কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শৌভিক দে

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

জগত পারাবারের তীরে

বিবস্বানের তখন মুঠোফোনে প্রাণ। তার সামনে টুলের ওপর ঝুঁকে বসা শঙ্খ-টাক ভদ্রলোকও তদ্রূপ। অন্তত একশো কোটি দেশবাসী - তাদেরও এক দশা। খাদ্যাভাব, দুর্নীতি, যুদ্ধ, দাঙ্গা, দিদি, দাদা কিছুই এখন গুরুত্বপূর্ণ নয়। শুধু আপামর ভারতীয় একমনে চাইছে - হে 'বৃহৎ বাহুবলী', হে কলি যুগের ঈশ্বর, হে ভারতের অস্মিতা - মারো - মারো - শুধু একটি ছক্কা হাঁকাও। দৌড়ে আসছেন 'জ্যাম-জেলি খান' - 'বাহুবলী' ঈষৎ টেরচা করে উঠিয়েছেন ব্যাট - ছক্কা শুধু সময়ের অপেক্ষা - এমন সময় -

- ' ও মা কচি! তুমি এখানে একা একা? ভালোই হয়েছে - ফ্রি আছো তো? একটু গোলুমোলুকে নাও না গো - জাস্ট পাঁচ মিনিট । আমি এই নাইটির দোকানে যাব আর আসব। প্লিজ - ধরো'।

মুঠোফোন থেকে মুখ তুলতে না তুলতেই বিবস্বানের কোলে এসে পড়ল এক গোলগাল শিশু। তার বিশ্ব সুন্দরী মাকে ঠিকঠাক চিনে ওঠার আগেই তিনি ত্বরিত গতিতে সেঁধিয়ে গেলেন চৈত্র সেলের ষাঁড়াষাঁড়ি গণ বন্যায়। বাহুবলী বল ফসকালেন আর...। কোলের শিশুটি - বিবস্বানের অসতর্কতার সুযোগে তার হাত থেকে মুঠোফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে আছড়ে দিল সামনে বসা টুলো পন্ডিতের চকচকে ব্রহ্মতালুতে। নিখুঁত স্টাম্পড আউট - কিন্তু -- এ সব কি হচ্ছে?

চৈত্র সেলের শেষ রবিবার। সেদিন আবার টি টোয়েন্টি ম্যাচ। আজকের লড়াই এক্কেবারে মরণ বাঁচন। অবশ্য প্রতিটি ম্যাচই তেমন হয়। বৈদিক ভারতে যে যুদ্ধ হত, তা ছিল দৈবিক ব্যাপার। কলিযুগে সেই পরাক্রম - দৈনিক ক্রিকেটে এসে ঠেকেছে। অর্থাৎ আগে লড়াই হত দু এক যুগ পেরিয়ে, এখন হুজুগ প্রায় প্রতিদিন। হোক। তবু সে খেলা না দেখা দেশদ্রোহিতার সমান। তাই বলে চৈত্র সেলকে অবহেলা? সেও তো ঘোর পাপ, ফল ছত্রভঙ্গ। আজ বিবস্বান কিছুতেই আসতে চায়নি। কিন্তু ঘরে যে খেলা হয় তার আইন আলাদা ও একমুখী। তিন বছর বয়সী স্ত্রীর কাছে গো হারা হেরে বিবস্বানকে গোঁ ছাড়তে হয়েছে। ফলত সে এখন এই শপিং মলে ত্রিভঙ্গ মুরারী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

কিছু কিছু বুড়ো খেলোয়াড় দলে পুষলে যেমন লোকান ফায়দা থাকে - তেমনি এখানেও দু একটা পরোক্ষ লাভ আছে। মলে কেন্দ্রীয় শীতাতপ, কাজেই  ঘরের ঠান্ডা খরচ বাঁচল।  দ্বিতীয়ত  ফ্রি ওয়াই ফাই। তৃতীয়ত বিবস্বানকে এক জায়গায় স্থাপিত করে অন্তত ঘণ্টা তিনেক তার  স্ত্রী মিঠি চারিদিক উড়ে বেড়াবে। সেই বিরল স্বাধীনতার প্রহরে - শুধু বিসিসি আর সিসিসি, কোক, চিপস, ক্রিকেট। হাতে মুঠোফোন, জমে ক্ষীর মন। অসুবিধে বলতে শপিং মলে বসার জায়গা অতি অল্প। কিছু কিছু রেস্তরাঁ অবশ্য একসঙ্গে বসার ও খেলা দেখার ব্যবস্থা করে থাকে। কিন্তু তাদের মোলায়েম বেয়ারারা - পাঁচ মিনিট ছেড়ে ছেড়েই - মধুর হেসে কাছে এসে জিজ্ঞেস করতে থাকে 'স্যার আর কিছু ট্রাই করবেন? আমাদের কঁ-তিনা-তাল মেনু, কিম্বা থাই, কিম্বা চাইনিজ, কিম্বা পেশোয়ারী'? কথা কিছু কিছু বুঝে নিতে হয়। হয় কিছু অর্ডার দিন, নইলে মৌরী নিন। এটা বেয়ারাদেরও বেয়াড়ামি নয়। মালিকের স্লোগান 'ক্রিকেট দেখুন, পকেট ভরুন'। তাদের পৃথিবী ইজ নট ক্রিকেট।

বহুবার এখানে আসার সূত্রে বিবস্বান জানে - এই মলের তিন তলার রেলিং ঘেঁষে - একটা নির্দিষ্ট কোণে - কনুইয়ের গুঁতো কম আর এসির হাওয়া বেশী। কাজেই যত ভিড় হোক না কেন - সেই কোণটি একবার দখল হলে মোটের উপর আরামে কালাতিপাত করা যায়। আজও সেখানেই দাঁড়িয়েছিল সে। সামনে কোনো এক দোকানের কর্মচারী টুল পেতে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল।

ভুল বলা হল। ডিউটি থেকে কিছুটা সময় চুরি করে সেও দেশের সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ ক্রিকেট দেখছিল। দেখুক গে। বিবস্বান পৌনে দুঘণ্টা যেন মহাকাশযাত্রী। পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক শুধু ইথারে। ঘাঁটি বলতে স্টেডিয়ামের মাটি। এখন এই শেষ বেলায় যখন রক্তচাপ অন্তত দুশো বাই একশ দশ - হঠাত গ্রহাণু গোছের এই শিশুর সঙ্গে কলিশন। অবশ্য - এ গ্রহাণু হলে - দুর্গ্রহ আর বলে কাকে। এসেই  বিবস্বানের মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়েছে। মুঠোফোন ছাড়া মানুষ যেন খর্পর ছাড়া কাপালিক। পাল্টা ছিনিয়ে নেবার আগেই ... আগে কি হয়েছে সে তো আগেই বলা হয়েছে। এবার সেখানে ফেরা যাক।

একে তো 'বৃহৎ বাহুবলীর' ছক্কা - ফক্কা হয়ে গেছে - শিরে বজ্রাঘাত। তার ওপর অরক্ষিত মাথায় বিবস্বানের ভারি মুঠোফোন আছড়ে পড়তে টুলে বসা ভদ্রলোক এক হায়দারী হাঁক ছাড়লেন। রঘু ডাকাতের সময় হলে বলা যেত ঝম্প বাজিয়ে দেওয়া। ডাকাতি করার সময় আতঙ্ক ছড়াতে তেমন হাঁকা হত। এখন তো সে সব শিল্প যাদুঘরে, ছেলে পিলেরাও আর ডাকাতের গল্প শুনতে চায় না। কিন্তু ডাকাত গেলেও - আতঙ্ক আছে। সন্ত্রাসবাদী হানা না কি? মুহূর্তে পালা পালা রব উঠল চারিদিকে ।

এক মেদবতী মহিলা - দু হাতে গোটা পনেরো প্যাকেট - ছুটতে গিয়ে ভাঙলেন বাঁ পায়ের পেন্সিল হিল। তারপর 'চৈতন্য-লীলায় বিনোদিনী' র মত এলিয়ে পড়তে যাচ্ছিলেন মাটিতে - একজন স্বেচ্ছাসেবক জড়িয়ে ধরলেন তাকে। অতি লজ্জিত ভদ্রমহিলা জিভ কেটে বললেন 'ভেরি সরি'। অনিচ্ছায় তাকে আলিঙ্গন মুক্ত করে স্বেচ্ছাসেবক বললেন 'মাই প্লেজার - অ্যাঁক'। তার ঘাড়ে হাত পড়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের, স্ত্রী ছিলেন পিছনেই। হিলভাঙ্গা মহিলার রাগ ভেঙ্গে পড়ল টুলওয়ালার ওপর। এ যখন বিদেশী আক্রমণ নয় - সরকারও দায়ী নয় - তখন তাৎক্ষণিক বিচার। ভদ্রমহিলা তার বেঁটে ছাতা বের করে দমাদম দাওয়াই দিয়ে দিলেন টুলওয়ালাকে। মুখে বললেন 'কোলিক পেন হয় তো ঠিকঠাক চিকিৎসা করান না কেন? এ রকম ষাঁড়ের মত যেখানে সেখানে চেঁচাতে আছে? বাচ্চাটা কত ভয় পেলো। আর রকম দেখো। একজন ভদ্রলোক বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে ঘামছেন আর দামড়াটা টুলে বসে আছে আকবর বাদশার মত। ঝাঁটা মারি'। টুলোর কোন ভুল নেই। কিন্তু ... জনতা রাগলে গিলোটিন ঘাড়ে নেমে আসে, এ তো শুধু ছাতার বাড়ি। ভাগ্যিস কাছে পিঠে ঝাঁটা ছিল না, আর ওনারও তাড়া ছিল। তাই আবার জনস্রোত বইতে লাগলো। যেমন বয়। করুণ মুখে ধুলো ঝেড়ে টুলোবাবু উঠলেন ভূমিশয্যা ছেড়ে। সামনেই বাচ্চা কোলে বিবস্বান। ইতি মধ্যে সে অপরাধী মুঠোফোন - ঝপ করে কুড়িয়ে টপ করে -  জেব যাত করে ফেলেছে। সমবেদনা নিয়ে জিজ্ঞেস করল -- 'খুব লেগেছে আপনার? ইস'।

= 'না না তেমন লাগেনি। ও সব চাইনিজ ছাতা, দম নেই। হত যদি সেকালের বাঁকানো বাঁশের - আমাকে আর উঠে বসতে হত না। কিন্তু কে যে মারল মাথায় - যাকগে। আপনি ... আপনি বসবেন টুলে? এটার আবার এই পায়াটা জখম, অন্যদিকে ভর দিয়ে বসতে হয়। এই যে এই দিকটা। বুঝলেন তো'?

বিবস্বান ঘাড় নেড়ে পালাতে পারলে বাঁচে। কিন্তু - এই - গোলুমোলু নামের গোলমেলে শিশুটিকে ঠেকাল তাকে। সেই ভ্যানিশিং মা আসবেন এইখানেই খুঁজতে। না পেলে হয়ত বাচ্চা চুরির কেস দিয়ে দেবেন। চেনেন তাকে। এমন কি তার ডাক নাম কচি পর্যন্ত তার ঠোঁটস্ত। ফিরল আবার টুলো-বাবুর পাশে। তিনি তখন গভীর অভিমান নিয়ে বসে আছেন। ফিরতে দেখে সখেদে বললেন -

- ' আরে পরের বলেই ছক্কা হাঁকড়েছে বাহুবলী। দেখতে পেলাম না। সেই মুহূর্তেই কে মাথায় ...। একবার যদি 'শা___ ' কে পাই - বুঝলেন'।

= ' না, না কাউকে তো দেখিনি। আসলে আমার মনে হয় - আপনি এত মনোযোগ দিয়ে ম্যাচ দেখছিলেন ভেবেছেন ওই বাউন্সারটা আপনারই মাথায় লেগেছে। মানে ... এমন হতেই পারে ...'।

-   ' বলছেন? কে জানে। আমার না সত্যি - খেলা দেখার সময় জ্ঞান থাকে না। এই তো - একবার পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের ম্যাচ। শেষ ছক্কাটা ভারত হাঁকড়াতেই  - সামনে দেখি সোফায় লুঙ্গি পরে বসে আমার শ্বশুর মশাই । আর যায় কোথায়  - মার মার করে ওনাকে কষে কটা কীল চড় দিয়ে দিলাম। খাঁটি দেশ প্রেম - বুঝলেন না - পাকিস্তানী পেলাম না তো যে কোনো লুঙ্গি পরা...। বুঝলেন তো'?

= ' বলেন কি'?

-  ' হ্যাঁ তারপর তো ডিভোর্স হয় হয়। শ্বশুর রাজি। নেহাত শাউড়ী মেয়ে ফেরত নিতে চাইলেন না তাই ...বুঝলেন তো'?

= ' বুঝলাম। বড় ফাঁড়া গেছে আপনার'।

-  ' আসলে কীল চড়ে শ্বশুর মশাইয়ের তেমন লাগেনি । আমি সঙ্গে অট্যোমেটিক গালাগালি গুলো - সে গুলো - মানে - বুঝছেন তো'।

= ' হ্যাঁ, হ্যাঁ, বুঝলাম বৈকি। আমিও একটু আধটু ক্রিকেট দেখি'।

-  ' একটু আধটু ? এ কি কথা?  ক্রিকেট দেখা দেশ মাতৃকার আরাধনা। সত্যিকারের দেশ প্রেম না থাকলে কারু ক্রিকেট দেখা উচিৎ না। কিন্তু একটা কথা, মনে মনে ভাবলে কি মাথায় ... দেখুন একটা আব গজিয়েছে। এরকম হয় ... কি বুঝলেন'?

বিবস্বান আর্ট ফিল্ম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যা বুঝবার নিজে বুঝে নে। এদিকে মিঠিও আসে না । গোলুমোলুর মাও দেখা দেন না। বাচ্চাটা নিষ্পাপ মুখে বিবস্বানের সার্টের পকেট থেকে পেনটা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল নিচের তলায়। বিবস্বান চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও সামলে নিল। একটু আগের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। গেল তিনশ তেরো টাকা। এরপর মাটিতে পড়ল সিগারেটের প্যাকেট। কুড়োবার আগেই সেটা উঠিয়ে নিল টুলো-বাবু। উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখ।

- ' বাঃ। ডানহিল। কত দিন খাইনি। একটা নিচ্ছি। ওহো, এখানে তো আবার সিগারেট খাওয়া মানা। আমি ওই গলিটা থেকে খেয়ে আসছি একটা। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড'।

গেল তো গেল, আর এলো না। সচরাচর এত দামী সিগারেট খায় না বিবস্বান। অভিজাত মলে হাই প্রোফাইল সাজবার চক্করে কিনে রেখে ছিল বুক পকেট। হপ্তা খানেক মৌজ করে খেত। গেল প্যাকেটটা। নিষ্পাপ হাত সাফাই আর কাকে বলে। তবু অল্পে হল। বাউন্সারের গল্পটা খেয়ে গেছে - না হয় এক প্যাকেট সিগারেট খেল। যেমন সব 'বুঝলেন' দেশপ্রেমিক। ঠিকঠাক বুঝলে - হাসপাতালের বিল ডানহিলের থেকে অনেক বেশিই হত।

এইবারে দূরে দেখা গেল মিঠিকে। মুখে হাজার ওয়াটের বাতি জ্বেলে আসছে। মনে হচ্ছে আগামী কিটি পার্টিতে চ্যালেঞ্জ দেবার জন্যে যথেষ্ট মাল মশলা পেয়েছে সে। কিন্তু কাছাকাছি এসেই তার মুখের সার্চ লাইট নিভে গেল এক্কেবারে। সেই অন্ধকারে বনলতা সেন বিবস্বানের দিকে আঙুল তুলে বললেন -

- এই বাচ্চাটা কার'?

বিবস্বান হাঁ করার আগেই শিশুটি মুখ থেকে দুটো আঙুল বার করে বলল -

- ' ওতা বাবা'।

হিরোশিমায় আণবিক বিস্ফোরণের বিস্ময় কি আরো বেশী ছিল। বিবস্বান আর মিঠি দুজনেই হাঁ করে দেখতে থাকল বাচ্চাটিকে। বিস্ময়ে বাক-বন্ধ। প্রথম জ্ঞান ফিরল মিঠির।

-  ' ও কি বলল'?

= ' আরে বাচ্চারা কত কি বলে । কোথাও শুনেছে ...'।

-  ' সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি । যা বলল সেটা শুনল কোথায় '?

= ' আরে আমি কি জানি। ওর মা কোথা থেকে দৌড়ে এসে আমার কোলে গছিয়ে দিয়ে আবার গায়েব হয়েছে, খুঁজেই পাচ্ছি না'।

-  ' বটে। তুমি ওনাকে চেন না - তোমার কোলে বাচ্চা দিয়ে চলে গেল। বাচ্চাটাও কেমন শান্ত হয়ে রয়েছে তোমার কোলে। অচেনা হলে থাকত'?

= ' আরে এ মোটেও শান্ত নয় ...'।

-  ' ওওও । ও যে শান্ত নয় তুমি কি করে জানলে? মাকে তো চেন না বলছ'।

= ' না ... মানে ... আমাকে হয়ত চেনে । বলল তো কচি একটু বাচ্চাটাকে ধরো তো ...'।

-  ' বাবাবা । তোমার মত দামড়ার ডাক নাম কচি তাও তিনি জানেন আর তুমি বলছ - চিনিনা। দেয়ার ইজ আ লিমিট বিব'।

= ' না, না শোনো আমার কথা। এত তাড়াতাড়ি সব ঘটে গেল - হয়ত আমিও চিনি ওনাকে। কিন্তু তখন মোবাইল দেখছিলাম, তেমন খেয়াল করে দেখিনি'।

-  ' মোবাইল দেখার সময় বিদ্যা বুদ্ধি লোপ পায় সে আমি জানি । পরশুই তো ওটস এ দুধের বদলে চা ঢালছিলে। দ্যাট মে বি পারডনড। তাই বলে জলজ্যান্ত বাচ্চা নিয়ে নেবে?কাম ক্লিন।  এ তোমার আগের পক্ষের সন্তান - তাই না? তোমার আগে একটা - কটা কে জানে - বিয়ে ছিল, রাইট? বিব আই কান্ট বিলিভ দ্যাট আই হ্যাভ ম্যারিড টু আ ...'।

= ' আরে ধ্যুত। ইংরেজি বলে ব্যাপারটা সিরিয়াস করোনা। বিলিভ মি আই টুক হিম মোস্ট ক্যাজুয়ালি ...'।

-  ' টুক আ বেবি মোস্ট ক্যাজুয়ালি? উই আর ম্যারিড ফর থ্রি ইয়ার্স এন্ড কুড নট ইভন প্ল্যান ফর'?

= ' আরে সে প্ল্যান তো করলেই হত, ইজিলি আমরা -'।

-  'ইজিলি বাচ্চা? তোমার কাছে তো ইজি হবেই, দায়িত্ব নেই যখন। আমি একবার ভেবে ছিলাম তোমার মত এলিজিবল ব্যাচেলর কেন তেত্রিশ বছর পর্যন্ত বিয়ে করোনি। এন্ড নাও আই রিপেন্ট ... ফোঁস ফোঁস'।

= ' দেখ দেখ কি কাণ্ড। এই - এই গোলুমোলু - তোর মাকে ডাক না । চিৎকার করে একবার ডাকতো সোনা বাবা'।

-  ' মাই ঘড! এর নাম তুমি জানো, কত আদর করে বলছ, আর শুধু মাকেই ডিনাই করছ? আমি ... আমি... '।

= ' শোনো শোনো মিঠি - কি করে বোঝাই - এ আমার ছেলে নয়। এর মাকে আমি চিনি না। আমার আগে কোনো দিন বিয়ে হয় নি'।

-  ' কি সহজে তুমি তোমার জীবন থেকে প্রথম স্ত্রী-পুত্রকে মুছে ফেলছ - তাহলে একদিন আমাকেও ...? ফোঁস ফোঁস'।

= ' কি আপদ। নেই কিছু তো মুছবো কি? এই এই - বাপ রে - ছাড় ছাড় এটা আমার আঁচিল । বডি অ্য়াটাচড, পেনের মত তোলা যাবে না । লাগছে, লাগছে, ছাড় বাবা'।

-  ' আর কত লোকাবে মিস্টার বাবা, তোমার বুকের বাঁদিকে আঁচিল আছে সেটাও এই বাচ্চা জানে । স্টিল ইউ ডিফাই, ইভেন গড মাস্ট বি ক্রেজি...'।

= ' আরে শার্টের বোতাম খোলা, দেখে ফেলেছে। মিঠি প্লিজ সিন ক্রিয়েট করো না। চল বাড়ি সব বুঝিয়ে বলছি'।

-  ' এই বাচ্চাটা কে নিয়ে যাবে'?

= ' আরে পাগল না কি? সেও তো বটে। এর মা গেল কই? নাইটি কিনতে কি টি পার্টিতে চলে গেল '।

-  ' দেখ বিব - বাড়ি আমি একাই যাচ্ছি আর তুমি, তোমার বাচ্চা -- ওমা আ আ আ। ফুলকি-দি ই ই ই'!

বিবস্বানও চেঁচিয়ে উঠল - ওই তো ওই তো। কিন্তু তাকে এক ধাক্কায় চুপ করিয়ে উচ্ছ্বসিত মিঠি কলবলিয়ে উঠল -

-  ' তুমিও এসেছ আজ। কতদিন পরে দেখা হল। জনিদা কোথায়? আসেনি? চুল স্টেপসে কাটালে বুঝি। পুরো ভোল বদলে ফেলেছ চেনাই যাচ্ছে না । অন্তত দশ বছর বয়েস কমিয়ে ফেলেছ। কোমরের টায়ার গুলোও কত কমে গেছে। কি গো চিনলে তো ফুলকি-দি কে। অমন ভ্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলে কেন?সেই যে বিয়ের দিন বাসরঘরে তোমাকে কচি পাঁঠা কচি পাঁঠা বলে কত রঙ্গ করল। ভাবো ফুলকি-দি তিন বছর হয়ে গেল ...'।

এই প্রবল কথার তোড়ের মধ্যে দু একবার বিবস্বান আর ম্যাডাম ফুলকি হাঁ করেছে আর বন্ধ করেছে।এবার মিঠি একটু দম নিতে থামলে হাসি মুখে ফুলকি বলল -

-  ' আর বলিস না আসতেই পারছি না । তোর জনিদার ট্যুরের পরে ট্যুর। আজ রবিবার আমি বললাম - যাবই। ঠেলে গুঁতিয়ে টিভি থেকে তুলে আনলাম। কিন্তু এখানে এসেই - ইউ নো - মেন ডেন বলে যে বিয়ার পাবটা হয়েছে - সোজা সেখানে সেঁধিয়েছে।ইউ নো- দ্য প্লেস ইজ টু আর্লি ফর গোলুমোলু। আবার এত ভিড় দোকানে যদি সাফোকেটেড হয়ে যায়। ভাবছি যখন - তখন দেখি আরে! কচি দাঁড়িয়ে, একদম বেকার। ব্যাস প্রব্লেম সলভড। ওর কোলে গোলুমোলুকে দিয়ে টুক করে কটা কাপড় নিয়ে এলাম। কচির ভুঁড়িটাও একেবারে জনির মাপেমাপে। গোলুমোলু ভুঁড়ি এত ভালবাসে না, কি বলব। তবে কচি বোধহয় আমাকে চিনতে পারোনি, তাই না কচি'।

বিবস্বান কাষ্ঠ হাসি হেসে বলল -

- ' না ঠিক মানে - এত বয়স কমিয়ে ফেলেছেন - মনে করছিলাম কোনো কলেজ পড়ুয়া বোধ হয়'।

ফুলকি-দি ব্লাশার ছাড়াই লাল হল। তারপর বিবস্বানের গাল টিপে বলল -

- ' ইউ নটি বয়। ফ্লার্টিং মি...'।

মিঠি মাছি তাড়ানোর মত প্রসঙ্গটা খারিজ করে বলল -

- 'যেতে দাও তো ওর কথা। যাকে তাকে ফ্লার্ট করে। কোনও এস্থেটিক সেন্স নেই। ছাড়ো - কি কিনলে গো? ওদিকের দোকানটাতে এত সস্তা ইউ কান্ট বিলিভ ...'।

এরপর প্রায় মিনিট দশেক বটগাছের মত স্থাণু হয়ে গোলুমোলুকে কোল দিল বিবস্বান। গোলুমোলু প্রাণপণে হাতড়াচ্ছে বিবস্বানের সারা গা। যদি কিছু টেনে ছুঁড়ে ফেলা যায় আর মেসি হয়ে পাস কাটাচ্ছে বিবস্বান। সাবধানতা বশত শার্টের বোতামও সব লাগানো । কিছু না পেয়ে হয়ত আঁচিলটাই উপড়ে নিল। শিশু না শিশুপাল। হটাত ফুলকি-দি ছটফট করে উঠলেন -

-  'আরে নটা বেজে গেল । আর কিছুতেই জনিকে একা রাখা যাবে না । তিনটে বিয়ার সাবড়েছে নিশ্চয়ই বাই দিস টাইম। ভেরি নটি ইউ নো। আয় আয় গোলু নইলে তোর ড্যাডি আর গাড়ি চালাতেই পারবে না। বাই মিঠি, বাই কচি। এসো একবার আমাদের ফ্লাটে । এই শনিবারই আসতে পারো ডিনারে। একটা ওরিজিনাল ডালমোর অরেঞ্জ ফ্লেভার আছে, একশো বছর পুরনো। ওটা খেলে না - জনি একেবারে জনি লিভার হয়ে যায়। মাই মাই । সি ইউ ফর নাও। বাই'।

ঠিক যখন এক ট্রাপিজ থেকে আর এক ট্রাপিজে গোলুমোলুর  বিনিময় ঘটছে - সে খুঁজে পেলো তার আরাধ্য। এক ঝটকায় বিবস্বানের চশমা খুলে ছুঁড়ে ফেলল - সেই একতালায়। সেটা প্রথমে এক মহিলার এয়ার হোস্টেস খোঁপায় ল্যান্ড করেই পড়ল মাটিতে আর অজস্র পায়ের চাপে ...। তিনশো তের টাকার জন্যে চেঁচায়নি বিবস্বান। কিন্তু এবার আর বিলাপ ধরে রাখতে পারল না। নিমাই হারা শচী দেবীর মত হায় হায় করে উঠল।  ভীষণ লজ্জিত ফুলকি-দি তখনি মুঠোফোন বার করে টাকা ট্র্যান্সফার করতে উদ্যত।  কিন্তু সম্পর্কটা শ্বশুর বাড়ির তরফে তায় শ্যালিকা। বুকের পাথর বুকেই ভেঙ্গে প্রাণপণে না না করে দিল সে। আরেক দফা 'সরি' বলে ফুলকি-দি নিভে গেলেন।

মিঠি যেন আগের তেতো কথা ভুলেই গেছে । গদগদ হয়ে গোলুমোলুর যাবার পথ দেখতে দেখতে নিজের হাত থেকে সতেরোটা ব্যাগ বিবস্বানের হাতে চালান করে দিল। তারপর খুব মিষ্টি করে বলল -

-  ' তুমি তখন যেটা বলছিলে ... আমি গা করিনি'?

= ' সে তো বটেই । তুমি তো সতীন খুঁজছিলে'।

-  ' আরে ছাড়ো না ওসব তুচ্ছ কথা। আমি অন্য কথা বলছি'।

= ' কি '?

-  ' আমাদের এবার এরকম খুব মিষ্টি একটা ... কি বল না'।

= ' তুমিতো মিস্টি পছন্দ করো না '।

-  ' ঢং। বলছি এবার আমাদের একটা গোলুমোলুর মত বাচ্চা নেওয়া উচিৎ, কি শান্ত, কি মিষ্টি...'।

= ' গোলুমোলুর মত? হে ঈশ্বর ।এ জানে না এ কি বলছে। তাছাড়া সে প্রজেক্ট-টার জন্যে বাড়ি তো যেতে হবে। চশমা ভেঙ্গে দিল, এখন গাড়ি চালাবো কি করে'?

-  ' সে না হয় ক্যাব করে নেবো কিন্তু বাচ্চাটা সো লাভলি...'

এরপরের গল্পটা অন্য রকম। সেন্সরে আটকাবে। কিন্তু অনেক ওপরে মা ষষ্ঠী ঠাকরোন প্রজাপতি-ঋষি  ব্রহ্মাকে বললেন-

- ' বুঝলেন ঠাকুর - এ আই - মানে কি একটা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মর্তে খুব শোরগোল হচ্ছে । কিন্তু আমাদের চাকরি পাকা। সে যাই করুক - আপনার, আমার আর মদনার কাজে  হাত ছোঁয়াতে পারবে না । ঠিক কি না'।

আকাশে পাতালে মর্মর ধ্বনি উঠল ' ঠিক, ঠিক'।

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন