কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / সপ্তম সংখ্যা / ১৪৬

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্মৃতিকণা সামন্ত

 

দেহি পদপল্লব


 

গল্পেরা ওড়ে ফানুসের মতো। গল্পেরা বেমিশাল। গল্পেরা যেন জমানোর কুবভাঁড়, খুচরোর মেহফিল। গল্পেরা ঠিক কপালের কোণে একফোঁটা গাঢ় তিল...

কিম্বা গল্পেরা ঠিক রাস্তার মতো, জঙ্গল ফুঁড়ে, নদী পেরিয়ে, গ্রাম পেরিয়ে দূরে চলে যায়। সর্ষে ক্ষেত ছুঁয়ে আকাশের গা ঘেঁষে দিকশূন্যপুরের খোঁজে। নভেম্বরের কিশোরী শীত জানুয়ারির শেষাশেষি মাঝবয়সী।  জমিতে জমিতে আলু আর সরষের নকশী কাঁথার ফোঁড় সাজু আর রুপাইয়ের জন্য চোখ বিছিয়ে বসে আছে মরা রোদের কোলে। নকশী কাঁথার গায়ে হরিতকি আর শালের সবুজ পাড়। সোঁদা আর বুনো গন্ধ মিলেমিশে লাট খাওয়ার কথা ছিল লাল মোরামের রাস্তায়। পিচ ঢেকেছে সেইসব গেরস্থালি ধুলো। গন্ধটা মিনিবাসের ছাদে চড়ে উড়ে যাচ্ছে দূরে, অজয়ের ধারে।

অজয়ের সাথে চেনাশোনা সেই স্কুলবয়সে। বাংলা ক্লাসের আখতারনামায় কবি কুমুদরঞ্জনের ডেরার প্রথম হদিস। তারপর গঙ্গা দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল, পাড় ভাঙার দুর্নাম ঘোচেনি অজয়ের। অকুলিন দুই নদী বয়ে গেছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কুলকুল, অন্যটি দামোদর।

লালমাটির বীরভূমে শীত আসে বেড়ালের পায়ে। পুজো-পারানি ভোরের গায়ে কারা যেন শিশির ছুপে যায় রোজ। দেখতে দেখতে অজয়ের বুকে পাক দিয়ে ওঠে কুয়াশার চাপ। মাঠে মাঠে খবর যায়। গৌরগোঁসাই তার ঝুলিতে আরো দুটো তাপ্পি মেরে দেয় বচ্ছরকার মতো। একতারার গাবগুব ফেনিয়ে ওঠে হাওয়ায়। উৎসবের বতর ভাসে অজয়ের জলে। খেজুরের গাছে নিরান দিতে দিতে তোষলা পরবের দিন গোনে আব্দুল রশিদ। ঘরে ঘরে নতুন ধানের ভাপ ওঠে।

রাস্তাটা থামে অজয়ের গায়ে। গল্পরা খোঁজে পারানির মাঝি। মরা শীতে বেবাক রাস্তা চলে যায় ইলাম বাজারের দিকে। কয়লার ট্রাক চলে যায় এপার ওপার। গল্পটা নেমে পড়ে জলে, এপারে কেঁদুলি গ্রাম। ওপারে থমকে থাকে মানুষ, খড়ের চাল, আর লাউডগার নিশ্চিন্তিপুর।

পৌষ সংক্রান্তির মেলা ফুরিয়েছে। তবু অজয়ের  দখলদারি ছাড়েনি বাঁশের ছাউনী, প্লাস্টিক, ছেঁড়া কাঁথা, ভাঙা বোতল আর অগুনতি আবর্জনা। বেলাশেষে পড়ে আছে স্মৃতির ফোস্কার মতো–কবে বর্ষা এসে ভাসিয়ে নেবে সব দগদগে ঘা, তারই অপেক্ষায়।

মেঘৈর্ম্মেদুরম্বরং বনভুবহ্শ্যা মাস্তমালদ্রুমৈ

নক্তং ভীরুরয়ং ত্বমেব তদিমং রাধে গৃহং প্রাপয় |

ইত্থং নন্দ-নিদেশতশ্চলিতয়োঃ প্রত্যধ্বকুঞ্জদ্রুমং

রাধামাধবয়োজয়স্তি যমুনাকুলে রহঃ কেলয়ঃ ||(গীতগোবিন্দ)

মেঘে মেদুর আকাশখানি, বনভূমি তমাল ছায়ায় ঢাকা।

কাল রাত্রি, কানুকুঞ্জে অভিসারে শ্রীমতী রাধিকা।

যে যমুনার জল মেঘের ছায়ায় কালনাগিনী হয়ে উঠত যখন তখন সে এখন ইন্তেকালের দিন গোনে তাজমহলের খিড়কি দরজায়।

মস্ত বাউল একাডেমি। মানুষ খুঁজবে নাকি বাউল? যে বাউল মাটির থেকে দূরে সে বিদেশ যাবে। মাটির মানুষ পড়ে থাকবে খড়ের চালায়, ধুনির আলোয় দু ছিলিম নেশার টানে।

গল্পরা নেমেছে রাস্তায়। রাস্তা অনেক। সব রাস্তাই চলে যায় কুঞ্জের দিকে।  বাকিটা ঢেকে দেয় গোষ্ঠের ধুলো। পথের অধিকারী মাত্র নিষ্কাম ভক্ত। মোড়ের মাথা থেকে ফেরা গ্রামের রাস্তায় মনিহারি আর মুদির দোকান। সাধুর আস্তানায় গৃহীর ক্যামোফ্লেজ।

মরা অজয়ের কোলে কান পাতলেই জলের শব্দ। তাল রূপকে কেউ কি গাইল প্রলয় পয়োধি জলে....?

 

(২)

 

লাল মাটি আর চোতমাসের শিমুল রঙ ঢেলেছে রাজা বল্লাল সেনের মনে। ডাকিনী, যোগিনী, শঙ্খিনী, পদ্মিনীর দেশে পায়ে পায়ে ভয়। পদ্মিনী নারী আর রাজাকে গিলে খায় শ্যামরূপার গড়। তন্ত্র আর বেনোজলের পাক সিংহাসনের তলে তলে। রাজপুত্তুর লক্ষণের সাধ্য কি তাকে বাঁচায়? ভেসে যায় সোনার ঘর, ঠিক যেমনটা ভাসায় অজয়।

আখড়ার গায়ে আখড়া আর তার ভেতরে মানুষ। টুকরো মানুষ, জীর্ণ মানুষ। তবুও মানুষ খোঁজার বিরাম কই? পার্বতী দাসী দাঁড়ায় আখড়ার চৌকাঠ ধরে। গান গায় বটে উত্তম বাউল। তবে সে এখন ভিনগাঁয়। আখড়ার খোঁজ ফেরে মুখে মুখে। সাধন বৈরাগী আর মাকি কাজুমির ঘরদোর পাতা থাকে দেশে দেশে। বৈরাগী চলে গেছে ওপারে, ফেলে গেছে একতারা। নিজের বাউলপনায় দাবি না থাকলে তন্ময় বাউলের দাবি হয় কি গুরুর পাতা ঘরদোরে? হয় না বলেই ঘর পালানো বাউন্ডুলে এখন ঘোর বাউল। সংসার পাতা সাধনার নামে। শুনশান অজয়ের ধার, ঝুপঝুপ অন্ধকার।

শীতের সাথে পাল্লা দেওয়া লেমন গ্রাসের লিকার চা। মেটে দাওয়ায় গান ধরেছে বাউল তন্ময় কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার”।

গান এগোয় আর গানের ফাঁকে গল্প। গবেষক সুধীর চক্রবর্তীর সাথে গুরু সাধন বৈরাগ্যের আলাপ পুরনো। দুজনেই এখন পরপারের কলোনিতে। মাকি কাজুমি কি দেশে ফিরে গেল নাকি হাট গোবিন্দপুরে এখনো খুঁজে বেড়ায় ঘরের ভেতর ঘর? শরীর কাঠামোর সাধন শেষে  নাড়া বাঁধল গানের মঞ্চে? তন্ময় তার দিল্লি বোম্বে সফরের গল্প বলে। মেয়ে নন্দিতা। সে এখনো বাউল হয়ে ওঠেনি। হবে কিনা সে নিজেও জানেনা। গলার সুর টেক্কা দেয় তন্ময়কে।

অন্ধকার বাড়ছে হালুইকরের কড়া পাকের ছাঁচে। পড়তে চায় নন্দিতা। বিদেশের মঞ্চ এখনো লোভ দেখায় না। নন্দিতা খোঁজে ব্যস্ত শহর আর কলেজের করিডোর। বাউল বাপ চায় রোজগার। টুয়েলভের পর পড়াশোনার পাট চুকিয়ে গান গাইবে? এই কি দস্তুর?

দরবেশী ঝোলা কাঁধে ট্যুরিস্ট নেহাত সখের খরিদ্দার। নন্দিতাকে রাস্তা দেখাই সাধ্য কী? তবু শেষ কথাটা বলতেই হয়, বলতেই হয় বিশ্বজোড়া ফকিরির নামে কসম খেয়ে... বলি, ভয় কি রে মা? আনন্দই তো সাধনার মোক্ষ। পড়ে আনন্দ পেলে পড়বি, গান গাইতে চাইলে গাইবি। এ জীবন পীর মুর্শেদের । অন্য কেউ চালায় সাধ্য কী? নন্দিতার নরম চোখ বিশ্বাস করতে চায়। ইচ্ছে করে মাথার ওপর হাত রাখি। তবুও বলা হয় কই আছি তো!?

 

(৩)

 

গোলকচাঁপা ফুলের মতো সকাল। হলদে রোদের সাইকেল লাল মোরামের রাস্তায়।  সর্ষেফুলের মেহফিলে কে ওস্তাদ, কে সাগরিদ পরখ করে কে? বাউল একাডেমির ওপারে আখড়া, মনের মানুষ। জয়দেব থেকে জয়দেবে গড়িয়ে যায় বছর,রোদের সিঁড়িতে পা ফেলে ফেলে সকাল আসে।

ঘন ঘুম সেরে গল্পেরা উঠে বসে, আড়মোড়া ভাঙে। পায়ে পায়ে রাস্তা যায় নদীর দিকে। বেআইনি বালি আর বাউল আসে একই পথে। বালি যায় আড়তে, রাধাবিনোদ মন্দিরে যায় বাউল।

ধোয়ী, শরণ, উমাপতি, গোবর্দ্ধন আর জয়দেব, এই পাঁচে লক্ষণের পঞ্চরত্ন হার। রাগে রাগে লড়াই বাধে নাকি পন্ডিতে পন্ডিতে? রাগের কারবারে জিতে যাওয়া কবি জয়দেব ডোবেন পদ্মাবতী সমর্পণে। কবির ঈশ্বর লেখেন দেহি পদপল্লবং মুদারম্ আর গীতগোবিন্দ ঝঙ্কার তোলে ঈশ্বরের সাক্ষী হয়ে। বসন্ত রসে মজে আকাশ বাতাস। পলাশ পাপড়িতে মদন ঠাকুরের নখের রঙ ঘন হয়ে এলে বসে রাসমন্ডল। কুঞ্জে কুঞ্জে ফুলের খবর, বাঁশির সুর ভেসে যায় যমুনা, কালিন্দী পার, অজয়ের তীর ছুঁয়ে সাগরের জলে।

গল্পরাও পথ খোঁজে পথের আছিলায়।  বাউল একাডেমী থেকে আরো উজিয়ে নদীর দিকে যেতে যেতে সকাল বাড়ে। রাগ ভৈরবী বয়ে যায় দীপকের টানে। তবু মাঝপথে কেউ বুঝি বেঁধে রাখে সুর।

সহজিয়া সাধনার গলিঘুঁজি ফেলে চওড়া রাস্তায় উঠে দিগন্ত ছুঁয়ে ফেলে রোদ। অজয়ের জলে নৌকা বাঁধা। সেই সহজ সুরে দুলতে দুলতে পথের খোঁজে পা ফেলেছে আসামের গায়েত্রী কৃষ্ণাত্রেয়। মস্ত জায়গা জুড়ে নদীর গায়ে যে অরণি তারই ম্যানেজার হয়ে আসা পঞ্চাশ পেরোনো গায়ত্রী নিজের পরিচয় দেয় যজুর্বেদী সনাতনী

হাওয়ার মেজাজ বুঝতে হলে সময় লাগে, তেমনই ঠিক পালের গতি। জম্বুদ্বীপ থেকে ভারত হয়ে ওঠার অনোখি দাস্তান এমনি এমনিই আঙ্গুল গুনে কষে ফেলবে গুরুঠাকুর?

বুদ্ধের কবরে যারা চুলোচুলি করে তারা মহাস্থবির আর মহাসাংঘিক। আগে ধম্ম না কি বুদ্ধ, আগে বুদ্ধ না কি ধম্ম। লড়তে লড়তে  কোর্টের লম্বা হাত ছাড়াই একটা রফায় আসে বুদ্ধিমান লোক।

ধম্মবাদীদের একদল বজ্রযান আর বজ্রযানের শাখানদীটি হয়ে বয়ে যায় সহজযানী মানুষ। ধম্মর রূপটি হল নারী। প্রজ্ঞা আর উপায়ের (প্রকৃতি আর পুরুষ) তত্ত্বে তত্ত্বে ঘুরপাক খায় পোড়া সংসারী মন। গোঁড়া শাস্তরে যা বলে বলুক দূরে, জাতবৈষ্ণবের সাধন ক্ষেত্রই নারীময়। নারীই শক্তি। শক্তির সাধনাই সিদ্ধাইয়ের পথ।

নেচার ফটোগ্রাফার গায়ত্রী যদি গাছের মগডালে উঠে নুড়িপাতা নদীর বুকে সূর্যাস্তের মায়ায় ইহজগত ভুলে মাটিতে পড়ে, সে দোষ তবে গায়ত্রীর নয়। সে দোষ তার হাজার হাজার বছরের মুগ্ধ হওয়া জিনে। সে দোষ সেইসব শিকারি যাযাবরের যারা হরিণ চোখের মায়া দেখে খালি হাতে ফিরে যেত ঘরে। গায়ত্রী সনাতনী। সনাতনী না হয়ে সে যায় কোথায়? সনাতনী মানুষের আপামর রেস। হোম যজ্ঞে আস্থা রেখে যজুর্বেদী হলে অজয় হোক বা যমুনা, নদীর তাতে থোড়াই কেয়ার।

রায় রামানন্দকে প্রভু চৈতন্য বলে চলেছেন এহ বাহ্য, আগে কহ আর...

 

(৪)

 

আস্ত সকাল লাট খেয়েছে দুব্বোঘাসের আগায়। জিলিপির প্যাঁচের ভেতর রসের খবর। দিওয়ানা দিল গল্পরা সব আগুন খোঁজে হাওয়ার গায়ে। ফড়িংডানায় সঙ্গীরা সব ভোকাট্টা।

শ্যামতমাল ছাওয়া অজয়ের ঘাট। ঘাটের পাথরে আলতাপরা পায়ের নিশান। কলসি কাঁখে ঘরে যায় পদ্মাবতী মেয়ে। জয়দেব ঠাকুরের সহজপাঠের ঘরে বসে থাকেন কবি। দক্ষিণদেশের পদ্মাবতীর তানে গৌড় রাগের রেশ। হাওয়ার টানে পাল তুলেছে মাঝি। বল্লাল সেনের বজরা ভেসে যায় গঙ্গা ফেলে অজয়ের দেশে।

দাস্য, সখ্য, ভক্তি, বাৎসল্য , প্রেমের ফর্দ নাকচ করতে করতে চৈতন্য ঠেকেছেন রাধাভাবে এসে। প্রভু চৈতন্যের কুঞ্জবনে গীতগোবিন্দের মুকুর, বর্ষার মেঘে মেঘে বিদ্যুৎলতার ঝিলিক। সহজবুদ্ধ আর তন্ত্রমন্ত্রে ডুবুডুবু মানুষকে ভাসায় নিত্যানন্দের হাল। কিন্তু ওই যে মানুষের সনাতনী অভ্যেস। রাধাভাবের তলে তলে বৈষ্ণব তন্ত্র আচার দিব্যি বেঁচে রইল ষোলকলায় টইটম্বুর হয়ে। বলাহাড়ি, সাহেবধনী, আউল, বাউল ভিড় করল সতীমার ঘোষপাড়া আর জয়দেবের কেন্দুলির খোপে খোপে।

গাছ থেকে পড়ে ডানদিক অবশ হয়ে যাওয়া গায়ত্রীর হাত আর ক্যামেরা ধরতে পারে না। নেচার ফটোগ্রাফির ক্যালাইডোস্কপিক স্মৃতি গলায় ঝুলিয়ে চাকরি খোঁজে এদিক সেদিক। আসামের সরকারি ওয়েবসাইট তার ছবির কদর করেছে সুদিনে, ছবির বদলে উপার্জনও, শুধু তার নাম দেয়নি কোথাও। এ যেন সন্তানের ওপর নিজের দাবি ছেড়ে দেওয়া... গায়ত্রীর মুখে বাদল মেঘের ছায়া।

ভেগান গায়ত্রী আর রেসের মাঠের জকি মনসুর আলমের এক ছাতার তলায় থাকা তলিয়ে না দেখলেও নেহাতই কাকতালীয়। রেসের মাঠের সারফেস আর ইনার টেনশন টানটান বাঁধা থাকে তেজী ঘোড়ার খুরে। লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকার দাঁওয়ে তখন মনসুরই ঈশ্বর। তারপর একদিন রেসের মাঠ থেকে বাতিল হয়ে যায় বুড়ো ঘোড়া আর ঘোড়ার ঈশ্বর। মনসুরের পিঠে ধন্নুর পেয়ারের নিশান। পিঠের মাংস খুবলে চলে এসেছিল জামা ধরে টানতে গিয়ে। আনজান ধন্নু। ইনসানি তওরতরিখা মালুম হবে কী করে?

আল্লাহ্পাকের দয়া। মনসুরের হাথ প্যেয়ের বাদ পড়েনি আজও। ঘোড়ার পিঠ থেকে বারবার পড়া, জিন্দা মনসুর রহমত দেখানো পরওয়ারদিগারকে ইনকার করবে এতবড় বুকের পাটা তার কই। হাজার লোকের শোরশারাবা পার, অজয়ের ধারে সখের বাগান-নবিশিতে উদাস হয় মনসুরের মন। বিজলি আর রাণীকে ছেড়ে দেয় ফার্মহাউসের মাঠে, মনসুরের আদরে গলা বাড়িয়ে চোখ বুজে থাকে।

সকালের ফিনকি দেওয়া আলোয় অজয়ের আদুল গায়ে লেগে থাকা কুয়াশা তখনও মোছেনি। পড়ে থাকা মেহগনির পাতায় তখনও ভেজা ভেজা শিশির। মাটির ঘরটার ঠিক বাইরে  রান্না চড়িয়েছে গায়ত্রী। সয়াবিন আর মরসুমী সবজি মিশিয়ে যে তরকারিটা ফুটছে কড়াইয়ে সেটাই তিনভাগে খাবে ভেগান গায়ত্রী। মনসুরের দাওয়াত ফ্রি। দাড়ি কাঁপিয়ে হাসে মনসুর ওসব ঘাসফুস আমার চলবেনা গায়ত্রী দিদি...। হাসে গায়েত্রী।

আসামি বোলো না, আমাদের আসামি বোলো না প্লিজ... আমার রাজ্যের নাম অহম, আমি আমরা অহমিয়া”।

আসাম থেকে আসা গায়ত্রী তার পরিচয় দেয় শব্দ বেছে বেছে যজুর্বেদী সনাতনী। আজকাল সনাতনী শব্দের গায়ে বড্ড বেশি রাজনীতির গন্ধ, বাতাসে ওড়া গন্ধকের মতো ভারী হয়ে যায় চারপাশ। গায়ত্রীর দেশের নাম ভারত। ইন্ডিয়া বিদেশি উচ্চারণ। গায়ত্রীর কথা শুনতে হয় বৈকি।

 তুমি কি রাজনৈতিক ধর্মবাদী গায়ত্রী?

হাসলে পঞ্চাশ পার গায়ত্রীকে বড় সুন্দর লাগে আজও। মনসুরের দিকে সরাসরি তাকায় গায়ত্রী — তা কেন? এই দেশ যতখানি আমার ততটাই মনসুর ভাইয়ের। আমার আর মনসুর ভাইয়ের আইডেনটিটি আলাদা, সেটা রাজনীতির বিষয় কেন হবে? হা হা করে হেসে ওঠা গায়ত্রীর কোলে পোষা বেড়ালটা এসে মুখ গুঁজে বসে। বেড়ালটার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেয় মনসুর।

দামী ক্যামেরাটা বিক্রি করে ফেলার গল্প বলে গায়ত্রী। রেসের মাঠ থেকে বাতিল হওয়ার গল্প বলে মনসুর। গায়ত্রী আর মনসুর কেউ কাউকে না চিনেই তল্পি গুটিয়ে এসে পড়ে অজয়ের ঘাটে।

অজয়ের স্রোত ছুটে যায় ডাকিনী যোগিনী, তন্ত্রমন্ত্রে রাজা বল্লাল সেনের গড়ে। রাজপুত্র লক্ষ্মণ রাজা হয়ে বসেন সিংহাসনে, আর গীত গোবিন্দে রাগ বড়ারীতে তান ধরেন কবি জয়দেব। সহজ বসন্ত আসে অজয়ের ঘাটে।

নাগাড়ে চৈতন্য বলে যান এহ বাহ্য, আগে কহ আর.... ঠিক তখনই আসে রাসের তিথি। পঞ্চরস, ষোড়শ শৃঙ্গারে  গেয়ে ওঠেন গীত গোবিন্দের কবি

বহতি মলয়সমীরে মদনমুপনিধায়

স্ফুটতি কুসুমনিকরে বিরহিহৃদয়দলনায় ||

সখি হে সীদতি তব বিরহে বনমালী ||

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন