে রাস্তাতেই একটা বেশ নামকরা স্টুডিয়ো পড়ে। ভেতরে ঢোকার ইচ্ছে হলেও সুযোগ হয়নি। নায়ক-নায়িকারা গাড়ির কাচ তুলে যাতায়াত করেন মস্ত গেটের মধ্য দিয়ে। ভেতরে ঢুকতে গেলে অনুমতিপত্র পেতে হয়, বাসন্তী অবশ্য চেষ্টা করেনি। ইদানিং স্কুল নিয়ে ব্যস্ততার জন্য তার সিনেমা দেখার নেশাতে ভাঁটা পড়েছে।
এপাড়ার মানুষ থিয়েটার না দেখলেও যাত্রা দেখে। শীতের রাতে কিম্বা দুর্গাপূজার পরে কাছেই বাজারের ফাঁকা মাঠে যাত্রাপার্টি আসে। সাতদিন ধরে হ্যাজাক জ্বেলে সারারাত জাঁকজমকের যাত্রাপালা চলে। নিস্পন্দ অন্ধকারের কোণায় দ্রিমদ্রিম ছড়িয়ে পড়ে কনসার্টের শব্দ। কাছাকাছি ডোবা, আগাছার ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থাকা পাতি-শেয়াল অথবা ভামবেড়াল সান্ধকালিন গলাসাধা ছেড়ে চুপ করে যায়।
কোনো দলে আজও পুরুষেরা মেয়ে সেজে পার্ট করে। তবে তেমন ঘটনা ইদানিং অনেক কম। উৎসবের মতো আশে-পাশের মানুষ পাড়াশুদ্ধ সকলে জড়ো হয়। শেফালীর যাওয়া বিশেষ পছন্দ করেন না যোগমায়া। বিশ্বনাথ গেলে তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। যোগমায়ার ধারণা অনেক বদস্বভাবের ‘ব্যাডা’ আসে, জাত-চরিত্রের ঠিক নেই। আলোহীন ঘনরাতে কুকর্ম করাই উদ্দেশ্য। মেয়েমানুষের সেখানে না যাওয়া ভালো। যোগমায়ার ভাবনায় ভুল নেই, অন্ধকারে লোভের চোখ বেশী লকলকে। তবু সারাদিনের কাজকর্ম সেরে মেয়েরা মিলে দল বেঁধে যায়, রাতশেষে ফিরেও আসে গায়ে-গায়ে একদল হয়ে। তারই মধ্যে ফিশফিশ করে অশ্লীল টিটকিরি, গা-ঘেঁষে শরীর স্পর্শ করে যাওয়ার ঘটনাও কম ঘটেনা। তবে এদের তুলনায় সৎ, সংগ্রামী, আদর্শনিষ্ঠ মানুষ সংখ্যায় বেশী। বাসন্তীর জবরদস্তিতে অমলা বিয়ের আগে দু-একবার গেছে, তার তত ভালো লাগেনি। সিনেমা দেখতেও তত উৎসাহ পেত না। স্বভাবে ঘরকুনো অমলা গল্প-উপন্যাসের বইয়ের পাতায় ঘাড় গুঁজে দিন কাটাতে সবচেয়ে ভালোবাসত। অঙ্গার দেখার কথা অমলাকেও বলেছে বাসন্তী।
দিবাকরের সঙ্গে মিনার্ভাতে অমলা দেখে এসেছে অঙ্গার। প্রথমে যেতে চায়নি, দেখে এসে বুকের মধ্যেটা থমথমে হয়ে দমবন্ধ লেগেছে ক-দিন ধরে। স্টেজের ওপর ফুটে উঠেছিল তীক্ষ্ণ মর্মান্তিক সত্য। খনিতে আগুন লেগেছে, খাদানে আটকে-পড়া খনি-শ্রমিকদের করুণ মর্মভেদী মৃত্যু-চীৎকার দর্শকদের নাড়িয়ে দিয়েছে। সঙ্গে ভাগ্যহত পরিবারগুলো অসহায় বিলাপ—। অভূতপূর্ব হয়েছে মঞ্চ ও আলোর কাজ, ফলে নাটকটি এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যেন জীবন্ত ঘটছে। একেবারে সামনের সারিতে বসে দেখেছে অমলা। দিবাকর ইদানীং তাকে নানা বিষয় নিয়ে অনেক কথা বোঝায়, দেশভাগ-বিপর্যস্ত ছন্নছাড়া বাঙালিদের কথা বলে। অমলা মন দিয়ে শোনে, বোঝার চেষ্টা করে—তলিয়ে ভাবতে শিখছে ধীরে ধীরে। দিবাকর দু-একবার হলিউডের ছবি দেখাতেও নিয়ে গেছে মেট্রো সিনেমা হল-এ। ফিরে এসে বুঝিয়ে দিয়েছে গল্প। রূপবানীতে নতুন পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের ছবি তারা দেখে এসেছে। দেখে মুগ্ধ বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল অমলা—শেষদৃশ্যে চোখের জলে শাড়ির আঁচল ভিজেছে। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালি, অপরাজিত সে পড়ে ফেলেছে বেশ ক-বছর আগে। সেই কাহিনি নিয়ে এমন ‘বই’ হতে পারে, না দেখলে জানতেও পারত না। এবার মা’র কাছে গিয়ে ভেবেছিল কত গল্প করবে—পারেনি। বরের কথা বলতে লজ্জা ঘিরে ধরেছে। নিরঞ্জনকে তবু অল্প-স্বল্প বলেছে। ছোড়দিদির কথা খুব মনে হচ্ছিল, অনেককাল দেখা হয়নি। সেই পয়লা বৈশাখে ছোট্ট মেয়ে পুতুলকে সঙ্গে নিয়ে এসে মা-র কাছে ক-দিন ছিল আর অমলা শুধু একটিবার দেখা করে ফিরে গেছে। অমলা অবাক হয়ে যায়, তার ব্যক্তিগত জীবনেও আজকাল কত গল্প আছে! মনে হয়, দিবাকরকে ততটা বুঝতে না পেরেও বুঝি সত্যিকারের ভালোবাসছে, সহজ হয়ে আসছে যাপন। ভয় কেটে যাচ্ছে।
দিবাকর বিয়ের হপ্তাদুই পরে তাকে বলেছিল, “অমলা যদি আমি আবার আগের মতো লড়াইতে নামি, তুমি বাধা দিয়ো না, কেমন? তোমার সাপোর্ট না পাইলে আমি কাজ করতে পারব না।”
অমলা ভয় পেয়ে বলেছে, “লড়াই করবা ক্যান? মা আমারে কইছেন—,”
দিবাকর উদাসভাবে বলেছে, “মা কী বলেছে আমি জানি, অন্তত অনুমান করতে পারি। আমাকে যেন সংসারে আটকাও—তাড়াতাড়ি নাতি-নাতনির মুখ দেখতে চায়। বুঝি আমি, কিন্তু—তোমাকেও বুঝতে হবে—দেশের অবস্থা দেখছ না? তোমার বাপ-মায়ে কত কষ্টে আছেন বুঝ নাই?”
অমলা ভয় পেয়ে বলেছিল, “আমি তাইলে কী করব? কোথায় থাকব?”
“এইখানে থাকবে, আর কোথায় যাবে? সেইজন্যই কই, পরীক্ষা দিয়া পাশ করলে চাকরি পাইবা।”
“আর তুমি তখন কী করবা? লড়াই করবা? কার লগে?”
অমলার সরল প্রশ্নে সেদিন দিবাকর হেসে উঠেছে, জবাব দেয়নি।
বিয়ের ক-মাস পর সে প্রাক-বিবাহ জীবনের গোপন ঘটনা বলেছে স্ত্রীকে। সেসব ঘটনা ক-জন সহযোদ্ধা অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়া কেউ জানেনা। অমলাকে নিয়ে একদিন বেরিয়েছিল শহর চেনাতে, অমলা ওইসব জায়গার নাম পর্যন্ত জানত না। শুধু মনে আছে অনেকবছর আগে উত্তর কলকাতার একটা ছোট্ট বাসাবাড়িতে এসে থেকেছিল। বাবার চিঠি পেয়ে বড়দাদা, ছোড়দিদি তাকে আর নিরঞ্জনকে নিয়ে কলকাতায় এল। বড়দিদি মারা গেল ছেলে হতে গিয়ে। জামাইবাবুর সে কী কষ্ট–সে আবছা টের পেয়েছিল। শহরে তখন ভয়ানক দাঙ্গা লেগেছিল—মরণ চীৎকার, কার্ফ্যু, রক্তারক্তি, বীভৎস দিনকাল। সে আর নিরঞ্জন দরজা-জানালা বন্ধ সেই ঘুপচি বাসাতে গায়ে-গায়ে লেগে বসে থাকত। বড়োরা তাদের ভয়-ডরকে যেন গুরুত্বই দিত না। এরপর দ্রুত ঘটনাপ্রবাহ পরিবর্তনে পুরোনো কথা অমলার তত স্পষ্ট মনে নেই।
উত্তর কলকাতায় অনেক টানা রিকশা চলে, রিকশাওয়ালারা বেশীর ভাগ গরীব বিহারী। গাঁট্টাগোট্টা পেশিবহুল শরীর, অনেক খাটতে পারে। বাঙালিরা এদের বলে ‘খোট্টা’। দিবাকরের বাসা থেকে কয়েকমিনিট হেঁটে গেলে বড়ো রাস্তা, ট্রামলাইন, বাসের ষ্টপ। ছেলের সঙ্গে অমলা বেরোলে কনকপ্রভা আপত্তি করেন না, বরং নীরব প্রশ্রয় থাকে। মনে-প্রাণে চান তাঁর পুত্রটি যেন এবার সংসারমুখী হয়। বাইরে যত রুক্ষতা দেখান, অমলার মৃদু, স্নিগ্ধ, বাধ্য স্বভাবে পুত্রবধূর ওপর স্নেহ জন্মেছে, খানিক ভরসাও। যেদিন অমলাকে নিয়ে প্রথম বেরিয়েছিল দিবাকর, জানতে চেয়েছিলেন, “দুফরকালে না ঘুমাইয়া তরা কই যাস রে?”
নির্বিকারমুখে দিবাকর বলেছিল, “রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ দেখাইয়া আনি গিয়া। এইদিকের দেখি কিছুই দেখি চিনে না।”
ট্রামে করে কিছুদূর গিয়ে অমলাকে নামিয়েছিল দিবাকর, তারপর হাঁটতে শুরু করেছিল। সায়েন্স কলেজের সামনে নিয়ে দাঁড় করাল, অবাকচোখে দেখল অমলা। চলতে চলতে এল রাজাবাজার বস্তি অঞ্চলে। সেখানে মালপত্রের গুদাম—নোংরা, ঘিঞ্জি, মানুষের অস্থায়ী মাথাগোঁজার আস্তানা। উস্কোখুস্কো চেহারার নারী-পুরুষ কাজকর্ম করছে। উদোম-ল্যাংটা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে পথের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে। তার মতো কোনো মহিলাকে এই পথে দেখতে পেল না অমলা। অস্বস্তিতে গায়ের কাপড় ভালো করে টেনে দিবাকরের পাশে সরে এসে নীচু গলায় বলেছিল, “বাসায় ফিরবা না?”
দিবাকর তার দিকে চেয়ে সস্নেহে বলেছিল, “এরাও মানুষ অমলা। দ্যাখ ক্যামনে বাস করে!”
অমলার মুখ কাঁদো-কাঁদো, “আমার ভাল্লাগতাছে না। বাসায় চলো।”
ক-দিন ব্যস্ত ছিল দিবাকর, তেমন আর কথাবার্তা হয়নি। এক রাতের নিভৃতিতে অমলাকে হেসে বলেছিল, “আবার যাবা ওই জাগাতে? জানবা না ওরা কারা, কোত্থেকে আসছে!”
অমলা ছদ্ম রাগ দেখিয়ে উত্তর দেয়নি। দিবাকর বলল, “আরও কয়টা জাগা তোমাকে দেখায়ে আনব। জোড়াসাঁকোতে রবিঠাকুরের পৈতৃক বাড়ি, প্রেসিডেন্সি কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, কফি হাউস, আর—,”
উৎসাহ জেগেছিল অমলার, কৌতূহলী হয়ে বলেছিল, “রবিঠাকুরের বাড়ি এইখানে বুঝি?”
“হ্যাঁ। যাবে? ওইখান থেকে বেশী দূর নয়, দু-এক মেইল হবে—আরেক জাগা আছে।”
“সেইটা কী?”
“সোনাগাছি—পতিতাপল্লী। ওয়ান অফ দি বিগেষ্ট রেড্ লাইট এরিয়া ইন এশিয়া। নাম শুনছ?”
“কী?” অমলা চমকে উঠে দিবাকরের মুখের দিকে তাকিয়েছিল। দিবাকর সামান্য হেসে ঘষা গলায় বলেছিল, “কী হইল? চিন্তায় পড়লা নাকি? না না, তোমারে সেইখানে নিয়ে যাব না। কিন্তু জান কী আমি গেছি—আগে—।”
রাত অনেক তখন, পাড়ার অন্ধকার গলি। কুকুরের চীৎকার শোনা যায় মাঝে-মাঝে, বেশ দূর থেকে ভেসে আসে জড়ানো অস্পষ্ট পুরুষকণ্ঠের কোলাহল। অমলার প্রায়ই ভয়-ভয় করে, যদিও কাউকে বলে না। অমলা অনুভব করল, শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নামছে। শরীর ঘামে ভিজে উঠছে। দিবাকর স্ত্রীর দিকে তাকাল। খড়খড়ির ফাঁক ধরে রাস্তা থেকে ল্যাম্পপোস্টের আলোর সরু রেখা তেড়ছা হয়ে ঢুকেছে ঘরে। দিবাকরের ফর্সা, দৃঢ়, পেশীবহুল হাত আলগাভাবে রাখা ছিল অমলার কোমরে। তাদের শারীরিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে তার অল্প কিছুদিন আগে, বিয়ের বেশ পরে। অমলা ধাতস্থ হয়নি, ভয় ও লজ্জা দুইই সমভাবে বর্তমান, সঙ্কোচে সে গুটিয়ে থাকে। দিবাকর অবশ্য জোর করে না। সোনাগাছির নাম শুনে উঠে বসেছিল অমলা। তার ঘন চুলে লম্বা বেনী, ধ্যাবড়ানো সিঁদুর। আলগা কাপড় সরে গিয়ে ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে উদ্ধত, উজ্জ্বল, শরীরাভাস। গলার সোনার চেইন ঘামে লেপ্টে গিয়ে মাধুর্য বাড়িয়েছে। দিবাকর স্বাভাবিকভাবে উত্থিত হয়ে উঠছিল, দমন করে সংযত হয়ে উঠে অমলার পাশে বসল। একহাতের বেড়ে তাকে নিয়ে বলল, “ভয় পাইলা নাকি? ভয়ের কারণ নাই।”
অমলার মুখের দিকে চেয়ে দেখল, দুটি সরল সুন্দর বিস্মিত ব্যথিত চোখ একরাশ প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে আছে। কষ্ট হল দিবাকরের। বলল, “আমাকে অবিশ্বাস কইর না। বলছি শোন।”
দিবাকর তখন বি-এস-সি শেষ করেছে। ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও কালীকিঙ্করের অনেক আশায় জল ঢেলে ইতিমধ্যেই জড়িয়ে পড়েছে রাজনীতিতে। দেশভাগ, যন্ত্রণাযাপন সে ও তার মতো অনেককে প্রবৃত্ত করেছিল রাজনীতির মঞ্চে সরাসরি প্রবেশ করতে। বারবার মনে হয়েছিল, এত রক্তপাতের শেষে কোন স্বাধীনতা পাওয়া গেল? প্রথমে গোপন ছিল যোগদান, ক্রমশঃ পরিচিত হয়ে উঠতে লাগল। পুলিশের খাতায় নাম উঠল। একদিন পুলিশ তাদের গোপন কেন্দ্রটি রেইড করল। টের পেয়ে দিবাকর ও তার সহযোদ্ধারা পালাতে বাধ্য হল। রাজাবাজার অঞ্চলে বস্তির পাশ দিয়ে পালাতে গিয়ে দিক-দিশা হারিয়ে কখন দিবাকর বেখায়ালে ঢুকে পড়েছিল সোনাগাছিতে। সেখানে তার উদ্ভ্রান্ত চেহারা দেখে আশ্রয় দিয়েছিল মরিয়ম নামের পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা যুবতী। সে নিজের ঘর ছেড়ে দিয়েছিল।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিবাকরের কাহিনি শুনছিল অমলা। থামার পর জানতে চাইল, “কেমন দেখতে তাকে?”
দিবাকরের চোখ করুণ হয়ে গিয়েছিল, “কেমন দ্যাখতে? শুনবে? কাল, রোগা, হারগিলা পাখির মতো একখান শরীর, আনএডুকেটেড মুসলমান মাইয়া। আমাকে বলল, ‘ভাইজান, আপনের বয়স আমার ছুডো ভাইডার মতো। তারে হারাইয়া ফালাইছি। সে কই আছে জানতে পারি নাই। পালানের যন্তনা আমি বুঝি। আপনে আমার ঘরে থাকেন। কয়দিন আমি পাশের ঘরে টিয়ারানির লগে থাকুম।’ আমার হাতে টাকা-পয়সা কিছু ছিল না। তারে কিছু দিতে পারি নাই। খালি বললাম, দিদি, ভালোদিন আনার জন্য আমরা লড়াই করতাছি, তুমি আশীর্বাদ দাও।”
অমলা নির্বাক হয়ে বসেছিল। দিবাকরের যেন জিদ চেপে গিয়েছিল। বলল, “ছিলাম দুইটা দিন। শেষরক্ষা হইল না। সোনাগাছির ব্যবসা ত আইনত বে-আইনি। দুঃখী মেয়েগুলা নিজেরা কই যাবে, ঠিক নাই। ইসের মধ্যে খবর পেয়ে পুলিশ রেইড করল, এইবার পালাতে পারলাম না। জেলে নিল পুলিশ। জামিন পেলাম না, মুচলেকা দিয়ে বার হইয়া আসতে পারলাম না। দেড় বছরের উপর ফাটকে বন্দী রইলাম—সশ্রম কারাদণ্ড।”
শুনতে শুনতে অমলার মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল। বিয়ের আগে ধীরেন্দ্রনাথ কিছুই বলেন নি, শুধু বলেছিলেন, “অনেক বিদ্বান, বড় ভাল ছেলে—।”
অমলা আস্তে আস্তে নিজের বালিশে মাথা রেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, “জেলখানার কথা বলবা না?”
দিবাকর অবাক হয়ে বলেছিল, “এখন আর না, পরে বলব’নে। তুমি রাগ কর নাই ত অমলা?”
(ক্রমশঃ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন